রাজধানীর উত্তরার উত্তর প্রান্তের দিয়াবাড়ি নিরিবিলি ও খোলামেলা পরিবেশের কারণে বহুদিন ধরেই জনপ্রিয় ঠিকানা। ২০২৫ সালের নভেম্বরে এসে সেই এলাকাই পরিণত হয়েছিল এক বিস্তীর্ণ সবুজ ব্যবসাকেন্দ্রে। জাগো নিউজ ২৪-এর ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উত্তরার ১৫ ও ১৬ নম্বর সেক্টরে নদীর পাড় ঘেঁষে সারি সারি ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক নার্সারি গড়ে উঠেছে। বাড়িঘর, অফিস কিংবা ছাদবাগান সাজাতে পছন্দের গাছ কিনতে প্রতিদিনই ঢাকা ও আশপাশের জেলা থেকে সেখানে ছুটে আসছিলেন নানা বয়সের মানুষ। শীতকালীন ফুলের মৌসুম শুরু হওয়ায় মালিক ও শ্রমিকদের কাছে সেটি ছিল বছরের অন্যতম ব্যস্ত সময়।
নদীর পাড়ে নার্সারির সারি
১৫ নম্বর সেক্টরের ১১ নম্বর ব্রিজের দক্ষিণ পাশে তাকালেই চোখে পড়ে রাস্তার দুই ধারে সারি সারি সাজানো অনেক নার্সারি, যেন সবুজের দীর্ঘ কারুকাজ বিছিয়ে আছে পুরো পথজুড়ে। ব্রিজের উত্তর পাশেও আছে আরও কিছু নার্সারি। প্রতিবেদনের হিসাবে ছোট-বড় সব মিলিয়ে দিয়াবাড়ি এলাকায় নার্সারির সংখ্যা শতাধিক, যা এলাকার সবুজ সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। দূর থেকে তাকালে গাছের রং, পাতার নানা আকার আর ফুলের উজ্জ্বল রঙে পুরো জায়গাটিকে অন্যরকম এক দৃশ্য মনে হয়। পথচারীরা হাঁটতে হাঁটতেই থেমে যান; কেউ ফুলের গন্ধ নেন, কেউ নতুন চারা দেখেন, কেউবা শুধু সবুজের সারি দেখে মন ভরে বাড়ি ফেরেন।
সরকারি ও বেসরকারি উন্নয়ন প্রকল্প, ছাদবাগান উদ্যোক্তা এবং সাধারণ ক্রেতাদের কাছে দিয়াবাড়ির নার্সারিগুলো তখন রাজধানীর অন্যতম নির্ভরযোগ্য ঠিকানা। নার্সারিগুলো ঘুরে দেখা যায়, কোথাও ফলের বড় চারা, কোথাও সারিবদ্ধ ইনডোর প্ল্যান্ট, আবার কোথাও দেশি-বিদেশি ফুল ও ফলের গাছের সারি। শোভাবর্ধক ও ওষুধি গাছও বিক্রি হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গাছের এই বৈচিত্র্যই এলাকার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ; এককথায় এখানে প্রায় সব ধরনের চারা ও গাছই পাওয়া যায়।
নার্সারি ছড়িয়ে পড়ার অনেক আগে থেকেই দিয়াবাড়ি নগরবাসীর বেড়ানোর জায়গা। প্রথম আলো ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে জানিয়েছিল, প্রতিবছর শরতে, অর্থাৎ ভাদ্র ও আশ্বিন মাসে, দিয়াবাড়ির খোলা মাঠে একটি জলাধারের পাশে সারি সারি কাশফুল ফোটে, আর বছরের সেই সময় ঢাকার নানা প্রান্ত থেকে মানুষ সেখানে ভিড় করেন; কাশবনের পাশে ফুচকা, চটপটি, ঝালমুড়ি ও হাওয়াই মিঠাইয়ের দোকানও গড়ে উঠেছে। দিয়াবাড়ি উত্তরার অংশ। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, ঢাকা মহানগরের উত্তরা থানার আয়তন ৩৬ দশমিক ৯১ বর্গকিলোমিটার; থানাটি গঠিত হয় ১৯৮৮ সালে, আর এর উত্তরে তুরাগ থানা ও গাজীপুর সদর উপজেলা। প্রধানত নগর এলাকা হলেও বাংলাপিডিয়ায় উদ্ধৃত ২০০১ সালের আদমশুমারির তথ্যে এই থানার প্রধান ফসল হিসেবে শাকসবজি এবং প্রধান ফল হিসেবে আম, কাঁঠাল, কলা, জাম ও নারকেলের নাম আছে।

শীতকালীন ফুলের মৌসুম
বর্ষায় ফল ও বনজ চারার বিক্রি বেশি হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, শীতের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই নার্সারিগুলোর পরিবেশ পুরোপুরি বদলে গিয়েছিল। ব্যবসায়ীরা হয়ে উঠেছিলেন আরও ব্যস্ত, মালিক-শ্রমিকদের যেন দম ফেলার সুযোগ ছিল না। কারণ, নভেম্বরেই শুরু হয় শীতকালীন ফুলের চারার গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম। গাঁদা, বেগুনি, ক্যালেন্ডুলা, কসমস, জারবেরা ও পিটুনিয়ার চাহিদা তখন সবচেয়ে বেশি। তাই শীতের ফুলের বীজতলা তৈরি, চারা বাছাই, মাটি তৈরি, টব প্রস্তুত এবং গাছের পরিচর্যাসহ নানা কাজে ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছিলেন শ্রমিকেরা। সব মিলিয়ে নার্সারিপাড়া হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত সবুজ কর্মশালা।
এগুলো বাংলাদেশের বাগানের চিরচেনা শীতের ফুল। বাংলাপিডিয়ার ‘বাগানের ফুল’ ভুক্তিতে বলা হয়েছে, দেশের মৌসুমি ফুলের বেশির ভাগই বিদেশি বীরুৎ, যেগুলো সাধারণত শীতকালে চাষ করা হয় এবং শীতের নিষ্প্রভ প্রকৃতিতে উজ্জ্বল ফুলের জন্য বিশেষভাবে প্রিয়। সেই তালিকায় আছে আফ্রিকান গাঁদা (Tagetes erecta), ফরাসি গাঁদা (Tagetes patula), ক্যালেন্ডুলা বা পট ম্যারিগোল্ড (Calendula officinalis), কসমস (Cosmos bipinnatus), পিটুনিয়া (Petunia hybrida), ডালিয়া, চন্দ্রমল্লিকা, ফ্লক্স, জিনিয়া, প্যানজি, স্ন্যাপড্রাগন, অ্যাস্টার, সূর্যমুখী, ডায়ান্থাস প্রভৃতি। একই বিশ্বকোষ জানায়, দেশের বর্তমান বাগানের গাছের অনেকগুলোই বিদেশি; ব্যবসায়ী, পর্যটক ও শাসকেরা এগুলো এনেছিলেন, কোনো কোনোটি এসেছে চীন, জাপান, আফ্রিকা ও গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আমেরিকার মতো দূর অঞ্চল থেকে।
গাঁদা বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হওয়া কাটা ফুলেরও একটি। বাংলাপিডিয়ার ফুলচাষ ভুক্তিতে দেশে উৎপাদিত যেসব ফুল নিয়মিত বাণিজ্যিক পরিসরে কেনাবেচা হয়, তার মধ্যে গোলাপ, গ্লাডিওলাস, চন্দ্রমল্লিকা ও রজনীগন্ধার পাশাপাশি হলুদ, লাল ও কমলা জাতের গাঁদার কথা বলা হয়েছে। শীতের প্রস্তুতি শুধু দিয়াবাড়িতেই চলছিল না। প্রথম আলো ২০২৫ সালের ১ নভেম্বর জানায়, বগুড়া শহর থেকে ১২ কিলোমিটার উত্তরে মহাসড়কঘেঁষা গোকুল গ্রামে দুই শতাধিক নার্সারি আছে, পাশের ধাওয়াকোলা গ্রামের মাঠেও নার্সারি গড়ে উঠেছে, আর সেখানে গ্লাডিওলাস, চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা, জারবেরা, রজনীগন্ধা, ডায়ানথাস, দোপাটি, নয়নতারা, গাজানিয়া ও পিটুনিয়াসহ শীতকালীন ফুলের চারা তৈরির কাজ চলছিল।

বীজতলার পেছনের শ্রমিকেরা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দিয়াবাড়ির প্রতিটি নার্সারিতে ৩ থেকে ৫ জন স্থায়ী শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন। মৌসুম ও কাজের চাপ অনুযায়ী অতিরিক্ত দৈনিক মজুরির শ্রমিকও নেওয়া হয়। পুরুষের পাশাপাশি নারী শ্রমিকেরাও এসব নার্সারিতে কাজ করেন।
ইমরান নামের এক শ্রমিক বীজতলায় পানি দিতে দিতে জানান, করোনাকাল থেকেই তিনি এখানকার নার্সারিতে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘বীজতলা তৈরি, চারা রোপণ, পানি দেওয়া, সার মেশানো, সবই সময়মতো করতে হয়। শীতকালে ফুল গাছের চাহিদা অনেক বেশি থাকে। তাই ফুলসহ শীতকালীন শাকসবজির চারা তৈরিতে শীতের শুরু থেকেই আমাদের কাজের চাপ বাড়তে থাকে। প্রতিটি নার্সারির শ্রমিকেরা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত কাজ করেন।’ ভালোভাবে চারা তৈরি করে শীতের মৌসুম ধরতে পারলে নার্সারির বাজারও জমজমাট হবে বলে জানান এই শ্রমিক।
আরেক শ্রমিক আবুল হোসেন জানান, দীর্ঘদিন ধরেই তিনি নার্সারি শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। তিনি বলেন, ‘বীজতলা ও গাছে নিয়মিত কয়েক বেলায় পানি দিই। কোনো পাতা বা কাণ্ড নষ্ট হলে সঙ্গে সঙ্গেই ব্যবস্থা নিই।’
এক জায়গায় বাগানের সব সরঞ্জাম
গাছের পাশাপাশি এই নার্সারিপাড়ায় পাওয়া যায় মিশ্র মাটি, ড্রাম, টব, হ্যাঙ্গিং বাসকেট, জিআই স্ট্যান্ড, জৈব সার, কীটনাশক, স্প্রে বোতলসহ বাগানের প্রয়োজনীয় সব সরঞ্জাম। ফলে ক্রেতারা এক জায়গা থেকেই সবকিছু সংগ্রহ করতে পারেন। রাজধানীর অন্য নার্সারিগুলোও একইভাবে চলে। প্রথম আলো ২০২৫ সালের ১৫ অক্টোবর জানায়, ঢাকার নার্সারিগুলোতে চারাগাছের পাশাপাশি মাটি, টব, পানি দেওয়ার স্প্রে মেশিন, পাতা কাটার কাঁচি, কীটনাশক ও সার পাওয়া যায়। আগারগাঁও, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকার বিক্রেতারা পত্রিকাটিকে জানান, প্লাস্টিকের টব ৫০ থেকে ৫০০ টাকায়, পানি দেওয়ার যন্ত্র ১০০ থেকে ৫০০ টাকায়, আগাছা নিড়ানি ২৫০ টাকার মধ্যে এবং পাতা কাটার কাঁচি ৪০০ টাকার আশপাশে পাওয়া যায়; সারের ছোট প্যাকেট ২০ থেকে ৫০ টাকা, এক বস্তা মাটি ১০০ টাকা, ছোট মাটির টব ১০০ থেকে ৩০০ টাকা এবং নকশা করা মাটির টব ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। মোহাম্মদপুরের এক নার্সারিমালিক পত্রিকাটিকে বলেন, গাছের চেয়ে আনুষঙ্গিক জিনিসের দাম বেশি; ৫০ টাকার একটি ছোট গাছের সঙ্গে টব ও সার মিলিয়ে আরও প্রায় ১৫০ টাকার জিনিস লাগে।
একই প্রতিবেদনে নার্সারিমালিকদের হিসাবে এই ব্যবসার আকারও তুলে ধরা হয়। তাঁদের হিসাবে ঢাকা শহর ও আশপাশে ছোট, মাঝারি ও বড় মিলিয়ে প্রায় ৮০০ নার্সারি আছে; এর মধ্যে ছোট আকারের ৪৫০টি ও মাঝারি ২৫০টি, আর ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় আছে প্রায় ৩০০টি। মালিকেরা জানান, অধিকাংশ নার্সারি গড়ে উঠেছে আগারগাঁও, ৩০০ ফুট, ১০০ ফুট, দিয়াবাড়ি, দোয়েল চত্বর, বেইলি রোড, কাকরাইল ও বেড়িবাঁধ এলাকায়; এ ছাড়া সাভার, আশুলিয়া, রূপগঞ্জ ও গাজীপুরসহ ঢাকার আশপাশে আছে আরও প্রায় ৫০০টি নার্সারি। শীতে শহরের পথের ধারের নার্সারিগুলোতে ফুলগাছের বেচাকেনা হয় সবচেয়ে বেশি। প্রথম আলোর ২০২৪ সালের ১৯ জানুয়ারির এক আলোকচিত্র প্রতিবেদনে আগারগাঁও, ধানমন্ডি, শ্যামলী ও মোহাম্মদপুরের নার্সারি ঘুরে দেখা যায়, ফুটপাত ও ভ্যানের ওপর ভ্রাম্যমাণ নার্সারিতে ৫০ থেকে ৫০০ টাকার মধ্যে ফুলগাছ বিক্রি হচ্ছিল।

ছাদবাগানিরাই সবচেয়ে বড় ক্রেতা
ঢাকার বাসাবাড়িতে জায়গার অভাব বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকেই এখন ছাদকে ব্যবহার করছেন ক্ষুদ্র কৃষিজমি হিসেবে; ছাদে শাকসবজি, ফুল, ফল সবই হচ্ছে। এতে নার্সারিগুলোর একটি বড় ক্রেতাগোষ্ঠী তৈরি হয়েছে। নার্সারিমালিকেরা জাগো নিউজ ২৪-কে জানান, তাঁদের ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ ক্রেতাই এখন ছাদবাগান চর্চাকারী। তাঁরা শুধু গাছই নন, বেড তৈরি, টবে মাটি মেশানো, পানিনিষ্কাশন ব্যবস্থা, ছাদবাগানের নকশা ও কীটনাশক ব্যবস্থাপনা, সবই নার্সারি থেকে সেবা হিসেবে নিচ্ছেন।
মালিকেরা বলেন, ‘অনেকেই শুরুতে জানেন না কোন গাছ কোথায় বসবে। আমরা পুরো ছাদের প্ল্যান সাজিয়ে দিই। তাই ছাদবাগানকারীরা এখন আমাদের সবচেয়ে বড় ক্রেতা।’ ঢাকার ব্যস্ত মানুষের কাছে এই তৈরি সেবা বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। শুধু ছাদ নয়, বারান্দা, অফিসের অভ্যর্থনাকক্ষ ও রেস্তোরাঁর সাজসজ্জা, সব জায়গাতেই নার্সারির গাছের চাহিদা বাড়ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিদিনই ঢাকা ও আশপাশের জেলা থেকে বাড়িঘর, অফিস, রেস্তোরাঁ ও ছাদবাগান সাজাতে গাছ কিনতে দিয়াবাড়ির নার্সারিপাড়ায় ভিড় জমে। কেউ আসেন নতুন বাগান শুরু করতে, কেউ পুরোনো বাগানে নতুন গাছ যোগ করতে। পরিবার, তরুণ-তরুণী, বাগান উদ্যোক্তা ও করপোরেট প্রতিনিধিদের পদচারণে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জমজমাট থাকে এই সবুজ বাজার।
ঢাকার হাজারীবাগ থেকে নতুন ছাদবাগান সাজাতে এসেছিলেন আজিম নামের এক কর্মচারী। তাঁর হাতে ছিল গাছ কেনার একটি তালিকা, সঙ্গে দুজন সহকারী; বাজেট ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। বাজেটের মধ্যে সেরা গাছ কিনতে তাঁরা নার্সারি ঘুরে ঘুরে দেখছিলেন ও দরদাম করছিলেন। আজিম জানান, মালিকের নতুন ছাদবাগান তৈরির দায়িত্ব তাঁর ওপর; তাই তিনি এসেছেন প্রয়োজনীয় ফুল, ফল ও শোভাবর্ধক গাছ সংগ্রহ করতে। তিনি বলেন, ‘আম, মাল্টা, লেবুসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন জাতের ফলের গাছ কিনতেছি। এখানে অনেক নার্সারি থাকায় ভালো গাছ বেছে নেওয়ার সুযোগ বেশি।’ গাছের পাশাপাশি টব, প্রস্তুত মাটি, পানিনিষ্কাশনের উপকরণ ও জৈব সারসহ নানা বাগানসামগ্রীও কেনার কথা জানান তিনি, আর নার্সারির শ্রমিকেরা তাঁকে ছাদবাগান পরিচর্যার নানা দিক বুঝিয়ে দেন।
সরকারি পর্যায়েও ছাদবাগানে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছিল। প্রথম আলো ২০২৩ সালের ১৪ জুন জানায়, সিটি করপোরেশন এলাকায় বাড়ির ছাদে বাগান করলে ১০ শতাংশ গৃহকর (হোল্ডিং ট্যাক্স) ছাড় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের আবেদনের পর এ সিদ্ধান্ত হয়, আর এর শর্তের মধ্যে ছিল ছাদবাগান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং মশার প্রজনন ঠেকানোর ব্যবস্থা রাখা। ২০২৪ সালের আগস্টে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ঢাকার ৩৩টি সরকারি স্কুলে ছাদবাগান ও সবুজ প্রাচীর গড়ার নির্দেশনা দেয়। একই পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী, শহরে তাপ ও কার্বন নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে প্রকল্পটি বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ডের অর্থায়নে শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের হর্টিকালচার বিভাগের আওতায় বাস্তবায়নের কথা, আর প্রতিটি স্কুলের একজন কর্মী ও পাঁচজন শিক্ষার্থীকে ছাদবাগান রক্ষণাবেক্ষণের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা বলা হয়।
মশার শর্তটির পেছনে বাস্তব ঝুঁকি আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ২০২৫ সালের ২১ আগস্টের ডেঙ্গু তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, ডেঙ্গু ছড়ায় এডিস মশার মাধ্যমে, আর প্রতিরোধে পানি জমতে পারে এমন কৃত্রিম আধার সরিয়ে ফেলতে এবং ঘরে পানি রাখার পাত্র প্রতি সপ্তাহে ঢেকে রাখা, খালি করা ও পরিষ্কার করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ছাদবাগানের ক্ষেত্রে এর মানে হলো টব, ট্রে ও ড্রামে যেন পানি জমে না থাকে। গাছের রোগবালাই বা পোকামাকড় দেখা দিলে কোনো কীটনাশক ব্যবহারের আগে নিজের এলাকার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) কৃষি অফিসের পরামর্শ নেওয়া যায়।
নার্সারি কী, কীভাবে বাড়ল এই ব্যবসা
বাংলাপিডিয়ার সংজ্ঞা অনুযায়ী, নার্সারি হলো এমন প্রতিষ্ঠান বা জায়গা, যেখানে রোপণ বা বিক্রির জন্য বিভিন্ন ধরনের গাছ, ছোট চারা বা প্ল্যান্টলেটের বংশবিস্তার, উৎপাদন ও বিতরণ করা হয়। শুরুতে শব্দটি দিয়ে বোঝানো হতো মূল্যবান বনজ ও ফলদ গাছের চারা তৈরির জায়গা; উদ্যান ও শোভাবর্ধক গাছের প্রতি আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে ধারণাটি বিস্তৃত হয়েছে। আধুনিক নার্সারি এখন গাছের প্রজনন ও নতুন জাত উদ্ভাবনের কাজও করে এবং শৌখিন বাগানি, ফুল ও ফলচাষি, কৃষক ও বনকর্মীদের নির্দিষ্ট মানের বীজ ও চারা সরবরাহ করে।
বিশ্বকোষটি জানায়, বসতবাড়ির আশপাশে দরকারি গাছ লাগানো এ দেশে পুরোনো অভ্যাস হলেও নার্সারিতে চারা তৈরি তুলনামূলক নতুন। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি বন বিভাগ প্রথম শুধু বনজ গাছের নার্সারি গড়ে তোলে; পরে তা কিছু বাণিজ্যিক ফলগাছে সম্প্রসারিত হয়, তবে সরকারি পর্যায়েই সীমিত ছিল। বিংশ শতকের মাঝামাঝি উদ্যানের গাছের জন্য কিছু বেসরকারি নার্সারি গড়ে ওঠে, আর বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উদ্যান বিভাগ দেশের বিভিন্ন স্থানে নার্সারি স্থাপন করে। গাছের বিপুল চাহিদা এবং অর্থকরী গাছ লাগানোর সচেতনতা বাড়ায় আশির দশকের শুরুতে নার্সারির চর্চা গতি পায়।
বাংলাপিডিয়ায় নার্সারির সাধারণ গাছ হিসেবে যেগুলোর নাম আছে, দিয়াবাড়ির ক্রেতারাও সেগুলোই কিনে নিয়ে যাচ্ছিলেন: বনজ গাছের মধ্যে মেহগনি, শিশু, কড়ই, রেইনট্রি, নিম, আকাশমণি, সেগুন, গামারি, কদম, চাঁপা, পিতরাজ ও জারুল; ফলের মধ্যে আম, সফেদা, কাঁঠাল, লিচু, পেয়ারা, নারকেল, বরই, বেল ও পেঁপে; শোভাবর্ধক গাছের মধ্যে থুজা, অ্যারাউকেরিয়া, পাম ও কৃষ্ণচূড়া; মৌসুমি ও বহুবর্ষজীবী ফুলের মধ্যে ডালিয়া, কসমস, চন্দ্রমল্লিকা, গাঁদা, ফ্লক্স, গোলাপ, বাগানবিলাস, জবা ও নয়নতারা; আর সবজির মধ্যে টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, ক্যাপসিকাম, লাউ-কুমড়াজাতীয় সবজি, পুঁইশাক ও বেগুনের চারা। সরকারি নার্সারিগুলো ওষুধি গাছের চারাও তৈরি করে, আর বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে সেগুলো নিজেদের আঙিনায় লাগাতে উৎসাহ দেওয়া হয়।
রাষ্ট্রীয় বৃক্ষরোপণ অভিযানও এই বাজার গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। বাংলাপিডিয়ার সামাজিক বনায়ন ভুক্তি অনুযায়ী, বন বিভাগ ১৯৬২-৬৩ সালে রাজশাহী ও ঢাকায় দুটি বন সম্প্রসারণ বিভাগ গঠন করে এবং ১ জুন বৃক্ষরোপণ দিবস চালু করে; অভিযানটি পরে এক দিন থেকে এক সপ্তাহ, এক মাস এবং শেষে তিন মাসে বিস্তৃত হয়। পরবর্তী সময়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের অর্থায়নে নেওয়া ‘উপজেলা বনায়ন ও নার্সারি উন্নয়ন’ প্রকল্পের লক্ষ্যের মধ্যে ছিল উপজেলা কমপ্লেক্সে ৩৪৫টি নার্সারি স্থাপন এবং প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে উদ্যোক্তাদের ১০০টি বেসরকারি নার্সারি গড়তে সাহায্য করা।
বর্ষার বৃক্ষমেলা ও নার্সারির বর্ষপঞ্জি
শীতের বাইরে ঢাকার নার্সারিগুলোর সবচেয়ে বড় বিক্রির সময় বর্ষা, যখন বন বিভাগ জাতীয় বৃক্ষমেলার আয়োজন করে। প্রথম আলো ২০২৪ সালের জুলাইয়ে জানায়, মানুষের মধ্যে বৃক্ষরোপণে আগ্রহ তৈরি এবং চারা ও কৃষি উপকরণ সহজলভ্য করতে বন বিভাগ ১৯৯৪ সালে রাজধানীতে প্রথম বৃক্ষমেলা শুরু করে; প্রথম মেলাতেই ব্যাপক জনসমাগম হওয়ায় পরের বছর থেকে সারা দেশে মেলা শুরু হয়, আর জুন থেকে আগস্টের বর্ষা মৌসুমে বিভাগ, জেলা এমনকি অনেক উপজেলা পর্যায়েও মেলা হয়। আগারগাঁওয়ের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে ২০২৪ সালের মেলা ঈদুল আজহার কারণে সাধারণ এক মাসের বদলে ৩৯ দিন চলে। সেখানে স্টল ছিল ১১৮টি, যার ৭৫টি বেসরকারি নার্সারির; মেলার তথ্যকেন্দ্রের হিসাবে শেষ দিনের আগের দিন পর্যন্ত ৩০ লাখ ৫০ হাজার চারা বিক্রি হয়, যার দাম ১৬ কোটি টাকার বেশি। মেলায় এক নার্সারির ব্যবস্থাপক জানান, ছাদে লাগানোর উপযোগী ফলগাছ ও ঘর সাজানোর গাছই বেশি বিক্রি হয়েছে, আর ফলগাছের মধ্যে আমের চারা বিক্রি হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
২০২৫ সালের জাতীয় বৃক্ষমেলা সাধারণত বিশ্ব পরিবেশ দিবসে, ৫ জুন, শুরু হলেও ঈদুল আজহার ছুটির কারণে সেবার শুরু হয় ২৫ জুন; প্রতিপাদ্য ছিল ‘পরিকল্পিত বনায়ন করি, সবুজ বাংলাদেশ গড়ি’। মেলার তথ্যকেন্দ্রের দায়িত্বে থাকা বন বিভাগের সামাজিক বন বিভাগের একজন সমাজবিজ্ঞানী প্রথম আলোকে জানান, মেলায় ৯২টি বেসরকারি নার্সারি ও ৬টি সরকারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয় এবং ২৫ জুলাই শুক্রবার পর্যন্ত ১৪ লাখ ৭৮ হাজার ৬৩২টি চারা বিক্রি হয়, যার মূল্য প্রায় ১২ কোটি ৭৪ লাখ ৮৬ হাজার ১৪৬ টাকা; ২০২৪ সালে একই সময়ে বিক্রি হয়েছিল ৩১ লাখ ৮৫ হাজার ৯৯৩টি চারা, যার মূল্য ছিল ১৬ কোটি ২৮ লাখ টাকার বেশি। আয়োজকেরা বিক্রি কমার একটি কারণ হিসেবে দেরিতে মেলা শুরু হওয়ার কথা বলেন। মেলায় অনেকেই এসেছিলেন ছাদবাগানের জন্য চারা কিনতে। বর্ষার ফল ও বনজ চারার এই বেচাকেনা এবং এরপর শীতের ফুলের চারার যে ব্যস্ততার কথা দিয়াবাড়ির শ্রমিকেরা বলেছেন, এই দুই মিলেই নার্সারির বছর গড়ে ওঠে।
দেশের ফুলচাষ ও সবুজ নগর
বাংলাপিডিয়ার ভাষ্যে বাংলাদেশে শৌখিন ও বাণিজ্যিক, দুই ধরনের ফুলচাষই এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে। এ খাতের ব্যবসার মধ্যে আছে কাটা ফুল, পাতাবাহার গাছ, শোভাবর্ধক গাছের বংশবিস্তারের উপকরণ এবং গ্রোয়িং মিডিয়া ও টবের মতো উৎপাদন উপকরণ। পাতাবাহার, কাটা ফুল ও মৌসুমি ফুলের বীজের চাহিদা ধীরে ধীরে বাড়ছে; সীমিত পরিমাণ গোলাপ ও রজনীগন্ধা মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপে রপ্তানি হয়, আর দেশি ও সম্ভাব্য রপ্তানি চাহিদা মেটাতে বেসরকারি নার্সারি গড়ে উঠছে। কাটা ফুলের ব্যবসার শুরু মাজার ও পবিত্র স্থানের আশপাশে ভক্তদের কাছে ফুল বিক্রির মধ্য দিয়ে; স্বাধীনতার পর সাধারণ মানুষের মধ্যে কাটা ফুল জনপ্রিয় হতে থাকে, আর রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের চাহিদা মেটাতে কৃষকেরা বাণিজ্যিকভাবে ফুলচাষ শুরু করেন। বাণিজ্যিক ফুলচাষ এগিয়ে নিতে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) একটি ফুল গবেষণা কেন্দ্র চালু করেছে।
জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, দিয়াবাড়ি শুধু ব্যবসার কেন্দ্র নয়, নগরের সবুজায়নেরও এক প্রধান উৎস। বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রকল্প, সড়ক উন্নয়ন, স্কুল-কলেজ, অফিস, শপিং মল ও পার্কে ব্যবহৃত গাছের বেশির ভাগ এখান থেকেই যায়। ঢাকার সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায়ও নার্সারিগুলো ভূমিকা রাখছে; গাছ বাতাস শুদ্ধ করে, তাপমাত্রা কমায় এবং পাখিদের আশ্রয় দেয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, নগরজীবনের চাপ, ক্লান্তি ও অস্থিরতার মধ্যে শহরের ভিড় ও ধুলো থেকে মুক্ত হয়ে সবুজের ছোঁয়া পেতে, জানা-অজানা নানা গাছের সঙ্গে পরিচিত হতে এবং মানসিক প্রশান্তির খোঁজে বহু মানুষ দিয়াবাড়ির শতাধিক নার্সারিতে ছুটে আসেন।
ছবি: Tarunsamanta / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, বাংলাপিডিয়া, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা





মন্তব্য
(০)