মুসলিমদের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা বাংলাদেশে পালিত হওয়ার কথা ছিল ২০২৬ সালের ২৮ মে। কোরবানির ঈদ হিসেবে পরিচিত এ উৎসবকে ঘিরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশজুড়ে পশুর হাটগুলোতে তখন দেশি-বিদেশি নানা জাতের গরু বেচাকেনা জমে উঠেছিল। এমন সময়ে, ২০২৬ সালের ২৪ মে, সংবাদমাধ্যম জাগো নিউজ ২৪ ক্রেতাদের জন্য দেশি গরু চেনার একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করে। বাংলাদেশে কোরবানির জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় পশু গরু। প্রতিবেদনে বলা হয়, এর মধ্যে দেশি জাতের গরুর চাহিদাই সবচেয়ে বেশি, এবং বিগত কয়েক বছরে দেশের বাজারে এ চাহিদা বেড়েছে।
সাধারণত দেশি গরু বিদেশি বা শংকর জাতের গরুর তুলনায় আকারে কিছুটা ছোট হয়। প্রতিবেদনের ভাষ্য অনুযায়ী, কম চর্বিযুক্ত ও সুস্বাদু মাংস এবং সাধ্যের মধ্যে দামের কারণে ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় দেশি গরু শীর্ষে উঠে এসেছে, ফলে দিনদিন চাহিদাও বাড়ছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, দেশি গরুর এই বাড়তি চাহিদাকে কেন্দ্র করে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী প্রতারণার আশ্রয় নিচ্ছেন, আর অনেক সময় সাধারণ ক্রেতারা বিদেশি গরুকে দেশি গরু ভেবে কিনে প্রতারিত হন। তাই কোরবানির জন্য পছন্দ যদি দেশি গরু হয়, কেনার আগে এ সম্পর্কে সঠিক ধারণা রাখা জরুরি বলে পরামর্শ দেওয়া হয়।
এই প্রতিবেদনে দেশের গবেষকেরা যে পাঁচ ধরনের দেশি গরুকে আলাদাভাবে চিহ্নিত করেন, তার প্রতিটির চেনার উপায় তুলে ধরা হলো। সঙ্গে রয়েছে ক্রেতার জন্য প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালের মে মাসে কোরবানির পশুর বাজার কেমন ছিল, দেশি গরুর ধরনগুলো কোথা থেকে এসেছে, আর ঈদের আগে মোটাতাজাকরণের ওষুধ নিয়ে সরকার কী বলেছিল।
২০২৬ সালের মে মাসে কোরবানির পশুর বাজার
রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস জানায়, ২০২৬ সালের ৩ মে মন্ত্রণালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতের দায়িত্বে থাকা মন্ত্রী বলেন, আসন্ন ঈদুল আজহায় কোরবানির জন্য ১ কোটি ২৪ লাখের বেশি পশু প্রস্তুত রয়েছে। তিনি বলেন, আগের বছরের মতো এবারও বিদেশ থেকে কোনো কোরবানির পশু আমদানি করা হবে না, আর সে কারণেই সীমান্ত হাটের ইজারা স্থগিত রাখা হয়েছে।
মন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসানোর কথা ছিল, এর মধ্যে ঢাকা শহরে ২৭টি: ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে ১৬টি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের তত্ত্বাবধানে ১১টি। তিনি জানান, রাজধানীতে নির্ধারিত স্থান ছাড়া হাট বসবে না এবং যান চলাচলে বিঘ্ন ঘটায় এমন রাস্তার পাশে কোনো হাট বসতে দেওয়া হবে না। তিনি আরও বলেন, অনলাইনে পশু কিনলে ক্রেতাদের হাসিল দিতে হবে না; হাসিল কেবল সরাসরি পশুর হাট থেকে কেনার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
শুধু গরুর হিসাবে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর জানায় যে সে বছর কোরবানির জন্য সারা দেশে খামারিরা প্রায় ৫৭ লাখ গরু ও মহিষ প্রস্তুত করেছেন, এবং গরু-মহিষ, ছাগল-ভেড়াসহ সব ধরনের কোরবানির পশুর সরবরাহ চাহিদার চেয়ে বেশি। বিবিসি বাংলা ২০২৬ সালের ২২ মে এ তথ্য প্রকাশ করে।
বিবিসি বাংলার একই প্রতিবেদনে ২০১৭ সাল থেকে প্রতি বছর দেশে কত গরু কোরবানি হয়েছে, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সেই পরিসংখ্যান তুলে ধরা হয়। এতে দেখা যায়, এই বছরগুলোতে চাহিদা কতটা ওঠানামা করেছে:
- ২০১৭ সাল: ৪৪ লাখ ৭৩ হাজার গরু
- ২০১৮ সাল: ৫৩ লাখ ৯১ হাজার
- ২০১৯ সাল: ৫৬ লাখ ৫৯ হাজার
- ২০২০ সাল, কোভিড-১৯ মহামারির সময়: ৫০ লাখ
- ২০২১ সাল: ৪০ লাখ
- ২০২২ সাল: ৪৫ লাখ ৬৫ হাজার
- ২০২৩ সাল: ৪৫ লাখ ৮১ হাজার
- ২০২৪ সাল: ৪৭ লাখ ৬৬ হাজার
- ২০২৫ সাল: ৪৬ লাখ ৫০ হাজার
গরু কোরবানি কমে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অর্থনীতির একজন অধ্যাপক বিবিসি বাংলাকে মূলত তিনটি কারণের কথা বলেন: কোভিড-পরবর্তী অর্থনৈতিক দুর্বলতায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়া, উৎপাদন খরচ বাড়ায় গরুর দাম বৃদ্ধি, এবং খরচ কমাতে গরুর বদলে ছাগল বা ভেড়া কোরবানির প্রবণতা। বিবিসি বাংলার সঙ্গে কথা বলা খামারিরা জানান, সে বছর ছোট ও মাঝারি আকারের গরুর চাহিদাই বেশি। ২০২৬ সালের ২৩ মে রাজশাহী থেকে বাসসের এক প্রতিবেদনেও একই চিত্র উঠে আসে: নগরীর ঐতিহ্যবাহী সিটি হাটে মধ্যম ও নিম্ন আয়ের ক্রেতারা মাঝারি আকারের গরু ও ছাগলে বেশি আগ্রহী ছিলেন, আর ৭০ হাজার থেকে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা দামের গরুর আশপাশেই ভিড় ছিল সবচেয়ে বেশি।
কোন গরুকে 'দেশি' বলা হয়
বাংলাদেশের দেশি গরু জেবু জাতের, অর্থাৎ ভারতীয় উপমহাদেশের কুঁজওয়ালা গরু, বৈজ্ঞানিক নাম বস ইন্ডিকাস (Bos indicus)। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, এ গরু সাধারণত শীতপ্রধান অঞ্চলের বস টরাস জাতের গরুর চেয়ে আকারে ছোট ও ধীরে বাড়ে, তবে কিছু সংক্রামক রোগ প্রতিরোধ করতে পারে। বাংলাপিডিয়ার 'গবাদিপশু' ভুক্তিতে বলা হয়েছে, দেশি জাতের গরু রোগে কম আক্রান্ত হয় এবং গরম সহ্য করতে পারে, অন্যদিকে বিশুদ্ধ বিদেশি ও শংকর জাতের গরুর পুষ্টির চাহিদা বেশি, পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর ক্ষমতা কম এবং পরজীবী ও রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি। দেশি গরু নিম্নমানের খড়-ঘাসও ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে এবং কঠিন পরিবেশে টিকে থাকতে অভ্যস্ত।
বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, বাংলাদেশে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো গরুর জাত প্রতিষ্ঠিত হয়নি; দীর্ঘ প্রাকৃতিক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কয়েকটি উন্নত দেশি ধরন গড়ে উঠেছে, যেগুলোর নাম এসেছে যে এলাকায় সেগুলো পাওয়া যায় সেই এলাকার নামে। ময়মনসিংহের বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকেরা ২০২১ সালে অ্যানিমেলস সাময়িকীতে এমন পাঁচটি ধরনের কথা লেখেন: রেড চিটাগাং, পাবনা, মুন্সীগঞ্জ, নর্থ বেঙ্গল গ্রে এবং নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যহীন সাধারণ দেশি গরু। তাঁদের মতে, এসব ধরনের গায়ের রং আলাদা, উৎপাদনক্ষমতা ও দেহের মাপেও পার্থক্য রয়েছে, এবং কৃষকেরা বহু বছর ধরে, বিশেষ করে দুধ ও চেহারার ভিত্তিতে পশু বাছাই করে নিজ নিজ এলাকায় এগুলো গড়ে তুলেছেন। ২০২৩ সালে হেলিয়ন সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেশের দেশি গরুর মধ্যে মাদারীপুর ধরন ও দিনাজপুরের খর্বাকৃতি গরুর নামও উল্লেখ করা হয়।
বিদেশি গরু এ অঞ্চলে এসেছে আজকের শংকর গরুর অনেক আগেই। বাংলাপিডিয়ার 'প্রাণিসম্পদ' ভুক্তি অনুযায়ী, দেশভাগের আগেই দেশি গরুর উন্নয়নের জন্য হরিয়ানা গরু আনা হয়েছিল; ১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর আসে সিন্ধি, শাহিওয়াল ও থারপারকার গরু; ১৯৫৮ সালে কৃত্রিম প্রজনন কর্মসূচি শুরু হয়; আর ১৯৭৪ সালে অস্ট্রেলিয়া সরকার বাংলাদেশকে হলস্টেইন-ফ্রিজিয়ান জাতের দুধেল গাভি ও প্রজনন ষাঁড় দান করে। ২০২১ সালের বাকৃবি গবেষণায় বলা হয়, বিংশ শতাব্দীর সত্তরের দশকের শেষ পর্যন্ত দেশে কেবল দেশি গরুরই প্রাধান্য ছিল; এরপর নির্বিচার উন্নয়ন ও সংকরায়ণের ফলে দেশি ধরনগুলোর বিনিময়ে উন্নত জাতের পশুর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। গবেষকেরা লেখেন, মুন্সীগঞ্জ ও পাবনা ধরন বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে, আর পাবনা, মুন্সীগঞ্জ ও রেড চিটাগাং ধরন রক্ষায় এক দশকের বেশি সময় ধরে সরকারি প্রাতিষ্ঠানিক খামারে সীমিত পরিসরে খামারভিত্তিক (এক্স সিটু) সংরক্ষণ কর্মসূচি চলছে।
২৪০টি গরুর রক্তের নমুনা বিশ্লেষণ করা ওই জিনগত গবেষণায় দেখা যায়, পাঁচটি দেশি ধরনের মধ্যে জিনগত পার্থক্য খুবই কম, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরস্পরের মধ্যে প্রজননের লক্ষণ। দীর্ঘ বাছাই-প্রজননের মাধ্যমে নয়, সাম্প্রতিক অতীতে মূলত গায়ের রং ও দেহের মাপ দেখেই এগুলোকে আলাদা ধরনে ভাগ করা হয়েছে। ক্রেতার জন্য এর তাৎপর্য হলো, গায়ের রং, গড়ন ও ওজনই এই ধরনগুলোকে আলাদা করে চেনার মূল উপায়। নিচে জাগো নিউজ ২৪-এর দেওয়া বর্ণনা তুলে ধরা হলো।
স্থানীয় দেশি জাতের গরু
দেশের সব অঞ্চলে এ ধরনের গরু দেখা যায়। এরা সাধারণত আকারে ছোট হয়। গায়ের লোম ছোট, মসৃণ ও চকচকে এবং চামড়া বেশ শক্ত। এদের কুঁজ সুগঠিত ও সুস্পষ্ট। গলার নিচের চামড়া বা গলকম্বল উন্নত ও প্রসারিত থাকে, বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্ক ষাঁড়ের ক্ষেত্রে এটি ঝুলন্ত অবস্থায় দেখা যায়। কান লম্বা এবং পাতার মতো ভাঁজযুক্ত। শিং সাধারণত বাঁকানো আকৃতির হয়।
গায়ের রং লাল, সাদা, কালো, ধূসর বা ছাইরঙা হতে পারে, কখনো কখনো দুই বা ততোধিক রঙের মিশ্রণও দেখা যায়। কুঁজ পর্যন্ত উচ্চতা সাধারণত তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট হয়। দেহের দৈর্ঘ্য, অর্থাৎ সামনের পায়ের গোড়া থেকে লেজের গোড়া পর্যন্ত দূরত্ব, সাড়ে তিন ফুটের কাছাকাছি হয়ে থাকে। একটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ গরুর ওজন সাধারণত ২০০ থেকে ২৫০ কেজি এবং স্ত্রী গরুর ওজন ১৫০ থেকে ২২০ কেজির মধ্যে হয়।
বাংলাপিডিয়া এ গরুকে নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যহীন দেশি জেবু বলে বর্ণনা করেছে, যা বহুমুখী কাজের পশু এবং দেশের গরুর বেশির ভাগই এ ধরনের। প্রচলিত ফসলভিত্তিক মিশ্র কৃষিব্যবস্থার অংশ হিসেবে দুধ ও মাংসের পাশাপাশি হালচাষ ও জৈবসারের জন্যও এ গরু পালন করা হয়। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে এর গড় দুধ উৎপাদন প্রতি দুগ্ধকালে প্রায় ২০৬ কেজি। ২০১২ সালে এশিয়ান-অস্ট্রেলেশিয়ান জার্নাল অব অ্যানিমেল সায়েন্সেসে প্রকাশিত এক গবেষণা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ২০০৯ সালের পরিসংখ্যান উদ্ধৃত করে জানায়, দেশে তখন গরুর সংখ্যা ছিল ২ কোটি ২৯ লাখ ৭০ হাজার, যার ৯০ শতাংশের বেশি দেশি জেবু।
রেড চিটাগাং ক্যাটল
এ ধরনের গরু প্রধানত চট্টগ্রাম ও পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলে পাওয়া যায়। এদের গায়ের রং সাধারণত লালচে, পাশাপাশি মুখমণ্ডল, চোখের পাতা, খুর এবং লেজের প্রান্তেও লালচে আভা দেখা যায়। এ গরুর দেহ তুলনামূলকভাবে ছোট। কুঁজ পর্যন্ত উচ্চতা সাধারণত সাড়ে তিন ফুটের মতো এবং দেহের দৈর্ঘ্য সাড়ে তিন থেকে চার ফুট পর্যন্ত হয়। একটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ গরুর ওজন সাধারণত ২৫০ থেকে ৪০০ কেজি এবং স্ত্রী গরুর ওজন ১৫০ থেকে ২৩০ কেজির মধ্যে হয়।
বাংলাপিডিয়া রেড চিটাগাং গরুকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের একটি সুন্দর লাল গরু হিসেবে বর্ণনা করেছে, যা দিনে প্রায় ২ লিটার দুধ দিতে পারে। ২০১৪ সালে এ ধরনের জিনগত গবেষণা করা বিজ্ঞানীরা লেখেন, চট্টগ্রাম জেলাই এ গরুর একমাত্র প্রজনন এলাকা। একই বছর বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএলআরআই) ও সহযোগী গবেষকদের প্রকাশিত আরেক গবেষণায় মহিষ, হলস্টেইন শংকর গাভি, দেশি গরু ও রেড চিটাগাং গরুর দুধ তুলনা করা হয়। এতে রেড চিটাগাং ও দেশি গরুর দুধে প্রোটিন, কেসিন, হুই প্রোটিন, ল্যাকটোজ ও মোট খনিজের পরিমাণ বেশি পাওয়া যায়; গবেষকদের সিদ্ধান্ত ছিল, পুষ্টি ও প্রক্রিয়াজাতকরণ উভয় দিক থেকে মহিষ ও রেড চিটাগাং গরুর দুধের ফল সবচেয়ে ভালো।
দেশি ধরনগুলোর মধ্যে রেড চিটাগাংকেই সবচেয়ে স্বতন্ত্র মনে হয়। ২০২১ সালের বাকৃবি জিনগত গবেষণায় নমুনা নেওয়া রেড চিটাগাং গরুর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ দেশের অন্য সব গরু থেকে স্পষ্টভাবে আলাদা হয়ে পড়ে, আর পাঁচ ধরনের মধ্যে এ ধরনেই জিনগত বৈচিত্র্য সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায়। গবেষকেরা এই আলাদা দলটির কারণ হিসেবে বদ্ধ নিউক্লিয়াস পালে খামারভিত্তিক সংরক্ষণের কথা উল্লেখ করেন।

পাবনা ক্যাটল
এ জাতের গরু প্রধানত পাবনা ও সিরাজগঞ্জ জেলায় বেশি দেখা যায়। সাধারণত এদের গায়ের রং লাল, ধূসর (ছাইরঙা) অথবা এ দুই রঙের মিশ্রণ। পুরুষ গরুর ক্ষেত্রে রং তুলনামূলক গাঢ় ধূসর থেকে সাদাটে ধূসর পর্যন্ত বিভিন্ন শেডের হতে পারে। মুখমণ্ডল, চোখের পাতা, শিং এবং লেজের প্রান্ত সাধারণত কালো রঙের হয়। এদের দেহ বেশ লম্বাটে: দেহের দৈর্ঘ্য সাড়ে পাঁচ ফুট এবং কুঁজ পর্যন্ত উচ্চতা চার ফুট। একটি প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ গরুর ওজন সাধারণত ৩৫০ থেকে ৪০০ কেজি এবং স্ত্রী গরুর ওজন ২৫০ থেকে ২৮০ কেজির মধ্যে হয়।
বাংলাপিডিয়া পাবনা ও সিরাজগঞ্জ এলাকাকে দেশের সেরা দেশি গরুর এলাকাগুলোর মধ্যে গণ্য করে এবং জানায়, একটি পাবনা গাভি দিনে ৩ থেকে ৫ লিটার দুধ দিতে পারে। এর পেছনে এলাকার জমিরও ভূমিকা আছে। বৃহত্তর পাবনায় স্থানীয়ভাবে 'বাথান' নামে পরিচিত সুনির্দিষ্ট মৌসুমি চারণভূমি রয়েছে: বড়াল ও গোহালা নদীর তীরে প্রায় ৬ হাজার হেক্টরের একটি নিচু অববাহিকা, যা বর্ষায় পানিতে ডুবে যায় এবং নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শুকনো থাকে। নদীর তলদেশে জমা পলিতে চাষ না দিয়েই মাষকলাই ও খেসারির বীজ ছিটিয়ে দেওয়া হয়, আর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত কৃষকেরা এই ডালজাতীয় চারণভূমিতে সরাসরি গরু চরান। বাংলাপিডিয়া জানায়, এসব এলাকার গরু বেশ উৎপাদনশীল এবং মিল্ক ভিটা সমবায়ের দুধের প্রধান উৎস; মুন্সীগঞ্জ ও টেকেরহাট এলাকাতেও একই ধরনের চারণব্যবস্থা রয়েছে।
পাবনা গাভিকে সংকরায়ণের ভিত্তি হিসেবেও ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাপিডিয়া দেশের শংকর গরুর মধ্যে শাহিওয়াল-পাবনা ও ফ্রিজিয়ান-পাবনা সংকরের কথা উল্লেখ করেছে, যাদের দুধ উৎপাদন প্রতি দুগ্ধকালে যথাক্রমে ১ হাজার ২৪০ ও ১ হাজার ৪৬০ লিটার। এই ইতিহাসের কারণেই খাঁটি দেশি পাবনা গরু কিনতে চাইলে ক্রেতাকে এর রং ও গড়ন ভালোভাবে দেখে নিতে হয়।
নর্থ বেঙ্গল গ্রে
উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় নর্থ বেঙ্গল গ্রে জাতের গরু দেখা যায়। এদের গায়ের রং সাধারণত সাদা অথবা গাঢ় ধূসর ও সাদার মাঝামাঝি বিভিন্ন শেডের হয়। পূর্ণবয়স্ক পুরুষ গরুর ঘাড়ে ছাইরঙা ছোপ দেখা যায়। মুখমণ্ডল, চোখের পাতা ও খুর সাধারণত কালো রঙের হলেও লেজের প্রান্ত সাদা হয়। এ জাতের গরুর শিং ছোট থেকে মাঝারি আকারের এবং ভেতরের দিকে বাঁকানো। একটি পূর্ণবয়স্ক গরুর উচ্চতা সাধারণত তিন ফুটের কিছু বেশি এবং দেহের দৈর্ঘ্য সাড়ে তিন ফুটের কাছাকাছি। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ গরুর ওজন সাধারণত ৩০০ থেকে ৩৫০ কেজি এবং স্ত্রী গরুর ওজন ২০০ থেকে ২৫০ কেজির মধ্যে হয়।
বাংলাপিডিয়া নর্থ বেঙ্গল গ্রেকে সেই উন্নত দেশি ধরনগুলোর তালিকায় রেখেছে, যাদের উৎপাদনক্ষমতা দেশের সাধারণ দেশি গরুর গড়ের চেয়ে বেশি। জ্ঞানকোষটি আরও জানায়, দেশজুড়ে গরু প্রায় সমানভাবে ছড়িয়ে আছে, তবে উত্তরাঞ্চলে এর ঘনত্ব কিছুটা বেশি। ২০২১ সালের বাকৃবি গবেষণায় বলা হয়, রেড চিটাগাং, মুন্সীগঞ্জ ও পাবনা ধরনের দুধ উৎপাদন নর্থ বেঙ্গল গ্রে ও সাধারণ দেশি গরুর চেয়ে তুলনামূলক বেশি।

মুন্সীগঞ্জ ক্যাটল বা মীরকাদিমের গরু
মুন্সীগঞ্জ ক্যাটল প্রধানত মুন্সীগঞ্জ জেলার মীরকাদিম এলাকায় পাওয়া যায়, তাই এ জাতের গরু সাধারণত 'মীরকাদিমের গরু' নামে পরিচিত। মুন্সীগঞ্জ ছাড়াও পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলায় এ গরুর দেখা মেলে। মীরকাদিম জাতের গরুর গায়ের রং মূলত সাদা, তবে দেহের বিভিন্ন স্থানে হালকা গোলাপি আভা দেখা যায়। শিং, চোখের পাতা, খুর এবং লেজের প্রান্ত গোলাপি অথবা গোলাপি ও কালো রঙের মিশ্রণে হয়। একটি পূর্ণবয়স্ক গরুর উচ্চতা সাধারণত ৩ থেকে ৫ ফুট পর্যন্ত হয়। প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ গরুর ওজন ২৫০ থেকে ৩৫০ কেজি এবং স্ত্রী গরুর ওজন ২০০ থেকে ২৮০ কেজির মধ্যে হয়।
বাকৃবি ও বিএলআরআইয়ের গবেষকেরা ২০২৩ সালে হেলিয়ন সাময়িকীতে মুন্সীগঞ্জ ধরনকে দেশের গৃহপালিত গরুর একটি সম্ভাবনাময় সম্পদ হিসেবে বর্ণনা করেন, যা কেবল মুন্সীগঞ্জ জেলা ও তার আশপাশে পাওয়া যায় এবং আন্তর্জাতিকভাবে বিশুদ্ধ জাত হিসেবে নয়, একটি ধরন (ভ্যারাইটি) হিসেবে স্বীকৃত। গবেষকদের ভাষায়, ক্রিম থেকে ফিকে গোলাপি রঙের কারণে এ গরু দেখতে আকর্ষণীয় এবং অন্য গরু থেকে সহজেই আলাদা করা যায়; এর সংকরায়ণের কোনো নির্ভরযোগ্য ইতিহাস পাওয়া যায়নি, ধারণা করা হয় স্থানীয়ভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মধ্য দিয়েই এটি গড়ে উঠেছে। তাঁরা সতর্ক করেন, এলোমেলো প্রজননের কারণে ধরনটি হুমকির মুখে।
গবেষণাটিতে ২০২১ সালের জুলাই থেকে ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত সাভারে বিএলআরআইয়ের পাচুটিয়া গবেষণা খামারে ১০টি ষাঁড় ও ১০টি গাভির মাপ নেওয়া হয়। ষাঁড়গুলোর গায়ের রং ছিল ক্রিম-সাদা থেকে মলিন গোলাপি, আর গাভিগুলোর সাদা থেকে ক্রিম। অর্ধেক পশুর ঘাড় ছিল গোলাপি, ৩০ শতাংশের বাদামি ও ২০ শতাংশের সাদা; ৭০ শতাংশের মুখের অগ্রভাগ (মাজল) গোলাপি এবং বাকিদের কালো ফোঁটাযুক্ত গোলাপি-সাদা; খুর বেশির ভাগই গোলাপি, ২০ শতাংশের হালকা কালো। গবেষণা খামারের এসব পশুর গড় ওজন ছিল ষাঁড়ের ৪১৮ কেজি ও গাভির ৩০৭.৬ কেজি, কাঁধ পর্যন্ত গড় উচ্চতা ১৩৫.২১ সেন্টিমিটার, যা জাগো নিউজ ২৪-এর দেওয়া হাটের ওজনসীমার চেয়ে বেশি।
মোটাতাজাকরণের ওষুধ ও সাবধানে পশু কেনা
প্রতি বছর ঈদের আগে ওষুধ দিয়ে মোটাতাজা করা গরু নিয়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। বাসস জানায়, ২০২৬ সালের ৩ মের সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর গরু মোটাতাজাকরণের ইনজেকশন বা যেকোনো স্টেরয়েড আমদানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ রেখেছে; তবে কিছু অসাধু গরু ব্যবসায়ী কোরবানির পশু মোটাতাজা করতে এসব ওষুধ সংগ্রহ করতে পারেন, তাই অধিদপ্তর সারা দেশে অভিযান চালিয়ে এসব অবৈধ ওষুধ ধ্বংস করবে। তিনি জানান, অসুস্থ পশুর জরুরি চিকিৎসা দিতে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে দেশের প্রতিটি পশুর হাটে বিশেষজ্ঞ পশুচিকিৎসক দল কাজ করবে।
খাদ্যে এ ধরনের উপাদানের ব্যবহার আইনেও নিয়ন্ত্রিত। মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্য আইন, ২০১০-এর ১৪ নম্বর ধারার শিরোনামই হলো মৎস্যখাদ্য ও পশুখাদ্যে এন্টিবায়োটিক, গ্রোথ হরমোন, কীটনাশক ইত্যাদি ব্যবহার নিষিদ্ধকরণ।
বাসস আরও জানায়, ২০২৬ সালের ২৩ মে ঢাকার গাবতলী পশুর হাট পরিদর্শন শেষে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী চোরাইপথে আনা পশু নয়, বৈধ উৎস থেকে কোরবানির পশু কেনার আহ্বান জানান।
জাগো নিউজ ২৪ তাদের নির্দেশিকা শেষ করে একটি ব্যবহারিক পরামর্শ দিয়ে: এসব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ধারণা থাকলে যেকোনো ক্রেতা কোরবানির হাটে সহজে দেশি জাতের গরু শনাক্ত করতে পারবেন, আর সম্ভব হলে হাটে যাওয়ার সময় একজন পশুচিকিৎসক কিংবা অভিজ্ঞ পশুপালনকারীকে সঙ্গে নেওয়া ভালো। পশুর স্বাস্থ্য নিয়ে সন্দেহ থাকলে হাটে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পশুচিকিৎসক দলের সাহায্যও নেওয়া যায়।

ছবি: Wasiul Bahar / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বিবিসি বাংলা, বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ), অ্যানিমেলস (এমডিপিআই), হেলিয়ন, এশিয়ান-অস্ট্রেলেশিয়ান জার্নাল অব অ্যানিমেল সায়েন্সেস, বাংলাদেশের আইন (লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ)





মন্তব্য
(০)