সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮+০.০%আদা - আমদানিকৃত১৬৭+০.০%আদা - দেশী১৫৪+০.০%আমন চাল - মাঝারি৫৬+০.০%আমন চাল - মোটা৪৮+০.০%আমন চাল - সরু৭২+০.০%আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২+০.০%কাঁচা মরিচ২১৮+০.০%খামারের মুরগী১৬২+০.০%খাসী৯০০+০.০%চিনি (দেশী)১৩২+০.০%ছোলা - গোটা৮৫+০.০%ডিম ফার্ম - লাল৪৭+০.০%পেঁয়াজ - দেশী৬০+০.০%বোরো চাল - মাঝারি৫৫+০.০%বোরো চাল - মোটা৪৭+০.০%বোরো চাল - সরু৬৬+০.০%মাংসঃ– গরু৭২৯+০.০%মুগ ডাল১২২+০.০%রসুন - আমদানিকৃত১৯২+০.০%রসুন - দেশী১৭৩+০.০%সয়াবিন তেল১৬৩+০.০%
হালনাগাদ ১ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা৩২°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৫৫%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

ক্ষুদ্র টিস্যু থেকে হাজারো চারা: টিস্যু কালচারে বদলে যাচ্ছে দেশের উদ্যান খাত

একটি ক্ষুদ্র উদ্ভিদ-টিস্যু থেকে জন্ম নিচ্ছে হাজার হাজার রোগমুক্ত চারা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তিনটি আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাবে গত এক বছরে উৎপাদিত হয়েছে ২ লাখ ১২ হাজার ৩৮৭টি চারা, যা আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে ফুল, ফল ও উদ্যান ফসলের চারা দেশেই উৎপাদনের পথ খুলছে।

ক্ষুদ্র টিস্যু থেকে হাজারো চারা: টিস্যু কালচারে বদলে যাচ্ছে দেশের উদ্যান খাত
এগ্রোটেক

একটি ক্ষুদ্র উদ্ভিদ-টিস্যু থেকেই জন্ম নিচ্ছে হাজার হাজার রোগমুক্ত চারা। আধুনিক টিস্যু কালচার প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) গবেষকরা ফুল, ফল ও উদ্যান ফসলের উন্নত চারা এখন আমদানি না করে দেশেই উৎপাদন করছেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, এ প্রযুক্তির ফলে আমদানিনির্ভরতা কমছে এবং কম খরচে মানসম্মত চারা পৌঁছে যাচ্ছে কৃষক ও নতুন কৃষি উদ্যোক্তাদের হাতে।

ডিএইর হর্টিকালচার উইংয়ের তথ্য অনুযায়ী, চালু থাকা তিনটি টিস্যু কালচার ল্যাবে গত এক বছরে ২ লাখ ১২ হাজার ৩৮৭টি রোগমুক্ত চারা উৎপাদিত হয়েছে। এর মধ্যে ১ লাখ ৯২ হাজার ৬৩৭টি চারা কৃষক ও উদ্যোক্তাদের কাছে বিক্রি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা জানান, নির্মাণাধীন ল্যাবগুলো পুরোদমে চালু হলে রোগমুক্ত ও মানসম্মত চারা উৎপাদনের সক্ষমতা কয়েকগুণ বাড়বে।

দেশের তিন ল্যাব ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বর্তমানে মাদারীপুর, বগুড়া ও ময়মনসিংহ জেলার হর্টিকালচার সেন্টারে তিনটি আধুনিক টিস্যু কালচার ল্যাব পরিচালনা করছে। 'টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্প'র আওতায় এসব ল্যাব গড়ে উঠেছে।

এর পাশাপাশি বান্দরবানের বালাঘাটা, সাভারের রাজালাখ, কুমিল্লা সদর, ভোলার চরফ্যাশন ও টাঙ্গাইলের ধনবাড়ীতে আরও পাঁচটি আধুনিক ল্যাব নির্মাণাধীন। সংশ্লিষ্টদের মতে, এগুলো চালু হলে দেশের আরও নানা অঞ্চলে রোগমুক্ত ও মানসম্মত চারার সরবরাহ কয়েকগুণ বাড়বে।

সরকারি ল্যাবে উৎপাদিত হওয়ায় এসব চারা পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত বা পাকিস্তানের তুলনায় অর্ধেকেরও কম খরচে পাচ্ছেন কৃষকেরা। জারবেরা, লিলিয়াম কিংবা ক্যাভেন্ডিশ জাতের কলা ও স্ট্রবেরির যেসব উন্নত চারার জন্য একসময় বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো, সেগুলো এখন দেশেই উৎপাদিত হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোগমুক্ত এই চারা ব্যবহার করে ইতোমধ্যে উপকৃত হচ্ছেন হাজারো কৃষক ও নতুন উদ্যোক্তা।

টিস্যু কালচার ল্যাবে নিয়ন্ত্রিত ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশে উদ্ভিদের বংশবিস্তার করা হয় (ছবিটি মালয়েশিয়ার একটি গবেষণাগারের)। ছবি: Rafi Bin Tofa / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
টিস্যু কালচার ল্যাবে নিয়ন্ত্রিত ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশে উদ্ভিদের বংশবিস্তার করা হয় (ছবিটি মালয়েশিয়ার একটি গবেষণাগারের)। ছবি: Rafi Bin Tofa / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

এক বছরের উৎপাদন ও দাম


হর্টিকালচার উইংয়ের তথ্য বলছে, গত বছর উৎপাদিত ২ লাখ ১২ হাজার ৩৮৭টি চারার মধ্যে মাদারীপুরে হয়েছে ৯০ হাজার ২৩৭টি, বগুড়ায় ৬২ হাজার ৫০০টি এবং ময়মনসিংহে ৫৯ হাজার ৬৫০টি। সবচেয়ে বেশি চাহিদা ছিল জি-৯ কলা, জারবেরা, স্ট্রবেরি ও আলুর চারার। আগামী অর্থবছরের জন্য তিনটি ল্যাবের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রাও বাড়ানো হয়েছে।

দামের ব্যবধানেই প্রযুক্তির সুবিধা স্পষ্ট। ভারত থেকে আমদানি করা একটি জারবেরা চারার দাম যেখানে ৮০ থেকে ১০০ টাকা, সেখানে একই মানের চারা সরকারি ল্যাবে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৩০ টাকায়। উচ্চমূল্যের চারার ক্ষেত্রে এই সাশ্রয় অনেক বড়, আর এই ব্যবধান কমিয়ে আনাই ল্যাবগুলোর লক্ষ্য।

বাকি ল্যাবগুলো চালু হলে বছরে উৎপাদন ৫ লাখ ছাড়িয়ে যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। মাদারীপুর ল্যাবে এবারই প্রথম টিস্যু কালচার প্রযুক্তিতে লিলিয়ামের চারা উৎপাদন শুরু হয়েছে; এক বছরে উৎপাদিত হয়েছে প্রায় আট হাজার চারা, আগামী মৌসুমের লক্ষ্য ২০ হাজার। প্রাকৃতিক মিষ্টিকারক উদ্ভিদ স্টেভিয়া নিয়েও পরীক্ষামূলক উৎপাদন চলছিল; বিদেশি চারার দাম কয়েকশ টাকা হলেও দেশীয়ভাবে উৎপাদিত চারা স্বল্পমূল্যে কৃষকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

টিস্যু কালচার কীভাবে কাজ করে


টিস্যু কালচার বা মাইক্রোপ্রোপাগেশন হলো নিয়ন্ত্রিত ও জীবাণুমুক্ত পরিবেশে, নির্দিষ্ট উপাদানের পুষ্টিমাধ্যমে উদ্ভিদের কোষ, টিস্যু বা অঙ্গ জন্মানোর একগুচ্ছ পদ্ধতি। অবিকল বা ক্লোন চারা বিপুল সংখ্যায় উৎপাদনের এটিই প্রচলিত উপায়।

মাদারীপুর ল্যাবে প্রতিটি ধাপ পরিচালিত হচ্ছে জীবাণুমুক্ত ও নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে। ল্যামিনার এয়ারফ্লো ক্যাবিনেটের সামনে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে ক্ষুদ্র উদ্ভিদ-টিস্যু স্থানান্তর করেন প্রযুক্তিবিদরা; পরিশোধিত বাতাসের এই প্রবাহ কাজের জায়গাটিকে বাতাসবাহিত জীবাণু থেকে মুক্ত রাখে। ল্যাবের দায়িত্বপ্রাপ্ত কৃষিবিদ মো. এনামুল হক জানান, নির্বাচিত মাতৃগাছ থেকে সংগ্রহ করা শুট টিপ প্রথমে জীবাণুমুক্ত করা হয়, এরপর বিশেষ পুষ্টিমাধ্যমে স্থাপন করলে উদ্ভিদ হরমোনের প্রভাবে কোষ বিভাজন শুরু হয়। কয়েক দফা সাব-কালচারের মাধ্যমে একটি ক্ষুদ্র টিস্যু থেকেই তৈরি হয় হাজার হাজার চারা।

প্রতিটি ধাপের বিজ্ঞান সুপ্রতিষ্ঠিত। এক্সপ্লান্ট প্রথমে সাধারণত অ্যালকোহল ও হাইপোক্লোরাইট দ্রবণে উপরিভাগ জীবাণুমুক্ত করা হয়, এরপর খনিজ লবণ, ভিটামিন ও উদ্ভিদ হরমোনসমৃদ্ধ এবং অ্যাগার দিয়ে জমানো জেলির মতো মাধ্যমে বসানো হয়। হরমোনের ভারসাম্যই চারার গতিপথ ঠিক করে: অক্সিন বেশি হলে শিকড় গজায়, সাইটোকাইনিন বেশি হলে কাণ্ড-পাতা বাড়ে, আর দুটির ভারসাম্যে প্রায়ই তৈরি হয় ক্যালাস নামে অবিভাজিত কোষের পিণ্ড। মাইক্রোপ্রোপাগেশনের জন্য শুট-টিপ বা মেরিস্টেম কালচারকেই সবচেয়ে উপযুক্ত ধরা হয়, কারণ এতে সোম্যাক্লোনাল নামে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের ঝুঁকি সবচেয়ে কম এবং ভাইরাসে আক্রান্ত গাছ থেকেও রোগমুক্ত চারা পাওয়া যায়।

শুট ও নোডাল বংশবিস্তার সাধারণত চারটি ধাপে বর্ণনা করা হয়। প্রথম ধাপ 'এস্টাবলিশমেন্ট' বা প্রতিষ্ঠা, যখন একটি পরিচ্ছন্ন এক্সপ্লান্টকে কালচারে আনা হয়; দ্বিতীয় ধাপ 'মাল্টিপ্লিকেশন' বা বহুগুণীকরণ, যখন বারবার সাব-কালচার করে শাখা-চারার মজুত গড়া হয়; তৃতীয় ধাপ 'রুটিং' বা শিকড় গজানো; এবং চতুর্থ ধাপ 'হার্ডেনিং' বা খাপ খাওয়ানো, যখন কচি চারাগুলোকে বয়াম থেকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক পরিবেশে অভ্যস্ত করা হয়। চারা পুনর্জন্মের তিনটি প্রধান পথ আছে: বিদ্যমান মেরিস্টেম থেকে, যেমন শুট-টিপ কালচারে; অর্গ্যানোজেনেসিসের মাধ্যমে, যেখানে টিস্যু থেকে নতুন কাণ্ড বা শিকড় গজায়; এবং সোম্যাটিক এমব্রায়োজেনেসিসের মাধ্যমে, যেখানে সাধারণ দেহকোষ থেকেই সরাসরি ভ্রূণ তৈরি হয়। সোম্যাটিক এমব্রায়োজেনেসিসে বহুগুণীকরণের হার অনেক বেশি হতে পারে এবং তা বায়োরিঅ্যাক্টরের মতো তরল ব্যবস্থায় চালানো যায়; 'কৃত্রিম বীজ' ধারণাটিরও ভিত্তি এটি।

ল্যাবে উৎপাদিত চারা সরাসরি মাঠে দেওয়া হয় না। বয়ামের উষ্ণ, আর্দ্র ও সুরক্ষিত পরিবেশ থেকে বের করে প্রথমে পলি হাউজ ও হার্ডেনিং জোনে ধাপে ধাপে বাইরের পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো হয়। পর্যাপ্ত শক্ত হওয়ার পরই সেগুলো কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া হয়। এনামুল হকের ভাষায়, টিস্যু কালচারে উৎপাদিত প্রতিটি চারা মাতৃগাছের বৈশিষ্ট্য ধারণ করে এবং রোগমুক্ত হওয়ায় দ্রুত বাড়ে ও অধিকাংশ ক্ষেত্রে মাঠে ভালো ফলন দেয়।

রোগমুক্ত ও অবিকল চারা কেন গুরুত্বপূর্ণ


টিস্যু কালচারের মূল আকর্ষণ দুটি: চারাগুলো মাতৃগাছের সঙ্গে জিনগতভাবে অভিন্ন হয়, আর এগুলোকে ভাইরাসসহ নানা রোগজীবাণুমুক্ত করা যায়। ক্লোন হওয়ায় একটি ভালো মাতৃগাছের গুণাবলি প্রতিটি চারায় সঞ্চারিত হয়, ফলে বীজ বা সাধারণ কাটিং থেকে তৈরি বাগানের তুলনায় টিস্যু কালচারের চারায় গড়া বাগান অনেক বেশি অভিন্ন ও সুসম হয়।

কৃষি বিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. এম. এ. রহিম বলেন, ভাইরাসমুক্ত ও মানসম্মত চারা উৎপাদনে টিস্যু কালচার প্রযুক্তির কার্যকারিতা আন্তর্জাতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। যেসব ফসলের দ্রুত ও বৃহৎ পরিসরে বংশবিস্তার প্রয়োজন, সেসব ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির বিকল্প সীমিত।

এত ব্যাপকভাবে প্রযুক্তিটি ছড়িয়ে পড়ার কারণ এর সুবিধাগুলো। এটি পছন্দের গাছের অবিকল প্রতিরূপ দেয়, পরিণত গাছ দ্রুত তৈরি করে এবং অল্প, নিয়ন্ত্রিত জায়গায় বিপুল সংখ্যায় চারা জন্মায়। যেসব গাছ বীজ ধরে না বা খুব কম ধরে, কিংবা বংশবিস্তারে নির্দিষ্ট পরাগবাহক লাগে, সেগুলোরও বহুগুণীকরণ সম্ভব; আর কালচার জীবাণুমুক্ত বলে রোগ-পোকা ছড়ানোর আশঙ্কা ছাড়াই চারা পরিবহন ও সংরক্ষণ করা যায়। অর্কিডের মতো যেসব বীজ সাধারণভাবে অঙ্কুরিত করা কঠিন, সেগুলো জন্মানো এবং জিনসম্পদ সংরক্ষণেও টিস্যু কালচার প্রচলিত উপায়।

তবে পদ্ধতির কিছু সীমাবদ্ধতাও আছে। প্রতিটি চারা ক্লোন হওয়ায় সবগুলোর সবলতা ও দুর্বলতা একই, ফলে যে রোগ একটি গাছকে আক্রমণ করতে পারে, তা গোটা আবাদকেই আক্রমণ করতে পারে। শিকড়ের এক্সপ্লান্ট আলাদা করা কঠিন এবং তাতে প্রায়ই মাটির জীবাণু থেকে যায় যা মাধ্যমকে ঢেকে ফেলে; কিছু টিস্যু ধীরে বাড়ে বা মরে যায়; আবার পুনর্জন্মের সাফল্য প্রজাতি থেকে প্রজাতি, এমনকি জাত থেকে জাতেও বদলায়। ল্যাব স্থাপন ও পরিচালনায় দরকার প্রশিক্ষিত জনবল, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও কঠোর পরিচ্ছন্নতা। তারপরও উচ্চমূল্যের উদ্যান ফসলে অভিন্নতা ও গাছের সুস্থতার সুবিধা অনেক বড়।

যেসব ফসলের চারা তৈরি হচ্ছে


ল্যাবগুলোতে নানা ফুল, ফল ও উদ্যান ফসলের চারা তৈরি হচ্ছে। এর অনেকগুলোকে বেছে নেওয়া হয়েছে উচ্চমূল্যের এবং আগে আমদানিনির্ভর হওয়ার কারণে।

জারবেরা বিশ্বের অন্যতম জনপ্রিয় কাটফ্লাওয়ার। সূর্যমুখী পরিবারের (অ্যাস্টারেসি) এই ফুলকে কখনো কখনো আফ্রিকান ডেইজিও বলা হয়; জার্মান উদ্ভিদবিজ্ঞানী ট্রাউগট গারবারের নামে এর নামকরণ। এই গণে প্রায় ২২টি প্রজাতি আছে, যার আদি নিবাস ক্রান্তীয় আফ্রিকা, পরে এটি ল্যাটিন আমেরিকা ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়েছে। বেশির ভাগ বাণিজ্যিক জাত Gerbera jamesonii ও Gerbera viridifolia-এর সংকর এবং বাগানের গাছ ও কাটফ্লাওয়ার দুই হিসেবেই চাষ হয়। গোলাপ, কার্নেশন, চন্দ্রমল্লিকা ও টিউলিপের পর বিশ্বে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত কাটফ্লাওয়ারের তালিকায় জারবেরার স্থান পঞ্চম; তাই সস্তায় ও রোগমুক্ত দেশীয় চারা পাওয়া দেশের ফুলচাষি ও বিক্রেতাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

জারবেরা বিশ্বের পঞ্চম সর্বাধিক ব্যবহৃত কাটফ্লাওয়ার; টিস্যু কালচার ল্যাবে এর রোগমুক্ত চারা উৎপাদিত হচ্ছে। ছবি: Panterka / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.5)
জারবেরা বিশ্বের পঞ্চম সর্বাধিক ব্যবহৃত কাটফ্লাওয়ার; টিস্যু কালচার ল্যাবে এর রোগমুক্ত চারা উৎপাদিত হচ্ছে। ছবি: Panterka / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.5)

লিলিয়াম বা প্রকৃত লিলি এমন একটি গণের উদ্ভিদ, যা মাটির নিচের কন্দ (বাল্ব) থেকে জন্মে এবং বড়, দৃষ্টিনন্দন ফুল ধরে। এর প্রায় ১১৯টি প্রজাতির বেশির ভাগই নাতিশীতোষ্ণ উত্তর গোলার্ধের স্থানীয়। লিলি বহুবর্ষজীবী, সাধারণত ৩০ থেকে ১৮০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়; এর কন্দে পেঁয়াজের মতো কাগজে আবরণ থাকে না এবং সাধারণত সুপ্ত মৌসুমে কন্দের উচ্চতার প্রায় আড়াই গুণ গভীরে রোপণ করা হয়। বিশেষত Lilium longiflorum গুরুত্বপূর্ণ কাটফ্লাওয়ার, যেগুলোকে ইস্টারের মতো নির্দিষ্ট বাজারের জন্য মৌসুমের বাইরেও ফোটানো হয়; প্রজননকারীরা বর্ডার ও টবের জন্য বহু শোভাময় সংকরও তৈরি করেছেন। লিলি ভালো হয় সুনিষ্কাশিত দোআঁশ মাটিতে, যেখানে মাটির অম্লমান (পিএইচ) ৬.৫-এর কাছাকাছি।

লিলিয়াম বা প্রকৃত লিলি, যা মাটির নিচের কন্দ থেকে জন্মে; মাদারীপুর ল্যাবে প্রথমবারের মতো এর চারা উৎপাদন শুরু হয়েছে। ছবি: George Chernilevsky / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
লিলিয়াম বা প্রকৃত লিলি, যা মাটির নিচের কন্দ থেকে জন্মে; মাদারীপুর ল্যাবে প্রথমবারের মতো এর চারা উৎপাদন শুরু হয়েছে। ছবি: George Chernilevsky / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

জি-৯ কলা ক্যাভেন্ডিশ গোত্রের, যে কলা বিশ্ববাণিজ্যে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। ডেভনশায়ারের ষষ্ঠ ডিউক উইলিয়াম ক্যাভেন্ডিশের নামে এই গোত্রের নামকরণ; ১৮৩৪ সালের দিকে মরিশাস থেকে আসা একটি চালান তাঁর কাছে পৌঁছালে তাঁর প্রধান মালী জোসেফ প্যাক্সটন চ্যাটসওয়ার্থ হাউসে এই কলা চাষ করেন, আর ১৮৮৮ সালের মধ্যে ক্যানারি দ্বীপপুঞ্জ থেকে ইংল্যান্ডে আসা কলা (এখন যা ডোয়ার্ফ ক্যাভেন্ডিশ বলে জানা যায়) আমদানি হয়। ১৯৫০-এর দশক থেকে ক্যাভেন্ডিশই আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হওয়া কলা, পানামা রোগে গ্রোস মিশেল জাত বিপর্যস্ত হওয়ার পর যা এর স্থান নেয়। 'চিকিটা কলা' নামে পরিচিত গ্র্যান্ড নেইন ক্লোনটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ; শতাব্দীর শুরুর দিকে বিশ্বের মোট কলা উৎপাদনের প্রায় ৪৭ শতাংশ ছিল ক্যাভেন্ডিশ এবং উন্নত দেশগুলোতে রপ্তানি হওয়া কলার প্রায় ৯৯ শতাংশই এই গোত্রের। ক্যাভেন্ডিশ কলা বীজহীন হওয়ায় কেবল ক্লোনিংয়ের মাধ্যমেই বংশবিস্তার সম্ভব, তাই টিস্যু কালচার এর জন্য স্বাভাবিক উপায়; তবে সংকীর্ণ জিনভিত্তির কারণে ফুসারিয়াম উইল্ট বা পানামা রোগের মতো রোগে এটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ।

ক্যাভেন্ডিশ গোত্রের কলা; জি-৯ কলা এই গোত্রের এবং বীজহীন হওয়ায় কেবল ক্লোনিংয়ে বংশবিস্তার হয়। ছবি: Andikan Efiok Eduok / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ক্যাভেন্ডিশ গোত্রের কলা; জি-৯ কলা এই গোত্রের এবং বীজহীন হওয়ায় কেবল ক্লোনিংয়ে বংশবিস্তার হয়। ছবি: Andikan Efiok Eduok / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

বাগানের স্ট্রবেরি (Fragaria × ananassa) আমেরিকার দুটি প্রজাতি, পূর্ব উত্তর আমেরিকার ভার্জিনিয়া স্ট্রবেরি ও চিলির স্ট্রবেরির সংকর; চিলির প্রজাতিটি ১৭১৪ সালে ইউরোপে নিয়ে আসেন আমেদে-ফ্রাঁসোয়া ফ্রেজিয়ের, এরপর ১৭৫০-এর দশকে ফ্রান্সের ব্রিটানিতে প্রজননকারীরা সংকরটি তৈরি করেন এবং ১৭৬৬ সালে এর সংকর-উৎস নিশ্চিত হয়। বাগানের স্ট্রবেরি অক্টোপ্লয়েড, আর দিনের দৈর্ঘ্য কীভাবে ফুল ধরা নিয়ন্ত্রণ করে তার ভিত্তিতে জাতগুলোকে শর্ট-ডে, লং-ডে ও ডে-নিউট্রাল ভাগে ভাগ করা হয়। সাধারণত রানার থেকে এর বংশবিস্তার হয় এবং বাণিজ্যিকভাবে প্লাস্টিকে ঢাকা উঁচু বেডে (প্লাস্টিকালচার) চাষ করা হয়, তবে গাছটি পাউডারি মিলডিউ ও গ্রে মোল্ডসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়; তাই রোগমুক্ত টিস্যু কালচার চারা চাষিদের কাছে মূল্যবান।

বীজআলুও এই প্রযুক্তির উপযুক্ত। ভাইরাসে আক্রান্ত আলু থেকেও মেরিস্টেম-টিপ কালচারের মাধ্যমে রোগমুক্ত গাছ পাওয়া যায়, এ কারণে বিশ্বজুড়ে ভাইরাসমুক্ত বীজআলু উৎপাদনে টিস্যু কালচার বহুল ব্যবহৃত। স্টেভিয়া (Stevia rebaudiana) প্যারাগুয়ে ও ব্রাজিলের স্থানীয় উদ্ভিদ, যার পাতা চিনির চেয়ে ৫০ থেকে ৩০০ গুণ মিষ্টি; মাদারীপুর ল্যাবে এটি পরীক্ষামূলকভাবে উৎপাদিত হচ্ছিল। দক্ষিণ আমেরিকার গুয়ারানি জনগোষ্ঠী এই উদ্ভিদকে বলত 'কা-আ হে-এ' বা 'মিষ্টি পাতা' এবং শত শত বছর ধরে পানীয় মিষ্টি করতে এর পাতা ব্যবহার করেছে। এর মিষ্টতা আসে স্টিভিওসাইড ও রেবাউডিওসাইড-এ'র মতো স্টেভিওল গ্লাইকোসাইড থেকে, পাতায় যার প্রায় ৬০টি শনাক্ত হয়েছে; মানবদেহ এগুলো ভাঙতে পারে না বলে কোনো ক্যালরি যোগ হয় না। বাণিজ্যিক মিষ্টিকারক তৈরি হয় গরম পানিতে পাতা নিষ্কাশন করে গ্লাইকোসাইডগুলো কেলাসিত করে, যদিও বেশি ঘনত্বে কোনো কোনো নির্যাসে হালকা যষ্টিমধুর মতো স্বাদ থেকে যায়। উচ্চমূল্যের এমডি-২ আনারসও সেসব চারার একটি, যা আগে আমদানি করতে হতো।

আমদানিনির্ভরতা কমছে, তৈরি হচ্ছে নতুন উদ্যোক্তা


প্রকল্পটি কেবল চারা উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, কৃষি উদ্যোক্তা তৈরি, নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও মাঠপর্যায়ে সেই প্রযুক্তি সম্প্রসারণেও সহায়তা দিচ্ছে। ইতোমধ্যে হাজারো উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ নিয়েছেন, যাঁদের অনেকে টিস্যু কালচার চারা ব্যবহার করে বাণিজ্যিকভাবে ফুল, ফল ও উচ্চমূল্যের উদ্যান ফসলের চাষ শুরু করেছেন।

ডিএইর মহাপরিচালক মো. আব্দুর রহিম বলেন, আধুনিক কৃষিতে মানসম্মত ও রোগমুক্ত চারা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি; শুরু থেকেই সুস্থ ও অভিন্ন বৈশিষ্ট্যের চারা পেলে কৃষকের উৎপাদনশীলতা ও ফসলের গুণগত মান বাড়ে। তাঁর মতে, বর্তমানে তিনটি ল্যাবে সফলভাবে চারা উৎপাদন হচ্ছে এবং নতুন ল্যাবগুলো চালু হলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মানসম্মত চারার প্রাপ্যতা আরও বাড়বে।

প্রকল্প পরিচালক তালহা জুবাইর মাসরুর বলেন, উন্নতমানের রোগমুক্ত চারা সহজলভ্য করা এবং গবেষণাগারের প্রযুক্তি দ্রুত মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দেওয়াই এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য। তিনি জানান, জি-৯ কলা, এমডি-২ আনারস, জারবেরা কিংবা লিলিয়ামের মতো উচ্চমূল্যের চারার জন্য একসময় বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হতো; এখন সরকারি ল্যাবেই এসব উৎপাদিত হচ্ছে, যাতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমছে, দেশীয় নার্সারি খাত শক্তিশালী হচ্ছে এবং নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, প্রকল্পটি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, মাঠপর্যায়ের কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষকের মধ্যে একটি কার্যকর সংযোগ তৈরি করছে, ফলে গবেষণাগারে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি দ্রুত মাঠে পৌঁছাচ্ছে এবং নতুন জাত ও উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তির সম্প্রসারণ সহজ হচ্ছে।

বিশ্বজুড়ে টিস্যু কালচার


টিস্যু কালচার নতুন প্রযুক্তি নয়, আর এ পথে বাংলাদেশ বহু দেশের অনুসরণ করছে। অধ্যাপক এম. এ. রহিম উল্লেখ করেন, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া ও নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশে এ প্রযুক্তির সফল ব্যবহার হচ্ছে। তিনি বলেন, নির্মাণাধীন ল্যাবগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালু হলে দেশীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানিমুখী উদ্যান খাতের বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। তিনি যে নেদারল্যান্ডসের কথা বলেছেন, সেটি বিশ্বে কাটফ্লাওয়ার ও শোভাময় গাছ রপ্তানিতে শীর্ষে; সেখানকার এবং বাকি দেশগুলোর বাণিজ্যিক চাষিরা অভিন্ন ও রোগমুক্ত চারা বড় পরিসরে পেতে টিস্যু কালচারের ওপর অনেকখানি নির্ভর করেন। বাংলাদেশের জন্য একই পথ ধরার অর্থ, বাণিজ্যিক ফুল ও ফলচাষিরা যেসব পরিচ্ছন্ন চারা আগে বিদেশ থেকে কিনতেন, সেগুলো এখন দেশের হর্টিকালচার সেন্টারেই উৎপাদন করা এবং ধীরে ধীরে ওই দেশগুলোর মতো আঞ্চলিক ও রপ্তানি বাজারকে লক্ষ্য করা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও হর্টিকালচার সেন্টার


কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন দেশের প্রধান কৃষি সম্প্রসারণ সংস্থা, যার দায়িত্ব সারা দেশের কৃষকের কাছে উন্নত প্রযুক্তি ও পরামর্শ পৌঁছে দেওয়া। বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে থাকা এর হর্টিকালচার সেন্টারগুলো ফল, ফুল ও অন্যান্য উদ্যান ফসলের মানসম্মত চারা উৎপাদন ও বিতরণ করে। এই নেটওয়ার্কের মধ্যেই রয়েছে টিস্যু কালচার ল্যাবগুলো, যা সেন্টারগুলোকে বিপুল সংখ্যায় রোগমুক্ত চারা উৎপাদনের আধুনিক হাতিয়ার দিচ্ছে এবং অধিদপ্তরের মাঠকর্মীদের মাধ্যমে তা কৃষকের হাতে পৌঁছে দিচ্ছে।

ছবি: Angphotorion / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪; উইকিপিডিয়া (প্ল্যান্ট টিস্যু কালচার, ক্যাভেন্ডিশ কলা, জারবেরা, লিলিয়াম, স্টেভিয়া, স্ট্রবেরি)।

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

এগ্রোটেক

সম্পর্কিত খবর

এগ্রোটেক

বিনায় চালু হলো গামা ইরেডিয়েশন প্রযুক্তি, কৃষিপণ্য রপ্তানিতে নতুন সুযোগ

গাজীপুরে বিনার আঞ্চলিক কেন্দ্রে ৮৯ কোটি টাকার গামা ইরেডিয়েশন সেন্টার চালু হয়েছে; এতে আম-কাঁঠালের মতো কৃষিপণ্য জীবাণুমুক্ত করে বেশি দিন রাখা যাবে।

এগ্রিকেয়ার২৪১ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

সৌরবিদ্যুতের পাতকুয়ায় সেচ, মীরসরাইয়ে চাষের আওতায় ২০ একর পতিত জমি

বিএডিসির বসানো সৌরবিদ্যুৎচালিত ছয়টি ডাগওয়েল বা পাতকুয়া থেকে বিদ্যুৎ বা ডিজেল ছাড়াই সেচের পানি পাচ্ছেন মীরসরাইয়ের পাহাড়ি এলাকার কৃষকেরা।

এগ্রিকেয়ার২৪১ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
এগ্রোটেক

মৌচাকের মুখে রাখা খাদ্য সম্পূরকে বাড়ল মৌমাছির সংখ্যা, ব্লুবেরির পরাগায়নে গবেষণা

যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন স্টেট ইউনিভার্সিটি ও এইচফোরবিজের গবেষণায় ন্যানো-বি-ফিড পাওয়া মৌচাকে মৌমাছি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি দেখা গেছে; আরও বড় পরীক্ষার পরিকল্পনা আছে।

Farms.com৩১ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)