বরিশালের উজিরপুর, ধামুরা, আগৈলঝাড়া ও আশপাশের বিস্তীর্ণ বিলে বর্ষার পানি বাড়লেই প্রাকৃতিকভাবে ফুটতে শুরু করে শাপলা। ভোরের আলো ফোটার আগেই নৌকা নিয়ে বিলে নামেন সংগ্রহকারীরা। পানি থেকে তুলে আনা শাপলা তীরে বসে আঁটি বাঁধা হয়, তারপর তা যায় গ্রামের হাটে; সেখান থেকে দূরের বাজার, এমনকি ঢাকার খাবার টেবিলেও।
সাধারণ ফসলের মতো শাপলার জন্য জমি চাষ, বীজ বপন, সার বা নিয়মিত পরিচর্যা লাগে না। স্থানীয় কৃষিসংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, পানি নেমে গেলেও মাটিতে শাপলা-শালুকের বীজ থেকে যায়, পরে পানি জমলে তা থেকে আবার নতুন গাছ জন্মায়। উৎপাদন খরচ না থাকলেও সংগ্রহ, আঁটি বাঁধা, পরিবহন ও বিক্রিতে লাগে মানুষের শ্রম আর সময়।
কাজটি সাধারণত পরিবারের সবাই মিলে করেন। পুরুষ সদস্য নৌকা চালিয়ে বিলের ভেতরে গিয়ে শাপলা তোলেন, নারীরা তীরে বসে গুছিয়ে আঁটি বাঁধেন, অনেক সময় স্কুলপড়ুয়া শিশুরাও হাত লাগায়। জ্যৈষ্ঠ থেকে কার্তিক পর্যন্ত বিলে পানি থাকলেও ভাদ্র, আশ্বিন ও কার্তিক, এই তিন মাসে শাপলা সবচেয়ে বেশি মেলে। মাঠে কাজ কমে গেলে কৃষক পরিবার, আর নিয়মিত কাজের নিশ্চয়তা নেই এমন ভূমিহীন শ্রমজীবীরাও এ সময় শাপলা তুলে আয় করেন; এর জন্য জমির মালিকানা বা বড় পুঁজি লাগে না।
দাম অবশ্য শ্রমের তুলনায় কম। স্থানীয় হাটে প্রতিটি আঁটি বিক্রি হয় প্রায় ৮ থেকে ১০ টাকায়, প্রতিটি আঁটিতে থাকে আনুমানিক ৩০ থেকে ৪০টি শাপলা। পাইকার ও সবজি ব্যবসায়ীরা সেগুলো কিনে দূরের বাজারে নিলে পরিবহনসহ অন্যান্য খরচ যোগ হয়ে দাম দাঁড়ায় ১২ থেকে ১৫ টাকা। এই ব্যবধানের পেছনে আছে পরিবহন ব্যয়, বাজারের দূরত্ব, সরবরাহের পরিমাণ আর মধ্যস্বত্বভোগীদের হিসাব।
উজিরপুরের ৬০ বছর বয়সী হারুন মিয়ার স্ত্রী ও চার ছেলে-মেয়ের সংসার চলে তাঁর নিজের শ্রমে। মাথায় শাপলার আঁটি নিয়ে হাটে যাওয়ার পথে তিনি বলেছিলেন, ক্ষেতে কাজ না থাকলে বিলে শাপলা তোলেন, আর বিলে শাপলা ছিল বলেই চুলায় হাঁড়ি চড়েছে। তাঁর ভাষায়, 'এই শাপলাই আমাগো সম্বল।'
তবে এ আয় মৌসুমনির্ভর। পানি কমে গেলে বা শাপলা কমে এলে কাজের সুযোগও কমে যায়, আর দ্রুত পচনশীল হওয়ায় সময়মতো বাজারে পৌঁছানো জরুরি। প্রতিবেদকের মতে, সংগ্রহকারীদের জন্য স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠিত বাজার, ক্রেতা-বিক্রেতার সরাসরি যোগাযোগ, পরিবহন খরচ কমানো এবং স্বাস্থ্যসম্মত সংগ্রহ ও সংরক্ষণের প্রশিক্ষণ এই পরিবারগুলোর আয় বাড়াতে পারে। শাপলা যেহেতু জলাভূমিনির্ভর, বিল, খাল ও প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ রক্ষা না করলে এই জীবিকাও টিকবে না।
প্রতিবেদনটি জাগো নিউজ ২৪-এর জন্য লিখেছেন খায়রুল বাশার আশিক।
ছবি: লালমনিরহাটের একটি গ্রামে শাপলা, Newaj150 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪





মন্তব্য
(০)