২০২৫ সালের শেষ দিকে রবি মৌসুমে আলু রোপণ শুরুর মুখে বাংলাদেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বেশ কিছু আলুচাষি ইউরিয়ার বাইরে অন্যান্য রাসায়নিক সারের সংকট ও চড়া দামের মুখে পড়েন। টিএসপি, এমওপি ও ডিএপির সরবরাহ কমে যাওয়া, ডিলার পর্যায়ে মজুত ঘাটতি এবং সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ ওই সময় জয়পুরহাট, বরেন্দ্র অঞ্চল ও শিবগঞ্জসহ কয়েকটি এলাকার আলুচাষিদের দুশ্চিন্তায় ফেলে। আলু বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান শীতকালীন ফসল, আর এই ফসলের ভালো ফলন অনেকখানি নির্ভর করে সময়মতো এবং ভারসাম্যপূর্ণ সার প্রয়োগের ওপর। তাই সংকটকালে কোন সার কেন দরকার, সরকারি প্রতিষ্ঠান কী মাত্রা সুপারিশ করে এবং চাষি ও প্রশাসনের কী করণীয়, তা জেনে রাখা জরুরি।
আলুর পুষ্টির প্রয়োজনে কৃষকেরা সাধারণত ইউরিয়ার (নাইট্রোজেন) ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। কিন্তু কৃষি বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে শুধু নাইট্রোজেন নয়, ফসফরাস, পটাশ, সালফার (জিপসাম) এবং জিংক ও বোরনের মতো অণুখাদ্যও আলুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও কন্দ গঠনের জন্য অত্যাবশ্যক। তাই জমিতে শুধু ইউরিয়া থাকলেই উৎপাদন নিরাপদ, এমন নয়; প্রয়োজন সুষম সার ব্যবস্থাপনা। নিচে আলুর পরিচিতি, উপযুক্ত আবহাওয়া, প্রতিটি সারের ভূমিকা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সুপারিশকৃত মাত্রা, প্রয়োগের পদ্ধতি এবং সার সংকটে করণীয় ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হলো।
আলু ও বাংলাদেশে এর গুরুত্ব
আলু (Solanum tuberosum) মূলত দক্ষিণ আমেরিকার আন্দিজ পর্বতমালায় উদ্ভূত একটি কন্দাল ফসল। আন্তর্জাতিক আলু কেন্দ্র (সিআইপি) অনুযায়ী ধান ও গমের পরেই আলু বিশ্বের তৃতীয় প্রধান খাদ্যফসল এবং বিশ্বে এর বার্ষিক উৎপাদন ৩০ কোটি টনের বেশি। আলু বীজ থেকে নয়, মূলত বীজআলু বা কন্দের টুকরা থেকে জন্মায়; একটি মাতৃকন্দ থেকে জন্মানো গাছে ৫ থেকে ২০টি নতুন কন্দ হয়, যেগুলো মাতৃগাছের হুবহু প্রতিরূপ। সিআইপি জানায়, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪ হাজার ৭০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত আলু জন্মাতে পারে এবং এর জিনব্যাংকে স্থানীয়, বন্য ও উন্নত জাতের ৭ হাজারের বেশি নমুনা সংরক্ষিত আছে। একই পরিমাণ জমি থেকে দানাজাতীয় ফসলের তুলনায় আলু কয়েক গুণ বেশি খাদ্য দিতে পারে এবং পানির ব্যবহারেও এটি তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী। এ কারণে বিশ্বের মোট আলু উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি এখন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে হয় এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার কোটি কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তায় আলু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বাংলাদেশে আলু ঠিক কবে এসেছে তা নিশ্চিত জানা যায় না; বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী সপ্তদশ শতকের শুরুতে পর্তুগিজদের হাত ধরে এটি ভারত উপমহাদেশে আসে বলে ধারণা করা হয়। পরে দেশে স্থানীয় ও উচ্চফলনশীল দুই ধরনের অনেক জাত ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশে প্রায় ২৭টি স্থানীয় জাত এবং প্রায় ৩৬টি উচ্চফলনশীল জাত অবমুক্ত হয়েছে; জনপ্রিয় জাতগুলোর মধ্যে আছে কার্ডিনাল, ডায়ামেন্ট ও কুফরী সিন্দুরী। রংপুরের শীলবিলাতী, বগুড়ার লালশীল ও লালপাকরী, দিনাজপুর ও সিরাজগঞ্জের লালপাকরী এবং চট্টগ্রামের দোহাজারীর মতো স্থানীয় জাত বিভিন্ন অঞ্চলে পরিচিত। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) কন্দাল ফসল গবেষণা কেন্দ্র বিদেশ থেকে জার্মপ্লাজম সংগ্রহ করে নতুন জাত পরীক্ষা করে এবং পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জে বীজআলুর খামার পরিচালনা করে।
আলু উৎপাদনের পাশাপাশি সংরক্ষণও এ দেশে একটি বড় বিষয়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী দেশে প্রায় ২৩৪টি হিমাগার রয়েছে, যার মোট ধারণক্ষমতা প্রায় ২২ লক্ষ টন। শীতকালে কার্যত দেশের সব জেলায় আলু চাষ হয়; রোপণের উপযুক্ত সময় নভেম্বরের প্রথম পক্ষ, আর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় আগাম ফসলের জন্য অক্টোবরেও রোপণ করা হয়। অধিকাংশ জাতের ফসল ফেব্রুয়ারি-মার্চে তোলা হয়, অর্থাৎ নভেম্বরে-ডিসেম্বরে রোপণ ও সার প্রয়োগের সময়ই ফলনের ভিত্তি তৈরি হয়। সরবরাহ, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত থাকায় আলুর ফলনে ব্যাঘাত ঘটলে তার প্রভাব বাজারদর ও ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। এ জন্যই রোপণের মৌসুমে সময়মতো ও পর্যাপ্ত সার পাওয়া চাষিদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আলুর জন্য উপযুক্ত আবহাওয়া ও মাটি
আলু শীতল ও আর্দ্র আবহাওয়ার ফসল। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বাংলাদেশ কৃষি আবহাওয়া তথ্য সেবা (বামিস) অনুযায়ী, রোপণের সময় প্রায় ১৮ থেকে ২১ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা এবং কন্দ গঠনের জন্য প্রায় ১৫ থেকে ১৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস মাটির তাপমাত্রা অনুকূল। দীর্ঘ সময় ধরে তাপমাত্রা ২৫ ডিগ্রির বেশি থাকলে কন্দ গঠন ও বৃদ্ধি কমে যায়; আর ১০ ডিগ্রির নিচে বা ৩০ ডিগ্রির ওপরে উঠলে কন্দ গঠন ও বৃদ্ধি থেমে যায়। এ জন্যই বাংলাদেশে আলু মূলত শীতকালীন রবি ফসল হিসেবে চাষ হয়।
বামিস আরও জানায়, আলুর জন্য সুষমভাবে বণ্টিত প্রায় ৪০০ থেকে ৬০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত এবং ৬৫ থেকে ৮০ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতা অনুকূল; ভারী বৃষ্টি কিংবা হঠাৎ শুষ্ক ও ভেজা আবহাওয়ার পালাবদল ফসলের জন্য ক্ষতিকর। হালকা তুষারপাত গাছের ক্ষতি করে এবং ফসলটি লবণাক্ততার প্রতি কিছুটা সংবেদনশীল। আলুর জন্য দরকার ভালোভাবে চাষ দেওয়া, রোদ পায় এমন এবং পর্যাপ্ত আর্দ্রতাযুক্ত উর্বর দোআঁশ মাটি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী সারি থেকে সারির দূরত্ব সাধারণত ৪৫ থেকে ৬০ সেন্টিমিটার রাখা হয় এবং কচুরিপানা বা খড়ের মালচ দিলে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা ও আগাছা দমনে সুবিধা হয়।
আলুর জন্য কোন সার কেন দরকার
আলুর ভালো ফলনের জন্য নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাশিয়ামের মতো প্রধান পুষ্টি উপাদানের পাশাপাশি সালফার এবং জিংক ও বোরনের মতো অণুখাদ্যও প্রয়োজন হয়। সরকারি সুপারিশে দেখা যায়, আলুর জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি পরিমাণে নাইট্রোজেন ও পটাশ এবং সেই সঙ্গে ফসফরাস, সালফার ও সামান্য জিংক ও বোরন দরকার হয়। এই পুষ্টি উপাদানগুলো জমিতে মূলত ইউরিয়া (নাইট্রোজেন), টিএসপি বা ডিএপি (ফসফরাস), এমওপি বা মিউরেট অব পটাশ (পটাশিয়াম), জিপসাম (সালফার), জিংক সালফেট (জিংক) ও বোরিক এসিড (বোরন) এর মাধ্যমে সরবরাহ করা হয়। তাই কেবল ইউরিয়া পাওয়া গেলেই চলে না; অন্যান্য সারের অভাব হলে ফলন ঝুঁকিতে পড়ে।
নাইট্রোজেন গাছের পাতা ও কাণ্ডের স্বাভাবিক বৃদ্ধি এবং সবুজ অংশ গঠনে সাহায্য করে, যা সালোকসংশ্লেষণ ও শেষ পর্যন্ত কন্দের খাদ্য তৈরির জন্য প্রয়োজনীয়। তবে প্রয়োজনের বেশি নাইট্রোজেন দিলে গাছ বেশি শাখা-পাতা ছাড়ে কিন্তু কন্দ কম হয়, তাই এর পরিমাণ ভারসাম্যপূর্ণ রাখা জরুরি। ফসফরাস শিকড়ের বিকাশ ও শক্তিশালী গোড়া গঠনে ভূমিকা রাখে; ফসফরাসের ঘাটতি হলে শিকড় দুর্বল হয় এবং গাছ মাটি থেকে ঠিকমতো পুষ্টি গ্রহণ করতে পারে না। পটাশিয়াম কন্দ গঠন ও পুষ্ট হওয়া এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ; পটাশের অভাব হলে কন্দের আকার ছোট হয় এবং গাছ রোগের প্রতি বেশি সংবেদনশীল হয়ে পড়ে। সালফার পাতায় সবুজ রঞ্জক ক্লোরোফিল তৈরিতে সহায়তা করে; এর অভাবে গাছ দুর্বল ও বিবর্ণ হয়ে পড়ে। জিংক ও বোরনের মতো অণুখাদ্য অল্প পরিমাণে লাগলেও এগুলোর ঘাটতি গাছের বৃদ্ধি ও কন্দের মান কমিয়ে দিতে পারে। এ জন্যই কৃষি বিজ্ঞানীরা শুধু একটি সারের ওপর নির্ভর না করে সব পুষ্টি উপাদানের ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবহারে জোর দেন। সরকারি সুপারিশে দেখা যায়, আলুর জন্য তুলনামূলকভাবে বেশি পরিমাণে নাইট্রোজেন ও পটাশ এবং সেই সঙ্গে ফসফরাস, সালফার ও সামান্য জিংক ও বোরন প্রয়োজন হয়, যা এই ভারসাম্যের গুরুত্বই নির্দেশ করে।

সুপারিশকৃত পুষ্টি মাত্রা: কী বলে বারি ও বিএআরসি
সার কতটা দিতে হবে তা মাটির ধরন, এলাকা (কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল) এবং লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী বদলায়, তাই নির্দিষ্ট মাত্রা মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে নির্ধারণ করাই সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের (বিএআরসি) সার সুপারিশ নির্দেশিকা (ফার্টিলাইজার রিকমেন্ডেশন গাইড) এই মাত্রা নির্ধারণের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একটি পর্যালোচিত গবেষণায় (আলী ও সহযোগী, বাংলাদেশ জার্নাল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চ, ২০০৯) এই নির্দেশিকা অনুসরণ করে আলুর জন্য সুপারিশকৃত পুষ্টি মাত্রা উল্লেখ করা হয়েছে প্রতি হেক্টরে নাইট্রোজেন ৯০ কেজি, ফসফরাস ১৫ কেজি, পটাশিয়াম ৫০ কেজি, সালফার ১০ কেজি ও জিংক ১ কেজি।
মাটি পরীক্ষার ভিত্তিতে নির্ধারিত মাত্রা এলাকাভেদে এর চেয়ে আলাদা হতে পারে। বারির মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের একটি গবেষণায় (বর্মণ ও সহযোগী, বাংলাদেশ এগ্রোনমি জার্নাল, ২০১৯) যশোর অঞ্চলের (কৃষি-পরিবেশ অঞ্চল ১১) জন্য মাটি পরীক্ষাভিত্তিক শতভাগ সুপারিশকৃত মাত্রা দেওয়া হয়েছে প্রতি হেক্টরে নাইট্রোজেন ১৫৭ কেজি, ফসফরাস ১৬ কেজি, পটাশিয়াম ৩৫ কেজি, সালফার ৭.২ কেজি, জিংক ০.৭১ কেজি ও বোরন ০.৮৫ কেজি। দুটি সুপারিশের পার্থক্যই দেখিয়ে দেয়, সার কতটা লাগবে তা মাটি ও এলাকা অনুযায়ী ভিন্ন; তাই চাষিকে নিজের জমির মাটি পরীক্ষা করে মাত্রা ঠিক করাই উত্তম।
এখানে যে সংখ্যাগুলো দেওয়া হলো তা পুষ্টি উপাদানের (নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম ইত্যাদি) পরিমাণ, সরাসরি ইউরিয়া বা টিএসপির বস্তার পরিমাণ নয়। কোন জমিতে কত কেজি ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি, জিপসাম বা জিংক সালফেট লাগবে, সেই সুনির্দিষ্ট হিসাব মাটি পরীক্ষা ও সর্বশেষ সার সুপারিশ নির্দেশিকা অনুযায়ী নির্ধারণ করতে হয়। তাই নিজ জমির জন্য সঠিক সারের মাত্রা জানতে স্থানীয় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা কৃষি অফিস এবং মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউটের (এসআরডিআই) মাটি পরীক্ষার পরামর্শ নেওয়া জরুরি। বারির কৃষি প্রযুক্তি হাতবইও ফসলভিত্তিক সার ব্যবস্থাপনার নির্ভরযোগ্য উৎস।
সার প্রয়োগের সঠিক পদ্ধতি
আলুতে সার কখন ও কীভাবে প্রয়োগ করা হয়, তা মাত্রার মতোই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ নিয়ম হলো, জমি তৈরির শেষ চাষের সময় সমস্ত টিএসপি (বা ডিএপি), এমওপি, জিপসাম ও জিংক সালফেট এবং ইউরিয়ার অর্ধেক মাটিতে মিশিয়ে দেওয়া হয়। বাকি অর্ধেক ইউরিয়া রোপণের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ দিন পর, গাছ কিছুটা বড় হলে উপরি প্রয়োগ হিসেবে সারির পাশে দেওয়া হয়। নাইট্রোজেন ভাগ করে দেওয়ার এই পদ্ধতি সার অপচয় কমায় এবং গাছের প্রয়োজন অনুযায়ী ধীরে ধীরে পুষ্টি জোগায়। জমি তৈরির সময় পর্যাপ্ত জৈব সার বা পচা গোবর মিশিয়ে দিলে মাটির গঠন ও পুষ্টি ধারণক্ষমতা ভালো থাকে।
তবে প্রতিটি সারের নির্দিষ্ট পরিমাণ জমি, জাত ও মাটি পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করে, তাই পরিমাণ নিজে অনুমান করে না নিয়ে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নেওয়া উচিত। অতিরিক্ত ইউরিয়া প্রয়োগ করলে গাছ বেশি শাখা-পাতা ছাড়ে কিন্তু কন্দ কম হয়, আবার পটাশ বা ফসফরাস কম পড়লে কন্দের আকার ও মান কমে যায়। জমিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা থাকা অবস্থায় সার দেওয়া এবং সার দেওয়ার পর প্রয়োজনমতো সেচ দেওয়া গেলে পুষ্টি উপাদান গাছ ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারে; বামিস অনুযায়ী আলুর জন্য মাটিতে স্বাভাবিক আর্দ্রতা থাকা প্রয়োজন, তবে ভারী বৃষ্টি বা জলাবদ্ধতা কন্দের ক্ষতি করে। মালচ ব্যবহার করলে মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখা সহজ হয় এবং আগাছা কম জন্মায়, যা সার কাজে লাগার জন্য সহায়ক। সঠিক সময়ে ও সঠিক মাত্রায় সার দিলে একই জমিতে অপেক্ষাকৃত কম সারেও ভালো ফলন পাওয়া যায়, কারণ তখন সারের অপচয় কমে এবং গাছ প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজনীয় পুষ্টি পায়।

২০২৫ সালের শেষে সার সংকট ও এর কারণ
২০২৫ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বরে রবি মৌসুম শুরুর সময় বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের আলুচাষিদের সার নিয়ে দুশ্চিন্তার কথা উঠে আসে। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, ইউরিয়ার তুলনায় টিএসপি, এমওপি ও ডিএপির সরবরাহ কমে যাওয়ায় এবং ডিলার পর্যায়ে মজুত ঘাটতির কারণে অনেক জায়গায় সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার কিনতে হচ্ছে। কোনো কোনো প্রতিবেদনে এই সংকটকে কৃত্রিম বলেও বর্ণনা করা হয়। এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কৃষক ও স্থানীয় সূত্রের বরাতে প্রকাশিত; এগুলোর প্রেক্ষিতে প্রশাসন তদারকি ও অভিযানের কথাও জানিয়েছে।
সার সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। প্রথমত, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা: সরকারি গুদাম থেকে পরিবেশক ও খুচরা দোকান পর্যন্ত সার পৌঁছাতে দেরি হওয়া এবং ডেলিভারি শিডিউল ঠিকমতো না মানা। দ্বিতীয়ত, চাহিদা ও জোগানের অসামঞ্জস্য: আলু মৌসুমে ইউরিয়া, টিএসপি ও এমওপির চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যায়, আর আমদানি কম বা দেরিতে হলে বাজারে ঘাটতি তৈরি হয়। টিএসপি, এমওপি ও ডিএপির একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বৃদ্ধি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ ও পরিবহন জটিলতা সরবরাহকে প্রভাবিত করে।
তৃতীয়ত, মজুতদারি ও বেশি দামে বিক্রির প্রবণতা: কিছু ব্যবসায়ী কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াতে চাইলে চাষিরা নির্ধারিত দামে সার পান না। চতুর্থত, পরিবহন সমস্যা: জ্বালানির দাম বৃদ্ধি বা পরিবহন ধর্মঘটে সার পরিবহন ব্যাহত হলে সংকট তীব্র হয়। পঞ্চমত, মাঠপর্যায়ে পরিকল্পনার অভাব: অনেক চাষি মৌসুমের শুরুতে প্রয়োজনীয় সার আগেভাগে সংগ্রহ করেন না এবং কতটা সার লাগবে সে সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না থাকায় শেষ মুহূর্তে চাপ পড়ে। সময়মতো সার দিতে না পারলে কন্দ গঠন ও কন্দের আকার বৃদ্ধির মতো গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা শেষ পর্যন্ত চাষির লাভ ও জাতীয় খাদ্য নিরাপত্তায় প্রভাব ফেলে।

সার সংকটে কৃষক ও সরকারের করণীয়
সংকট মোকাবিলায় সরকারি পর্যায়ে কয়েকটি পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারে। গুদাম থেকে পরিবেশক ও খুচরা দোকান পর্যন্ত সরবরাহ চেইন আরও শক্তিশালী করা, ভ্রাম্যমাণ টিমের মাধ্যমে ডিলার, পরিবেশক ও গুদাম পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করে মজুতদারি ও বেশি দামে বিক্রি বন্ধ করা এবং আলু মৌসুমের আগেই পর্যাপ্ত সার আমদানি ও গুদামে মজুত নিশ্চিত করা এর মধ্যে অন্যতম। কৃষকদের কাছে নিবন্ধন বা কার্ডভিত্তিক বিতরণ ব্যবস্থা কার্যকর করলে নির্ধারিত দামে সার পৌঁছানো সহজ হয়। প্রতিটি এলাকার সার সরবরাহ, মজুত ও দাম নিয়মিত প্রকাশ করলে গুজব ও কৃত্রিম সংকট কমে আসে। কৃষি বিভাগ, উপজেলা প্রশাসন ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সমন্বিত উদ্যোগে মাঠপর্যায়ে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
চাষিদেরও কিছু পরিকল্পিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। মৌসুম শুরুর আগেই প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করে রাখা, স্থানীয় কৃষি অফিস বা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী মাটি পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সার ব্যবহার করা এবং অতিরিক্ত দামের বিরুদ্ধে সচেতন থাকা এর মধ্যে পড়ে। এলাকার চাষিরা মিলে দলগতভাবে বা সমবায়ের মাধ্যমে সার কিনলে দাম তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থাকে এবং মজুত ও সংরক্ষণে সুবিধা হয়। সঠিক পরিমাণে ও সঠিক সময়ে সার প্রয়োগ করলে একই জমিতে কম সারেও ভালো ফলন পাওয়া সম্ভব হয়, কারণ তখন অপচয় কমে।
রাসায়নিক সারের ওপর নির্ভরতা কমাতে জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোও একটি কার্যকর উপায়। জমি তৈরির সময় পচা গোবর, কম্পোস্ট ও ভার্মি কম্পোস্ট ব্যবহার করলে মাটির জৈব পদার্থ ও পুষ্টি ধারণক্ষমতা বাড়ে এবং রাসায়নিক সারের একটি অংশের চাহিদা পূরণ হয়। সবুজ সার ও জৈব উপাদানের ব্যবহার মাটির উর্বরতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে সাহায্য করে। তবে জৈব সার কত পরিমাণে ও কীভাবে দিতে হবে তা জমি ও ফসল অনুযায়ী ভিন্ন, তাই এ ক্ষেত্রেও উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নেওয়া ভালো। সব মিলিয়ে সরকারি সুষ্ঠু তদারকি, চাষির আগাম প্রস্তুতি, মাটি পরীক্ষাভিত্তিক সুষম সার ব্যবহার এবং জৈব সারের সম্প্রসারণ, এই কয়েকটি পদক্ষেপ একসঙ্গে নিলে সার সংকটের প্রভাব অনেকটাই কমিয়ে আলু উৎপাদন ও চাষির আয় দুটোই স্বাভাবিক রাখা সম্ভব।
ছবি: কুউ পুলক / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)। মুন্সিগঞ্জের একটি আলুর জমি।
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪; বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) সার সুপারিশ নির্দেশিকা, আলী ও সহযোগী (বাংলাদেশ জার্নাল অব এগ্রিকালচারাল রিসার্চ, ২০০৯); বর্মণ ও সহযোগী, বারি মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগ (বাংলাদেশ এগ্রোনমি জার্নাল, ২০১৯); কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বামিস; বাংলাপিডিয়া; আন্তর্জাতিক আলু কেন্দ্র (সিআইপি)।





মন্তব্য
(০)