সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮+০.০%আদা - আমদানিকৃত১৬৭+০.০%আদা - দেশী১৫৪+০.০%আমন চাল - মাঝারি৫৬+০.০%আমন চাল - মোটা৪৮+০.০%আমন চাল - সরু৭২+০.০%আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২+০.০%কাঁচা মরিচ২১৮+০.০%খামারের মুরগী১৬২+০.০%খাসী৯০০+০.০%চিনি (দেশী)১৩২+০.০%ছোলা - গোটা৮৫+০.০%ডিম ফার্ম - লাল৪৭+০.০%পেঁয়াজ - দেশী৬০+০.০%বোরো চাল - মাঝারি৫৫+০.০%বোরো চাল - মোটা৪৭+০.০%বোরো চাল - সরু৬৬+০.০%মাংসঃ– গরু৭২৯+০.০%মুগ ডাল১২২+০.০%রসুন - আমদানিকৃত১৯২+০.০%রসুন - দেশী১৭৩+০.০%সয়াবিন তেল১৬৩+০.০%
হালনাগাদ ১ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা৩২°বৃষ্টির সম্ভাবনাআর্দ্রতা ৫৩%বাতাস ৬ কিমি/ঘবৃষ্টি ০.৬ মিমি

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিশ্বে শীর্ষে চীন, শীর্ষ ১০-এর অর্ধেকই এশিয়ার

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সবশেষ বৈশ্বিক ডেটাবেজ অনুযায়ী ফল ও ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণে বিশ্বের শীর্ষে চীন, এরপর ব্রাজিল ও ভারত। শীর্ষ ১০ দেশের অর্ধেকের বেশি এশিয়ায় অবস্থিত।

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিশ্বে শীর্ষে চীন, শীর্ষ ১০-এর অর্ধেকই এশিয়ার
এগ্রোটেক

বিশ্বে জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও মানুষের আয়ের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্যাভ্যাসে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। সাধারণ কৃষিজাত কাঁচামালের চেয়ে এখন বিশ্বজুড়ে প্রক্রিয়াজাত খাবারের কদর বেড়েছে কয়েকগুণ। ফল, তেলবীজ ও বিভিন্ন খাদ্যশস্যকে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে প্রক্রিয়াজাত করে মাসের পর মাস ব্যবহার এবং দূরদূরান্তে পরিবহনের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে। এর ফলে গড়ে উঠেছে এক বিশাল বাণিজ্যিক বাজার। ২০২৬ সালের ২৮ জুন জাগো নিউজ ২৪ জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সবশেষ বৈশ্বিক ডেটাবেজের তথ্য তুলে ধরে জানায়, ফল ও ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের অর্ধেকের বেশি এশিয়ায় অবস্থিত এবং এই তালিকার একেবারে শীর্ষে রয়েছে চীন।

এফএও-র তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশ আধুনিক অবকাঠামো ও প্রযুক্তির জোরে এই খাতে বড় ধরনের প্রভাব বিস্তার করছে। বিশেষ করে এশিয়ার দেশগুলো কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে সবচেয়ে বেশি আধিপত্য দেখাচ্ছে। নিচে ফল ও অন্যান্য ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণে শীর্ষ ১০ দেশের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হলো, যেখানে প্রতিটি সংখ্যা ও ক্রম এফএও-র ডেটাবেজ থেকে নেওয়া।

এফএও ও তার পরিসংখ্যান


জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা বা এফএও প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৫ সালের ১৬ অক্টোবর; এটি খাদ্য ও কৃষি বিষয়ে জাতিসংঘের বিশেষায়িত সংস্থা এবং এর সদর দপ্তর ইতালির রোমে। সংস্থাটির সবচেয়ে পরিচিত মাধ্যমগুলোর একটি হলো ফাওস্ট্যাট (FAOSTAT), একটি উন্মুক্ত পরিসংখ্যান ডেটাবেজ, যা ২৪৫টির বেশি দেশ ও অঞ্চল থেকে খাদ্য ও কৃষিসংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ করে। এই ডেটাবেজে ফসল, পশুসম্পদ ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের উৎপাদনসহ বহু সূচকের তথ্য থাকে। এই প্রতিবেদনের ক্রম ও পরিমাণও এই ডেটাবেজ থেকেই নেওয়া। সব দেশের তথ্য একই মানদণ্ডে সংগ্রহ করা হয় বলে প্রতিটি দেশের প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের আকার একই ভিত্তিতে তুলনা করা যায়; এ কারণেই একটিমাত্র ডেটাবেজ চীন, ব্রাজিল ও জার্মানিকে পাশাপাশি রাখতে পারে।

কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ আসলে কী


কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ বা অ্যাগ্রো-প্রসেসিং বলতে বোঝানো হয় কৃষিজাত কাঁচামালকে খাদ্য বা অন্য ব্যবহারযোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা। শস্য ভেঙে ময়দা তৈরি থেকে শুরু করে আখ থেকে চিনি, সয়াবিন থেকে তেল কিংবা আঙুর থেকে ওয়াইন তৈরি, সবই এই প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত। সাধারণভাবে প্রক্রিয়াজাতকরণকে তিন স্তরে ভাগ করা হয়। প্রাথমিক স্তরে কাঁচা ফসলকে খাওয়ার উপযোগী মৌলিক উপাদানে পরিণত করা হয়, যেমন শস্য মাড়াই ও মিলিং, বীজ থেকে তেল নিষ্কাশন কিংবা দুধ পাস্তুরায়ন। দ্বিতীয় স্তরে সেই প্রস্তুত উপাদান থেকে পরিচিত খাবার তৈরি হয়, যেমন রুটি বানানো কিংবা গাঁজন প্রক্রিয়ায় বিয়ার ও ওয়াইন তৈরি। তৃতীয় স্তরে বাণিজ্যিকভাবে তৈরি হয় প্যাকেটজাত ও সরাসরি খাওয়ার উপযোগী প্রক্রিয়াজাত খাদ্য।

খাদ্য সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণের ইতিহাস বহু পুরোনো। প্রাচীনকালে মানুষ গাঁজন, রোদে শুকানো, লবণ দিয়ে সংরক্ষণ ও ধোঁয়ায় শুকানোর মতো পদ্ধতিতে খাবার নষ্ট হওয়া ঠেকাত। আধুনিক শিল্পের সূচনা হয় উনিশ শতকে। ১৮০৯ সালে ফরাসি উদ্ভাবক নিকোলা আপের বায়ুরোধী পাত্রে খাবার সংরক্ষণের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন, আর ১৮১০ সালে পিটার ডুরান্ড চালু করেন টিনজাত বা ক্যানিং প্রক্রিয়া। ১৮৬৪ সালে লুই পাস্তুর উদ্ভাবন করেন পাস্তুরায়ন পদ্ধতি, যা ওয়াইন, বিয়ার ও দুধ নিরাপদে সংরক্ষণের পথ খুলে দেয়। বিশ শতকে ক্লারেন্স বার্ডসাইয়ের হাত ধরে বিকশিত হয় হিমায়িত খাদ্যের শিল্প। এই প্রযুক্তিগুলোই আজকের বিশাল প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের ভিত্তি।

প্রক্রিয়াজাতকরণের মূল পদ্ধতির মধ্যে আছে টিনজাতকরণ, শুকানো, হিমায়ন, মিলিং এবং তেল নিষ্কাশন। তেল পাওয়া যায় দুভাবে, হয় বীজ বা ফল যান্ত্রিকভাবে চেপে, নয়তো গুঁড়া করা উপাদান দ্রাবক দিয়ে ধুয়ে, পরে যে দ্রাবক সরিয়ে ফেলা হয়। শস্য গুঁড়া করা হয় রোলার বা পাথরের চাকতির মাঝে। গাঁজন বা ফারমেন্টেশন হলো ইস্ট বা ব্যাকটেরিয়ার নিয়ন্ত্রিত ক্রিয়া, যার মাধ্যমে শর্করা অ্যালকোহলে রূপান্তরিত হয়ে বিয়ার ও ওয়াইন তৈরি হয়। টিনজাতকরণ ও হিমায়ন খাবারকে বাতাস ও পচনকারী জীবাণু থেকে আলাদা করে রাখে, যাতে তা এক বছর বা তার বেশি সময় ভালো থাকে। এসব পদ্ধতির উদ্দেশ্য এক: পচনশীল কৃষিপণ্যকে দীর্ঘ সময় ভালো রাখা, দূরের বাজারে পৌঁছে দেওয়া এবং অপচয় কমানো। এর ফলে একদিকে ভোক্তা পান নিরাপদ ও সহজলভ্য খাবার, অন্যদিকে উৎপাদক ও প্রক্রিয়াজাতকারী দেশ গড়ে তোলে বড় শিল্প ও রপ্তানি আয়।

শীর্ষে চীন ও ব্রাজিল


এফএও-র তথ্য অনুযায়ী, ফল ও ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণে বিশ্বের এক নম্বর দেশ চীন। দেশটির মোট বার্ষিক প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ প্রায় ৯ কোটি ৯৫ লাখ ২৬ হাজার ৬৭৬ টন। চীনের এই অর্জনের পেছনে রয়েছে দক্ষ জনশক্তি ও সাশ্রয়ী উৎপাদন ব্যবস্থা। দেশটির কারখানাগুলোতে সবচেয়ে বেশি প্রক্রিয়াজাত হয় বিয়ার, সয়াবিন তেল ও চিনি। চা প্রক্রিয়াজাতকরণেও চীন বিশ্বে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। শিল্প ও এফএও-র পরিসংখ্যান বলছে, পরিমাণের বিচারে চীন বিশ্বের বৃহত্তম বিয়ার উৎপাদনকারী দেশ এবং চা উৎপাদনেও শীর্ষে। বিপুল অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও বিশাল কৃষিভিত্তি দেশটিকে এই অবস্থানে পৌঁছে দিয়েছে।

তালিকার দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিল। দেশটির মোট প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ ৯ কোটি ৯৩ লাখ ৪৬ হাজার ৩২৯ টন। ব্রাজিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান চিনি উৎপাদনকারী দেশ; আখের চিনি ও এর উপজাত চিটাগুড় উৎপাদনে দেশটি বৈশ্বিক বাজারে বড় প্রভাব রাখে। শিল্প পরিসংখ্যান অনুযায়ী ব্রাজিল বহু বছর ধরে বিশ্বের বৃহত্তম আখ ও আখের চিনি উৎপাদক এবং রপ্তানিকারক। চিনির পাশাপাশি বিয়ার উৎপাদনেও দেশটি অনেক এগিয়ে। চিটাগুড় হলো আখ বা বিট থেকে চিনি পরিশোধনের সময় তৈরি হওয়া ঘন, গাঢ় রঙের উপজাত, যা পশুখাদ্য, রাম এবং ইথানল তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়।

ব্রাজিলের সাঁউ পাউলো অঙ্গরাজ্যে সাঁউ মার্তিনিউ চিনিকল; এটি বিশ্বের বৃহত্তম চিনিকলগুলোর একটি। প্রতীকী ছবি। ছবি: Elmschrat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
ব্রাজিলের সাঁউ পাউলো অঙ্গরাজ্যে সাঁউ মার্তিনিউ চিনিকল; এটি বিশ্বের বৃহত্তম চিনিকলগুলোর একটি। প্রতীকী ছবি। ছবি: Elmschrat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

ভারত ও ইন্দোনেশিয়া


তালিকার তৃতীয় স্থানে রয়েছে ভারত। দেশটির মোট ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ ৮ কোটি ২৮ লাখ ৬৮ হাজার ৫১৩ টন। বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার ও প্রচুর কাঁচামালের সহজলভ্যতার কারণে ভারত এই খাতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ভারতের প্রধান প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে চিনি, চিটাগুড় এবং বিপুল পরিমাণ তুলাবীজ। তুলাবীজ হলো তুলা চাষের উপজাত; এর থেকে রান্নার তেল এবং পশুখাদ্যের জন্য খইল তৈরি হয়। ব্রাজিলের মতো ভারতও বিশ্বের বৃহত্তম আখ ও চিনি উৎপাদক দেশগুলোর একটি।

চতুর্থ স্থানে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপরাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়া। দেশটির মোট প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ ৬ কোটি ৮৩ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫১ টন। মালয়েশিয়ার মতো ইন্দোনেশিয়ার অর্থনীতিও পাম তেল উৎপাদনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল। বৈশ্বিক বাজারে পাম তেলের সিংহভাগ জোগান আসে এই দুই দেশ থেকেই। ইন্দোনেশিয়ার প্রধান পণ্যের মধ্যে আছে পাম তেল ও পাম কার্নেল তেল। পাম তেল আসে তেলপাম গাছের (Elaeis guineensis) ফলের মাংসল অংশ থেকে, আর পাম কার্নেল তেল আসে সেই ফলের ভেতরের শক্ত বীজ বা কার্নেল থেকে। পাম তেল খাদ্য, সাবান, প্রসাধনী ও জৈব জ্বালানিসহ বহু পণ্যে ব্যবহৃত হয়।

মালয়েশিয়ার সাবাহ রাজ্যের তাওয়াউয়ে একটি তেলপাম কল; ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে পাম পণ্যের আধিপত্য। ছবি: Negaraku / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
মালয়েশিয়ার সাবাহ রাজ্যের তাওয়াউয়ে একটি তেলপাম কল; ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পে পাম পণ্যের আধিপত্য। ছবি: Negaraku / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)

যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া


বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র এই তালিকায় পঞ্চম স্থানে রয়েছে। দেশটির মোট বার্ষিক প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ ৫ কোটি ৯০ লাখ ৫৭ হাজার ৫৭৭ টন। যুক্তরাষ্ট্রের বিশাল কৃষিখাত থেকে উৎপাদিত কাঁচামাল দেশীয় উন্নত প্রযুক্তির কারখানায় প্রক্রিয়াজাত করা হয়। তাদের প্রধান পণ্যের মধ্যে রয়েছে সয়াবিন তেল, বিয়ার ও চিনি। সয়াবিন তেল সয়াবিন বীজ থেকে নিষ্কাশিত হয় এবং এটি বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ভোজ্যতেলগুলোর একটি। যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রাজিল বিশ্বের বৃহত্তম সয়াবিন উৎপাদক দেশ।

আয়তনে বিশ্বের বৃহত্তম দেশ রাশিয়া প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতেও শক্তিশালী অবস্থানে আছে। ২ কোটি ৭০ লাখ ৫৩ হাজার ৫১৭ টন বার্ষিক উৎপাদন নিয়ে রাশিয়া রয়েছে ষষ্ঠ স্থানে। দেশটির কারখানাগুলোতে সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় বিয়ার, সূর্যমুখী তেল ও আখের চিনি। সূর্যমুখী তেল আসে সূর্যমুখী ফুলের বীজ থেকে; এটি একটি হালকা রান্নার তেল এবং রাশিয়া এই তেল উৎপাদনে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ। ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে রাশিয়ার এসব পণ্যের বড় সরবরাহ রয়েছে এবং দেশটি নিজস্ব অভ্যন্তরীণ চাহিদাও সহজে মেটায়।

সয়াবিন ও সয়াবিনজাত পণ্য; সয়াবিন তেল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান প্রক্রিয়াজাত পণ্য। ছবি: ইউএসডিএ / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সয়াবিন ও সয়াবিনজাত পণ্য; সয়াবিন তেল যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান প্রক্রিয়াজাত পণ্য। ছবি: ইউএসডিএ / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

মালয়েশিয়া, মেক্সিকো ও থাইল্যান্ড


দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আরেক অর্থনৈতিক শক্তি মালয়েশিয়া রয়েছে সপ্তম স্থানে। দেশটির মোট প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ ২ কোটি ৫৬ লাখ ৮৭ হাজার ৪৮৫ টন। মালয়েশিয়ার পুরো প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প মূলত পাম পণ্যের ওপর নির্ভরশীল; দেশটির মূল পণ্যের মধ্যে রয়েছে পাম তেল ও পাম কার্নেল তেল। ভোজ্যতেলের বৈশ্বিক বাজারে মালয়েশিয়া অন্যতম প্রধান অংশীদার, আর ইন্দোনেশিয়ার সঙ্গে মিলে এই দুই দেশ বিশ্বের পাম তেলের বড় অংশ জোগান দেয়।

লাতিন আমেরিকার অন্যতম প্রধান অর্থনীতি মেক্সিকো রয়েছে অষ্টম স্থানে। দেশটির মোট বার্ষিক প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ প্রায় ২ কোটি ৩২ লাখ ৫৪ হাজার ৪৪১ টন। বৈশ্বিক বাজারে মেক্সিকোর পণ্যের বড় চাহিদা রয়েছে। দেশটিতে সবচেয়ে বেশি প্রক্রিয়াজাত হয় বিয়ার, চিনি ও বিভিন্ন প্রকার ভেষজ তেল। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র তার সীমান্তেই থাকায় মেক্সিকোর প্রক্রিয়াজাত পণ্যের রপ্তানি বাণিজ্য অনেক সহজ ও বড় বাজারের সুবিধা পায়।

তালিকার নবম স্থানে রয়েছে এশিয়ার অন্যতম শীর্ষ কৃষিপ্রধান দেশ থাইল্যান্ড। দেশটির মোট প্রক্রিয়াজাতকরণের পরিমাণ ২ কোটি ১৫ লাখ ১০ হাজার ৭২৫ টন। থাইল্যান্ডের প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সিংহভাগ জুড়েই রয়েছে চিনি উৎপাদন এবং এর উপজাত চিটাগুড়। এর পাশাপাশি এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোতে সরবরাহের জন্য দেশটি বিপুল পরিমাণে পাম তেলও প্রক্রিয়াজাত করে।

জার্মানি ও ইউরোপের বাজার


তালিকার দশম স্থানে রয়েছে ইউরোপের দেশ জার্মানি। জাতিসংঘের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জার্মানির ফল ও ফসল প্রক্রিয়াজাতকরণের মোট পরিমাণ ছিল প্রায় ১ কোটি ৯৫ লাখ ৪০ হাজার ৮৪২ টন। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে দেশটি অত্যন্ত উন্নত। জার্মানির প্রধান প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মধ্যে রয়েছে বিয়ার, চিনি এবং রেপসিড বা ক্যানোলা তেল। রেপসিড হলো সরিষা পরিবারের একটি তেলবীজ ফসল; এর কম ইরুসিক অ্যাসিডযুক্ত জাতকে ক্যানোলা বলা হয়, যা রান্নার তেল ও জৈব জ্বালানি তৈরিতে ব্যবহৃত হয়। ইউরোপের বাজারে জার্মানির প্রক্রিয়াজাত পণ্যের বড় আধিপত্য রয়েছে।

লক্ষণীয়, শীর্ষ দশে চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড, এই পাঁচটি এশীয় দেশ জায়গা করে নিয়েছে। এর বিপরীতে ইউরোপ থেকে একমাত্র জার্মানি এবং লাতিন আমেরিকা থেকে ব্রাজিল ও মেক্সিকো তালিকায় রয়েছে। বিশাল জনসংখ্যা, বিপুল কাঁচামাল ও তুলনামূলক কম খরচের উৎপাদন ব্যবস্থাই এশীয় দেশগুলোর এগিয়ে থাকার মূল কারণ। এফএও-র এই চিত্র স্পষ্ট করে, বিশ্বের কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের কেন্দ্র এখন ধীরে ধীরে এশিয়ার দিকে সরে আসছে।

ফুল ফোটা ক্যানোলা বা রেপসিডের খেত; রেপসিড তেল জার্মানির অন্যতম প্রধান প্রক্রিয়াজাত পণ্য। প্রতীকী ছবি, কানাডার সাসকাচোয়ান। ছবি: Nas2 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
ফুল ফোটা ক্যানোলা বা রেপসিডের খেত; রেপসিড তেল জার্মানির অন্যতম প্রধান প্রক্রিয়াজাত পণ্য। প্রতীকী ছবি, কানাডার সাসকাচোয়ান। ছবি: Nas2 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)

সংখ্যার পেছনের পণ্যগুলো


তালিকায় বারবার ফিরে আসা পণ্যগুলোর পরিচয় জানলে এই শিল্পের চরিত্র বোঝা সহজ হয়। নিচে প্রধান প্রক্রিয়াজাত পণ্যগুলোর সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হলো:

  • চিনি ও চিটাগুড়: আখ ও চিনিবিট থেকে চিনি তৈরি হয়, আর পরিশোধনের সময় তৈরি হওয়া ঘন, গাঢ় উপজাত হলো চিটাগুড়, যা পশুখাদ্য, রাম ও ইথানল উৎপাদনে ব্যবহৃত হয়।
  • পাম তেল ও পাম কার্নেল তেল: তেলপাম গাছের ফলের মাংসল অংশ থেকে পাম তেল এবং ভেতরের বীজ থেকে পাম কার্নেল তেল পাওয়া যায়; দুটিই খাদ্য, প্রসাধনী ও সাবান শিল্পে ব্যবহৃত হয়।
  • সয়াবিন তেল: সয়াবিন বীজ থেকে নিষ্কাশিত বিশ্বের অন্যতম বেশি ব্যবহৃত ভোজ্যতেল।
  • সূর্যমুখী তেল: সূর্যমুখী ফুলের বীজ থেকে তৈরি হালকা রান্নার তেল।
  • রেপসিড বা ক্যানোলা তেল: সরিষা পরিবারের তেলবীজ থেকে তৈরি তেল, রান্না ও জৈব জ্বালানিতে ব্যবহৃত।
  • তুলাবীজ: তুলা চাষের উপজাত, যার থেকে তেল ও পশুখাদ্যের খইল তৈরি হয়।
  • বিয়ার ও ওয়াইন: যথাক্রমে শস্য ও আঙুরের রস গাঁজন করে তৈরি দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়াজাত পানীয়।

এই তালিকা থেকে স্পষ্ট, প্রক্রিয়াজাতকরণের বড় অংশই চিনি, ভোজ্যতেল ও গাঁজনজাত পানীয়ের মতো কয়েকটি পণ্যকে ঘিরে আবর্তিত। যেসব দেশের আখ, তেলপাম কিংবা সয়াবিনের মতো প্রচুর কাঁচামাল আছে, তারাই স্বাভাবিকভাবে এই খাতে এগিয়ে।

বৈশ্বিক প্রক্রিয়াজাতকরণে ভোজ্যতেলের অংশ বিশেষভাবে বড়। পাম, সয়াবিন, সূর্যমুখী ও রেপসিড তেল বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বাণিজ্য হওয়া উদ্ভিজ্জ তেলগুলোর অন্যতম; এগুলো শুধু রান্নায় নয়, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, পশুখাদ্য, সাবান, প্রসাধনী এবং ক্রমবর্ধমানভাবে জৈব জ্বালানিতেও ব্যবহৃত হয়। এই বিস্তৃত চাহিদাই ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো তেল উৎপাদক দেশগুলোকে তালিকায় এত ওপরে রাখার একটি কারণ।

পণ্যগুলো কীভাবে তৈরি হয়, তা জানলে এত বিপুল পরিমাণের কারণও বোঝা যায়। আখের চিনি তৈরিতে কাটা আখ কলে পিষে রস বের করা হয়; এরপর সেই রস পরিশোধন করে ফুটিয়ে ঘন করা হয় যতক্ষণ না চিনির দানা তৈরি হয়, আর সেন্ট্রিফিউজে ঘুরিয়ে দানাগুলো অবশিষ্ট চিটাগুড় থেকে আলাদা করা হয়। অর্থাৎ একই কারখানা থেকে পরিশোধিত চিনি ও চিটাগুড় দুটিই পাওয়া যায়, এ কারণেই তালিকার বহু দেশের ক্ষেত্রে এ দুটি একসঙ্গে উঠে আসে।

পাম তেল তৈরি হয় ভিন্নভাবে। তেলপাম গাছের তাজা ফলের কাঁদি প্রথমে বাষ্পে জীবাণুমুক্ত করা হয়, এরপর ফল আলাদা করে চেপে বাইরের মাংসল অংশ থেকে অপরিশোধিত পাম তেল বের করা হয়। বাকি থাকা শক্ত বাদাম ভেঙে ভেতরের কার্নেল থেকে চাপ বা দ্রাবকের মাধ্যমে পাওয়া যায় পাম কার্নেল তেল। অর্থাৎ একটি কল থেকেই ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়ার শিল্পে প্রাধান্য বিস্তারকারী দুই ধরনের পাম পণ্যই উৎপাদিত হয়।

প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন গুরুত্বপূর্ণ


প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প শুধু খাদ্যের স্থায়িত্বই বাড়ায় না, একটি দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতেও বড় ভূমিকা রাখে। কাঁচামাল আকারে রপ্তানি করলে কৃষক ও দেশ যে দাম পায়, সেই পণ্য প্রক্রিয়াজাত করে বিক্রি করলে তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্য যুক্ত হয়। প্রক্রিয়াজাতকরণ ফসলের অপচয় কমায়, কর্মসংস্থান তৈরি করে এবং কৃষিকে শিল্পের সঙ্গে যুক্ত করে। এফএও দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, কৃষিভিত্তিক শিল্প বা অ্যাগ্রো-ইন্ডাস্ট্রি গ্রামীণ অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

মূল্য সংযোজনের বিষয়টি এই শিল্পের প্রাণ। স্বল্পমূল্যের একটি কাঁচা ফসলকে প্রক্রিয়াজাত করে বোতলজাত তেল, প্যাকেটজাত চিনি বা টিনজাত খাবারে রূপান্তর করলে তার দাম কয়েকগুণ বেড়ে যায়; সেই সঙ্গে গড়ে ওঠে বাছাই, পরিষ্কার, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বিপণনকে ঘিরে অসংখ্য কাজ। এতে একদিকে কৃষিপণ্যের সরবরাহ শৃঙ্খল দীর্ঘ ও শক্তিশালী হয়, অন্যদিকে গ্রামাঞ্চলে আয় ও কর্মসংস্থান বাড়ে। এ কারণেই শুধু উৎপাদন নয়, প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতাকেও এখন কৃষি উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়।

প্রক্রিয়াজাতকরণ ফসল কাটা থেকে খাবার টেবিল পর্যন্ত পথে হওয়া বিপুল অপচয়ও কমায়। ফল, শস্য ও তেলবীজের একটি বড় অংশ ব্যবহারের আগেই নষ্ট হয়ে যেতে পারে; সেগুলোকে দ্রুত তেল, চিনি বা টিনজাত পণ্যের মতো টেকসই রূপে রূপান্তর করলে অনেক খাবার বেঁচে যায়। বিশাল জনসংখ্যা ও বড় কৃষিভিত্তির এশীয় দেশগুলোর জন্য ফসল উৎপাদনের কাছাকাছি প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা গড়ে তোলা একদিকে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটায়, অন্যদিকে রপ্তানিযোগ্য পণ্য তৈরি করে, এ কারণেই তাদের অনেকে এফএও-র তালিকার ওপরের দিকে রয়েছে।

শীর্ষ দেশগুলোর এই উৎপাদন চিত্র প্রমাণ করে, আগামী দিনে বিশ্ব অর্থনীতিতে কৃষিজাত পণ্যের প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতের গুরুত্ব আরও বাড়বে। অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোও এখন কেবল কাঁচামাল রপ্তানি না করে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের দিকে ঝুঁকছে, যাতে নিজেদের পণ্যের পূর্ণ মূল্য তারা নিজ দেশেই ধরে রাখতে পারে। এশিয়ার দেশগুলোর শীর্ষ তালিকায় উঠে আসা সেই পরিবর্তনেরই ইঙ্গিত দেয়।

ছবি: Narek75 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), ফুড প্রসেসিং ও সংশ্লিষ্ট পণ্য বিষয়ে বিশ্বকোষীয় তথ্য

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

এগ্রোটেক

সম্পর্কিত খবর

এগ্রোটেক

বিনায় চালু হলো গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন সুযোগ

গাজীপুরে বিনার আঞ্চলিক কেন্দ্রে ৮৯ কোটি টাকার গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার চালু হয়েছে; এতে আম-কাঁঠালের মতো কৃষিপণ্য জীবাণুমুক্ত করে বেশি দিন রাখা যাবে।

এগ্রিকেয়ার২৪১ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

সৌরবিদ্যুতের পাতকুয়ায় সেচ, মীরসরাইয়ে চাষের আওতায় ২০ একর পতিত জমি

বিএডিসির বসানো সৌরবিদ্যুৎচালিত ছয়টি ডাগওয়েল বা পাতকুয়া থেকে বিদ্যুৎ বা ডিজেল ছাড়াই সেচের পানি পাচ্ছেন মীরসরাইয়ের পাহাড়ি এলাকার কৃষকেরা।

এগ্রিকেয়ার২৪১ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

মৌচাকের মুখে রাখা খাদ্য সম্পূরকে বাড়ল মৌমাছির সংখ্যা, ব্লুবেরির পরাগায়নে গবেষণা

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটি ও এইচফোরবিজের গবেষণায় ন্যানো-বি-ফিড পাওয়া মৌচাকে মৌমাছি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দেখা গেছে; আরও বড় পরীক্ষার পরিকল্পনা আছে।

Farms.com৩১ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)