২০২৫ সালের ২২ সেপ্টেম্বর জাগো নিউজ ২৪ ‘বাজারদর’ অ্যাপ ব্যবহারের একটি নির্দেশিকা প্রকাশ করে। এটি জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের (ডিএনসিআরপি) বিনামূল্যের একটি অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ, যাতে প্রতিদিন শতাধিক নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম দেখা যায়। চাল, আটা-ময়দা, ভোজ্যতেল, চিনি, লবণ, ডাল, আলু, মসলা, মাছ, মাংস, দুধ, ডিম, শাকসবজি ও ফলের পাশাপাশি রান্নার গ্যাসসহ জ্বালানির দামও এতে রয়েছে। অধিদপ্তর ২০২৫ সালের ২৩ জুন ঢাকায় অ্যাপটি চালু করে, আর সেপ্টেম্বরে এর প্রচার জোরদার করে, যাতে দেশের যেকোনো প্রান্তের ক্রেতা বাজারে যাওয়ার আগেই জেনে নিতে পারেন কোন পণ্যের দাম কত হওয়া উচিত।
কোনদিন কোন পণ্যের সঠিক দাম কত, তা যাচাই করা সাধারণ ক্রেতার পক্ষে কঠিন। বাজারে গিয়ে হয়তো কয়েকটি দোকান ঘুরে পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, সবজি কিংবা মাছ-মাংসের দাম মিলিয়ে দেখলেন, কিন্তু দেখা যায় সব দোকানের দাম প্রায় কাছাকাছি, আর তুলনা করার মতো আলাদা কোনো নির্ভরযোগ্য দর হাতে থাকে না। অ্যাপটির নামই বলে দেয় এটি কী দেয়: প্রতিটি পণ্যের জন্য একটি সরকারি দর, যা প্রতিদিন হালনাগাদ হয় এবং মোবাইল ফোনেই দেখা যায়।
ভোক্তা অধিদপ্তরের অ্যাপ, চালু হয় ২০২৫ সালের জুনে
জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ২০২৫ সালের ২৩ জুন, সোমবার, অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ্লিকেশনটির উদ্বোধন করেন বলে সেদিন খবর সংযোগ ও দেশ রূপান্তর জানায়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জানানো হয়, এই অ্যাপের মাধ্যমে যেকোনো জায়গা থেকে যেকোনো সময় দেশের ৬৪টি জেলার খুচরা বাজারে পণ্যের সর্বোচ্চ দর জানা যাবে। অ্যাপে প্রতিদিনের খুচরা বাজারদরের তথ্য সরবরাহ করে অধিদপ্তর নিজেই।
অধিদপ্তরের চাহিদা অনুযায়ী সম্পূর্ণ বিনামূল্যে অ্যাপটি তৈরি করে দেয় ড্যাফোডিল ইনস্টিটিউট অব আইটি। উদ্বোধনের দিন অ্যাপটির নির্মাতা জানান, পণ্যের বাজারে দাম নিয়ে কারসাজি বন্ধে অবাধ তথ্য সরবরাহ নিশ্চিত করবে বাজারদর অ্যাপ, এতে নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্যের ন্যায্য দাম ভোক্তার জন্য নিশ্চিত করা সহজ হবে। মহাপরিচালক বলেন, পণ্যের প্রকৃত সর্বোচ্চ দাম ভোক্তার জানা থাকলে এ সংক্রান্ত প্রতারণা ধীরে ধীরে কমে আসবে।
যেকোনো অ্যান্ড্রয়েড ফোনে বাজারদর অ্যাপ ডাউনলোড করা যায়। ব্যবহারকারীদের সুবিধার কথা ভেবে অফলাইনে ব্যবহারের সুযোগও রাখা হয়েছে, অর্থাৎ ফোনে ইন্টারনেট সংযোগ না থাকলেও অ্যাপ থেকে দাম দেখা যায়। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অ্যাপটি গুগল প্লে-স্টোরে পাওয়া যাচ্ছিল; সে সময়ের প্রতিবেদনগুলোতে একে কেবল অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপ্লিকেশন হিসেবেই বর্ণনা করা হয়েছে।
উদ্বোধনের তিন মাস পর অধিদপ্তর অ্যাপটির প্রচার বাড়ায়। ২০২৫ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার, অধিদপ্তরের একজন সহকারী পরিচালক, যিনি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটও, এক ভিডিও বার্তায় অ্যাপটি ব্যবহারের আহ্বান জানান। খবর সংযোগের প্রতিবেদন অনুযায়ী তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন বাজারে যাচ্ছেন, কিন্তু নিত্যপণ্যের কোন দামটি সঠিক, তা নিয়ে কি দ্বিধায় পড়ছেন? আর নয় দুশ্চিন্তা! জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এনেছে ‘বাজারদর’ অ্যাপস। এখানে পাবেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর হালনাগাদ প্রতিদিন। গুগল প্লে-স্টোর থেকে ‘বাজারদর’ অ্যাপসটি ইন্সটল করুন, প্রতিদিনের বাজারদর জানুন এবং সচেতন হোন।’ চার দিন পর জাগো নিউজের নির্দেশিকাতেও একই কথা বলা হয়: বাজারে গিয়ে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সঠিক দাম নিয়ে ক্রেতার আর দ্বিধায় থাকার দরকার নেই।
বাজারদর অ্যাপে যেভাবে দাম দেখবেন
২০২৫ সালের জুন ও সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত বর্ণনা অনুযায়ী অ্যাপটি ব্যবহার করতে কয়েকটি ধাপই যথেষ্ট:
- অ্যান্ড্রয়েড ফোনে গুগল প্লে-স্টোর খুলে ‘বাজারদর’ (Bazardor) লিখে খুঁজুন এবং অ্যাপটি ডাউনলোড ও ইনস্টল করুন।
- প্রথমবার অ্যাপ খোলার পর নিজের বিভাগ ও জেলা নিবন্ধন করুন, যাতে আপনার এলাকার দাম দেখায়।
- মূল পাতার দুটি প্রধান অপশনের একটি বেছে নিন: ‘খাদ্যসামগ্রী’ অথবা ‘অন্যান্য’।
- অপশনের ভেতরে প্রয়োজনীয় ভাগটি বাছুন, যেমন চাল, ডাল, মসলা, মাছ ও গোশত, শাক ও সবজি, ফল কিংবা জ্বালানি।
- নির্দিষ্ট পণ্যটি সিলেক্ট করুন, যেমন মোটা চাল, বড় দানার মসুর ডাল বা ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার; তাহলেই সেদিনের দাম দেখা যাবে।
- অ্যাপটি অফলাইনেও চলে বলে মোবাইল ইন্টারনেট না থাকলেও বাজারে দাঁড়িয়েই দাম দেখে নেওয়া যায়।
অ্যাপে দেখানো দর একটি মানদণ্ড হিসেবে দেওয়া হয়। উদ্বোধনের সময় অধিদপ্তর একে জেলার খুচরা বাজারের সর্বোচ্চ দর হিসেবে বর্ণনা করেছিল, ফলে বিক্রেতা যে দাম চাইছেন, ক্রেতা তা এই দরের সঙ্গে মিলিয়ে দেখতে পারেন। মহাপরিচালকের ভাষায় অধিদপ্তরের প্রত্যাশা ছিল, ভোক্তা সচেতন হলে সময়ের সঙ্গে বাড়তি দাম আদায় কঠিন হয়ে উঠবে।

চাল, আটা, তেল, চিনি, ডাল ও মসলা
অ্যাপটিতে দুটি প্রধান বিভাগ রয়েছে, ‘খাদ্যসামগ্রী’ ও ‘অন্যান্য’। খাদ্যসামগ্রী বিভাগে চাল, আটা ও ময়দা, ভোজ্যতেল, চিনি, লবণ, ডাল, আলু, মসলা, মাছ ও গোশত, দুধ, ডিম, শাক ও সবজি এবং ফলের দাম প্রতিদিন হালনাগাদ করা হয়। প্রধান খাদ্যশস্য চালের পাঁচটি ধরনের দাম এখানে আলাদা করে দেওয়া আছে: সরু চাল (নাজির বা মিনিকেট), মাঝারি চাল (পাইজাম বা আটাশ), মোটা চাল (স্বর্ণা বা চায়না ইরি), সুগন্ধি চাল এবং কাটারিভোগ।
আটা ও ময়দার ক্ষেত্রে খোলা ও প্যাকেটজাত দুই ধরনেরই দাম দেওয়া আছে, আর একই ভাগে প্যাকেটজাত সুজির দামও জানা যায়। চিনির ক্ষেত্রে খোলা ও প্যাকেটজাত এবং সাদা ও লাল চিনির আলাদা আলাদা দাম রয়েছে। লবণেরও খোলা ও প্যাকেটজাত আলাদা দাম দেখা যায়। ডালের মধ্যে মসুর ডালকে দানার আকার অনুযায়ী বড়, মাঝারি ও ছোট দানায় ভাগ করা হয়েছে; মুগ ডাল সরু ও মোটা দুই ভাগে; এর পাশাপাশি অ্যাংকর ডালের দামও আছে।
আলুর মধ্যে ডায়মন্ড, লাল ও হল্যান্ড জাতের আলুর পাশাপাশি মিষ্টি আলুর দাম জানা যায়। মসলার তালিকা বেশ দীর্ঘ: দেশি পেঁয়াজ, রসুন (দেশি ও আমদানি), কাঁচামরিচ, শুকনা মরিচ (দেশি ও আমদানি), দেশি হলুদ, দেশি আদা, জিরা, দারুচিনি, লবঙ্গ, এলাচ, ধনিয়া ও তেজপাতা। ফলে প্রতিদিনের তরকারির উপকরণের খরচ একটি একটি করে মিলিয়ে দেখা যায়।
এসব পণ্যের কয়েকটিতে আগেও সরকারকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। বাংলাপিডিয়া জানায়, জরুরি পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রায়ত্ত ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি) পেঁয়াজ, মসুর ডাল, লবণ, শুকনা মরিচ, খেজুর ও আদা আমদানি করে। আর কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় আগের বছরগুলোতে পেঁয়াজ, মসুর ডাল, ভোজ্যতেল ও চিনির দাম বেঁধে দেওয়ার চেষ্টা করেছিল, যা নিচে বলা হয়েছে।

মাছ, মাংস, ডিম, দুধ, শাকসবজি ও ফল
অ্যাপের সবচেয়ে বড় ভাগ মাছ ও গোশত। কেনার আগে এখান থেকে রুই, কাতলা, চিতল, বোয়াল, আইড়, সিলভার কার্প, গোল্ড কার্প, গ্রাস কার্প, ইলিশ (এক কেজির কম ও এক কেজির বেশি ওজনের), পাঙ্গাস (চাষের ও নদীর), চিংড়ি (ছোট, মাঝারি ও বড়), মলা, কাচকি, শোল, শিং (দেশি ও চাষের), মাগুর (দেশি ও চাষের), কই (দেশি ও চাষের), তেলাপিয়া, বাইম, টেংরা, টাকি, বাতাসী, শুলশা, গজার, পাবদা, চেউয়া, বেলে, পুঁটি, সরপুঁটি, রূপচাঁদা, পোয়া, কোরাল (লাল ও সাদা), সুরমা, রিটা ও লইট্টা মাছের প্রতিদিনের দাম জেনে নেওয়া যায়।
মাংসের মধ্যে আছে গরু, মহিষ, খাসি ও বকরি, মুরগি (কক বা সোনালী, ব্রয়লার, দেশি ও টার্কি), হাঁস (দেশি, রাজহাঁস ও চায়না হাঁস), কবুতর ও কোয়েল পাখি। দুধ ও ডিমের ভাগে রয়েছে তরল দুধ, মুরগির ডিম (লাল, সাদা ও দেশি), হাঁসের ডিম এবং কোয়েল পাখির ডিম।
শাক ও সবজির মধ্যে আছে পুঁইশাক, লালশাক, কলমিশাক, পালংশাক, পাটশাক, কচুশাক, পটল, বেগুন (লম্বা ও গোল), বরবটি, জালি, মিষ্টিকুমড়া, কাঁচা পেঁপে, পাকা পেঁপে, টমেটো, লাউ (ছোট, মাঝারি ও বড়), চিচিঙ্গা, ঝিঙা, উচ্ছে বা করলা, গাজর, ঢেঁড়স, লেবু (গোল, লম্বা, বাতাবি ও কাগজি), ধনিয়াপাতা, কাঁচকলা, শসা, ধুন্দল, কাঁকরোল, কচুর মুখি, সাতকরা ও চুইঝাল।
ফলের তালিকায় রয়েছে পেয়ারা (কাজী ও দেশি), কাঁঠাল (ছোট, মাঝারি ও বড়), আনারস, জাম্বুরা, জাম, বরই, আম (ফজলি, হিমসাগর, ল্যাংড়া, আম্রপালি, কাঁঠমিঠা, লক্ষ্মণভোগ, গোপালভোগ, হাঁড়িভাঙ্গা, গোবিন্দভোগ, ব্যানানা, কাটিমন ও বারি-৪), আপেল (সবুজ ও ফুজি), মাল্টা (আমদানি ও দেশি), খেজুর (সাধারণ, মরিয়ম ও আজওয়া), কমলা (দেশি ও চায়না), লটকন, তেঁতুল, আনার বা ডালিম, ডাব, নারকেল, কলা (সবরি, সাগর ও চাঁপা), আঙুর (লাল ও কালো) এবং ড্রাগন ফল।
এই তালিকাগুলো একসঙ্গে দেখলে বোঝা যায়, প্রতিবেদনে কেন শতাধিক পণ্যের কথা বলা হয়েছে: অ্যাপটি শুধু পণ্য নয়, পণ্যের ধরন, আকার ও উৎস অনুযায়ীও দাম আলাদা করে দেখায়, আর বাস্তব বাজারে দামের পার্থক্য এভাবেই হয়। যেমন এক কেজির কম ওজনের ইলিশ আর এক কেজির বেশি ওজনের ইলিশের দাম এক নয়, দেশি শিং বা মাগুরের দামও চাষের মাছের চেয়ে আলাদা।

‘অন্যান্য’ বিভাগে জ্বালানির দাম
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ‘অন্যান্য’ বিভাগে শুধু জ্বালানি পণ্যের দাম হালনাগাদ করা হচ্ছিল। এখানে এলপিজি গ্যাসের ১২ কেজি, সাড়ে ১২ কেজি, ৩০ কেজি ও ৩৫ কেজির সিলিন্ডার এবং ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের প্রতিদিনের দাম দেখা যায়। জাগো নিউজ সিলিন্ডারের আকার হিসেবে ১২ কেজি, ৩০ কেজি ও অন্যান্য ওজনের কথা লিখেছিল; সেপ্টেম্বরে অধিদপ্তরের প্রচারণার সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনে চারটি আকারই উল্লেখ করা হয়।
২০২৫ সালে দাম ও জীবনযাত্রার ব্যয়
দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যের মধ্যেই অ্যাপটি আসে। ২০২৫ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ঢাকা ট্রিবিউনে প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের আগস্টে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.২৯ শতাংশ, জুলাইয়ে যা ছিল ৮.৫৫ শতাংশ। ব্যুরোর তথ্যে এটি ছিল ২০২২ সালের আগস্টের পর সবচেয়ে কম বৃদ্ধি, এবং এই কমার মূল কারণ ছিল খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের মূল্যস্ফীতি কমে যাওয়া; খাদ্যপণ্যের দাম তখনও বাড়ছিল।
বিবিএসের একই তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের আগস্টে স্বল্প আয়ের দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮.১৫ শতাংশ; টানা ৪৩ মাস ধরে মজুরি বেড়েছে দামের চেয়ে ধীরে। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৬.৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য ঠিক করেছিল। যে পরিবারের আয় দামের সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না, চাল, তেল বা মাছে প্রয়োজনের চেয়ে কয়েক টাকা বেশি দেওয়াও তার জন্য বড় ব্যাপার, আর প্রতিদিনের দামের একটি মানদণ্ড এই ব্যবধান কমাতেই সাহায্য করার কথা।
দাম নির্ধারণ ও প্রকাশের আগের উদ্যোগ
ভোক্তাকে পণ্যের দাম জানানোর সরকারি চেষ্টা বাজারদর অ্যাপ দিয়েই শুরু হয়নি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ২০২৪ সালের ১৫ মার্চ, শুক্রবার, রমজানের মধ্যে ২৯টি কৃষিপণ্যের ‘যৌক্তিক মূল্য’ নির্ধারণ করে দেয় বলে দুদিন পর প্রথম আলো জানায়। অধিদপ্তর জানায়, তারা কৃষি বিপণন আইন ২০১৮-এর ৪(ঝ) ধারার ক্ষমতাবলে দাম নির্ধারণ করেছে; ওই ধারায় অধিদপ্তরের কাজের মধ্যে ‘কৃষিপণ্যের সর্বনিম্ন মূল্য ও যৌক্তিক মূল্য নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন’ উল্লেখ আছে। উৎপাদন খরচ হিসাব করে তার সঙ্গে উৎপাদক, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে নির্ধারিত হারে মুনাফা যোগ করে দামগুলো ঠিক করা হয়।
প্রকাশিত হিসাব থেকেই পদ্ধতিটি বোঝা যায়। অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এক কেজি ব্রয়লার মুরগির উৎপাদন খরচ ১৪৬ টাকা, আর খুচরা দাম নির্ধারণ করা হয় ১৭৫ টাকা। গরুর মাংসের উৎপাদন খরচ কেজিতে ৫৮৮ টাকা ধরে উৎপাদক পর্যায়ে ৬০৫ টাকা, পাইকারি পর্যায়ে ৬৩২ টাকা ও খুচরা পর্যায়ে ৬৬৪ টাকা দাম ঠিক করা হয়, অথচ বাজারে তখন গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছিল ৭৩০ থেকে ৭৮০ টাকা কেজি। এক কেজি আলুর উৎপাদন খরচ ১৪ টাকার কম এবং যৌক্তিক দাম ২৯ টাকা ধরা হলেও ঢাকার কাঁঠালবাগান বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছিল ৪০ টাকা কেজিতে। তালিকায় আরও ছিল বিভিন্ন ধরনের ডাল, মাছ, মাংস, ডিম, পেঁয়াজসহ মসলা, সবজি, খেজুর, চিড়া ও সাগর কলা।
প্রথম আলো দেখতে পায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নির্ধারিত দর মানা হচ্ছিল না। সরকারি সংস্থা টিসিবির বাজারদরের তালিকা বিশ্লেষণ এবং ঢাকার চারটি বাজার ঘুরে দেখা যায়, ২৯টির মধ্যে শুধু আমদানি করা আদা, অ্যাংকর ডালের বেসন ও নেপালি সাগর নামে পরিচিত কলা নির্ধারিত দরে বিক্রি হচ্ছিল। কারওয়ান বাজার, কাঁঠালবাগান, মালিবাগ ও শাহজাহানপুরের কয়েকজন ব্যবসায়ী দাবি করেন, নতুন দরের কথা তাঁদের জানানো হয়নি, আর জানালেও বেশি দামে কেনা পণ্য ওই দরে বিক্রি করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হতো না। নির্ধারিত দাম না মানলে কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের নিজের আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার এখতিয়ার নেই; তারা অভিযোগ জানাতে পারে, বিচার করেন ম্যাজিস্ট্রেটরা।
আগের চেষ্টাগুলোরও একই পরিণতি হয়েছিল। ২০২১ সালে কৃষি বিপণন অধিদপ্তর ছোলা, পেঁয়াজ, ভোজ্যতেল, মসুর ডাল, চিনি ও খেজুরের দাম নির্ধারণ করে দিলেও বাজারে তা কার্যকর হয়নি, আর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ছয়টি পণ্যের দাম বেঁধে দিলে তাও কেউ মানেনি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও উৎপাদন ও আমদানি ব্যয় বিশ্লেষণ করে দাম নির্ধারণ করতে পারে; ২০২৪ সালের মার্চে বাজারে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নির্ধারিত দামের পণ্য ছিল তিনটি, ভোজ্যতেল, চিনি ও সাধারণ মানের খেজুর। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সভাপতি, যিনি একসময় বাণিজ্যসচিব ছিলেন, প্রথম আলোকে বলেন, বাজারে দাম কত হবে তা সরবরাহ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে; দাম নির্ধারণের সঙ্গে সরবরাহ বাড়ানো, চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ, নির্ধারিত দর কার্যকর করার পদক্ষেপ এবং মানুষের আয় বাড়ানোর চেষ্টাও করতে হবে।
এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে টিসিবি সবচেয়ে পুরোনো। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, এটি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, যা ১৯৭২ সালে রাষ্ট্রপতির আদেশ নং ৬৮ বলে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর প্রধান কার্যালয় ঢাকার কারওয়ান বাজারে। শুরু থেকেই এর একটি কাজ ছিল নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ ও দামের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখা। দাম বাড়লে স্বল্প আয়ের মানুষের কষ্ট লাঘবে সংস্থাটি চিনি, সয়াবিন তেল, মসুর ডাল ও ছোলা আমদানি করে দেশজুড়ে ডিলারদের মাধ্যমে বিক্রি করে; বাংলাপিডিয়ার নিবন্ধে ডিলারের সংখ্যা ২,৮৪৯ বলা হয়েছে। টিসিবি নিজের ওয়েবসাইটে দৈনিক খুচরা বাজারদরের তালিকাও প্রকাশ করে, ২০২৪ সালে দামের তুলনা করতে প্রথম আলো সেই তালিকাই ব্যবহার করেছিল। ভোক্তা অধিদপ্তরের অ্যাপ এর সঙ্গে যোগ করে প্রতিটি জেলার প্রতিদিনের দর, যা সরাসরি ক্রেতার ফোনে পৌঁছায়।
ভোক্তা অধিকার আইনে কী আছে
বাজারদর অ্যাপের পেছনের অধিদপ্তরটি গঠিত হয়েছে ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ (২০০৯ সনের ২৬ নং আইন) অনুযায়ী, যার তারিখ ২০০৯ সালের ৬ এপ্রিল। আইনের ১৮ ধারায় জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর নামে একটি অধিদপ্তরের বিধান রয়েছে; ১৯ ধারা অনুযায়ী এর প্রধান কার্যালয় ঢাকায়, আর সরকার প্রয়োজন মনে করলে যেকোনো জেলায় জেলা কার্যালয় স্থাপন করতে পারে। ২১ ধারা অনুযায়ী ভোক্তার অধিকার সংরক্ষণ, অধিকারবিরোধী কাজ প্রতিরোধ ও অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে পারেন মহাপরিচালক, যার মধ্যে ওজন ও পরিমাপে কারচুপি, ভেজাল, নকল পণ্য, মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য ও অসত্য বিজ্ঞাপনের তদারকি রয়েছে।
আইনে ‘ভোক্তা-অধিকার বিরোধী কার্য’ সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর মধ্যে আছে কোনো আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রি করা বা বিক্রির প্রস্তাব দেওয়া; জেনেশুনে ভেজাল পণ্য বিক্রি; খাদ্যে নিষিদ্ধ দ্রব্য মেশানো পণ্য বিক্রি; অসত্য বা মিথ্যা বিজ্ঞাপনে ক্রেতাকে প্রতারিত করা; দাম নিয়ে প্রতিশ্রুত পণ্য বা সেবা না দেওয়া; ওজনে বা পরিমাপে কম দেওয়া; প্রকৃত ওজন বা দৈর্ঘ্যের চেয়ে বেশি দেখায় এমন বাটখারা, ওজনযন্ত্র বা ফিতা ব্যবহার; নকল পণ্য বা ওষুধ তৈরি; এবং মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্য বা ওষুধ বিক্রি।
দুটি ধারা সরাসরি দামের সঙ্গে জড়িত। ৩৮ ধারা অনুযায়ী আইন বা বিধির বাধ্যবাধকতা অমান্য করে কেউ দোকান বা প্রতিষ্ঠানের সহজে দৃশ্যমান স্থানে পণ্যের মূল্যতালিকা টাঙিয়ে না রাখলে তাঁর অনূর্ধ্ব এক বছরের কারাদণ্ড, বা অনধিক পঞ্চাশ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড হতে পারে। ৪০ ধারা অনুযায়ী আইন বা বিধির অধীন নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য, ওষুধ বা সেবা বিক্রি বা বিক্রির প্রস্তাব দিলেও একই সর্বোচ্চ দণ্ড প্রযোজ্য। আইনে প্রতিটি জেলায় জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে জেলা ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ কমিটির বিধান আছে, আর প্রয়োজনে উপজেলা ও ইউনিয়ন কমিটি গঠনের সুযোগও রাখা হয়েছে।
যেকোনো ভোক্তা অভিযোগ করতে পারেন। ৭৬ ধারা অনুযায়ী ভোক্তা-অধিকারবিরোধী কোনো কাজ সম্পর্কে মহাপরিচালক বা তাঁর ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়া যায়; অভিযোগটি অনুসন্ধান বা তদন্ত করা হয়, এবং প্রমাণিত হলে প্রশাসনিক ব্যবস্থায় জরিমানা করা যায়। জরিমানার অর্থ আদায় হলে তার ২৫ শতাংশ অভিযোগকারীকে দিতে হয়, তবে অভিযোগকারী অধিদপ্তরের কর্মকর্তা বা কর্মচারী হলে তিনি এই অর্থ পাবেন না। ৬০ ধারা অনুযায়ী কারণ উদ্ভবের ৩০ দিনের মধ্যে অভিযোগ করতে হয়। বাজারদর অ্যাপে দেখা দাম আর বিক্রেতার চাওয়া দাম পাশাপাশি রাখলে ক্রেতা বুঝতে পারেন, অভিযোগ করার মতো কারণ আছে কি না।
ছবি: Masum-al-hasan / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, খবর সংযোগ, দেশ রূপান্তর, প্রথম আলো, ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলাপিডিয়া, ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ, ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ (বাংলাদেশের আইন)





মন্তব্য
(০)