পাহাড় কেটে পর্যটনকেন্দ্র বানালে কত পর্যটক আসবেন আর কত আয় হবে, জলাশয় ভরাট করে ভবন তুললে জমির দাম কত বাড়বে, এসব হিসাব পাওয়া যায়। কিন্তু হারানো পাহাড় বা জলাশয়ের অর্থনৈতিক মূল্য কত ছিল, আর তার ক্ষতি সমাজকে কতটা বইতে হবে, সেই হিসাব খুব কমই সামনে আসে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের পিএইচডি গবেষক রাকিব হোসেন ঢাকা পোস্টে এক মতামত নিবন্ধে এই অসংগতি তুলে ধরেছেন। মতামতগুলো লেখকের নিজস্ব।
লেখক উদাহরণ টেনেছেন দেশের নানা প্রান্ত থেকে। ২০২৬ সালের মার্চে কক্সবাজারের সুগন্ধা সৈকত থেকে পাঁচ শতাধিক অবৈধ স্থাপনা সরানো হয়েছে; সেন্টমার্টিনে ২০২৫ সালের এক গবেষণায় ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ভূমি ব্যবহারে বড় পরিবর্তন ধরা পড়েছে; কুয়াকাটায় পাঁচ বছরে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বনভূমি হারানোর তথ্য এসেছে ২০২৫ সালের সংবাদে। বান্দরবানে রিসোর্টের জন্য পাহাড় কাটা, আর সিলেটের ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর ও জাফলংয়ে ২০২৫ সালের পাথর লুটকেও তিনি একই সমস্যার অংশ মনে করেন।
তাঁর যুক্তি, যে প্রবাল, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ওপর পর্যটন দাঁড়িয়ে, তা ধ্বংস করে পর্যটন বাড়ালে বর্তমানের মুনাফায় ভবিষ্যতের আয়ের উৎসই দুর্বল হয়। উপকূলীয় বন দুর্যোগের ক্ষতি কমায়; বন হারানোর পর কংক্রিটের প্রতিরক্ষায় যে বিপুল খরচ হয়, তা-ই প্রকৃতির হারানো সেবার দাম বোঝায়। সাদাপাথরের একটি পাথরের বাজারদর ঠিক করা সহজ, কিন্তু সেই পাথর ঘিরে নৌপরিবহন, দোকান ও পর্যটনসেবায় যে জীবিকা ছিল, তার ক্ষতিও হিসাবে আনতে হবে।
গাজীপুরের শালবনসহ নানা জায়গায় 'ইকো রিসোর্ট' বা 'ইকো পার্ক' নাম দিয়ে বন পরিষ্কার, পাহাড় কাটা বা জলধারা আটকানোকে লেখক 'গ্রিনওয়াশিং' বলেছেন; রিসোর্টের বাগান বা কৃত্রিম জলাশয় প্রাকৃতিক বনের বিকল্প নয়। সুন্দরবনের ঢাংমারী খালের পাশে রিসোর্ট আর ডলফিনের আবাসে পর্যটনের ঝুঁকির কথাও তিনি উল্লেখ করেছেন। নগর উন্নয়ন অধিদপ্তরের ২০২৬ সালের এক প্রাথমিক গবেষণার বরাতে লিখেছেন, ঢাকা ও আশপাশে ১৭৭৬ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে নদী, খাল, পুকুর ও জলাশয়ের আয়তন প্রায় ৮৩.৪ শতাংশ কমেছে; জলাশয় ভরাটে জমির দাম বাড়লেও জলাবদ্ধতা ও নিষ্কাশনের খরচ চাপে পুরো শহরের ওপর, যাকে অর্থনীতিতে নেতিবাচক বহিঃপ্রভাব বলা হয়।
তাঁর প্রস্তাব, পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকায় প্রকল্প অনুমোদনের আগে প্রকৃত সামাজিক ও পরিবেশগত ব্যয় নির্ধারণ, বন, পাহাড়, জলাশয় ও উপকূলে ভূমি ব্যবহারের পরিবর্তন নিয়মিত পর্যবেক্ষণ, পরিবেশগত ছাড়পত্রকে আনুষ্ঠানিকতা না রেখে বাস্তব মানদণ্ডে বাঁধা এবং ক্ষতিগ্রস্ত স্থানীয় মানুষের মতামত ও জীবিকাকে মূল্যায়নের কেন্দ্রে রাখা। লেখকের ভাষায়, প্রকৃতিভিত্তিক পর্যটনের প্রধান সম্পদ যদি প্রকৃতিই হয়, তবে সেই প্রকৃতি রক্ষাই হওয়া উচিত বিনিয়োগের প্রথম শর্ত।
লেখক: রাকিব হোসেন, পিএইচডি গবেষক, অর্থনীতি বিভাগ, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়। মতামত লেখকের নিজস্ব।
ছবি: চট্টগ্রামের চুনতি রেঞ্জে পাহাড় কাটার স্থান পরিদর্শন, ২০২৫, তথ্য অধিদপ্তর (পিআইডি) / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: ঢাকা পোস্ট





মন্তব্য
(০)