২০১৯ সালের ১৪ মে বিবিসি বাংলা জানায়, এমন দিন হয়তো আর বেশি দূরে নয়, যখন দোকানে কৃত্রিম মাংসের খাবার বিক্রি হবে, যা দেখতে, গন্ধে ও স্বাদে আসল মাংসের মতো এবং যা থেকে আসল মাংসের মতোই 'রক্ত' বেরোয়। কিছু দেশে 'মিট-ফ্রি' বা মাংসমুক্ত খাবার সহজলভ্য হয়ে ওঠায় বিশেষজ্ঞরা এমন কথাই বলছিলেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মানুষের খাদ্যাভ্যাস পরিবেশ ও স্বাস্থ্যের ওপর কী প্রভাব ফেলছে, তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছিল, আর নিরামিষ খাবারের প্রতি মানুষের আগ্রহও বাড়ছিল। মাংসজাত নানা খাবারের ভেগান বা উদ্ভিদভিত্তিক সংস্করণ, যেমন ভেগান সসেজ-রোল ও ভেগান বার্গার, তখন বাজারে আসছিল।
উদ্ভিদের প্রোটিনে 'মাংস', বিটের রসে 'রক্ত'
বিবিসির বর্ণনায়, এসব 'নিরামিষ মাংস' দেখতে চিরাচরিত মাংসের মতো, এর গন্ধ ও স্বাদও আসল মাংসের মতো। এগুলো তৈরি হচ্ছিল উদ্ভিজ্জ প্রোটিন থেকে, সাধারণত গম, মটরশুঁটি বা আলু থেকে। আর এই মাংসের 'রক্ত' তৈরি হচ্ছিল বিটের রস দিয়ে।
গরুর মাংসের রং ও স্বাদ আসে 'হেম' নামের একটি প্রাণিজ উপাদান থেকে। বিবিসি বাংলা জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ইম্পসিবল ফুডস উদ্ভিজ্জ হেম তৈরি করেছে, যা কৃত্রিম মাংসকে আসল মাংসের চেহারা এনে দেবে বলে প্রতিষ্ঠানটি মনে করে।

ইম্পসিবল ফুডসের হেম আসে সয়াবিনের শিকড়ের গুটি থেকে
মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) কাছে জমা দেওয়া নথিতে ক্যালিফোর্নিয়ার রেডউড সিটির প্রতিষ্ঠান ইম্পসিবল ফুডস জানায়, তাদের ব্যবহৃত উপাদানটি সয় লেগহিমোগ্লোবিন নামের একটি প্রোটিন। এটি সয়াবিন গাছের শিকড়ের গুটিতে (নডিউল) পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটি এই প্রোটিন তৈরি করে পিকিয়া পাস্তোরিস নামের একটি ইস্টের সাহায্যে, এবং গরুর মাংসের বিকল্প পণ্যে স্বাদ আনতে তাতে সর্বোচ্চ ০.৮ শতাংশ সয় লেগহিমোগ্লোবিন প্রোটিন যোগ করার কথা জানায়। প্রতিষ্ঠানের ভাষ্য, রান্না ও হজমের পর এই প্রোটিন এবং প্রাণীর মাংসের মায়োগ্লোবিন একই ধরনের হেম অণু ছাড়ে।
এফডিএর তালিকা অনুযায়ী, ২০১৮ সালের ২৩ জুলাই সংস্থাটি জানায়, নির্ধারিত ব্যবহারে উপাদানটি সাধারণভাবে নিরাপদ বলে ইম্পসিবল ফুডস যে সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে, তা নিয়ে এফডিএর কোনো প্রশ্ন নেই। একই সঙ্গে সংস্থাটি উল্লেখ করে, কিছু ব্যবহারের ক্ষেত্রে রং-সংযোজক (কালার অ্যাডিটিভ) হিসেবে আলাদা তালিকাভুক্তির প্রয়োজন হতে পারে।


গবেষণাগারে প্রাণীর কোষ থেকে মাংস
বিবিসি বাংলা জানায়, বিজ্ঞানীরা তখন গবেষণাগারে প্রাণীর স্টেম সেল থেকেও মাংস তৈরি করছিলেন। তাঁদের লক্ষ্য এমন মাংস, যা রান্না করা বা খাওয়ার সময় আসল মাংস থেকে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব হবে।
এই পথের প্রথম বড় প্রদর্শনী হয়েছিল ২০১৩ সালের ৫ আগস্ট লন্ডনে। বিবিসি নিউজের সেদিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেদারল্যান্ডসের মাস্ট্রিখট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মার্ক পোস্টের দল গরুর পেশির টিস্যু থেকে নেওয়া স্টেম সেল গবেষণাগারে বাড়িয়ে ছোট ছোট পেশির ফালি তৈরি করে এবং সেগুলো জুড়ে একটি প্যাটি বানায়। এক সংবাদ সম্মেলনে সেটি রান্না করে খাদ্য সমালোচকদের খেতে দেওয়া হয়। গবেষণার ২ লাখ ১৫ হাজার পাউন্ড (৩ লাখ ৩০ হাজার ডলার) দিয়েছিলেন গুগলের সহপ্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন। সেই বার্গারও বিটের রস দিয়ে লাল করা হয়েছিল।

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বলা হয়, 'জাস্ট' নামের একটি প্রতিষ্ঠান আশা করছিল, ২০১৯ সাল শেষ হওয়ার আগেই তারা যুক্তরাষ্ট্রের সুপারস্টোরে গবেষণাগারে তৈরি মুরগির মাংস আনতে পারবে, তবে এর জন্য এফডিএর অনুমতি লাগবে। তার কয়েক সপ্তাহ আগে, ২০১৯ সালের ৭ মার্চ, মার্কিন কৃষি বিভাগের খাদ্য নিরাপত্তা ও পরিদর্শন সেবা (এফএসআইএস) ও এফডিএ গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির কোষ থেকে তৈরি মানুষের খাবার যৌথভাবে তদারকির একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি ঘোষণা করে। এতে কোষ সংগ্রহ, কোষ ব্যাংক এবং কোষের বৃদ্ধি দেখার দায়িত্ব এফডিএর, আর কোষ তোলার পর্যায় থেকে উৎপাদন ও লেবেলিং দেখার দায়িত্ব এফএসআইএসের।
বিবিসি বাংলা আরও জানায়, পাশ্চাত্যের কিছু সুপারস্টোরে তখন মাংসমুক্ত খাবারের আলাদা শাখা দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু গবেষণাগারে তৈরি মাংসের খাবার তখনও দোকান বা রেস্তোরাঁয় পৌঁছায়নি, কয়েক বছরের মধ্যে তা পাওয়া যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। অনুমতি মিললেও এমন মাংস নিয়ে মানুষের বিরূপ ধারণা বা 'ছি ছি' করে ওঠার প্রবণতা বড় বাধা হবে বলে অনেকে মনে করছিলেন।
বিকল্প মাংস খোঁজার পেছনে পরিবেশের হিসাব
খাদ্যাভ্যাসের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে যে উদ্বেগের কথা বিবিসি বলেছে, তার একটি হিসাব পাওয়া যায় জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ২০১৩ সালের মূল্যায়ন 'ট্যাকলিং ক্লাইমেট চেঞ্জ থ্রু লাইভস্টক'-এ। এফএও জানায়, প্রাণিসম্পদ খাত থেকে বছরে আনুমানিক ৭.১ গিগাটন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়, যা মানুষের কর্মকাণ্ডে সৃষ্ট নির্গমনের ১৪.৫ শতাংশ। এই খাতের নির্গমনের ৪১ শতাংশ আসে গরুর মাংস এবং ২০ শতাংশ গরুর দুধ উৎপাদন থেকে।
ছবি: Missvain / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, মার্কিন খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ), মার্কিন কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ), বিবিসি নিউজ, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও)





মন্তব্য
(০)