টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার ফাজিলহাটী ইউনিয়নের গাছপাড়া কামারনওগাঁ বিলের পানিকে কাজে লাগিয়ে একটি ভ্রাম্যমাণ হাঁসের খামার গড়ে তুলেছেন কামারনওগাঁ গ্রামের প্রবাসফেরত আমিনুর। ২০২০ সালের ৬ মার্চ জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, বছরখানেক আগে ৩৫ হাজার টাকায় জিনডিং ও খাকি ক্যাম্পবেল জাতের এক হাজার হাঁসের বাচ্চা কিনে তিনি খামারটি শুরু করেন। জাগো নিউজ তাকে আমিনুর রহমান এবং ২২ ফেব্রুয়ারির বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন আমিনুর ইসলাম নামে উল্লেখ করেছে।
ডিম উৎপাদন ও আয়ের হিসাব
জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিন-চার মাস পালনের পর থেকে খামারে প্রতিদিন গড়ে ৩০০ থেকে ৩৫০টি ডিম হচ্ছে, আর পাঁচ মাস ধরে নিয়মিত দিনে প্রায় ৩৫০টি ডিম তুলছেন আমিনুর। পাইকাররা খামার থেকেই প্রতি শ ডিম ১,১০০ টাকা (প্রতি হালি ৪৪ টাকা) দরে কিনে নেন। প্রতিবেদনের হিসাবে দিনে প্রায় ৩,৮০০ টাকার ডিম বিক্রি হয় এবং মাসে আয় দাঁড়ায় প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা।
আমিনুরের নিজের হিসাবে, আগের চার-পাঁচ মাসে খামারের ডিম বিক্রি হয়েছে ৫ লাখ টাকার, খরচ হয়েছে ২ লাখ টাকা। হাঁসগুলো প্রতিটি ৪০০ টাকা দরে বিক্রি করলে আরও প্রায় ৪ লাখ টাকা আসবে বলে তিনি সেটিকেও লাভ ধরছেন; এ হিসাবেই তার দাবি, মাসে লাখ টাকার বেশি আয় হচ্ছে। দুই সপ্তাহ আগের বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে আমিনুর মাসে গড়ে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা আয় এবং পাঁচ মাসে প্রায় ছয় লাখ টাকার ডিম বিক্রির কথা বলেছিলেন; সেখানে জানানো হয়, এক হাজার বাচ্চার মধ্যে তখন সাড়ে আটশ হাঁস ছিল। আয়ের এসব হিসাব খামারির নিজের দেওয়া, স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি।

জিনডিং ও খাকি ক্যাম্পবেল কেমন হাঁস
খামারের দুই জাতই ডিমের জন্য পরিচিত। খাকি ক্যাম্পবেল জাতটি উনিশ শতকের শেষ দিকে ইংল্যান্ডে তৈরি; এ জাতের হাঁস বছরে গড়ে প্রায় ৩০০টি ডিম দেয়। জিনডিং চীনের একটি দেশি ডিমপাড়া জাতের হাঁস; ২০১৭ সালে বিএমসি জিনোমিকস সাময়িকীতে প্রকাশিত এক গবেষণা অনুযায়ী, এ জাতের বেশির ভাগ হাঁস নীলচে-সবুজ খোসার ডিম পাড়ে, অল্প কিছু পাড়ে সাদা ডিম।
বিলের পানির সঙ্গে সরে চলা খামার
বিল হলো বাংলাদেশের প্লাবনভূমির হ্রদের মতো জলাভূমি, যেখানে পানি স্থির থাকে। বর্ষায় নিচু জমি ডুবে বিল বড় হয়ে যায়, আর শুকনো মৌসুমে পানি নেমে গেলে উর্বর জমিতে ধান চাষ হয়। কামারনওগাঁ বিলেও তাই ঘটেছিল: মার্চের শুরুতে বিলের পানি প্রায় পুরোটা শুকিয়ে আবাদি জমিতে রূপ নিয়েছিল, মাঝে মাঝে কেবল অল্প পানি ছিল, আর কয়েক দিনের মধ্যে সেখানে বোরো ধান রোপণের কথা ছিল।
বিলের পাশে এক খণ্ড উঁচু জমিতে একচালা ঝুপড়ি বানিয়ে হাঁস পাহারা দেন আমিনুর, সেখানেই শোবার জায়গা করেছেন। পানি যেখানে, খামারও সেখানে: প্রথমে শ্বশুরবাড়ি, পরে নিজের বাড়ি, তারপর কামারনওগাঁ বিলে আনা হয় হাঁসগুলো। জাগো নিউজ জানায়, জলাশয়ের অভাবে নয় মাসে তিনবার জায়গা বদলাতে হয়েছে, আর এবার পাশের এলাসিন ইউনিয়নের সিংহরাগী এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর কাছে হাঁসগুলো সরানোর কথা ভাবছিলেন তিনি।
আমিনুর জানান, হাঁস সবসময় জলাশয়ে থাকায় খাবারের খরচ কম পড়ে। খাবার হিসেবে গম ভাঙা, কুঁড়া ও ধান মিশিয়ে দেওয়া হয়, বাজারের কেনা ফিড দেওয়া হয় না। তার মতে, জলাশয়ে ঠিকমতো পানি থাকলে খরচ আরও কমত; পানি কমে যাওয়ায় অনেকটা সময় হাঁসগুলোকে বাড়িতে রাখতে হয়।


গমের ব্যবসা থেকে প্রবাস, তারপর হাঁস
আমিনুর জানান, ১০-১২ বছর আগে তিনি গমের ব্যবসা করতেন এবং প্রতিদিনের লাভ থেকে একটি করে হাঁস কিনে ১৬৫টি হাঁস জমিয়েছিলেন। হাঁস পালনের আয়ে সংসার চালিয়ে বিদেশ যাওয়ার খরচও জোগাড় করেন। সৌদি আরবে যান, ফিরে আবার যান সিঙ্গাপুরে। প্রবাসের চেয়ে হাঁস পালনে আয় বেশি হবে ভেবে দেশে ফিরে খামার শুরু করেন। সে বছর খামারে তিন হাজার বাচ্চা তোলার পরিকল্পনার কথা জানান তিনি।
দুই প্রতিবেদনেই উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের আওতায় ১৭ ও ২১ দিনের দুই ধাপের প্রশিক্ষণের কথা আছে, যার ফলে খামারের প্রাথমিক চিকিৎসা এখন নিজেরাই দেন; বাংলা ট্রিবিউনে এ কথা বলেছেন খামারে কাজ করা আমিনুরের স্ত্রী। আমিনুরের দাবি, প্রাণিসম্পদ বিভাগ নিয়মিত খামার পরিদর্শন, বিনামূল্যে ভ্যাকসিন ও পরামর্শ দিলে খামারিরা উপকৃত হতেন।

টিকা ও রোগ প্রতিরোধ
দেলদুয়ার উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের ভেটেরিনারি সার্জন ডা. মোহাম্মদ আলী খামারটিকে ভালো উদ্যোগ বলেন। তিনি জানান, হাঁস সুস্থ রাখতে নিয়ম মেনে ভ্যাকসিন এবং সময়সূচি অনুযায়ী ডাক কলেরার টিকা দিতে হবে, আর সরকার নির্ধারিত মূল্যে ভ্যাকসিন, চিকিৎসা ও পরামর্শ সেবা দেওয়া হচ্ছে।
মার্ক ভেটেরিনারি ম্যানুয়াল অনুযায়ী, ফাউল কলেরা (হাঁসে যা ডাক কলেরা নামে পরিচিত) পাস্তুরেলা মাল্টোসিডা ব্যাকটেরিয়াজনিত ছোঁয়াচে রোগ, এবং মুরগির চেয়ে টার্কি ও জলচর পাখি এতে বেশি আক্রান্ত হয়। হঠাৎ অনেক পাখি মরে যাওয়া প্রায়ই প্রথম লক্ষণ; প্রতিরোধে ভালো ব্যবস্থাপনা ও জীবনিরাপত্তা জরুরি। টিকার সময়সূচি ও চিকিৎসার জন্য খামারিরা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার পরামর্শ নিন।
ছবি: Md Rafeur Rahaman / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ, দ্য এগ্রো নিউজ, বাংলা ট্রিবিউন, মার্ক ভেটেরিনারি ম্যানুয়াল, বিএমসি জিনোমিকস, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)