কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় প্রায় বিলীন হয়ে যাওয়া চকরিয়া সুন্দরবন ফেরানোর আশা জাগাচ্ছে বাইনগাছ। প্রথম আলোর প্রতিবেদক মোস্তফা ইউসুফের বিশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করা এই ম্যানগ্রোভ প্রজাতির টিকে থাকার হার সন্তোষজনক, আর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জোয়ার-ভাটার প্রবাহ ফিরিয়ে আনাসহ চারটি বিষয় নিশ্চিত করা গেলে বনটির প্রাণবৈচিত্র্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
মাতামুহুরী নদীর কোল ঘেঁষা চকরিয়া সুন্দরবন ছিল উপমহাদেশের প্রাচীন শ্বাসমূলীয় বনগুলোর একটি; ১৯০৩ সালে এটি সংরক্ষিত বন ঘোষিত হয়। গত শতকের পঞ্চাশের দশকে বনটি প্রায় ২১ হাজার ১০২ একরজুড়ে ছিল। পরে চার হাজার একর বন বিভাগের অধীনে রেখে বাকি অংশ চিংড়ি চাষের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংস্থাকে ইজারা দেওয়া হয়। সংঘবদ্ধ দখল ও ভুল নীতিতে বনটি এখন প্রায় বিলীন—টিকে আছে মাত্র একটি গাছ।
গত বছরের জুলাই থেকে বেসরকারি সংস্থা কোডেক (কমিউনিটি ডেভেলপমেন্ট সেন্টার) বনের অংশ বদরখালী চ্যানেলে ২৫ একর জমিতে ৮০ হাজার বাইনগাছ রোপণ করে; সংস্থাটির হিসাবে গাছগুলোর টিকে থাকার হার সন্তোষজনক। চলতি বছরের জুনে রামপুরা মৌজায় আরও ২৫ একরে ৪০ হাজার বাইনগাছ লাগানো হয়েছে। চলতি মাসের ১০ তারিখে বন বিভাগ বনায়নের স্থান চিহ্নিত করে দিয়েছে এবং গাছ রক্ষায় নিয়মিত পাহারার আশ্বাস দিয়েছে। কোডেক ছাড়া আরণ্যক ফাউন্ডেশনও ম্যানগ্রোভ চারা লাগাচ্ছে।
কোডেকের প্রকল্প কর্মকর্তা শীতল কুমার নাথ বলেন, বদরখালী চ্যানেলে লাগানো প্রজাতিগুলোর মধ্যে বাইনগাছই সবচেয়ে ভালো ফল দেখিয়েছে। তবে ‘চকরিয়া সুন্দরবনে চিংড়িঘেরের অনেক বাঁধ আছে। এর কারণে জোয়ার-ভাটার প্রবাহ এখানে আসে না। এটা কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়, সেটা ভাবতে হবে,’ বলেন তিনি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্সের অধ্যাপক খালেদ মিসবাহুজ্জামান ২০১৪ সালে ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব ইকোলজিতে প্রকাশিত গবেষণায় ২৪০টি ম্যানগ্রোভ চারা তিন মাস পর্যবেক্ষণ করে দেখেছিলেন, সাদা বাইন ও মরিচা বাইনের বেঁচে থাকার হার অন্য প্রজাতির চেয়ে বেশি। তাঁর মতে, চারটি বাধা পেরোতে হবে: ম্যানগ্রোভকে ব্যবসার হুমকি মনে করা ইজারাদারদের অনীহা, পোল্ডার ও চিংড়িঘেরের বাঁধে আটকে থাকা জোয়ার-ভাটা, চার দশকের লবণ ও চিংড়ি চাষে নষ্ট হওয়া মাটির গুণাগুণ এবং পানিপ্রবাহের বদলে যাওয়া গতিপথ।
গত ১০ আগস্ট বনটি পরিদর্শন করে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, বিভিন্ন সংস্থাকে ইজারা দেওয়ার পরও বন বিভাগের নামে চার হাজার একর বনভূমি রেকর্ডভুক্ত আছে; মৎস্য, কৃষি ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের ইজারা দেওয়া জমির সীমানা চিহ্নিত না হওয়ায় ইজারাগ্রহীতারা বন বিভাগের জমিও দখল করেছেন। ‘আমাদের প্রথম লক্ষ্য আগে বন বিভাগের নামে থাকা বনভূমি উদ্ধার করা,’ বলেন তিনি; এরপর ধাপে ধাপে অন্য ইজারা বাতিল ও জীববৈচিত্র্য ফেরানোর পরিকল্পনা নেওয়া হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, সরকার ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করছে; এর মধ্যে চকরিয়া সুন্দরবন ফেরাতে পারলে তা হবে অনন্য অর্জন, আর সে জন্য দরকার জবরদখল উচ্ছেদে সমন্বিত উদ্যোগ ও বিশেষজ্ঞদের নিয়ে ধাপে ধাপে কর্মপরিকল্পনা। প্রতিবেদনে ইউএনইপির বরাতে বলা হয়, ঝড়-জলোচ্ছ্বাস থেকে উপকূল রক্ষা ও মৎস্যসম্পদ রক্ষায় ম্যানগ্রোভের ভূমিকা রয়েছে, আর ভিয়েতনাম মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে প্রজাতি বাছাইয়ের মাধ্যমে ১৯৯৬ সালের মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার একর কান জিও ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধার করেছে।
সূত্র: প্রথম আলো — প্রতিবেদন: মোস্তফা ইউসুফ, প্রথম আলো




মন্তব্য
(০)