সরকারি কর্মকর্তারা প্রযুক্তিগত পরামর্শ দেবেন আর কৃষক তা মেনে চলবেন, কৃষি সম্প্রসারণের এই পুরোনো ধাঁচ ক্ষুদ্র কৃষকের প্রয়োজন আর মেটাচ্ছে না। ২০২৬ সালের এফএও বিজ্ঞান ও উদ্ভাবন ফোরামে এ কথা বলেছে আন্তর্জাতিক কৃষি গবেষণা সংস্থা ক্যাবি (CABI)। ক্ষুদ্র কৃষকের খাদ্য নিরাপত্তার জন্য কৃষি সম্প্রসারণ নতুন করে ভাবা নিয়ে এক আলোচনায় সংস্থাটির প্রতিনিধিত্ব করেন জ্যানি ভস (Janny Vos)।
আলোচনার মূল প্রশ্ন ছিল, উদ্ভাবনে কৃষকের কি নেতৃত্বে থাকা উচিত? ভসের উত্তর, হ্যাঁ। যে পরামর্শ, প্রযুক্তি আর সেবা কৃষকের জন্য, তা তৈরিতে কৃষককেই সক্রিয় অংশীদার করতে হবে, তাদের স্থানীয় জ্ঞান কাজে লাগাতে হবে। ক্যাবির মতে এই পরিবর্তনের তিনটি শর্ত: বহুমুখী, চাহিদানির্ভর ও সবার নাগালের সেবা; ভালোভাবে প্রশিক্ষিত জনবল; আর সরাসরি ও ডিজিটাল পরামর্শের মিশেল।
যুক্তিটা দাঁড়িয়ে আছে কৃষক আসলে কোথা থেকে পরামর্শ পান তার ওপর। সম্প্রসারণে সরকারি অর্থ কমে আসায় কৃষক যাচ্ছেন বীজ-সার বিক্রেতা, বেসরকারি সংস্থা, প্রতিবেশী কৃষক, ব্যবসায়ী, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম আর গণমাধ্যমের কাছে। উৎপাদনের বাইরেও তাদের সহায়তা লাগছে: বাজারে প্রবেশ ও মান রক্ষা, মূল্য সংযোজন, জলবায়ুর সঙ্গে খাপ খাওয়ানো আর টেকসই চাষ। নারী, তরুণ আর দুর্গম এলাকার কৃষকের জন্য পরামর্শ পাওয়া আরও কঠিন। কেনিয়ায় ক্যাবির প্ল্যান্টওয়াইজপ্লাস (PlantwisePlus) কর্মসূচি পেঁপের মিলিবাগ দমনে জৈব নিয়ন্ত্রণ চালুর আগে কৃষকের মনোভাব জেনেছে; দেখা গেছে, দলবদ্ধ বালাই দমনে জোরালো সমর্থন আছে, তবে সময় আর শ্রম নিয়ে দুশ্চিন্তাও আছে।
ক্যাবির জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. নেগুসি এফা (Negussie Efa) বলেন, "আমাদের এমন বহুমুখী পদ্ধতি দরকার, যেখানে নানা উৎসের অর্থ, নানা সেবাদাতা আর নানা মাধ্যম থাকবে, আর কৃষকের নিজস্ব জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও প্রজ্ঞাকে স্বীকৃতি দিয়ে তার ওপর গড়ে তোলা হবে।"
কর্মসূচির ফার্মার অ্যাডভাইজরি পাথওয়েতে একসঙ্গে চলে প্ল্যান্ট ক্লিনিক, যেখানে প্রশিক্ষিত উদ্ভিদ চিকিৎসক সামনাসামনি পরামর্শ দেন, ডিজিটাল ফসল-স্বাস্থ্য সরঞ্জাম, নারীদের জন্য ডিজিটাল দক্ষতা প্রশিক্ষণ, আর নারী ও তরুণ উদ্যোক্তাদের সেবাদাতা হিসেবে গড়ে তোলা। জেনারেটিভ এআই ফর অ্যাগ্রিকালচার অ্যাডভাইজরি (GAIA) প্রকল্পে ক্যাবি পরীক্ষা করছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে স্বাক্ষরতা, লিঙ্গ বা ডিজিটাল দক্ষতার বাধা পেরিয়ে স্থানীয় কৃষিতথ্য কৃষকের কাছে পৌঁছানো যায় কি না। সংস্থাটি ২৭টিরও বেশি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশে প্ল্যান্ট ক্লিনিকে সহায়তা দিয়েছে; আগের প্ল্যান্টওয়াইজ কর্মসূচির মূল্যায়নে দেখা গেছে, এই মিলিত সেবা পাওয়া কৃষকেরা সুপারিশকৃত পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন, তাদের ফলন ও আয় বেড়েছে, কম ঝুঁকির বালাইনাশকের দিকে ঝুঁকেছেন।
পরামর্শদাতাদের প্রশিক্ষণও সেই মাপের হতে হবে। সমস্যার আসল কারণ শনাক্ত করা, বিকল্প যাচাই করা, আর কৃষককে সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা, জৈব নিয়ন্ত্রণ ও কম ঝুঁকির বালাইনাশকের দিকে নেওয়া, সঙ্গে জলবায়ু অভিযোজন আর কৃষিকে ব্যবসা হিসেবে দেখা, সবই তাদের কাজ। ভিয়েতনামের আন জিয়াং বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাবি একাডেমির অনলাইন উদ্ভিদ-স্বাস্থ্য কোর্স পাঠ্যক্রমে যুক্ত করেছে, ৪০০-র বেশি শিক্ষার্থী তাতে ভর্তি হয়েছেন। ক্যাবির মতে, ডিজিটাল সরঞ্জাম সামনাসামনি গড়ে ওঠা আস্থার বিকল্প নয়; দুটোকে মেলাতে হবে।
ক্যাবির উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ বিভাগের পরিচালক ড. ড্যানি রমনি (Dannie Romney) বলেন, "কোন পরিস্থিতিতে কোন পদ্ধতি সবচেয়ে ভালো কাজ করে, তা কার কাছে পৌঁছায়, আর দীর্ঘ মেয়াদে কৃষককে সহায়তা দিতে পারে কি না, সেটা বুঝতে হবে।"
ছবি: MJN2000 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC0)
সূত্র: Global Agriculture





মন্তব্য
(০)