মধ্যরাত থেকে ডিলারের দোকানের সামনে লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজনের সার পাচ্ছেন না কৃষকেরা; কখনো এক-দুই বস্তা নিয়ে, কখনো খালি হাতে ফিরছেন। অথচ খুচরা বাজারে বাড়তি টাকা দিলেই সার মিলছে। সমকালের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মাঠ পর্যায়ের চাহিদা, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) প্রস্তাব আর সরকারের চূড়ান্ত বরাদ্দের মধ্যে প্রতিটি ধাপে বড় ব্যবধান।
২০২৬-২৭ অর্থবছরে ইউরিয়া, ডিএপি, এমওপি ও টিএসপি মিলিয়ে মাঠ পর্যায়ের চাহিদা দেখানো হয় ৬৮ লাখ ৭৯ হাজার টন। ডিএই প্রস্তাব করে ৫৮ লাখ ৪৯ হাজার ২০০ টন, আর অনুমোদন হয় ৫৮ লাখ ৫ হাজার টন, মাঠের চাহিদার চেয়ে ১০ লাখ ৭৪ হাজার টন কম। ইউরিয়ায় চাহিদা ৩০ লাখ ২২ হাজার টনের বিপরীতে বরাদ্দ ২৬ লাখ ২০ হাজার, টিএসপিতে ৯ লাখ ৬৩ হাজারের বিপরীতে ৭ লাখ ৫০ হাজার, ডিএপিতে ১৬ লাখ ৯২ হাজারের বিপরীতে ১৪ লাখ ৮৫ হাজার, এমওপিতে ১২ লাখ ২ হাজারের বিপরীতে ৯ লাখ ৫০ হাজার টন।
আগের বছরগুলোতে ফারাক আরও বড় ছিল। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মাঠের চাহিদা ছিল ১ কোটি ৩৭ লাখ ৮৩ হাজার ১৮৫ টন, বরাদ্দ ৫৭ লাখ ৮৫ হাজার টন, ব্যবধান প্রায় ৮০ লাখ টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১ কোটি ৩৩ লাখ ৩১ হাজার ৫৭৪ টন চাহিদার বিপরীতে বরাদ্দ ছিল ৫৯ লাখ টন।
ডিএইর মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম মাঠের হিসাবকে প্রকৃত চাহিদা মানতে নারাজ। তিনি বলেন, ব্লক পর্যায় থেকে আসা চাহিদা কয়েক বছরের ব্যবহারের প্রবণতা আর বিশেষজ্ঞ মতামত দিয়ে যাচাই করা হয়; সারের লো, মিডিয়াম ও হাই, তিন মাত্রার মধ্যে ডিএই মধ্যম মাত্রা ধরে, আর ব্লক পর্যায়ে হয়তো বেশি মাত্রা ধরা হয়। কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, চাহিদা কীভাবে ঠিক হচ্ছে আর কোন বিবেচনায় কমানো হচ্ছে, তাতে স্বচ্ছতা দরকার; মাঠের হিসাব অতিমূল্যায়িত হলেও ডিএইর কাটছাঁট করা হিসাব কম মূল্যায়িত, মন্ত্রণালয়ে গিয়ে তা আরও কমে।
উদাহরণ চাঁপাইনবাবগঞ্জ, যেখানে বছরে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার আম হয়, আর মাষকলাই, গম, আখ, সরিষা, ভুট্টা ও ধানের আবাদও আছে। সরকারি নথি অনুযায়ী গত ১০ বছরে জেলাটি কখনো চাহিদামতো সার পায়নি: ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বরাদ্দ ছিল চাহিদার চেয়ে ৫৩ শতাংশ কম, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ২ লাখ ৯৮ হাজার ১৯৫ টন চাহিদার বিপরীতে এসেছে ৯৮ হাজার ৮৩২ টন। চলতি অর্থবছরে ১ লাখ ১৪ হাজার ৮৭৩ টন চাহিদার বিপরীতে অনুমোদন ১ লাখ ১ হাজার ৩৩৬ টন, ঘাটতি ১৩ হাজার ৫৩৭ টন।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) জেলা সভাপতি আকবর হোসেন বলেন, বর্তমান বরাদ্দ দিয়ে কৃষকের চাহিদা মেটানো কঠিন, প্রকৃত চাহিদা ধরে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। ডিএইর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, উপজেলা পর্যায়ে অনেক সময় মাঠ যাচাই ছাড়াই চাহিদাপত্র তৈরি হয়, আর জেলার ৪৫টি ইউনিয়নে ফসল আলাদা হলেও বরাদ্দে প্রায় একই হিসাব চলে। প্রতিবেদনটি করেছেন সমকালের জাহিদুর রহমান (ঢাকা) ও এ কে এস রোকন (চাঁপাইনবাবগঞ্জ)।
ছবি: Hopeoflight / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: সমকাল





মন্তব্য
(০)