২০২৫ সালের ৮ জুলাই, মঙ্গলবার দুপুরে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার সোনারদাইড় গ্রামে দিনের বেলায় এক কৃষকের ফলসহ প্রায় ১৫০টি মাল্টা ও পেয়ারা গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী কৃষক বিপুল হোসেন (৩৮) পেশায় ইজিবাইকচালক; তিনি জানান, গাছগুলো তার লিজ নেওয়া ৫০ শতক জমিতে ছিল এবং এতে তার প্রায় ৪ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ঘটনায় তিনি ঝিনাইদহ সদর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের তীর একই এলাকার এক সেনা সদস্যের দিকে; তবে ওই সেনা সদস্য দাবি করেছেন, জমিটি তার এবং কৃষক জমি না ছাড়ায় তিনি গাছ কেটেছেন। খবর পেয়ে স্থানীয় পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন এবং জানান, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কৃষকের অভিযোগ
বিপুল হোসেনের অভিযোগ অনুযায়ী, হলিধানী ইউনিয়নের সোনারদাইড় গ্রামের মাঠে তার বাগানে মঙ্গলবার দুপুরে ফলসহ মাল্টা ও পেয়ারা গাছগুলো কেটে ফেলা হয়। তিনি জানান, দুজন শ্রমিক এবং সেনা সদস্য মো. আবু হানিফ, তার স্ত্রী ও স্ত্রীর আত্মীয়স্বজন মিলে ধরন্ত মাল্টা গাছগুলো কেটে দেন। থানায় দেওয়া অভিযোগে তিনি প্রায় ৪ লাখ টাকার ক্ষতির কথা উল্লেখ করেন, আর পরে বলেন, বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী ৫০ শতক জমিতে ক্ষতির পরিমাণ ৫ লাখ টাকার বেশি। বিপুল হোসেন সোনারদাইড় গ্রামের মো. সামছুল মণ্ডলের ছেলে; আর অভিযুক্ত সেনা সদস্য আবু হানিফ একই এলাকার মৃত আলী হোসেনের ছেলে।
গাছ কাটার প্রথম খবর দেন বিপুল হোসেনের ভাতিজা সম্রাট মিয়া। তিনি বলেন, 'দুপুরে মাঠে ঘাস কাটতে আসি। এরপর চাচার বাগান থেকে গাছ কাটার শব্দ শুনতে পাই। পরে বাগানের দিকে গিয়ে দেখি হানিফ, তার স্ত্রী, শালীসহ বেশ কয়েকজন লোক মিলে মাল্টা গাছ কাটছে। আমি গাছ কাটতে নিষেধ করতে গেলে আমাকে দা দেখিয়ে মারতে আসে। পরে বাড়িতে গিয়ে চাচাকে ঘটনাটি জানাই।'
জমির লিজ ও সালিশ
বিপুল হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি প্রতিবেশী মোশারেফ ও তার মা ফাতেমার কাছ থেকে ৫০ শতক জমি ৫ বছরের জন্য লিজ নেন। লিজ বাবদ প্রতি বছর ২৫ হাজার টাকা করে ৫ বছরে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা দেওয়ার কথা ছিল। এর বাইরে ওই জমিতে আগে থেকেই গাছ থাকায় সেগুলোর জন্য ৩৫ হাজার এবং তারের বেড়ার জন্য ২০ হাজার টাকা দেওয়ার চুক্তি হয়। সব মিলিয়ে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকায় জমির মালিক মোশাররফ হোসেন ও তার মায়ের সঙ্গে ৫ বছরের চুক্তি হয়, যার মধ্যে অগ্রিম ১ লাখ ২০ হাজার টাকা মোশারেফ ও ফাতেমার হাতে দেওয়া হয় বলে তিনি দাবি করেন।
কৃষকের ভাষ্যে, লিজের প্রায় তিন বছরের মাথায় ঝামেলার সূত্রপাত। তিনি জানান, মোশারেফের ভাই সেনা সদস্য আবু হানিফ ওই জমি দখল নিতে গেলে তিনি চুক্তির কথা তুলে ধরেন; পরে হানিফ তার বিরুদ্ধে থানায় ও সেনা ক্যাম্পে অভিযোগ করেন। এরপর পুলিশ ও সেনাবাহিনী উভয় পক্ষকে ডেকে সালিশে বসায়। বিপুল বলেন, তিনি চুক্তির কাগজপত্র দেখান, এবং সালিশে সিদ্ধান্ত হয় যে গাছের মাল্টা বিক্রি হওয়া পর্যন্ত তিনি জমি চাষ করতে পারবেন, এরপর মেয়াদের দুই বছর আগেই জমি ফিরিয়ে দেবেন। তিনি বলেন, এই সিদ্ধান্তে তিনি রাজি ছিলেন এবং আশা করছিলেন এক মাসের মধ্যেই ফল বাজারজাত করার উপযোগী হয়ে যাবে।
দুই পক্ষের বক্তব্য
মাল্টাচাষি বিপুল হোসেন বলেন, 'আমি ৫ বছরের জন্য এই জমি লিজ নিয়েছি। চুক্তি অনুযায়ী এখন ৩ বছর চলমান, সামনে আরও দুই বছর মেয়াদ রয়েছে। কিন্তু এর মধ্যে হানিফ জমি ছেড়ে দিতে বারবার হুমকি দিয়ে আসছে। এক মাস আগে ওই জমি জবরদখল করতে আসে, আমার নামে থানায় ও সেনা ক্যাম্পে অভিযোগ দেয়। সেনাবাহিনী ও পুলিশ উভয় পক্ষকে ডাকে, আমি চুক্তির কাগজ দেখাই। তখন সবাই সিদ্ধান্ত নেয়, গাছে যেহেতু মাল্টা আছে, মাল্টাগুলো বিক্রি শেষে দুই বছর আগেই জমি ফেরত দিতে হবে।'
তিনি আরও বলেন, 'আমি তাদের সিদ্ধান্তে রাজি ছিলাম। গাছে প্রচুর মাল্টা থাকায় আমিও চেয়েছিলাম সেগুলো বিক্রি করে জমিটা ছেড়ে দিতে। কিন্তু হঠাৎ হানিফ তার স্ত্রী ও আত্মীয়স্বজন নিয়ে আমার ধরন্ত মাল্টা গাছ কেটে দিয়েছে। বাগানে এক একটি গাছে ৫০ থেকে ৬০ কেজির বেশি মাল্টা ধরেছিল। বর্তমান বাজার অনুযায়ী ৫০ শতক জমিতে ৫ লাখ টাকার বেশি ক্ষতি হয়েছে। আমি এর সঠিক বিচার চাই।'
অভিযোগের বিষয়ে সেনা সদস্য মো. আবু হানিফ অবশ্য নিজের কোনো দোষ দেখেন না। তিনি বলেন, 'এই জমি লিজের ব্যাপারে কিছুই জানতাম না। এটা আমার জমি, আমার ভাই মোশারফ বিপুলের কাছে লিজ দিয়েছে। বিষয়টি জানার পর তাকে ডেকে বলি, তুমি গরিব মানুষ, তোমাকে ক্ষতি করতে চাচ্ছি না, তুমি তোমার মতো করে জমি থেকে সরে যাও। তারপরও দখল ছাড়েনি। এ কারণে গাছগুলো কেটে দিয়েছি।'
জমির মালিকানা কীভাবে হাতবদল হয়েছে, তা তুলে ধরেন হলিধানী ইউনিয়নের সোনারদাইড় ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আশরাফুল ইসলাম। তিনি বলেন, 'জমিটা পাশের গ্রামের আলি হোসেনের। তিনি মারা যাওয়ার পর উত্তরসূরি হিসেবে ছেলে আবু হানিফ মালিক হন। হানিফ সেনাবাহিনীতে চাকরি করেন। তিনি চাকরিতে থাকা অবস্থায় তার ভাই মোশারেফ, বোনজামাই ও মা মিলে আমাদের গ্রামের বিপুলের কাছে ৫ বছরের জন্য জমি লিজ দেন। বাবা মারা যাওয়ার পর হানিফ মালিক হলে বিপুলকে বলেন, এই জমি লিজ দিয়েছে আমার মা, আমি মানি না, জমি ফেরত দিতে হবে। তখন বিপুল বলে, যদি না দেন, আমাকে একটু সুযোগ দেন যেন মাল্টাগুলো উঠাতে পারি।'
ইউপি সদস্য আরও বলেন, মাঝে একটি ঝামেলা হলে বিপুল হোসেন ঝিনাইদহ সেনা ক্যাম্পে অভিযোগ করেন, সেখান থেকে উভয় পক্ষকে ডাকা হয় এবং সালিশে সিদ্ধান্ত হয় মাল্টা বিক্রি হওয়া পর্যন্ত বিপুল জমি চাষ করতে পারবেন। 'সেই অনুযায়ী আগামী এক মাসের মধ্যে গাছের মাল্টা বাজারে বিক্রির উপযোগী হয়ে যেতো, জমিটাও ছেড়ে দিতো,' বলেন তিনি।
খবর পেয়ে কাতলামারী পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ জাহাঙ্গীর আল মামুন ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তিনি বলেন, 'ধরন্ত মাল্টা ও পেয়ারা গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। সব ভিডিও করে নিয়েছি, ওসি স্যারের সঙ্গে কথা হয়েছে। আইন সবার জন্য সমান। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।'
মাল্টা: বাংলাদেশে মিষ্টি কমলার চাষ
মাল্টা আসলে মিষ্টি কমলা (Citrus sinensis), রসালো ও মৃদু মিষ্টি শাঁসের জন্য চাষ করা একটি সাইট্রাস বা লেবুজাতীয় ফল। আগে মূলত বসতবাড়ির আঙিনায় সীমিত থাকলেও গত দুই দশকে এটি দেশের অন্যতম আলোচিত বাণিজ্যিক ফলে পরিণত হয়েছে; পাহাড়ি জেলাগুলোর পাশাপাশি সমতলের চাষিরাও এখন মাল্টা বাগান করছেন। এই বিস্তারের পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে দেশে উদ্ভাবিত জাত 'বারি মাল্টা-১'।
মিষ্টি কমলা সাইট্রাস বা লেবুজাতীয় গণের অন্তর্ভুক্ত; এই ধরনের ফল বাংলাদেশের পাহাড়ি ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের জেলাগুলোতে বহুকাল ধরে চাষ হয়ে আসছে, যেখানে লেবু, কাগজি লেবু ও ছোট আকারের দেশি কমলা ভালো জন্মে। তুলনায় মিষ্টি কমলা উষ্ণ সমতলে ভালোভাবে ফলাতে হলে উপযুক্ত জাত বাছাই করতে হয়, আর এ কারণেই সমতল-উপযোগী একটি জাত এর বিস্তারে এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। মাল্টা টাটকা খাওয়া ও রস তৈরিতে সমাদৃত এবং শরৎকালের অল্প সময়ের মৌসুমে পাকা ফল স্থানীয় বাজারে ভালো দাম পায়।
বারি মাল্টা-১ উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)-এর সিলেটের জৈন্তাপুরে অবস্থিত সাইট্রাস গবেষণা কেন্দ্র; জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদনের পর জাতটি চাষিদের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এর সবুজাভ, মিষ্টি ফল শরৎকালে, মোটামুটি সেপ্টেম্বরের পর থেকে পাকে এবং জাতটি দেশের নানা জেলায় সম্প্রসারিত হয়েছে। গত দশকের মাঝামাঝি থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো জেলায় বাণিজ্যিক মাল্টা বাগান গড়ে উঠতে শুরু করে।
জাতটি নিয়ে গবেষণায় এটিকে উৎপাদনশীল ও চাষিদের কাছে জনপ্রিয় বলে পাওয়া গেছে। নির্বাচিত এলাকায় বারি মাল্টা-১ গ্রহণ নিয়ে বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, জরিপে অংশ নেওয়া মাল্টাচাষিদের বড় অংশই উচ্চ ফলন, মিষ্টতা ও তুলনামূলক কম পোকার আক্রমণের কারণে এই জাত বেছে নিয়েছেন; পাঁচ থেকে দশ বছর বয়সী পূর্ণাঙ্গ বাগানে হেক্টরপ্রতি প্রায় ২০ টন পর্যন্ত ফলন পাওয়া গেছে।

মাল্টা বাগানের অর্থনীতি
মাল্টা বাগান মৌসুমি ফসল নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, আর এই দিকটিই অভিযোগকৃত ক্ষতির মাত্রা বুঝতে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ-এর ওই গবেষণায় একটি মাল্টা বাগান গড়ে তুলতে হেক্টরপ্রতি আনুমানিক ৭ লাখ টাকা খরচের কথা বলা হয়েছে, যা গাছ পূর্ণমাত্রায় ফল দেওয়ার আগের কয়েক বছরে ভাগ হয়ে পড়ে। এই খরচের বিপরীতে পাঁচ থেকে দশ বছর বয়সী বাগান থেকে স্থূলভাবে হেক্টরপ্রতি প্রায় ১৫ লাখ টাকা ঘরে তোলার তথ্য পাওয়া গেছে; এ কারণেই চাষিরা প্রথম পূর্ণাঙ্গ ফলনের জন্য তিন থেকে চার বছর অপেক্ষা করতে রাজি হন।
৫০ শতক জমিতে, অর্থাৎ হেক্টরের প্রায় এক-পঞ্চমাংশে, চাষ করা একজন ক্ষুদ্র চাষির কাছে গাছই ওই জমির মূল সম্পদ, জমির বার্ষিক লিজের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। তাই ধরন্ত গাছ কেটে ফেললে কেবল এক মৌসুমের ফল নয়, বছরের পর বছরের বেড়ে ওঠা গাছও নষ্ট হয়, যা পরের ফলনচক্রের আগে আর ফিরে পাওয়া যায় না। যেহেতু মাল্টা গাছে ফল সংগ্রহের আগে কয়েক সপ্তাহ ধরে ঝুলে থাকে, তাই ফসল তোলার ঠিক আগমুহূর্তে ধরন্ত গাছ হারানো, যেমনটি এখানে অভিযোগ করা হচ্ছে, ক্ষতির দিক থেকে বছরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে পড়ে, আর কৃষকের কয়েক লাখ টাকার ক্ষতির দাবির ভিত্তি এটিই।
পেয়ারা: বাংলাদেশের বাগানের চেনা ফল
পেয়ারা (Psidium guajava) বাংলাদেশের সবচেয়ে বহুল চাষ হওয়া ফলগুলোর একটি এবং জাতীয় খাদ্যতালিকায় ভিটামিন সি-র অন্যতম সস্তা উৎস। গাছটি ছোট থেকে মাঝারি আকারের, উচ্চতায় প্রায় ২ থেকে ১০ মিটার, এবং রোপণের তিন থেকে চার বছর পর পূর্ণমাত্রায় ফল দিতে শুরু করে; এ কারণেই একটি প্রতিষ্ঠিত বাগানের মূল্য অনেক। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, পূর্ণাঙ্গ একটি পেয়ারাগাছে ৪০০ থেকে ৮০০টি ফল ধরতে পারে এবং বাগানে হেক্টরপ্রতি ২০ থেকে ৩০ টন পর্যন্ত ফলন হতে পারে।
ফলটি ভিটামিন সি-তে সমৃদ্ধ; বাংলাদেশি পেয়ারায় ভোজ্য অংশের প্রতি ১০০ গ্রামে প্রায় ২৬০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি পাওয়ার তথ্য রয়েছে, যা অন্য অনেক পরিচিত ফলের চেয়ে অনেক বেশি। পেয়ারা কাঁচা ও পাকা দুই অবস্থাতেই খাওয়া হয় এবং জ্যাম, জেলি, জুস ও আচার তৈরিতেও ব্যবহৃত হয়। দেশে অনেক জাতের পেয়ারা আছে, আশির দশকে থাইল্যান্ড থেকে আনা বড় আকারের কাজী পেয়ারা থেকে শুরু করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভাবিত বাউ পেয়ারা জাতগুলো পর্যন্ত, যার কোনো কোনোটি একাধিক মৌসুমে ফল দেয়। এই ঘটনায় বর্ণিত বাগানের মতো ছোট মিশ্র বাগানে প্রায়ই মাল্টা ও পেয়ারা পাশাপাশি লাগানো হয়।
পেয়ারা শক্তপোক্ত ও সহজে চাষযোগ্য বলেই বাংলাদেশের বসতবাড়িতে এত সাধারণ। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, গাছটি ২৩ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় সবচেয়ে ভালো জন্মে, যদিও পূর্ণবয়স্ক গাছ এর চেয়ে অনেক বেশি তাপমাত্রাও সহ্য করে, এবং সুনিষ্কাশিত এঁটেল বা বেলে-দোআঁশ মাটিতে বিস্তৃত অম্লমানে ভালো ফলে। এর প্রধান পোকা মিলিবাগ ও সাদা মাছি, আর রোগের মধ্যে আছে ঢলে পড়া (উইল্ট), অ্যানথ্রাকনোজ, ক্যাঙ্কার ও ডাই-ব্যাক; ঢলে পড়া সাধারণত রোগ-প্রতিরোধী মূলকাণ্ডে কলম করে সামলানো হয়। মূল ফুল আসে গ্রীষ্মে, আর সেচের ব্যবস্থা থাকলে কোনো কোনো গাছকে জানুয়ারি থেকে মার্চের মধ্যে অমৌসুমেও ফুল ধরানো যায়।
বাংলাপিডিয়ার হিসাবে পেয়ারাগাছের প্রায় ৮০ থেকে ৮৬ শতাংশ ফুলে ফল ধরে, তবে এর মধ্যে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ফলই পরিণত হয়; ফুল আসার চার থেকে পাঁচ মাস পর ফল সংগ্রহ করা যায়। পাতা থেকেও চা তৈরি হয়। এভাবে পেয়ারা সারা বছর তুলনামূলক সস্তায় ভিটামিন সি জোগায় বলে গ্রামীণ পরিবারে একটি প্রতিষ্ঠিত পেয়ারাগাছ কেবল ফলের উৎস নয়, পুষ্টিরও ভরসা।

ঝিনাইদহ: দক্ষিণ-পশ্চিমের কৃষিপ্রধান জেলা
ঝিনাইদহ দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের খুলনা বিভাগের একটি জেলা, আয়তন প্রায় ১ হাজার ৯৬৫ বর্গকিলোমিটার; দক্ষিণ ও পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, যা মোট আয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ; ফলে জমি ও ফসল নিয়ে বিরোধ এখানে বহু পরিবারের জীবিকার প্রশ্ন। গড়াই, কুমার, নবগঙ্গা, চিত্রা ও ভৈরবের মতো নদী জেলাটিকে সিক্ত করে, আর উর্বর সমতলে ধান, সবজি, ডাল এবং ক্রমবর্ধমান ফলের বাগান চাষ হয়।
২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জেলার জনসংখ্যা প্রায় ১৭ লাখ ৭১ হাজার, যা ছয়টি উপজেলায় বিভক্ত: ঝিনাইদহ সদর, মহেশপুর, শৈলকুপা, কালীগঞ্জ, হরিণাকুণ্ডু ও কোটচাঁদপুর। নদীর পাশাপাশি অঞ্চলটিতে কান্নাদহের মতো বিল এবং বলুহর ও মর্জাতের মতো বাঁওড় (অশ্বক্ষুরাকৃতির হ্রদ) ছড়িয়ে আছে, যা এই এলাকার বৈশিষ্ট্য। জনসংখ্যার বড় অংশ মুসলিম, উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় হিন্দু জনগোষ্ঠীও রয়েছে।
জেলার জনঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৯০০ জন এবং সাক্ষরতার হার প্রায় ৪৮ শতাংশ; নদীর পাশাপাশি পুটিমারি ও সোনালীডাঙার মতো খালও এই এলাকাকে জালের মতো ঘিরে আছে। এমন ঘনবসতিপূর্ণ, কৃষিনির্ভর গ্রামীণ জনপদে অল্প জমির ধরন্ত গাছের বাগানও একটি দরিদ্র পরিবারের সম্পদের উল্লেখযোগ্য অংশ হয়ে দাঁড়ায়, আর সে কারণেই জমি ও ফসল নিয়ে এমন বিরোধ জীবিকার প্রশ্ন হয়ে ওঠে।
যে উপজেলায় এই ঘটনার অভিযোগ, সেই ঝিনাইদহ সদর জনসংখ্যায় জেলার সবচেয়ে বড় উপজেলা। হলিধানী এর একটি ইউনিয়ন, আর অভিযোগে উল্লিখিত সোনারদাইড় গ্রাম এই ইউনিয়নেই। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জেলার অনেক চাষি, যাদের অনেকেই বিপুল হোসেনের মতো ক্ষুদ্র বা ভূমিহীন, কয়েক শতক জমি লিজ নিয়ে মাল্টার মতো উচ্চমূল্যের ফল লাগিয়েছেন, এই আশায় যে মাঠের ফসলের চেয়ে অল্প জমি থেকেই বেশি আয় হবে।

অন্যের গাছ কাটা ও আইন
জমি কে ভোগদখল করবে, সেটি মূলত দুই পক্ষের লিজ চুক্তির ওপর নির্ভরশীল একটি দেওয়ানি প্রশ্ন, আর এ নিয়ে দুই পক্ষ ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দিচ্ছে। তবে দাঁড়িয়ে থাকা, ফলসহ গাছ কেটে ফেলার বিষয়টি ফৌজদারি আইনে আলাদাভাবে দেখা হয়। দ্য পেনাল কোড, ১৮৬০-এর ৪২৫ ধারায় 'অনিষ্ট' বা 'মিসচিফ'-কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এভাবে: কেউ জনসাধারণ বা কোনো ব্যক্তির অন্যায় ক্ষতি করার অভিপ্রায়ে বা তা হতে পারে জেনে কোনো সম্পত্তি ধ্বংস করলে, কিংবা সম্পত্তিতে এমন পরিবর্তন ঘটালে যা তার মূল্য বা উপযোগিতা নষ্ট বা হ্রাস করে, তখন তা 'মিসচিফ'। ৪২৬ ধারা অনুযায়ী এর শাস্তি তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ড।
যেখানে এই অনিষ্টে পঞ্চাশ টাকা বা তার বেশি অঙ্কের ক্ষতি হয়, সেখানে ৪২৭ ধারায় দুই বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড, অথবা জরিমানা, অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে। আইনে অন্যের দখলে থাকা সম্পত্তিতে প্রবেশের বিষয়ও আছে: ৪৪১ ধারায় অপরাধ করা কিংবা দখলদারকে ভয় দেখানো, অপমান বা বিরক্ত করার অভিপ্রায়ে অন্যের দখলে থাকা সম্পত্তিতে প্রবেশকে 'অপরাধমূলক অনধিকার প্রবেশ' বলা হয়েছে, এবং ৪৪৭ ধারায় এর শাস্তি তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড বা পাঁচশ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। কোন বিধান প্রযোজ্য হবে, তা নির্ধারণের দায়িত্ব পুলিশ ও আদালতের, কোনো পক্ষের নয়; কৃষক লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন এবং পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ বলেছেন, তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ছবি: Zeynel Cebeci / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)। গাছে ধরে থাকা পাকা মিষ্টি কমলা বা মাল্টা, তুরস্কে তোলা।
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪; বাংলাপিডিয়া (ঝিনাইদহ জেলা, পেয়ারা); বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) ও বাংলাদেশ জার্নাল অব অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ (বারি মাল্টা-১); দ্য পেনাল কোড, ১৮৬০।





মন্তব্য
(০)