কোরবানির ঈদের দিন, ২০২৬ সালের ২৮ মে বৃহস্পতিবার, রাজধানীর লালবাগের পোস্তায় কোরবানির পশুর কাঁচা চামড়ার বেচাকেনা জমে উঠেছিল। দেশের সবচেয়ে বড় এই কাঁচা চামড়ার আড়তে সেদিন সরকার এবার দাম বাড়িয়ে নতুন দর নির্ধারণ করে দিলেও চামড়া বিক্রি হচ্ছিল মোটামুটি গত বছরের দামেই। সরবরাহও ছিল আগের তুলনায় কম। সব মিলিয়ে চামড়া কেনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার শঙ্কার কথা জানিয়েছিলেন আড়তদাররা। এই প্রতিবেদন জাগো নিউজ ২৪-এর সরেজমিন বর্ণনা এবং ঈদের আগে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্ধারিত দাম ও ব্যবস্থাপনা ঘোষণার ভিত্তিতে তৈরি।
ঈদের দিন পোস্তার চিত্র
দুপুরের পর থেকেই ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে পোস্তায় কোরবানির পশুর চামড়া আসতে শুরু করে। ফড়িয়া, মাদরাসার শিক্ষক ও শিক্ষার্থী এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা ভ্যান ও পিকআপ ভ্যানে করে এসব চামড়া নিয়ে আসছিলেন। আড়তদারদের হাঁকডাকে সরব হয়ে উঠেছিল লালবাগের শায়েস্তা খান রোড, রাজ নারায়ণ ধর রোডসহ আশপাশের বিভিন্ন সড়ক। পাইকারি ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন এলাকার মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চামড়া সংগ্রহ করছিলেন, আর দরদামে মিললে সেগুলো তোলা হচ্ছিল গোডাউনে।
মূলত ঈদের দিন বিকেল পাঁচটার পর থেকেই চামড়া কেনাবেচা জমে ওঠে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেদিন রাত দশটা পর্যন্ত চামড়া সংগ্রহের কথা ছিল। পোস্তায় সংগ্রহ করা চামড়া প্রথমে লবণজাত করা হয়, এরপর সেগুলো পাঠিয়ে দেওয়া হয় সাভারের হেমায়েতপুরের ট্যানারিগুলোতে। লবণ দেওয়া এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ; কারণ সংগ্রহের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে লবণ না দিলে কাঁচা চামড়া পচতে শুরু করে। তাই ঈদের রাতে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও আড়তের কর্মীদের রীতিমতো সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিতে হয়।
সরকার এবার যে দাম নির্ধারণ করেছিল
ঈদের আগে, ২০২৬ সালের ১৩ মে বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবারের কোরবানির চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দিয়েছিল। মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকের পর ঘোষিত দর অনুযায়ী, ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়া কেনা হবে প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকায় এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকায়। গত বছর এই দর ছিল যথাক্রমে ৬০ থেকে ৬৫ এবং ৫৫ থেকে ৬০ টাকা; অর্থাৎ এবার প্রতি বর্গফুটে দুই টাকা করে বাড়ানো হয়েছিল। লবণযুক্ত খাসির চামড়ার দর ঠিক করা হয় প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দর ২২ থেকে ২৫ টাকা, যা ঢাকার ভেতরে ও বাইরে একই।
চামড়ার দাম যেহেতু আয়তনের হিসাবে ঠিক হয়, তাই একটি চামড়ার মোট মূল্য নির্ভর করে তার আকারের ওপর। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসকে ট্যানার্স সমিতির এক সদস্য চামড়ার আকারের পার্থক্য ব্যাখ্যা করেছিলেন। তাঁর হিসাবে, এক লাখ টাকা বা তার কম দামের গরুর ছোট চামড়া হয় প্রায় ২০ থেকে ২২ বর্গফুট, মাঝারি চামড়া ২০ থেকে ২৮ বর্গফুট বা কিছুটা বেশি, বড় চামড়া ৩০ থেকে ৪০ বর্গফুট এবং খুব বড় চামড়া সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ বর্গফুট পর্যন্ত হয়। তিনি জানান, এই হিসাবে গরুর একেকটি চামড়ার দাম নির্ধারিত দরে দাঁড়ায় প্রায় ১,২০০ থেকে ৩,৫০০ টাকা, আর ৩ থেকে ৬ বর্গফুটের একটি খাসির চামড়ার দাম হয় প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা।
যেহেতু নির্ধারিত দাম বর্গফুটের হিসাবে, তাই বড় ও ভালোভাবে সংরক্ষণ করা একটি চামড়ার দাম ছোট চামড়ার চেয়ে অনেক বেশি হওয়ার কথা; এ কারণেই পশুর আকার এবং লবণ দেওয়ার যত্ন দুটিই ঠিক করে দেয় একজন ব্যবসায়ী শেষ পর্যন্ত কত টাকা পাবেন। ব্যবসায়ীরা যাতে এই দর অনুযায়ী চামড়া সংরক্ষণ করতে পারেন, সে জন্য সরকার এবার কোরবানির চামড়া সংরক্ষণে প্রায় ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ বিনা মূল্যে সরবরাহের কথা জানিয়েছিল। পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন মসজিদ ও মাদরাসার লোকজনকে কোরবানির পর চামড়ায় সঠিকভাবে লবণ দেওয়া ও সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ দেবে বলেও জানানো হয়েছিল।

পোস্তায় দাম ও ব্যবসায়ীদের ক্ষোভ
পোস্তায় অবশ্য সরকারের বেঁধে দেওয়া দর মিলছিল না। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুপুরের পর থেকে আড়তদাররা বড় আকারের প্রতিটি চামড়া কিনছিলেন ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায়, মাঝারি আকারের চামড়া ৬০০ থেকে ৭০০ টাকায় এবং ছোট চামড়া ১৫০ থেকে ৫০০ টাকায়। সরকারের বেঁধে দেওয়া দাম না পাওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছিলেন মৌসুমি ব্যবসায়ী ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের অভিযোগ ছিল, লবণ ও সংরক্ষণের খরচ বেড়ে গেলেও চামড়ার দাম রয়ে গেছে গত বছরের মতোই।
পোস্তার চামড়ার আড়ত কামাল অ্যান্ড সন্সের মালিক আনোয়ার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, গত বছর চামড়ার আমদানি বেশি ছিল, কারণ কোরবানি বেশি হয়েছিল। তাঁর ভাষ্য, ‘এবার কোরবানি কম হয়েছে, চামড়ার আমদানিও কম হচ্ছে। আজ ঈদের দিন এক হাজার ৫০০ পিস চামড়া কেনার টার্গেট থাকলেও এখন পর্যন্ত ৭৫০ পিস চামড়া কিনতে পেরেছি। এবার টার্গেট পূরণ না হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ঢাকা শহরে কোরবানি শেষ হওয়ার পরপরই এখন অনেক চামড়া সরাসরি হেমায়েতপুরের দিকে চলে যায়, এটাও পোস্তায় সরবরাহ কমে যাওয়ার একটি কারণ।
অর্থাৎ সরকার আয়তনের হিসাবে যে দর ঠিক করে দিয়েছিল, পোস্তায় চামড়া বিক্রি হচ্ছিল তার চেয়ে অনেকটা কম পিসপ্রতি দামে। বাসসকে দেওয়া ট্যানার্স সমিতির হিসাবে একটি বড় গরুর চামড়ার দাম যেখানে নির্ধারিত দরে কয়েক হাজার টাকা হওয়ার কথা, সেখানে পোস্তায় বড় চামড়াও বিক্রি হচ্ছিল ৭৫০ থেকে ৯০০ টাকায়। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের বক্তব্য ছিল, এই দামে চামড়া বেচে তাঁদের লবণ ও পরিবহন খরচই উঠছে না। এ কারণেই ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছিলেন, এবার চামড়া কেনার লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না।

কেন কম চামড়া পৌঁছাচ্ছিল বাজারে
আড়তদারদের ভাষ্যে সরবরাহ কমে যাওয়ার মূল কারণ ছিল, ঢাকা শহরে কোরবানি শেষ হওয়ার পরপরই অনেক চামড়া পোস্তায় না এসে সরাসরি সাভারের হেমায়েতপুরের দিকে চলে যাচ্ছিল। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল সরকারের একটি সিদ্ধান্তও। বাসসের ২৫ মের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঈদের পর সাত দিন ঢাকার বাইরের কাঁচা চামড়া ঢাকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল; উদ্দেশ্য ছিল শিল্পনগরী ও কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারকে (সিইটিপি) সক্ষমতার মধ্যে রেখে সুশৃঙ্খল রাখা। এ জন্য ঢাকার প্রবেশপথ ও টোল প্লাজাগুলোতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি বাড়ানো, প্রয়োজনে অস্থায়ী সংরক্ষণাগার তৈরি এবং স্থানীয়ভাবে চামড়া সংগ্রহ করে পর্যাপ্ত লবণ দিয়ে সংরক্ষণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। ফলে চামড়া সংগ্রহ ও সরবরাহের চিরচেনা ভৌগোলিক চিত্রটিও কিছুটা বদলে যাচ্ছিল।
পোস্তা, হাজারীবাগ ও সাভারের পথ
পুরান ঢাকার লালবাগের পোস্তা দেশের সবচেয়ে বড় কাঁচা চামড়ার আড়ত। সারা দেশের মৌসুমি ব্যবসায়ীরা স্থানীয় পর্যায়ে চামড়া কিনে পোস্তার আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন; আড়তদাররা সেই চামড়া লবণজাত করে পাঠান ট্যানারিগুলোতে। স্থানীয় পর্যায়ে এই মৌসুমি ব্যবসায়ীরা কোরবানিদাতা পরিবার, মসজিদ ও মাদরাসা থেকে চামড়া কিনে বা সংগ্রহ করে উপজেলা ও জেলা হয়ে পোস্তায় নিয়ে আসেন; তাই দেশের বড় অংশের কোরবানির চামড়ার দরদাম শেষ পর্যন্ত এই আড়তেই ঠিক হয়ে যায়। এক সময় দেশের ট্যানারিগুলো কেন্দ্রীভূত ছিল পুরান ঢাকার হাজারীবাগে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দেশে আধুনিক ট্যানারি ইউনিটের সংখ্যা প্রায় ১০০, যেগুলো মূলত হাজারীবাগেই ছিল।
পুরান ঢাকার একটি ছোট এলাকায় এত ট্যানারি কেন্দ্রীভূত থাকায় পরিবেশগত উদ্বেগ তৈরি হয়েছিল এবং কারখানাগুলো শহরের বাইরে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়। পরে এগুলো সরিয়ে নেওয়া হয় সাভারের হেমায়েতপুরে গড়ে তোলা চামড়াশিল্প নগরীতে, যেখানে বর্জ্য পরিশোধনের জন্য কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার (সিইটিপি) নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণেই ঢাকায় কোরবানি শেষ হওয়ার পর কাঁচা চামড়ার গন্তব্য এখন হেমায়েতপুর, আর পোস্তা হয়ে উঠেছে সংগ্রহ ও লবণজাত করার কেন্দ্র।
কোরবানি ও চামড়া শিল্পের কাঁচামাল
কোরবানির ঈদ বা ঈদুল আজহা মুসলিমদের বছরের দুটি প্রধান উৎসবের একটি। ঈদের দিনগুলোতে সারা দেশে পরিবারগুলো গরু, মহিষ, ছাগল ও ভেড়া কোরবানি দেয় এবং সেসব পশুর চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রি করা হয়। বাংলাদেশে চামড়া শিল্প বড় পরিসরে গড়ে ওঠে ১৯৭০-এর দশক থেকে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট চামড়ার সরবরাহের প্রায় ৪০ শতাংশই আসে কোরবানির ঈদে জবাই করা পশু থেকে। অর্থাৎ বছরের মধ্যে কোরবানির এই কয়েকটি দিনই চামড়া শিল্পের কাঁচামালের একক বৃহত্তম উৎস, আর এ কারণেই ঈদের চামড়া সংগ্রহের বিষয়টি শুধু আড়তদার বা মৌসুমি ব্যবসায়ীর জন্যই নয়, গোটা শিল্পের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কোরবানির বাইরে প্রতিদিনের মাংস ভোগ, মুসলিম বিয়ে ও অন্যান্য উৎসব থেকেও সারা বছর চামড়া ও কাঁচামাল আসে, তবে এক সঙ্গে এত বিপুল পরিমাণ চামড়া আর কোনো সময়ই বাজারে আসে না।
দেশে ক্রাস্ট, ফিনিশড ও মিহি দানার চামড়া উৎপাদিত হয়। মিহি দানার চামড়ার পশ্চিম ইউরোপ ও জাপানে বিশেষ চাহিদা রয়েছে এবং কুষ্টিয়ার কালো ছাগলের চামড়া সূক্ষ্ম দানা ও টেকসই গুণের জন্য পরিচিত। জুতা, স্যান্ডেল, জ্যাকেট, গ্লাভস, ব্যাগ, মানিব্যাগ ও বেল্টের মতো নানা পণ্য তৈরি হয় এই চামড়া থেকে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, কাঁটাতারের বেড়া না থাকায় দেশের খামার ও মাঠের পশুর চামড়ার মান তুলনামূলক ভালো হয়, ফলে আঁচড় বা কাটা কম থাকে।

লবণ ও চামড়ার মান
একটি চামড়ার দাম অনেকটাই ঠিক হয়ে যায় প্রথম কয়েক ঘণ্টার যত্নে। লবণ না দিলে গরমে কাঁচা চামড়া দ্রুত নষ্ট হতে শুরু করে, আর নষ্ট বা খারাপভাবে সংরক্ষণ করা চামড়ার দাম কম মেলে এবং তা থেকে ভালো মানের চামড়া তৈরি হয় না। এ জন্যই পোস্তায় সংগৃহীত চামড়া আগে লবণজাত করা হয়, এ জন্যই সরকার কোরবানির চামড়ায় বিনা মূল্যে লবণ দেওয়ার কথা জানিয়েছিল এবং স্থানীয় প্রশাসনকে মসজিদ-মাদরাসার লোকজনকে লবণ দেওয়া ও সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ দিতে বলা হয়েছিল। বিসিকের সমীক্ষায়ও চামড়ার সঠিক সংরক্ষণ না হওয়া এবং ন্যায্য দাম না পাওয়াকে এই খাতের সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। তাই সময়মতো ও সঠিকভাবে লবণ দেওয়া চামড়া শুধু ভালো দামই পায় না, তা থেকেই তৈরি হয় রপ্তানিযোগ্য উন্নত মানের চামড়া; আর খারাপভাবে সংরক্ষণ করা চামড়ার ক্ষতি গিয়ে পড়ে গোটা শৃঙ্খলের ওপর।
চামড়া যায় কোথায়
এসব চামড়া থেকে তৈরি অধিকাংশ পণ্যই দেশের বাইরে চলে যায়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, উৎপাদিত চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের প্রায় ৯৫ শতাংশই রপ্তানি হয় এবং বিশ্বের চামড়ার বাজারে বাংলাদেশের অংশ প্রায় ২ শতাংশ। প্রধান ক্রেতাদের মধ্যে রয়েছে জার্মানি, ইতালি, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস, স্পেন, রাশিয়া, ব্রাজিল, জাপান, চীন, সিঙ্গাপুর ও তাইওয়ান; রপ্তানিতে গড়ে প্রায় ৮৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন হয় দেশে, বাকি ১৫ শতাংশ বিদেশে। বছরের পর বছর ধরে পুমা ও হুগো বসের মতো আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ড বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান থেকে পণ্য নিয়েছে। ফলে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য দেশের উল্লেখযোগ্য রপ্তানি আয়ের একটি উৎস।
এই শিল্পের বিকাশ দীর্ঘদিনের। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৮ সালে দেশ ১৭ কোটি ৮০ লাখ বর্গফুট চামড়া রপ্তানি করে প্রায় ১৬ কোটি মার্কিন ডলার আয় করেছিল; নব্বইয়ের দশকে বছরে গড়ে প্রায় ২২ কোটি ৫০ লাখ ডলারের চামড়া রপ্তানি হতো এবং বাজার বছরে ১০ থেকে ১৫ শতাংশ হারে বাড়ছিল; ২০০৭-০৮ অর্থবছরে চামড়াপণ্যের রপ্তানি দাঁড়ায় প্রায় ২৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার এবং ২০০৯ সালে প্রায় ২৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার। কম মজুরি এবং আধা-প্রক্রিয়াজাত ওয়েট ব্লু চামড়া রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা এই শিল্পকে বাড়তি গতি দিয়েছে, কারণ তাতে দেশেই উচ্চ মূল্যের ক্রাস্ট ও ফিনিশড চামড়া তৈরি হয়। বর্তমানে ক্রাস্ট চামড়া উৎপাদনের সক্ষমতা দেশের নিজস্ব কাঁচা চামড়ার সরবরাহের প্রায় দ্বিগুণ, যে কারণে কোরবানির চামড়া সংগ্রহ এত গুরুত্বপূর্ণ।
চামড়ার দাম কেন বছরের পর বছর কম
কাঁচা চামড়ার দাম বছরের পর বছর কম থাকার পেছনের কারণ নিয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল ২০২৪ সালের মাঝামাঝি। প্রথম আলোর ১৩ জুলাই ২০২৪-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের বর্তমান অবস্থা, চ্যালেঞ্জ ও সমাধান’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে আট বিভাগের আট জেলার ৪০৩ জনের মতামত নেওয়া হয়, যাঁদের মধ্যে ২২০ জন কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ী। ব্যবসায়ীদের ভাষ্যে দাম কম থাকার সাতটি কারণ উঠে এসেছিল:
- একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ চামড়া সরবরাহ হওয়া;
- লবণের দাম, ভ্যানভাড়া ও ঈদ বোনাসের খরচ বেড়ে যাওয়া;
- ক্রেতা কম থাকা ও ক্রেতাদের একসঙ্গে বেশি চামড়া কেনা;
- ব্যবসায়ীদের নিজেদের মূলধনের সংকট;
- ট্যানারি মালিকদের সময়মতো টাকা পরিশোধ না করা;
- ট্যানারি সিন্ডিকেট;
- বাজার সিন্ডিকেট।
প্রতিবেদনে বলা হয়, কোরবানির পরের তিন মাসে প্রায় ৬৪ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবসায়ী মাসে গড়ে প্রায় ২০ লাখ টাকার লেনদেন করেন, অথচ বছরের বাকি সময়ে ৮৫ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যবসায়ীর মাসিক লেনদেন ১০ লাখ টাকার নিচে নেমে আসে। এতে বোঝা যায়, এই ব্যবসা কতটা কোরবানিকেন্দ্রিক। প্রতিবেদনে সিন্ডিকেট ভাঙা, লবণের দাম কমানো, লেনদেনে নজরদারি এবং ট্যানারিগুলোকে সময়মতো টাকা পরিশোধে বাধ্য করার সুপারিশ করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, হেমায়েতপুরের শিল্পনগরীতে দূষণের কারণে চামড়ার রপ্তানিমূল্য কম মেলে এবং জরিপে অংশ নেওয়া ১২৯টি প্রতিষ্ঠানের ৮৬ শতাংশ কমপ্লায়েন্স-ঘাটতির কারণে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল থেকে স্বল্প সুদের ঋণ পায় না। সিইটিপি পুরোপুরি চালু করা ও ট্যানারির মানোন্নয়নের সুপারিশও ছিল সেখানে, যাতে বাংলাদেশি চামড়া আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত হয়ে ভালো দাম পায় এবং সেই সুফল শেষ পর্যন্ত চামড়া সংগ্রহের দামেও এসে পড়ে।
এবার সরকারের ব্যবস্থাপনা
বাসসের ২৫ মের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের চামড়া সংগ্রহ সুশৃঙ্খল রাখতে সরকার একাধিক তদারকি ব্যবস্থা নিয়েছিল। শিল্প, বাণিজ্য, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং জননিরাপত্তা বিভাগের সমন্বয়ে একটি যৌথ দল লবণ সরবরাহ, সংগ্রহ, দরদাম, পরিবহন ও সংরক্ষণ তদারকি করার কথা ছিল। অবৈধভাবে পশু প্রবেশ, পাচার, চাঁদাবাজি ও গুজব ঠেকাতে বিসিক একটি কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম চালু করে এবং চামড়া শিল্পনগরীতে শিল্পাঞ্চল পুলিশ মোতায়েনের কথাও জানানো হয়।
মাঠপর্যায়ে প্রাণিসম্পদ কর্তৃপক্ষ আট বিভাগে ১৫ হাজার ৪৪৪ জন পেশাদার এবং ২২ হাজার ৯১৮ জন অপেশাদার কসাইকে প্রশিক্ষণ দিয়েছিল, প্রায় ২ হাজার ৬৬৩টি সভা করেছিল, প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার ৭৪টি লিফলেট ও পোস্টার বিতরণ করেছিল এবং ঈদের আগে ৮ বিভাগে ৬৭ হাজার ৩৬৬টি গরু মোটাতাজাকরণ খামার পরিদর্শন করেছিল। এসব আয়োজনে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ইমাম, মাদরাসাশিক্ষার্থী, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের যুক্ত করা হয়েছিল। পাশাপাশি টেলিভিশন বিজ্ঞাপন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার, সরকারি ওয়েবসাইটে পপ-আপ বার্তা, সব জেলায় প্রায় ২ লাখ লিফলেট, হাটে ব্যানার ও এসএমএস বার্তা দিয়ে চামড়া নষ্ট বা পাচার ঠেকানো এবং সঠিক সংরক্ষণের বার্তা দেওয়া হয়েছিল।
বাংলাদেশে বহু মানুষ কোরবানির পশুর চামড়া বা তার মূল্য দান করেন মাদরাসা, এতিমখানা ও গরিব-মিসকিনদের জন্য; তাই প্রতি বছর ঈদের চামড়ার একটি বড় অংশ সংগ্রহ করেন মাদরাসার লোকজন ও মৌসুমি সংগ্রাহকেরা। পোস্তায় সেদিন মাদরাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের চামড়া নিয়ে আসার চিত্রেই তা ফুটে উঠছিল। এ কারণেই চামড়ার ন্যায্য দাম না পাওয়া শুধু ব্যবসায়ীর লোকসান নয়, দরিদ্র মানুষের জন্য নির্ধারিত দানের অর্থও কমিয়ে দেয়, যা ঈদের চামড়ার দাম নিয়ে প্রতিবছরের আলোচনাকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
ছবি: ওয়াসিউল বাহার / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দাম (প্রথম আলো), বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), বিসিক প্রতিবেদন (প্রথম আলো), বাংলাপিডিয়া।





মন্তব্য
(০)