গাজীপুরের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (বশেমুরকৃবি) 'বিইউ সয়াবিন-৫' নামে একটি উচ্চ ফলনশীল সয়াবিনের জাত উদ্ভাবন করেছে বলে ২০২৪ সালের ১৬ আগস্ট জাগো নিউজ ২৪ জানায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্যে জাতটি জলাবদ্ধতাসহনশীল ও স্বল্পজীবনকালের, আর এর দানা দেশের যেকোনো সয়াবিন জাতের চেয়ে বড়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের গবেষকেরা তাইওয়ানের ওয়ার্ল্ড ভেজিটেবল সেন্টার থেকে সংগৃহীত একটি জার্মপ্লাজম থেকে জাতটি তৈরি করেন, নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে কৃষকদের মাঠে তা যাচাই করেন এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ অনুবিভাগে নিবন্ধন করেন।
এর আগে ১৩ আগস্ট প্রথম আলো নিবন্ধনের খবর দেয়; পত্রিকাটি লেখে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নতুন জাতের অনুমোদনের বিষয়টি তাদের কাছে নিশ্চিত করেছেন। ১৪ আগস্ট দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডও একই তথ্য প্রকাশ করে। প্রতিবেদনগুলোতে উঠে আসে এমন একটি জাতের কথা, যা ৭৫ থেকে ৮৫ দিনে পাকে, সাত দিন জমে থাকা পানি সইতে পারে এবং যার লক্ষ্য উপকূলীয় অঞ্চল, যেখানে ফসল পাকতে শুরু করার মুখেই ঘূর্ণিঝড়ের বৃষ্টিতে প্রায়ই সয়াবিনের খেত ডুবে যায়।
উপকূলের চাষিদের জন্য উদ্ভাবিত জাত
বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, উপকূলীয় অঞ্চলের সয়াবিনচাষিদের দীর্ঘদিনের চাহিদা ছিল এমন একটি জাত, যা একই সঙ্গে স্বল্পজীবনকালের ও জলাবদ্ধতাসহনশীল। ওই অঞ্চলে সয়াবিনের পরিপক্বতার শুরুতেই প্রায়ই ঘূর্ণিঝড়ের কারণে আকস্মিক অতিরিক্ত বৃষ্টি হয়। ফলে খেতে পানি জমে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়, আর তাতে সয়াবিনের প্রভূত ক্ষতি হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্য, সে কারণেই সেখানে এ বিষয়ে নিবিড় গবেষণা করা হয়।
জাতটি উদ্ভাবন দলের প্রধান প্রফেসর ড. আব্দুল করিম জানান, এশিয়ান ভেজিটেবল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার (এভিআরডিসি, বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ভেজিটেবল সেন্টার) থেকে সংগৃহীত বিডি২৩৩৪ জার্মপ্লাজমটি উচ্চ ফলনের পাশাপাশি সাত দিন ধরে জলাবদ্ধতা সহ্য করতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব মাঠে পাওয়া ফলাফলের ভিত্তিতে কৃষক পর্যায়ে এর সঠিকতা যাচাইয়ের জন্য নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় কৃষকদের সম্পৃক্ত করে রবি ও খরিফ, দুই মৌসুমেই জাতটি চাষ করা হয়। সংশ্লিষ্ট কৃষক ও গবেষকদের মতামতের ভিত্তিতে বিডি২৩৩৪ জার্মপ্লাজমটি বিইউ সয়াবিন-৫ নামে কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ অনুবিভাগে নিবন্ধন করা হয়।
দীর্ঘমেয়াদি এ গবেষণায় আর্থিক সহযোগিতা দেয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বশেমুরকৃবির গবেষণা বিভাগ। কৃষকের মাঠ পর্যায়ের গবেষণায় নানাভাবে সহযোগিতা করে সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া নামের একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) স্থানীয় কর্মকর্তারা।
সংখ্যায় নতুন জাতটি
প্রফেসর করিম জানান, দেশের অন্য জাতগুলোর জীবনকাল যেখানে ১০০ থেকে ১১০ দিন, সেখানে বিইউ সয়াবিন-৫ মৌসুমভেদে ৭৫ থেকে ৮৫ দিনেই পরিপক্ব হয়। ফলে ফল পাকার ঠিক আগে অতিরিক্ত বৃষ্টিতে যে আকস্মিক জলাবদ্ধতা হয়, তা থেকে জাতটি রক্ষা পাবে বলে তিনি জানান। বিভিন্ন উপজেলায় জাতটির ফলন পাওয়া গেছে ৩.৫ মেট্রিক টন; তবে কতটুকু জমিতে এই ফলন মাপা হয়েছে, কোনো প্রতিবেদনেই তা উল্লেখ করা হয়নি।
বিইউ সয়াবিন-৫ এর ১০০০ বীজের ওজন ২৮৫ গ্রাম, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্যে বাংলাদেশের বিদ্যমান যেকোনো জাতের চেয়ে বেশি। জাতটিতে প্রোটিনের পরিমাণ ৩৮ শতাংশ এবং তেল ২০ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের দেওয়া মূল তথ্যগুলো এমন:
- মূল উৎস: তাইওয়ানের এভিআরডিসি (ওয়ার্ল্ড ভেজিটেবল সেন্টার) থেকে সংগৃহীত বিডি২৩৩৪ জার্মপ্লাজম।
- জীবনকাল: মৌসুমভেদে ৭৫ থেকে ৮৫ দিন; দেশের অন্য জাতের ক্ষেত্রে ১০০ থেকে ১১০ দিন।
- জলাবদ্ধতা: জার্মপ্লাজমটি সাত দিন জমে থাকা পানি সহ্য করেছে।
- কৃষকের মাঠে ফলন: বিভিন্ন উপজেলায় ৩.৫ মেট্রিক টন।
- দানার আকার: ১০০০ বীজের ওজন ২৮৫ গ্রাম, বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষ্যে দেশে সবচেয়ে বড়।
- পুষ্টি উপাদান: প্রোটিন ৩৮ শতাংশ, তেল ২০ শতাংশ।
- মাঠ যাচাই: নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরে কৃষকের জমিতে, রবি ও খরিফ মৌসুমে।
- নিবন্ধন: কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ অনুবিভাগে, বিইউ সয়াবিন-৫ নামে।
দেশের সামগ্রিক চিত্রের পাশে রাখলে সংখ্যাগুলো আলাদা করে চোখে পড়ে। মার্কিন কৃষি বিভাগের ফরেন এগ্রিকালচারাল সার্ভিস (ইউএসডিএ এফএএস) ২০২৪ সালের ১৯ মার্চের বাংলাদেশ তেলবীজ প্রতিবেদনে লেখে, বাংলাদেশে সয়াবিন জাতগুলোর সাধারণ ফলন হেক্টরপ্রতি ১.৭ টন, যা বৈশ্বিক গড় ২.৮ টনের চেয়ে অনেক কম। প্রতিবেদন অনুযায়ী ফসল তুলতে ১১০ থেকে ১১৫ দিন লাগে, আর প্রায় ৭০ শতাংশ সয়াবিনচাষি এখনো 'সোহাগ' জাত চাষ করেন, যা ১৯৯১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে অবমুক্ত হয় এবং হেক্টরপ্রতি ১.৬ থেকে ১.৮ টন ফলন দেয়।
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯০ সালের পর থেকে দেশে ১০টির বেশি উচ্চ ফলনশীল সয়াবিন জাত অবমুক্ত হলেও উচ্চ ফলনশীল জাতের অভাব ও মানসম্মত বীজের ঘাটতি এ ফসলের সম্প্রসারণে বাধা হয়ে আছে। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বারি) উদ্ভাবিত বারি সয়াবিন-৫ ও বারি সয়াবিন-৬ প্রায় ৩০ শতাংশ চাষি আবাদ করেন, তবে বীজের সীমিত সরবরাহে তা আটকে আছে; বাংলাদেশ পরমাণু কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিনা) ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবমুক্ত জাতগুলোর চাষও সীমিত। ইউএসডিএ এফএএস আরও জানায়, চাষিরা পরের মৌসুমের জন্য নিজের বীজ রেখে দিতে পছন্দ করেন; এক মৌসুমে প্রায় ৩ হাজার টন সয়াবিন বীজ লাগে।
জমে থাকা পানি কেন সয়াবিনের সর্বনাশ করে
বশেমুরকৃবির কৃষিতত্ত্ববিদদের একটি পিয়ার-রিভিউড গবেষণা, যা ২০২২ সালের নভেম্বরে 'লাইফ' সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়, নতুন জাতটি যে সমস্যার জবাব, তা ব্যাখ্যা করে। লেখকদের মতে, বাংলাদেশে সয়াবিন বোনার উপযুক্ত সময় ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে জানুয়ারির মাঝামাঝি, আর ফসল তোলা হয় এপ্রিলে। বৃষ্টির ধরন বদলে যাওয়ায় জানুয়ারিতে বোনা সয়াবিন মার্চে শুঁটি গঠনের পর্যায়ে জলাবদ্ধতায় পড়ে। তাঁরা উদাহরণ দেন: ২০১৭ সালের এপ্রিলের প্রবল বৃষ্টি এবং ২০২০ সালের সুপার সাইক্লোন আম্পান বৃহত্তর নোয়াখালী ও ভোলায় শুঁটি পরিপক্ব হওয়ার শেষ পর্যায়ে সয়াবিনের ক্ষতি করে; আর ২০১৬ সালের নভেম্বরের শুরুতে ঘূর্ণিঝড় নাডার ভারী বৃষ্টিতে সয়াবিন বোনা পিছিয়ে যায়, যা সাধারণত আমন ধান কাটার পরপরই হওয়ার কথা।
ক্ষতি কেন এত বেশি, গবেষণাটি তা-ও ব্যাখ্যা করে। সয়াবিনের মাটিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন দরকার, আর জলাবদ্ধতা গাছের জন্য প্রাপ্য অক্সিজেন কমিয়ে দেয়। এতে সালোকসংশ্লেষণ, শুষ্ক পদার্থ জমা, গাছের বৃদ্ধি এবং ফুল ও শুঁটি গঠন ব্যাহত হয়। শিকড়ের গুটির মাধ্যমে নাইট্রোজেন সংবন্ধন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়; জলাবদ্ধ গাছের পাতা হলুদ হয়ে যায়, কোষকলা মরে যায় এবং পাতা ঝরে পড়ে। লেখকেরা আগের গবেষণা উদ্ধৃত করে জানান, আর৫ প্রজনন পর্যায়ে ডুবে গেলে সয়াবিনের ফলন ২০ থেকে ৩৯ শতাংশ কমে; অঙ্গজ বৃদ্ধির শেষ পর্যায়ে ডুবলে বিশ্বজুড়ে ফলন কমে প্রায় ১৮ শতাংশ; আর ভি২ ও ভি৩ পর্যায়ে জলাবদ্ধতায় ক্ষতি প্রায় ২০ শতাংশ।
নিজেদের পরীক্ষায় গবেষকেরা ফুল আসার সময় বিইউ সয়াবিন-১ ও বিইউ সয়াবিন-২ চার দিন জলাবদ্ধ রাখেন। পটাশ সারের একাংশ বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর উপরি প্রয়োগ করলে জলাবদ্ধ অবস্থায় বিইউ সয়াবিন-২ এর গাছ লম্বা হয়, দানা ভারী হয় এবং দানা ও খড়ের ফলন বাড়ে। লেখকেরা বন্যাকবলিত সয়াবিন এলাকায় পানি নেমে যাওয়ার পর সুপারিশকৃত পটাশের ৫০ শতাংশ প্রয়োগের পরামর্শ দেন; সুপারিশকৃত মাত্রা নিজেই মাটিভেদে আলাদা, তাই সারের পরিমাণ নিয়ে চাষিদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়াই ভালো।
লক্ষ্মীপুরের মাঠে এই ঝুঁকি আগেই দেখা গিয়েছিল। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, ৭ থেকে ১০ ডিসেম্বর, ৩ থেকে ৫ জানুয়ারি ও ২৯ জানুয়ারির অসময়ের বৃষ্টিতে জেলার রবি মৌসুমের জমি তলিয়ে যায়। সাধারণত ডিএইর বেঁধে দেওয়া সময় ১৫ জানুয়ারির মধ্যে সয়াবিন বোনা হয়, কিন্তু সেবার ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৫৩ হাজার ২৩৮ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সয়াবিন বোনা হয়েছিল ১০০ হেক্টরেরও কম জমিতে। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা পত্রিকাটিকে জানান, ২০১৫, ২০১৬, ২০১৭ ও ২০১৮ সালে ফসল তোলার আগের ঝড় ও বৃষ্টিতে হাজারো মানুষ লোকসান ও ঋণে পড়েছিলেন। রামগতি উপজেলায় ডিএইর একজন উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা সতর্ক করেন, জানুয়ারির পরে বোনা ফসল তুলতে হবে জুনে, যখন বর্ষা শুরু হয়; আর নোয়াখালীতে বারির একজন প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা দ্রুত কাটা যায় এমন নতুন জাতের প্রয়োজনের কথা বলেন।

দেশের 'সয়াল্যান্ড' লক্ষ্মীপুর
মাঠ যাচাইয়ের প্রধান জেলা লক্ষ্মীপুর পরিচিত 'সয়াল্যান্ড' নামে। ২০২০ সালে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের প্রকাশিত ডিএইর হিসাবে, ২০১৯ সালে জেলায় ৪৮ হাজার ৫৪৫ হেক্টর জমি থেকে ৮৬ হাজার ৪১০ টন সয়াবিন উৎপাদিত হয়, যা দেশের মোট উৎপাদনের ৫৯.৮০ শতাংশ। ২০১৮ সালে এ হার ছিল ৬৫ শতাংশ ও ২০১৭ সালে ৬০ শতাংশ; আর ২০১৫ সাল পর্যন্ত দেশের মোট সয়াবিনের ৭৫ থেকে ৮০ শতাংশ আসত লক্ষ্মীপুর থেকে। লক্ষ্মীপুরের ডিএই ও কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, আগের বছরগুলোতে জেলাটি সয়াবিন থেকে বছরে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আয় করেছে, আর ২০১৯ সালে করেছে ৩২৪ কোটি টাকা।
চট্টগ্রাম বিভাগের এ জেলার আয়তন ১ হাজার ৪৪০ বর্গকিলোমিটার। ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত এটি নোয়াখালীর অংশ ছিল; সে বছর তৎকালীন লক্ষ্মীপুর মহকুমা আলাদা জেলা হয়। এর উত্তরে চাঁদপুর, পূর্বে নোয়াখালী, আর দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রশস্ত মেঘনার ওপারে ভোলা ও বরিশাল। জেলার বেশির ভাগ ভূমি মেঘনার পলিতে গড়া: নদীর চরে কয়েক মাসের মধ্যেই ঘাস জন্মায় এবং তা চাষের উপযোগী হয়ে ওঠে, আর আজকের লক্ষ্মীপুরের বড় অংশ গত শতকে চর মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে মিশে তৈরি হয়েছে। জেলায় পাঁচটি উপজেলা: লক্ষ্মীপুর সদর, রামগঞ্জ, রায়পুর, রামগতি ও কমলনগর। ২০২২ সালের জনশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ১৯ লাখ ৩৭ হাজার ৯৪৮। সয়াবিন ছাড়াও জেলাটি নারিকেল, সুপারি ও ইলিশের জন্য পরিচিত।

বাংলাদেশে সয়াবিন চাষ
সয়াবিন (Glycine max) ঝোপালো ধরনের একটি শিমজাতীয় উদ্ভিদ, যার উৎপত্তি সম্ভবত চীনে। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, সত্তরের দশকের শুরুতে আমেরিকান ধরনের সয়াবিন বাংলাদেশে আনা হয়; পার্বত্য চট্টগ্রামে দেশি বুনো সয়াবিনও পাওয়া যায়; আর এর চাষ শুরু হয় ১৯৭৮ সালে, মূলত নোয়াখালী ও ফেনীতে। বশেমুরকৃবির ২০২২ সালের গবেষণাপত্রে বলা হয়, সত্তরের দশকের শুরুতে মেনোনাইট সেন্ট্রাল কমিটি যখন বৃহত্তর নোয়াখালীতে কাজ করত, তখন থেকেই দেশে সয়াবিন চাষ হচ্ছে, এবং এর আবাদ ২০০৫ সালের মাত্র ৫ হাজার হেক্টর থেকে ২০২০-২১ সালে ৫৭ হাজার ৬৭০.৮৫ হেক্টরে পৌঁছায়।
ইউএসডিএ এফএএসের সংকলিত ডিএইর হিসাব দেখায়, নতুন জাতটি আসার ঠিক আগের বছরগুলোতেও আবাদ বাড়ছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৭৯ হাজার হেক্টরে উৎপাদন ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার টন, ২০২২-২৩ সালে ৮০ হাজার হেক্টরে ১ লাখ ৪৫ হাজার টন, আর ২০২৩-২৪ সালে ৮৮ হাজার হেক্টরে ১ লাখ ৫০ হাজার টন। ফসলটি চাষ হয় সীমিত এলাকায়, মূলত দক্ষিণাঞ্চলে: চট্টগ্রাম বিভাগের নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুর এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর, পটুয়াখালী, বরগুনা ও ভোলায়।
ইউএসডিএ এফএএসের বর্ণনায়, দক্ষিণাঞ্চলের কৃষক পরিবারে সয়াবিন অর্থকরী ফসল হিসেবে জনপ্রিয় হচ্ছে। অন্য ফসলের চেয়ে এর উৎপাদন খরচ কম, কারণ চাষিরা সয়াবিনে সেচ দেন না: সাধারণত আমন ধান কাটার পর তাঁরা সয়াবিন বোনেন, আর ধানখেতে থেকে যাওয়া মাটির আর্দ্রতাতেই বীজ গজায়। দেশে তিনটি ফসল মৌসুম, রবি, খরিফ-১ ও খরিফ-২; ২০২৩-২৪ সালের রবি সয়াবিন বোনা হয় ২০২৪ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে, আর কাটা শুরু হয় এপ্রিল ও মে মাসে। তবু দেশের বার্ষিক সয়াবিন চাহিদার মাত্র ৫ থেকে ৭ শতাংশ দেশে উৎপাদিত হয়।

হাঁস-মুরগি, মাছ ও গবাদিপশুর খাদ্যে সয়াবিন
বিশ্ববিদ্যালয় জানায়, বাংলাদেশে এখনো মূলত পশু ও মাছের খাদ্য হিসেবেই সয়াবিন ব্যবহৃত হয়; প্রথম আলো যোগ করে, ইদানীং বিভিন্ন স্ন্যাকস, সয়ামিট বল ও সয়ামিল্ক হিসেবে এর ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। ইউএসডিএ এফএএস লেখে, দেশে উৎপাদিত সয়াবিন প্রধানত পশুখাদ্য শিল্পে যায়; দানার মান খারাপ ও তেলের পরিমাণ কম হওয়ায় তা তেল উৎপাদনে ব্যবহৃত হয় না। তেল ছাড়া সয়াবিনজাত পণ্য মানুষ খায় সামান্যই: চাষিরা ফসলের একাংশ দিয়ে সয়ামিল্ক, সয়া হালুয়া, সয়া দই, সয়া পিঁয়াজু ও সয়া আটা তৈরি করেন।
দেশের সয়াবিনের বেশির ভাগই আসে বিদেশ থেকে। ইউএসডিএ এফএএস ২০২৩-২৪ বিপণন বছরে সয়াবিন আমদানি ১৮ লাখ টন হবে বলে প্রাক্কলন করে এবং হাঁস-মুরগি, মাছ ও দুগ্ধ খামারের খাদ্যের চাহিদা বাড়ায় ২০২৪-২৫ সালের জন্য ২০ লাখ টনের পূর্বাভাস দেয়। ২০২২-২৩ সালে তীব্র ডলার-সংকটে আমদানি ব্যাহত হওয়ায় তা নেমে এসেছিল ১১ লাখ ৯০ হাজার টনে। দেশে পশুখাদ্যের উপকরণের প্রায় ৩০ শতাংশ সয়াবিন মিল। সয়াবিন মাড়াই শিল্পে সিটি গ্রুপ ও মেঘনা গ্রুপের আধিপত্য, দেশের মোট দৈনিক মাড়াই সক্ষমতা ১৮ হাজার টন, আর দেশে উৎপাদিত তেলবীজ ভোজ্যতেলের চাহিদার মাত্র ১৫ থেকে ২০ শতাংশ মেটায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্যও এই বাজার। সলিডারিডাড নেটওয়ার্ক এশিয়া ও ডিএইর সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় জানানো হয়, বশেমুরকৃবি উদ্ভাবিত প্রতিকূল পরিবেশে খাপ খাওয়ানোর উপযোগী সয়াবিনের জাতগুলো প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমিতে চাষ হচ্ছে, আর বীজের আকার দেশের প্রচলিত জাতের চেয়ে অনেক বড়, জীবনকাল কম ও প্রোটিনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য হওয়ায় পশু ও মাছের খাদ্যের উপকরণ হিসেবে এগুলোর ব্যাপক চাহিদা আছে। ২০২২ সালের গবেষণাপত্রে বলা হয়, শুকনো সয়াবিন বীজে প্রোটিন থাকে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ।
বিইউ সয়াবিনের জাতগুলো
বিইউ সয়াবিন-৫ একই বিভাগের ধারাবাহিক জাত উদ্ভাবনের সর্বশেষটি। ২০১৪ সালে বিভাগটি বিইউ সয়াবিন-১ উদ্ভাবন করে, যা খর্বাকৃতি, উচ্চ ফলনশীল এবং অপেক্ষাকৃত কম সময়ে পাকে। এরপর ২০২০ সালে আসে বিইউ সয়াবিন-২। ২০২০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ডেইলি অবজারভারে প্রকাশিত বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, জাতটি এভিআরডিসির এজিএস ৩৮৩ জাতধারা থেকে তৈরি, যা খরা, জলাবদ্ধতা ও হেলে পড়া প্রতিরোধ করতে পারে। কমলনগর, সুবর্ণচর, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের ভূঞাপুরে অংশগ্রহণমূলক ফলন পরীক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে এর গড় ফলন হয় হেক্টরপ্রতি ৩.৫ টন; গোবিন্দগঞ্জে ৪.৭ টন ও কমলনগরে ৪.৪ টন। এর ১০০০ দানার ওজন ২২০ গ্রাম, যা তখন দেশের সবচেয়ে বেশি ছিল; শীতকালে এটি প্রায় ১০০ দিনে এবং খরিফ-২ মৌসুমে ৯০ দিনে পাকত।
২০২৩ সালের আগস্টে জাতীয় বীজ বোর্ড লবণসহিষ্ণু দুটি জাত, বিইউ সয়াবিন-৩ ও বিইউ সয়াবিন-৪ অনুমোদন দেয় বলে প্রথম আলো জানায়। নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ও ভোলার কয়েকটি উপজেলায় বিভিন্ন মাত্রার লবণাক্ত জমিতে কৃষকদের সম্পৃক্ত করে রবি ও খরিফ দুই মৌসুমে জাত দুটি চাষ করা হয় এবং গড় ফলন পাওয়া যায় ৩.২ মেট্রিক টন। প্রফেসর করিম পত্রিকাটিকে জানান, সমপরিমাণ লবণাক্ততায় দেশের অন্য জাত হেক্টরপ্রতি ২০০ থেকে ৪০০ কেজি ফলন দিলেও নতুন দুটি জাতের ফলন ছিল ৮০০ থেকে ১ হাজার ১০০ কেজি। জাত দুটির ১০০০ বীজের ওজন যথাক্রমে ২২০ ও ২২৫ গ্রাম, প্রোটিন ৪২ ও ৩৯ শতাংশ এবং তেল ১৯ ও ১৭ শতাংশ। সে গবেষণায় অর্থায়ন করে কৃষি গবেষণা ফাউন্ডেশন (কেজিএফ) ও বশেমুরকৃবি, মাঠে সহযোগিতা দেয় সলিডারিডাড ও ডিএই; আর বীজ অনুবিভাগের মহাপরিচালক, যিনি জাতীয় বীজ বোর্ডের সচিবও, জানান, মাঠপর্যায়ে পর্যবেক্ষণ করেই জাত দুটির অনুমোদন দেওয়া হয়।

জাতটির পেছনের প্রতিষ্ঠানগুলো
বশেমুরকৃবি গাজীপুরের সালনায় অবস্থিত, দেশের দ্বিতীয় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। জাপানের সহায়তায় ১৯৮০ সালে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ কলেজ অব এগ্রিকালচারাল সায়েন্সেস ১৯৮৩ সালে ইনস্টিটিউট অব পোস্টগ্র্যাজুয়েট স্টাডিজ ইন এগ্রিকালচার (ইপসা) হয়; ১৯৯৮ সালের নভেম্বরে ১৯৯৮ সালের ১৬ নম্বর রাষ্ট্রপতির আদেশে বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। ক্যাম্পাসের আয়তন প্রায় ৭৬ হেক্টর, আর কৃষিতত্ত্ব এর ডিগ্রি প্রদানকারী বিভাগগুলোর একটি। সেখানে সয়াবিন গবেষণা শুরু হয় ২০০৬ সালে, এভিআরডিসি, বারি এবং নোয়াখালী-লক্ষ্মীপুর থেকে সংগৃহীত প্রায় ২০০ জার্মপ্লাজম নিয়ে; ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত সয়াবিন উৎপাদনের নানা সমস্যা সমাধানে এ গবেষণা থেকে ৬ জন পিএইচডি ও ১৮ জন শিক্ষার্থী এমএস ডিগ্রি অর্জন করেন।
মূল জার্মপ্লাজমের জোগানদাতা ওয়ার্ল্ড ভেজিটেবল সেন্টার ১৯৭১ সালে দক্ষিণ তাইওয়ানের শানহুয়ায় এশিয়ান ভেজিটেবল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার নামে প্রতিষ্ঠিত হয়; প্রতিষ্ঠাতা ছিল এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ ভিয়েতনাম। এর মূল ক্যাম্পাস চালু হয় ১৯৭৩ সালে, আর বর্তমান নাম নেওয়া হয় ২০০৮ সালে। এটি সবজি নিয়ে গবেষণা ও উন্নয়নের একটি অলাভজনক আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান, যার কাছে রয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও বৈচিত্র্যময় সবজি জার্মপ্লাজম সংগ্রহগুলোর একটি।
মাঠ পরীক্ষায় সহযোগিতাকারী সলিডারিডাড ১৯৬৯ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি আন্তর্জাতিক নাগরিক সমাজ সংগঠন, যা সামাজিকভাবে দায়িত্বশীল, পরিবেশসম্মত ও লাভজনক সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তুলতে কাজ করে; দায়িত্বশীল সয়াবিন বিষয়ক গোলটেবিল (রাউন্ড টেবিল অন রেসপনসিবল সয়) প্রতিষ্ঠাতাদেরও একটি এটি। কৃষি মন্ত্রণালয়ের বীজ অনুবিভাগ নতুন জাত নিবন্ধন করে, আর ডিএই মন্ত্রণালয়ের সম্প্রসারণ সংস্থা, যার উপজেলা কর্মকর্তারা পরীক্ষামূলক প্লটের চাষিদের সঙ্গে কাজ করেছেন।
ছবি: Nazmul.t2 / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রথম আলো, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, ডেইলি অবজারভার, মার্কিন কৃষি বিভাগের ফরেন এগ্রিকালচারাল সার্ভিস, লাইফ (এমডিপিআই), বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)