খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে মাগুরাঘোনা ইউনিয়নের চণ্ডীপুর গ্রাম, আর তার গা ঘেঁষে সাতক্ষীরার তালা উপজেলার জেয়ালা। দুই গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এখন গাভি আছে, আর দুধ উৎপাদন ও বিক্রির কারণেই গ্রাম দুটি স্থানীয়ভাবে পরিচিত ‘দুধ গ্রাম’ নামে। গ্রামবাসীর হিসাব অনুযায়ী জেয়ালার ১৬০টি পরিবারের কাছে প্রায় ১ হাজার ৬৮৯টি এবং চণ্ডীপুরের ৪০টি পরিবারের কাছে প্রায় ৪১০টি গাভি রয়েছে; দুই গ্রামে দিনে উৎপাদিত হয় আনুমানিক ৮ থেকে ১০ হাজার লিটার দুধ।
একসময় গাভি পালন মূলত ঘোষ পরিবারগুলোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। দুধ বিক্রিতে ভালো আয় হওয়ায় এখন দুই শতাধিক পরিবার এই পেশায়, আর পাশের নলতা, আঠারোই ও আরনগর গ্রামের অনেক পরিবারও একই পথে হাঁটছে। গ্রামবাসীর ভাষ্য, বাড়ির অল্প জায়গাতেই গাভি পালন করা যায়, ঝুঁকিও তুলনামূলক কম, আর ধান, গম বা পাটের চাষের চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে এটি বেশি লাভজনক। কারও ঘরে ৫ থেকে ১০টি গাভি, বড় খামারিদের কারও কারও ২০ থেকে ৪০টি।
চণ্ডীপুরের রিপন ঘোষ এক যুগ ধরে বিদেশি জাতের গাভি পালন করছেন। ছয়টি গাভি থেকে প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ লিটার দুধ পান তিনি; লিটারপ্রতি ৪৫ টাকা দরে বিক্রি করে মাসে আয় প্রায় ৩৫ হাজার টাকা, যার একটি অংশ যায় গরুর খাবারের খরচে, বাকিতে চলে চার সদস্যের সংসার। জেয়ালার বিক্রম ঘোষ ও তাঁর বাবার খামারে ৪৫টি বিদেশি জাতের গাভি, দিনে দুধ ২৫০ থেকে ৩০০ লিটার। একই গ্রামের সুনীল ঘোষের ১০টি গাভি; ৯ বছর ধরে দুধের আয়েই তাঁর সংসার চলছে।
জেয়ালার প্রবীর ঘোষ ও সুচিত্রা রানী ঘোষ জানান, আগে অনেক বাড়িতে দেশি জাতের গাভি পালন হতো, এখন অধিকাংশ পরিবারই উন্নত জাতের গাভি রাখছে; আকার ও জাতভেদে একটি গাভি থেকে দিনে সাত থেকে ২০ লিটার পর্যন্ত দুধ পাওয়া যায়। ভোরে ও বিকেলে দুবার দোহনের পর দুধ যায় সাতক্ষীরার বিনেরপোতা এবং ডুমুরিয়ার শাহাপুর, থুকড়া ও দৌলতপুরে মিল্ক ভিটার সংগ্রহকেন্দ্রে। দুই গ্রামের মাঝামাঝি আকিজ ডেইরির এবং ডুমুরিয়ার আঠারোমাইল বাজারে ব্র্যাক ডেইরির সংগ্রহকেন্দ্র আছে; বাকি দুধ যায় খুলনা ও সাতক্ষীরার মিষ্টির দোকান ও পরিবারগুলোর কাছে।
গাভি পালন শুধু দুধেই থামেনি। গোবর থেকেও আয় আসছে — কেউ ঘুঁটে তৈরি করছেন, কেউ বসিয়েছেন বায়োগ্যাসের চুলা। চণ্ডীপুরের দেবী রানী ঘোষ জানান, তারা প্রতিদিন ৩০ থেকে ৪৫টি ঘুঁটে তৈরি করেন, প্রতিটি বিক্রি হয় তিন থেকে সাড়ে তিন টাকায়; রান্নার জ্বালানি হয়, বাড়তি আয়ও হয়। দুধের আয়ে অনেকের বাড়ি পাকা হয়েছে, ঘরে এসেছে টেলিভিশন, ফ্রিজ, ফ্যান, কেউ কিনেছেন মোটরসাইকেল।
তবু অনিশ্চয়তা যায়নি। এত দুধ উৎপাদন হলেও সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই, ফলে কখনও কম দামে বিক্রি করতে হয়, ক্রেতা না পেলে নষ্ট হওয়ার আশঙ্কাও থাকে। খামারি অসিত কুমার ঘোষ ও সদানন্দ ঘোষ বলেন, মিল্ক ভিটা সপ্তাহে এক দিন ও ব্র্যাক ডেইরি সপ্তাহে দুই দিন দুধ কেনা বন্ধ রাখে; ওই সময় বাধ্য হয়ে কম দামে মিষ্টির দোকানে দুধ দিতে হয়। গাভি কেনা বা খামার বাড়ানোর জন্য সহজ শর্তে ব্যাংকঋণও পাওয়া যায় না বলে তাঁদের অভিযোগ। চণ্ডীপুর দুগ্ধ উৎপাদনকারী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি সুবীর ঘোষের বক্তব্য, সরকারি সহযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে দুই গ্রামে গাভির সংখ্যা আরও বাড়ানো সম্ভব।
ভবতোষ ঘোষ ও সুকান্ত ঘোষ জানান, গ্রাম দুটিতে এখনও পাকা সড়ক নেই; বড় গাড়ি ঢুকতে না পারায় নছিমন, ভ্যান বা ছোট পিকআপে দুধ বাইরে নিতে হয়, একইভাবে আনতে হয় গাভির খাবার, আর বর্ষায় দুর্ভোগ বাড়ে। খামারিদের অভিযোগ, তড়কা, বাদলা, খুরা, গলাফোলা বা কৃমিতে গাভি আক্রান্ত হলে নিয়মিত প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বা চিকিৎসকের দেখা পাওয়া যায় না। ডুমুরিয়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. আশরাফুল আলম বলেন, সংক্রামক রোগের প্রতিষেধক টিকা ও চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় খামারিদের বিনামূল্যে ওষুধ ও কৃমিনাশক, ফ্লোর ম্যাট, মশারি ও ঘাস কাটার মেশিন দেওয়া হয়েছে; তবে সীমাবদ্ধতা ও জনবল সংকটে সব ওষুধ বিনামূল্যে দেওয়া সম্ভব হয় না।
খামারিরা বলছেন, দুধ সংরক্ষণের ব্যবস্থা, সহজ শর্তে ঋণ, নিয়মিত প্রাণিসম্পদ সেবা আর যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে এই সম্ভাবনা আরও বড় হতে পারে। খুলনা-৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা) আসনের সংসদ সদস্য মোহাম্মদ আলী আসগার লবি বলেন, উন্নত জাতের গাভি পালনে দুই গ্রামের বাসিন্দাদের সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে এবং দুধ সহজে বাজারজাত করার জন্য গ্রামের কাঁচা ও আধাপাকা সড়ক পাকা করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
প্রতিবেদনটি সমকালের ডুমুরিয়া প্রতিনিধির; ছবি আরিফ হাজরার।
সূত্র: সমকাল





মন্তব্য
(০)