গ্রামের কোনো পুরনো আমগাছের গা বেয়ে ওপরে উঠে গেছে একটি লতা। দেখে মনে হয় কেউ লাগায়নি, কেউ যত্নও নেয় না। অথচ শীতের শুরুতে লতা শুকিয়ে গেলে গাছের গোড়ার মাটি খুঁড়লে বেরিয়ে আসে বিশাল এক কন্দ, কখনো কখনো একজন মানুষের পক্ষে একা তোলা কঠিন। এটিই মেটে আলু। দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় বাড়ির চারপাশে, গাছের নিচে, মাচায়, আঙিনায় আর বেড়ার ধারে এর দেখা মেলে, কিন্তু বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ তেমন হয় না। অবহেলায় বেড়ে ওঠা এই ফসলটিকে একটু নিয়ম মেনে চাষ করলে সবজির ঘাটতি মেটানো, বাড়ির আশপাশের পড়ে থাকা জায়গা কাজে লাগানো আর কীটনাশক ছাড়াই সবজি পাওয়া, তিনটিই সম্ভব।
মেটে আলু আসলে কী
মেটে আলু কন্দজাতীয় ফসল; এর খাওয়ার অংশটি মাটির নিচে জমে থাকা মোটা, খাদ্যে ভরা কন্দ। আমাদের দেশে এটি সবজি হিসেবে খাওয়া হয়। ওল বা গোল আলুর মতোই এটি ভর্তা করে, মাছ বা মাংসের সঙ্গে রান্না করে খাওয়া যায়। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় মেটে আলু একবীজপত্রী লতানো উদ্ভিদ, মানে অঙ্কুর বের হওয়ার সময় এর একটিমাত্র বীজপাতা থাকে, ধান বা ঘাসের মতো। বৈজ্ঞানিক নাম ডায়োস্কোরিয়া অ্যালাটা।
এই ফসল শুধু বাংলাদেশের নয়। উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে এর উৎপত্তি এশিয়া ও ওশেনিয়ার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে, আর ভোজ্য যত রকম ইয়াম বা কন্দ আছে, তার মধ্যে এটিই পৃথিবীতে সবচেয়ে বিস্তৃতভাবে চাষ হয়। গ্রীষ্মমণ্ডলের প্রায় সব অঞ্চলে এর চাষ আছে। ক্যারিবীয় অঞ্চলে এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইয়াম, পশ্চিম আফ্রিকায় দ্বিতীয়। ফিলিপাইনে এর বেগুনি জাতকে বলা হয় উবে, আর সেখানে কেক, আইসক্রিম, জ্যামসহ নানা মিষ্টান্নে এটি ব্যবহার হয়। বেগুনি জাতের এই রং আসে অ্যান্থোসায়ানিন নামের প্রাকৃতিক রঞ্জক থেকে।
এক ফসল, অনেক নাম
দেশের বিভিন্ন এলাকায় এই আলু নানা নামে পরিচিত: গড় আলু, মেটে আলু, গুইচ্যা আলু, লেমা আলু, ধুসড়ী আলু, আলতাপাট, চুবড়ি আলু, হরিণখালি, মাছআলু, হাতিপায়া, মৌ আলু বা মঘু আলু। নামের সংখ্যা বেশি হলেও জাত আছে চার থেকে পাঁচটির মতো বলে জানা যায়।
জাতভেদে মাটির নিচের প্রতিটি আলু ২ কেজি থেকে ৫০ থেকে ৬০ কেজি পর্যন্ত হয়ে থাকে। আকারেও বৈচিত্র্য অনেক: কোনোটি ডিম্বাকৃতি, কোনোটি লম্বাটে, কোনোটি হাতির পায়ের মতো, কোনোটি হরিণের মাথার মতো। এই আকার থেকেই হাতিপায়া বা হরিণখালির মতো নামের জন্ম। রঙেও ভিন্নতা আছে; জাতভেদে আলু হয় গোলাপি অথবা ধূসর বা মেটে রঙের।
মাটির নিচের আলু ছাড়াও লতানো গাছে ঝুলন্ত অবস্থায় ধরে ডিম্বাকৃতি ও লম্বাটে অনেক ছোট আলু, একেকটির ওজন ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম। লতায় ধরে বলে কোনো কোনো এলাকায় এগুলোকে পাতাশি বলা হয়। পাতাশি বীজ হিসেবে, সবজি হিসেবে এবং আগুনে পুড়িয়ে মুখরোচক খাবার হিসেবে ব্যবহার হয়। যেসব জাতের আলু সামান্য আঠালো এবং অল্পতেই সেদ্ধ হয়, সেগুলো খেতে সুস্বাদু, বাজারে চাহিদাও বেশি।
কেমন আবহাওয়া, কেমন মাটি
মেটে আলু গরম আবহাওয়ায় ভালো জন্মে। ঠান্ডায় গাছ বাড়ে না, শীত এলে গাছ শুকিয়ে মরে যায়। হালকা দোআঁশ মাটি এর জন্য সবচেয়ে উপযোগী; এমন মাটি ঝুরঝুরে থাকে বলে কন্দ মাটির নিচে বাধা ছাড়াই বড় হতে পারে। গাছটি আংশিক ছায়াতেও ভালো হয়, আর এ কারণেই বড় গাছের নিচে, যেখানে অন্য সবজি ভালো ফলে না, সেখানেও মেটে আলু দিব্যি বেড়ে ওঠে।
লতানো গাছ বলে মেটে আলুর বেয়ে ওঠার জন্য অবলম্বন লাগে: মাচা, জাংলা, বেড়া বা জীবিত কোনো গাছ। অনেক ক্ষেত্রে এর জন্য বাড়তি খরচ করতে হয় না; বাড়ির আশপাশের পরিত্যক্ত জায়গা কিংবা রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে থাকা গাছের নিচেই এর চাষ হতে দেখা যায়। এক বছরের এই ফসল পুরো বর্ষা মৌসুমজুড়ে মাঠে থাকে। তাই এমন জায়গা বাছতে হয়, যেখানে ভারী বৃষ্টিতেও পানি দাঁড়াবে না, আবার শুকনো সময়ে সেচ দেওয়ার ব্যবস্থাও আছে।
জমি ও গর্ত তৈরি
মেটে আলু লাগানোর অন্তত এক মাস আগে, ফাল্গুন মাসে, জমি চাষ করে পুরো জমিতে ভালোভাবে প্রচুর জৈব সার ছিটিয়ে দিতে হয়। তারপর ৩ থেকে ৪ হাত দূরে দূরে ২ ফুট চওড়া ও ৩ ফুট গভীর গর্ত করতে হয়। গর্তের মাটি ২০ থেকে ২৫ দিন রোদে শুকাতে দিতে হয়; কড়া রোদে মাটি শুকালে তা ঝুরঝুরে হয়, আর মাটির ভেতরের ক্ষতিকর জীবাণু ও পোকার ডিমও কিছুটা কমে।
এরপর জৈব সার, ছাই আর ধানের চিটা একসঙ্গে মিশিয়ে প্রতিটি গর্ত ভরাট করতে হবে। প্রতিটি গর্তে রাসায়নিক সার হিসেবে ৫০ গ্রাম ফসফেট ও ৫০ গ্রাম পটাশ দিতে হবে, আর মাটিতে রস না থাকলে সেচ দিতে হবে। গর্ত ভরাটের ১০ থেকে ১২ দিন পর বীজ লাগানো হয়। বীজ হিসেবে ব্যবহার হয় মাটির নিচের আলুর মুখিকন্দ, অর্থাৎ যে অংশ থেকে লতা বের হয়, অথবা লতায় ধরা পাতাশি।
জীবিত গাছকে অবলম্বন হিসেবে ব্যবহার করতে চাইলে সেই গাছের গোড়া থেকে ২ হাতের মধ্যে মাদা তৈরি করতে হবে। মাদা হলো গাছ লাগানোর জন্য উঁচু করে তৈরি মাটির ঢিবি। গাছের গোড়ায় যেন পানি জমে না থাকে, সেজন্য পানি বের হওয়ার নালা রাখতে হবে।
বীজ শোধন: একমাত্র বড় রোগের প্রতিষেধক
মেটে আলুর প্রধান এবং প্রায় একমাত্র রোগ হলো গোড়া পচা। বীজ শোধন করে লাগালে এই রোগের হাত থেকে অনেকটাই রক্ষা পাওয়া যায়। শোধনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে কার্বেন্ডাজিম গ্রুপের যেকোনো অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ২ গ্রাম, অথবা ম্যানকোজেব গ্রুপের যেকোনো অনুমোদিত ছত্রাকনাশক ৩ গ্রাম মিশিয়ে বীজ ৩০ থেকে ৪০ মিনিট ডুবিয়ে রাখতে হবে। তারপর বীজ তুলে ছায়ায় শুকিয়ে গর্তে লাগাতে হবে।
আরেকটি প্রচলিত পদ্ধতিও আছে। কাঁচা গোবর পানিতে গুলে তাতে লিটারপ্রতি ২ গ্রাম হারে কার্বেন্ডাজিম বা ম্যানকোজেব মিশিয়ে সেই মিশ্রণে বীজ বা কন্দ ডুবিয়ে তুলে ছায়ায় শুকিয়ে লাগালে বীজ শোধনও হয়, অঙ্কুরও বের হয় তাড়াতাড়ি।
লাগানোর নিয়ম ও সময়
মুখিকন্দের মুখ বা চোখের অংশটি ওপরের দিকে রেখে মাটির উপরের স্তর থেকে চার আঙুল নিচে বীজ লাগাতে হবে। মাটিতে রস না থাকলে ১০ থেকে ১৫ দিন পরপর সেচ দিতে হবে। লাগানোর জায়গা খড় বা কচুরিপানা দিয়ে ঢেকে দেওয়া যায়; এতে মাটির রস ধরে থাকে, আগাছাও কম হয়।
আধা কেজি থেকে ২ কেজি ওজনের বীজ বা কন্দ লাগালে ভালো ফলন পাওয়া যায়। বড় বীজে খাবার বেশি জমা থাকে বলে শুরুতেই গাছ শক্তপোক্ত হয়ে ওঠে। আরেকটি কৌশল হলো, প্রথম বছর কোনো গাছের ফসল না তুলে রেখে দেওয়া; পরের বছর সেখান থেকে সুঠাম চারা বের হয়, আর সেই চারা লাগালে ফলনও বেশি হয়। মার্চ-এপ্রিল, অর্থাৎ ফাল্গুন-চৈত্র মাস মেটে আলু লাগানোর উপযুক্ত সময়।
পরিচর্যা: আগাছা, সার আর মাচা
চারা গজানোর পর থেকেই জমি বা মাদা আগাছামুক্ত রাখতে হবে। তবে এ কাজে দুটি বিষয়ে সতর্ক থাকতে হয়: গোড়ার মাটি যেন বেশি আলগা না হয়ে যায়, আর দাওয়ালি, কুরনি বা কোদালের আঘাত যেন গাছে না লাগে। গোড়ার মাটি বেশি আলগা হলে সেখানে পানি জমে, আর আঘাতের ক্ষত দিয়ে জীবাণু ঢুকে গোড়া পচা রোগ হয়; দুটিতেই ফলনের ব্যাপক ক্ষতি হতে পারে।
চারা লাগানোর পর থেকে এক মাস পরপর দুই থেকে তিনবার প্রতিটি গাছে ৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৫০ গ্রাম পটাশ সার দিতে হবে। সার দিতে হবে গাছের গোড়ার চারপাশের মাটিতে, দুই থেকে তিন আঙুল গভীরে, যাতে সার শিকড়ের কাছে পৌঁছায় কিন্তু কন্দে আঘাত না লাগে।
মেটে আলুর চাষে একটি সরল সূত্র মনে রাখা দরকার: লতানো গাছের অবলম্বন বা মাচা যত ভালো হবে এবং গাছ যত ছড়িয়ে পড়তে পারবে, মাটির নিচের আলু তত বড় হবে। কারণ পাতা যত বেশি আলো পায়, তত বেশি খাদ্য তৈরি হয়, আর সেই খাদ্যই জমা হয় কন্দে। তাই লতাকে মাটিতে গড়াতে না দিয়ে ওপরে তুলে দেওয়াই ভালো ফলনের চাবি।
মাটির নিচে কন্দ কীভাবে বড় হয়
মেটে আলুর চাষ বুঝতে হলে গাছটির জীবনচক্র একটু জানা দরকার। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার উদ্ভিদসম্পদ নিয়ে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক তথ্যভান্ডার প্রোসিয়া জানাচ্ছে, এই ফসলের পুরো জীবনকাল ৮ থেকে ১০ মাস, যা আমাদের দেশের কৃষকদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে হুবহু মেলে। অঙ্কুর বের হওয়ার ৬ থেকে ১২ সপ্তাহের মধ্যে মাটির নিচে কন্দ তৈরি শুরু হয়। এরপর গাছ মূলত নতুন শিকড় বা লতা বাড়ানোর বদলে কন্দ মোটা করার কাজে মন দেয়।
প্রোসিয়ার তথ্য অনুযায়ী, কন্দ গঠনের জন্য দিন ছোট হওয়া, অর্থাৎ দিনের আলো ১২ ঘণ্টার কম হওয়া দরকার। বাংলাদেশে সেপ্টেম্বরের শেষ দিক থেকে দিন রাতের চেয়ে ছোট হতে থাকে। ফলে ফাল্গুন-চৈত্রে লাগানো গাছ গ্রীষ্ম ও বর্ষায় লতা-পাতা বাড়িয়ে খাদ্য তৈরির কারখানা গড়ে তোলে, আর শরৎ থেকে হেমন্তে সেই খাদ্য জমা হতে থাকে কন্দে। এ কারণেই শীতের শুরুতে লতা শুকিয়ে যাওয়ার সময় কন্দ থাকে সবচেয়ে বড় ও পরিপক্ব অবস্থায়।
একই তথ্যভান্ডারে বলা হয়েছে, অবলম্বন বা খুঁটি ছাড়া মাটিতে লতা ছড়িয়ে চাষ করলে আগাছা কিছুটা কম হয়, কিন্তু ফলন কমে যায়। অর্থাৎ মাচা বা গাছে লতা তুলে দেওয়ার যে পরামর্শ আমাদের কৃষকেরা দেন, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও তার পক্ষে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এই ফসলের বেশির ভাগ উৎপাদন হয় সেচ বা রাসায়নিক সার ছাড়াই, যা থেকে বোঝা যায় কতটা কম যত্নেও এটি টিকে থাকতে পারে। তবে ভালো ফলনের জন্য আমাদের দেশে যে সার ও সেচের পরামর্শ দেওয়া হয়, তা মানলে কন্দের আকার বাড়ে।
আবহাওয়ার দিক থেকেও বাংলাদেশ এই ফসলের জন্য উপযোগী। প্রোসিয়ার হিসাবে মেটে আলু চাষের জন্য বছরে ১,০০০ থেকে ১,৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টি দরকার, যা অন্তত ছয় থেকে সাত মাস ধরে ছড়িয়ে পড়বে। আমাদের দীর্ঘ বর্ষাকাল এই চাহিদা ভালোভাবেই মেটায়; বরং এখানে বড় ঝুঁকি অতিবৃষ্টিতে গোড়ায় পানি জমা, তাই নিকাশের ওপর এত জোর।
রোগ ও পোকা: প্রায় নেই বললেই চলে
মেটে আলুতে রোগ ও পোকার আক্রমণ নেই বললেই চলে, আর এটিই এই ফসলের বড় সুবিধা। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে রস চোষা পোকার আক্রমণ দেখা যায়। তখন কীটনাশক হিসেবে সেভিন প্রয়োগ করা যেতে পারে।
রোগের মধ্যে ছত্রাকের কারণে ডাঁটায় বা লতায় প্রথমে বাদামি দাগ পড়ে, পরে গোড়া বা পাতা পচে গাছ ঢলে পড়ে। এমন হলে প্রতি লিটার পানিতে কপার অক্সিক্লোরাইড গ্রুপের ছত্রাকনাশক ৪ গ্রাম অথবা কার্বেন্ডাজিম ২ গ্রাম মিশিয়ে গাছের গোড়ার মাটি ভিজিয়ে স্প্রে করতে হবে। কোনো কোনো জায়গায় শামুকও ক্ষতি করে; হাত দিয়ে শামুক ধরে মেরে ফেললেই এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। যেকোনো ছত্রাকনাশক বা কীটনাশক ব্যবহারের আগে প্যাকেটের নির্দেশনা পড়ে নেওয়া এবং স্প্রের সময় হাত-মুখ ঢেকে রাখা নিরাপদ অভ্যাস।
আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মেটে আলুর সবচেয়ে গুরুতর রোগ হিসেবে পরিচিত ইয়াম অ্যানথ্রাকনোজ, যাতে পাতা কালো হয়ে ডগা থেকে শুকিয়ে যায়। প্রোসিয়ার তথ্য অনুযায়ী, অন্য ইয়ামের তুলনায় এই প্রজাতিতেই রোগটি বেশি ক্ষতি করে। আমাদের দেশে এর প্রকোপ তেমন দেখা না গেলেও লতায় বাদামি বা কালো দাগ ছড়াতে দেখলে দেরি না করে উপজেলা কৃষি অফিসের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
কখন তুলবেন মেটে আলু
মেটে আলুর জীবনকাল ৮ থেকে ১০ মাস। কার্তিক-অগ্রহায়ণে ঠান্ডা পড়তে শুরু করলে পাতা হলদে হয়ে পুরো গাছ শুকিয়ে যায়। গাছ পুরোপুরি শুকিয়ে গেলেই আলু তোলা উচিত। তখন আলু পুরোপুরি পরিপক্ব হয়, ফলে বীজের মান ভালো হয় এবং স্বাদও বাড়ে। তাড়াহুড়া করে গাছ সবুজ থাকতেই তুলে ফেললে এই সুবিধাগুলো পাওয়া যায় না।
তবে পুরো মৌসুম অপেক্ষা না করেও কিছু আলু খাওয়ার উপায় আছে। ভাদ্র-আশ্বিন মাসে গাছের গোড়ার মাটি সরিয়ে, মুখের অংশ অক্ষত রেখে, নিচের দিক থেকে খাওয়ার জন্য কিছুটা আলু কেটে নেওয়া যায়। এতে গাছ মরে না; বরং কাটা অংশে আলু আবার স্বাভাবিক নিয়মে বড় হতে থাকে। পরিবারের দরকারে বর্ষার শেষে তাই কিছুটা সবজি ঘরে আনা যায়, আর মূল ফসল তোলা যায় শীতে।
ফলনের হিসাবও উৎসাহ দেওয়ার মতো। খোলা জায়গায় চাষ করলে একেকটি মাদা থেকে সর্বোচ্চ ৫০ থেকে ৬০ কেজি পর্যন্ত আলু পাওয়া সম্ভব। জাংলা বা মাচায় চাষেও সন্তোষজনক ফলন মেলে। বিঘাপ্রতি মেটে আলুর গড় ফলন ৩ থেকে ৪ টন।
বীজ রাখা ও সংরক্ষণ
তোলা আলুর একটি অংশ পরের মৌসুমের বীজ হিসেবে রেখে দিতে হয়। এখানে গাছটির একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য কাজে আসে: প্রোসিয়ার তথ্য অনুযায়ী, তোলার পর মেটে আলুর কন্দ ২ থেকে ৪ মাস সুপ্ত অবস্থায় থাকে, অর্থাৎ এই সময়ে এর অঙ্কুর বের হয় না। অগ্রহায়ণে তোলা কন্দ তাই স্বাভাবিকভাবেই ফাল্গুন পর্যন্ত বিশ্রাম নেয়, আর লাগানোর সময় এলে অঙ্কুর দেওয়ার জন্য তৈরি থাকে।
কন্দ রাখতে হয় ঠান্ডা ও ছায়াযুক্ত জায়গায়। তবে বেশি ঠান্ডাও ক্ষতিকর; প্রোসিয়া জানাচ্ছে, ১২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচের তাপমাত্রায় কন্দ ঠান্ডাজনিত ক্ষতির শিকার হয়। মেটে আলুর কন্দ আঘাতে দ্রুত জখম হয়, তাই কোদাল বা খন্তা দিয়ে খোঁড়ার সময় কন্দের গায়ে যেন কোপ না লাগে, আর বহনের সময় যেন ছুড়ে ফেলা না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। কাটা বা থেঁতলানো কন্দ পচে যাওয়ার ঝুঁকি বেশি, তাই বীজের জন্য রাখতে হবে অক্ষত, সুস্থ আর সুস্বাদু জাতের কন্দ। লতায় ধরা পাতাশিও একইভাবে শুকনো, ছায়াযুক্ত জায়গায় রেখে দেওয়া যায়, যা পরের বছরের বীজের কাজ করে।
অন্য দেশের ফলনের সঙ্গে তুলনা করলে আমাদের হিসাবটা আরও পরিষ্কার হয়। প্রোসিয়ার তথ্য বলছে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মেটে আলুর ফলন হেক্টরপ্রতি ৮ থেকে ৩০ টন; একেকটি কন্দের ওজন সাধারণত ৫ থেকে ১০ কেজি, আর সবচেয়ে বড়গুলো ৬০ কেজি পর্যন্ত হয়। আমাদের দেশে বিঘাপ্রতি ৩ থেকে ৪ টন ফলনের যে হিসাব, তা হেক্টরে দাঁড়ায় মোটামুটি ২২ থেকে ৩০ টন, অর্থাৎ বিশ্বের ফলনের ঊর্ধ্বসীমার কাছাকাছি। অন্য দেশে সাধারণত ৫০ থেকে ৫০০ গ্রাম ওজনের বীজ কন্দ লাগানো হয়; আমাদের দেশে আধা কেজি থেকে ২ কেজি ওজনের বড় বীজ লাগানোর যে পরামর্শ, বড় কন্দ পাওয়ার পেছনে তারও ভূমিকা আছে।
রান্নাঘরে মেটে আলু
মেটে আলু ক্যালসিয়াম ও ফসফরাসের খুব ভালো উৎস, এতে প্রচুর পটাশিয়াম ও সোডিয়ামও রয়েছে। ক্যালসিয়াম ও ফসফরাস হাড় ও দাঁতের গঠনে দরকারি, আর পটাশিয়াম শরীরের পানি ও লবণের ভারসাম্য রক্ষায় কাজ করে। ভাতের পাশাপাশি শর্করার একটি বিকল্প উৎস হিসেবেও এটি পাতে জায়গা পেতে পারে।
প্রোসিয়ার তথ্যভান্ডারে মেটে আলুর খাওয়ার অংশের যে গড় পুষ্টি উপাদান দেওয়া আছে, তাতে প্রতি ১০০ গ্রামে পানি প্রায় ৭০ গ্রাম, শ্বেতসার প্রায় ২৮ গ্রাম, আমিষ ১.১ থেকে ২.৮ গ্রাম, আর ভিটামিন সি ৫ থেকে ২৮ মিলিগ্রাম। চর্বির পরিমাণ খুবই সামান্য। অর্থাৎ এটি মূলত শক্তি জোগানো শর্করার খাবার, সঙ্গে কিছু ভিটামিন ও খনিজ।
মেটে আলু সবসময় ভালোভাবে রান্না করে খেতে হয়। এই কন্দে অক্সালেট নামের উপাদান তুলনামূলক বেশি থাকে, যা বেশি পরিমাণে গেলে পুষ্টি শোষণে বাধা দিতে পারে এবং কিডনিতে পাথর তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত বলে গবেষণায় উল্লেখ আছে। তাই কাঁচা খাওয়া নয়; সেদ্ধ, ভর্তা, তরকারি বা পোড়ানো, যেভাবেই হোক, ভালোভাবে রান্না করাই নিয়ম।
গ্রামে মেটে আলুর ভর্তা আর মাছ দিয়ে রান্না করা তরকারি পরিচিত খাবার। শহরের বাজারেও মৌসুমে এর দেখা মেলে। যেসব জাত অল্পতে সেদ্ধ হয় আর সামান্য আঠালো, সেগুলোর চাহিদা সবচেয়ে বেশি, তাই বীজ বাছাইয়ের সময় সুস্বাদু জাতের কন্দ রেখে দেওয়া ভালো।
পড়ে থাকা জমিতে পুষ্টি ও আয়ের সম্ভাবনা
অন্য সবজির তুলনায় মেটে আলু উৎপাদনে ঝুঁকি কম, রোগবালাইও অত্যন্ত কম। দেশের মানুষের পুষ্টিহীনতা দূর করা, সবজির ঘাটতি মেটানো, পরিত্যক্ত জায়গার সঠিক ব্যবহার, কীটনাশক ছাড়াই সবজি পাওয়া আর পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা, সবখানেই এই সবজিটি বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। মেটে আলু আদিকাল থেকে খাওয়া হলেও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এর চাষের প্রসার ও প্রচার হয়নি, তাই ব্যাপক আকারে এর চাষও বাড়েনি।
পুরো মৌসুমের কাজ এক নজরে সাজালে দাঁড়ায় এমন:
- ফাল্গুনের শুরু: জমি চাষ, জৈব সার ছিটানো, ২ ফুট চওড়া ও ৩ ফুট গভীর গর্ত খুঁড়ে ২০ থেকে ২৫ দিন রোদে শুকানো।
- গর্ত ভরাট: জৈব সার, ছাই ও চিটা মিশিয়ে, সঙ্গে গর্তপ্রতি ৫০ গ্রাম ফসফেট ও ৫০ গ্রাম পটাশ।
- ১০ থেকে ১২ দিন পর: শোধন করা মুখিকন্দ বা পাতাশি চার আঙুল গভীরে লাগানো, ফাল্গুন-চৈত্রের মধ্যে।
- লাগানোর পর প্রতি মাসে, দুই থেকে তিনবার: গাছপ্রতি ৫০ গ্রাম ইউরিয়া ও ৫০ গ্রাম পটাশ, সঙ্গে আগাছা পরিষ্কার ও মাচা ঠিক রাখা।
- ভাদ্র-আশ্বিন: দরকার হলে মুখ অক্ষত রেখে নিচ থেকে কিছু আলু কেটে খাওয়া।
- কার্তিক-অগ্রহায়ণ: লতা পুরোপুরি শুকালে আলু তোলা, আর সেরা কন্দগুলো বীজের জন্য রেখে দেওয়া।
অথচ প্রতিটি গ্রামে এমন অনেক জায়গা আছে, যেখানে আর কিছুই চাষ হয় না: পুকুরপাড়, রাস্তার ধারের গাছের গোড়া, বাড়ির পেছনের ছায়াঘেরা কোণ, পুরনো বেড়া। সেখানে দু-একটি মাদা তৈরি করে ফাল্গুনে মেটে আলুর বীজ বসিয়ে দিলে শীতের শুরুতে পরিবারের হাতে আসতে পারে কয়েক মণ সবজি। একটু সচেতন হলেই কম খরচে, হাতের কাছের এই সবজিটি চাষ করা যায়, যা পুষ্টির অভাব পূরণে যথেষ্ট ভূমিকা রাখতে পারে।
ছবি: মেটে আলুর লতা (Dioscorea alata), Tauʻolunga / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)





মন্তব্য
(০)