বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অধ্যুষিত এলাকায় প্রতি বছরই আগাম বন্যা ও বাঁধ ভেঙে তলিয়ে যায় শত শত হেক্টর জমির আধাপাকা বোরো ধান। ফসল ঘরে তোলার আগেই পানি ঢুকে পড়ায় অনেকটা নিয়মিতভাবেই আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন এ অঞ্চলের কৃষক। এ অবস্থায় আগাম বন্যা থেকে কৃষকের ধান রক্ষায় হাওর অঞ্চলের ১৩টি নদী ড্রেজিংয়ের একটি প্রকল্প হাতে নিচ্ছে সরকার। ২০২৬ সালের মে মাসে প্রস্তাবিত এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (বাপাউবো), আর বাস্তবায়নের আগে এটি পর্যালোচনা করেছে পরিকল্পনা কমিশন।
প্রকল্পের মূল কথা
প্রস্তাবিত এ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে এক হাজার ৪২৯ কোটি টাকা। প্রতি ঘনমিটার মাটি অপসারণে প্রায় ১৯৩ টাকা ব্যয় হিসাব করা হয়েছে। 'হাওর অঞ্চলের আগাম বন্যা ও সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন (১ম পর্যায়)' শীর্ষক এই প্রকল্পের আওতায় ১৩টি নদী ড্রেজিং, খাল পুনঃখনন এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। এর মাধ্যমে এক লাখ ৬৫ হাজার ২৩০ হেক্টর কৃষিজমি আগাম বন্যা থেকে সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব হবে বলে ধরা হয়েছে।
সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৯ সালের জুন পর্যন্ত। কার্যক্রম পরিচালিত হবে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার ১৬টি উপজেলায়। পরিকল্পনা কমিশন জানায়, প্রকল্পের আওতায় ৩০৩ দশমিক ৫৮ কিলোমিটার নদী ড্রেজিং বাবদ খরচ ধরা হয়েছে এক হাজার ২৪৬ কোটি ৭০ লাখ টাকা। পাশাপাশি প্রকল্পের আওতায় এক হাজার হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতিপূরণ বাবদ ২৫ কোটি টাকার সংস্থান রাখা হয়েছে।
ড্রেজিংয়ের মূল লক্ষ্য একটাই, আর তা হলো পলি ও বালু জমে ভরাট হয়ে যাওয়া নদীগুলোর তলদেশ খনন করে পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, যাতে পাহাড় থেকে নেমে আসা আগাম বন্যার পানি দ্রুত ভাটির দিকে সরে যেতে পারে। পানি দ্রুত নামলে বোরো ধান ঘরে তোলার আগ পর্যন্ত ফসল রক্ষাকারী বাঁধগুলো টিকে থাকার সম্ভাবনা বাড়ে।
কোন কোন নদী খনন হবে
প্রকল্পের আওতায় যে ১৩টি নদী খনন করা হবে সেগুলো হলো সুরমা, বাউলাই, ধনু, ঘোড়াউত্রা, আপার মেঘনা, পুরাতন সুরমা, দাড়াইন, চামতি, সোমেশ্বরী, কাউনাই, বাউলাই-পাটনাই, গাং ও আবুয়া। এসব নদীর মধ্যে ৮টি সুনামগঞ্জে এবং ৫টি কিশোরগঞ্জে অবস্থিত।
বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড জানায়, বর্তমান পর্যায়ে ড্রেজিংয়ের জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে তিনটি রিভার সিস্টেম খনন করা হবে। এগুলো হলো সুরমা-বাউলাই-আপার মেঘনা রিভার সিস্টেম, পুরাতন সুরমা রিভার সিস্টেম এবং আবুয়া-পাটনাই-কাউনাই রিভার সিস্টেম। এসব সিস্টেমের আওতায় ১৩টি নদী ড্রেজিং, খাল পুনঃখনন এবং পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নের মাধ্যমে এক লাখ ৬৫ হাজার ২৩০ হেক্টর কৃষিজমি সুরক্ষার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন, জনগণের মতামত যাচাই এবং হাওরাঞ্চলের পানি নিষ্কাশন সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে এসব নদী ড্রেজিং নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। অর্থাৎ, কোথায় কতটুকু খনন হবে তা চূড়ান্ত হবে স্থানীয় ভূপ্রকৃতি ও পানিপ্রবাহের ধরন বিবেচনায় নিয়ে।
হাওর কী এবং কেন ফসল ঝুঁকিতে
হাওর হলো বাটির মতো এক ধরনের নিচু ভূগঠন, যেখানে নদী ও খালের পানি এসে জমা হয়। বর্ষায় এটি বিশাল জলরাশিতে পরিণত হয় আর শুষ্ক মৌসুমে অনেকটাই শুকিয়ে যায়। সংস্কৃত 'সাগর' শব্দ থেকে স্থানীয় উচ্চারণে এসেছে 'হাওর' নামটি। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, হাওরগুলো মূলত বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে অবস্থিত; এই অববাহিকার উত্তরে মেঘালয় পাহাড়, দক্ষিণে ত্রিপুরা ও মিজোরাম পাহাড় এবং পূর্বে মণিপুরের উঁচু ভূমি।
পুরো সুনামগঞ্জ জেলা, হবিগঞ্জের বেশির ভাগ অংশ, সিলেট সদর উপজেলার কিছু অংশ ও মৌলভীবাজার জেলা নিয়ে এই হাওরাঞ্চল বিস্তৃত। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে সেখানে প্রায় ৪৭টি বড় হাওর এবং কমবেশি ৬ হাজার ৩০০টি বিল রয়েছে; এর মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি স্থায়ী এবং প্রায় ২ হাজার ৮০০টি মৌসুমি। বর্ষায় ভারতের পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীর পানিতে এসব এলাকায় প্রায় ৬ মিটার পর্যন্ত গভীর বন্যা হয় এবং সমতল এলাকা বছরে প্রায় সাত থেকে আট মাস পানির নিচে থাকে। হাওর মূলত মেঘনা নদীব্যবস্থার একটি প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে কাজ করে।
শুষ্ক মৌসুমে পানি সরে গেলে উন্মুক্ত পলিমাটিতে ধান চাষ হয়; এ কারণেই হাওর মূলত এক-ফসলি বোরো ধানের এলাকা। কিন্তু ঠিক এই বোরো ধান কাটার ঠিক আগে, অর্থাৎ বৈশাখের শুরুতে, আগাম বন্যার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি থাকে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের চেরাপুঞ্জিতে পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপাত হয়; সেই পাহাড়ি এলাকার বিপুল পরিমাণ বৃষ্টির পানি খুব দ্রুত ধেয়ে আসে সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের হাওরে। ফলে ধান পাকার আগেই তা তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়।

কেন আগাম বন্যার পানি ধীরে নামে
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী (সুনামগঞ্জ পওর বিভাগ-২) মো. ইমদাদুল হক জাগো নিউজকে বলেন, হাওরের ১৩টি নদী ড্রেজিং করলে আগাম বন্যা থেকে কৃষকের ধান রক্ষা করা সম্ভব হবে। তিনি বলেন, উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওর অধ্যুষিত সুনামগঞ্জ জেলাকে বাংলাদেশের শস্যভান্ডার বলা হয়; এই এলাকার অর্থনীতি মূলত ধান ও মাছ উৎপাদননির্ভর।
ইমদাদুল হক ব্যাখ্যা করেন, সুনামগঞ্জ জেলার উত্তরে ভারতের মেঘালয় ও আসাম রাজ্য। এই অঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় প্রচুর বৃষ্টি হয়। সেই বৃষ্টির পানি ভারতের বিভিন্ন নদী দিয়ে সুনামগঞ্জে প্রবেশ করে এবং সুরমা ও কুশিয়ারা নদী হয়ে মেঘনায় পড়ে। সুরমা ও কুশিয়ারাসহ অন্যান্য নদীর তলদেশ পলি ও বালু জমে ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা কমে গেছে। এতে ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা আকস্মিক বন্যার পানি নিষ্কাশন হতে অতিরিক্ত সময় লাগে।
তিনি বলেন, 'আকস্মিক বন্যার পানি নিষ্কাশনে বিলম্বের ফলে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃক নির্মিত বোরো ফসল রক্ষাকারী ডুবন্ত বাঁধ ভেঙে হাওরের ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এছাড়া প্রতি বছর হাওরের পানি নিষ্কাশন বিলম্বের কারণে বোরো ধানের বীজতলা প্রস্তুত ও চারা রোপণের সময়ও কমে আসে। এ অবস্থায় হাওর অঞ্চলে নদ-নদী ড্রেজিংয়ের মাধ্যমে নিষ্কাশন ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ অন্তর্বর্তী খালগুলো খনন করা প্রয়োজন।'
ডুবন্ত বাঁধ হলো হাওরের ফসল রক্ষার বিশেষ ব্যবস্থা। এগুলো নিচু করে তৈরি করা হয়, যাতে বর্ষার পূর্ণ বন্যায় পানির নিচে ডুবে যায়; এর কাজ কেবল বোরো ধান কাটার আগ পর্যন্ত আগাম বন্যার পানি ঠেকিয়ে রাখা। কিন্তু নদী ভরাট হয়ে পানি দেরিতে নামলে এসব বাঁধের ওপর চাপ বাড়ে, আর বাঁধ ভাঙলে এক রাতেই গোটা হাওরের ফসল তলিয়ে যেতে পারে।

পরিকল্পনা কমিশনের পর্যালোচনা
সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনে প্রকল্পটি নিয়ে সভা করে প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি)। পরিকল্পনা কমিশনের কৃষি, পানিসম্পদ ও পল্লি প্রতিষ্ঠান বিভাগের সদস্য (সচিব) মো. মাহমুদুল হোসাইন খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এ সভায় প্রকল্পটি পর্যালোচনা করা হয়। সভায় প্রকল্পের বেশ কিছু বিষয়ে সাময়িকভাবে প্রশ্ন তোলা হয়; তবে সেসব খাতে ব্যয়ের কারণ উল্লেখ করে বাপাউবো।
পিইসি সভায় প্রকল্পে ১২টি মোটরসাইকেল বাবদ ১৬ লাখ ৮০ হাজার টাকার সংস্থান রাখার যৌক্তিক কারণ জানতে চাওয়া হয়। এ সময় বাপাউবোর প্রতিনিধি বলেন, তিন জেলায় প্রকল্পের কার্যক্রম পরিচালনার সুবিধার্থে ১২টি মোটরসাইকেলের সংস্থান রাখা প্রয়োজন। এ বিষয়ে সভায় সবাই একমত হন।
প্রস্তাবিত প্রকল্পে একটি অনাবাসিক ভবন (পরিদর্শন বাংলো) নির্মাণ বাবদ ২ কোটি টাকা এবং ৫টি অনাবাসিক ভবন মেরামত বাবদ ৮০ লাখ টাকার সংস্থান রাখা হয়েছিল। এর প্রয়োজনীয়তা জানতে চাওয়া হলে বাপাউবোর প্রতিনিধি বলেন, ৫টি ভবন মেরামতের সংস্থান বাদ দিয়ে একটি অনাবাসিক ভবন (পরিদর্শন বাংলো) নির্মাণের সংস্থান রাখা প্রয়োজন। এ বিষয়েও সবাই একমত হন।
পরিকল্পনা কমিশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, জাগো নিউজকে বলেন, প্রকল্পের ব্যয় যৌক্তিকভাবে কমানোর জন্য আগে গঠিত একটি কমিটি সুনামগঞ্জের হাওর এলাকা পরিদর্শন করে। পরে হাওরের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় চেইনেজ ও আউটলেটের অবস্থান এবং পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রয়োজনীয় খাল চিহ্নিত করা হয়। তিনি বলেন, প্রকল্পের ডিপিপিতে ড্রেনেজ আউটলেট নির্মাণ এবং খাল পুনঃখনন কাজ অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে সবাই একমত হয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, সভায় সবার সিদ্ধান্তের আলোকে প্রকল্পের প্রতিটি খাতের যৌক্তিক ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনা: তিন জেলার হাওর
প্রকল্পের কাজ হবে তিন জেলার ১৬টি উপজেলায়। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জ জেলার আয়তন ৩ হাজার ৫২৬ দশমিক ১২ বর্গকিলোমিটার; ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৩ লাখ ৭৫ হাজার। জেলাটি ১৯৮৪ সালে পূর্ণাঙ্গ জেলায় উন্নীত হয় এবং এতে ১১টি উপজেলা রয়েছে। জেলার প্রধান নদীগুলো সুরমা, কুশিয়ারা ও জাদুকাটা। এখানে পরিবারের আয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশই আসে কৃষি থেকে, যা হাওরনির্ভর অর্থনীতির চিত্রই তুলে ধরে। প্রকল্পের ১৩টি নদীর মধ্যে ৮টিই এই জেলায়।
কিশোরগঞ্জ জেলার আয়তন ২ হাজার ৬৮৮ দশমিক ৫৯ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ২৯ লাখ (২০১১)। জেলায় ১৩টি উপজেলা রয়েছে। জেলার নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে পুরাতন ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, কালনী, ঘোড়াউত্রা ও ধনু; এখানে কৃষি থেকে আসে পরিবারের আয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ। ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম, কিশোরগঞ্জের এই উপজেলাগুলো দেশের অন্যতম বড় হাওরাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। প্রকল্পের ১৩টি নদীর বাকি ৫টি এই জেলায়।
নেত্রকোনা জেলার আয়তন ২ হাজার ৭৯৪ দশমিক ২৮ বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা প্রায় ২২ লাখ ৩০ হাজার (২০১১)। জেলায় ১০টি উপজেলা রয়েছে। জেলার নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে ধনু, ধলাই, ঘোড়াউত্রা, পিয়াইন, গুনাই ও সোমেশ্বরী। এখানে পরিবারের আয়ের প্রায় ৭২ শতাংশই আসে কৃষি থেকে, যা তিন জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ। প্রকল্পের তালিকায় থাকা সোমেশ্বরী নদী এ জেলার উজানের একটি গুরুত্বপূর্ণ নদী। তিন জেলার এই কৃষিনির্ভরতা থেকেই বোঝা যায়, হাওরের বোরো ধান রক্ষা কেন স্থানীয় অর্থনীতির জন্য এত জরুরি।
হাওরের একফসলি অর্থনীতি ও প্রাণবৈচিত্র্য
হাওরে কেন একটি ফসল রক্ষা এত গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝা যায় এ অঞ্চলের অর্থনীতির দিকে তাকালে। সুনামগঞ্জের বিখ্যাত টাঙ্গুয়ার হাওরকে উদাহরণ ধরা যায়। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ধর্মপাশা ও তাহিরপুর উপজেলার ১০টি মৌজা জুড়ে বিস্তৃত এই হাওরের আয়তন প্রায় ১০০ বর্গকিলোমিটার, এর মধ্যে জলাভূমি প্রায় ২ হাজার ৮০২ দশমিক ৩৬ হেক্টর, আর ছোট-বড় বিলের সংখ্যা ১২০টি। এখানে বছরে একটিই ফসল হয় এবং অধিকাংশ বাসিন্দাই ভূমিহীন বা প্রান্তিক কৃষক; মৌসুমি বেকারত্ব এখানে তীব্র। তবে মাটি উর্বর হওয়ায় একফসলেই ফলন ভালো হয়।
হাওর কেবল ধানের নয়, মাছেরও বড় উৎস। টাঙ্গুয়ার হাওরের ভেতরেই রয়েছে ৪৬টি গ্রাম, আর এখানে ১৪০টির বেশি মিঠাপানির মাছের প্রজাতি পাওয়া যায়, যার মধ্যে আছে আইড়, গাং মাগুর, বাইম, টেংরা ও গুলশা। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯-২০০০ অর্থবছরে শুধু হাওরের মৎস্যসম্পদ থেকেই সরকার প্রায় ৭০ লাখ ৭৩ হাজার টাকা রাজস্ব পেয়েছিল। শীতে এখানে প্রায় ২০০ প্রজাতির পরিযায়ী পাখি অস্থায়ী আশ্রয় নেয়। এ কারণেই পানি উন্নয়ন বোর্ডের প্রকৌশলীর ভাষায় হাওর এলাকার অর্থনীতি মূলত ধান ও মাছ উৎপাদননির্ভর।
পরিবেশগত গুরুত্ব বিবেচনায় সরকার টাঙ্গুয়ার হাওরকে রামসার কনভেনশনের আওতায় 'রামসার এলাকা' হিসেবে ঘোষণা করে আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এখানে হিজল, করচ ও নলখাগড়ার মতো বিপন্ন জলাভূমির গাছ টিকে আছে, আর পরিবেশের ক্ষতি করে এমন উন্নয়ন বা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ; হাওরের ১০ কিলোমিটারের মধ্যে গ্যাস বা তেল উত্তোলনের জন্য খননও নিষিদ্ধ। হাওর অঞ্চল একদিকে যেমন ধান ও মাছের ভান্ডার, তেমনি তা ঝড়, শিলাবৃষ্টি ও আগাম বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখেও পড়ে বারবার; তাই এখানকার একফসলি ধান রক্ষা মানে লাখো প্রান্তিক পরিবারের বছরজোড়া খাদ্য ও আয়ের নিরাপত্তা।

নদীব্যবস্থা ও ভাটির দিকে পানি
হাওরের পানি কীভাবে সরে, তা বুঝতে হলে মেঘনা নদীব্যবস্থার দিকে তাকাতে হয়। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ভারতের আসামের পাহাড় থেকে নেমে আসা বরাক নদী সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার অমলশিদে এসে দুই ভাগে ভাগ হয়; দক্ষিণ-পশ্চিমের শাখাটি কুশিয়ারা এবং উত্তর-পশ্চিমের শাখাটি সুরমা। অমলশিদে সুরমার তলদেশ অনেকটাই ভরাট হয়ে যাওয়ায় বরাকের প্রবাহের প্রায় ৮৫ শতাংশই এখন কুশিয়ারা দিয়ে বয়ে যায়। প্রায় ১৬১ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং গড়ে প্রায় ২৫০ মিটার প্রশস্ত কুশিয়ারা আসাম ও ত্রিপুরার পাহাড় থেকে বিপুল পলি বয়ে আনে, আর এই পলিই হাওরের নদীগুলোর তলদেশ ভরাট হওয়ার অন্যতম কারণ। বর্ষায় এই নদীর গড় গভীরতা প্রায় ১০ মিটার পর্যন্ত পৌঁছায়; শেরপুরে মাপা সর্বোচ্চ প্রবাহ ছিল সেকেন্ডে ৩ হাজার ৭০০ ঘনমিটার আর সর্বনিম্ন ৩৩ ঘনমিটার। এই বিপুল মৌসুমি প্রবাহ ও শুষ্ক মৌসুমের স্বল্প প্রবাহের ফারাকই বোঝায়, বর্ষার শুরুর আগাম ঢল কত দ্রুত হাওরে চাপ তৈরি করতে পারে।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, আজমিরীগঞ্জের ভাটিতে সুরমা নদীই মেঘনা নামে পরিচিত হয়। সুরমা আজমিরীগঞ্জ থেকে বয়ে এসে কুলিয়ারচরের প্রায় পাঁচ কিলোমিটার পূর্বে ধনু নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে; এই সংযোগস্থলের ভাটিতে নদীটি মেঘনা নামে পরিচিত।
কুলিয়ারচর থেকে ষাটনল পর্যন্ত অংশকে বলা হয় আপার মেঘনা বা উজান মেঘনা, যা তুলনামূলক ছোট; ষাটনলের ভাটিতে এটি বিস্তৃত মোহনায় পরিণত হয়। সুরমা-মেঘনা ব্যবস্থার মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৬৭০ কিলোমিটার। অর্থাৎ, মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নেমে আসা পানিকে সুরমা, কুশিয়ারা ও এসব নদী হয়ে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে মেঘনায় পৌঁছাতে হয়। পথের নদীগুলোর তলদেশ ভরাট থাকলে এই নিষ্কাশন আরও ধীর হয়ে পড়ে, আর তখনই হাওরে পানি জমে বিপদ বাড়ে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পের মাধ্যমে এই নদীগুলোর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। হাওর এলাকার নদীগুলো পলি জমে ভরাট হয়ে নদীর পানি নিষ্কাশন ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে; ফলে আগাম বন্যার পানি হাওর অঞ্চল থেকে ভাটির দিকে নিষ্কাশিত হতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়। ড্রেজিং ও খাল পুনঃখননের মাধ্যমে এই পথ আবার সচল করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
খাদ্যনিরাপত্তায় হাওরের বোরো
হাওর মূলত এক-ফসলি এলাকা, আর সেই এক ফসলটাই বোরো ধান। শুষ্ক মৌসুমে পানি সরে গেলে কৃষক বোরো আবাদ করেন এবং বৈশাখে তা কাটেন। ঠিক এই সময়টাতেই আগাম বন্যার ঝুঁকি, তাই একটি মৌসুমের ফসল রক্ষা মানে পুরো বছরের খাদ্য ও আয় রক্ষা।
প্রকল্পের নথিতে বলা হয়েছে, এটি বাস্তবায়ন করা হলে প্রায় ১৫ লাখ টন বোরো ধান আগাম বন্যার ক্ষতি থেকে রক্ষা পাবে, যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। নদী ড্রেজিং, খাল পুনঃখনন ও নিষ্কাশন কাঠামো নির্মাণের মধ্য দিয়ে হাওরের পানি দ্রুত নামানো গেলে ফসল রক্ষাকারী বাঁধের ওপর চাপ কমবে, বীজতলা তৈরি ও চারা রোপণের জন্য কৃষক আরও সময় পাবেন, এবং আগাম বন্যায় প্রতি বছরের পুনরাবৃত্ত ক্ষতির হাত থেকে কৃষক কিছুটা হলেও রেহাই পাবেন।
প্রস্তাবিত এই প্রকল্পের মূল ভাবনাটি তাই সরল। পাহাড় থেকে নেমে আসা পানিকে দ্রুত ভাটির দিকে সরিয়ে দিতে হলে আগে নদীর স্বাভাবিক গভীরতা ও প্রবাহপথ ফিরিয়ে আনতে হবে। সুরমা, বাউলাই, ধনু, ঘোড়াউত্রা, আপার মেঘনা, পুরাতন সুরমা, দাড়াইন, চামতি, সোমেশ্বরী, কাউনাই, বাউলাই-পাটনাই, গাং ও আবুয়া, এই ১৩টি নদী খনন করে এবং সংযোগকারী খালগুলো পুনঃখনন করে সেই পথই সচল করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার ১৬ উপজেলার লাখো কৃষকের কাছে এটি তাই নিছক একটি অবকাঠামো প্রকল্প নয়, বরং প্রতি বছর আগাম বন্যায় ফসল হারানোর শঙ্কা থেকে মুক্তির একটি উপায়।
ছবি: P.K.Niyogi / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪; বাংলাপিডিয়া (হাওর, সুনামগঞ্জ জেলা, কিশোরগঞ্জ জেলা, নেত্রকোনা জেলা, মেঘনা নদী)





মন্তব্য
(০)