সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ২ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা৩০°মেঘলাআর্দ্রতা ৬৯%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

শীতের বার্তা নিয়ে বিষখালীর মোহনায় হাজারো পরিযায়ী পাখি

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে ঝালকাঠি সদরের গাবখান ধানসিঁড়ি ও পোনাবালিয়া ইউনিয়নে বিষখালী নদীর মোহনা হাজারো পরিযায়ী পাখির আশ্রয় হয়ে ওঠে। স্থানীয়রা জানান, কয়েক বছরের পাহারায় এখানে পাখি শিকার বন্ধ হয়েছে।

শীতের বার্তা নিয়ে বিষখালীর মোহনায় হাজারো পরিযায়ী পাখি
পরিবেশ

প্রতি বছরের মতো ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের মাঝামাঝিও ঝালকাঠির বিষখালী নদীর মোহনা হাজারো পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আশ্রয়স্থল হয়ে উঠেছিল বলে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর জাগো নিউজ ২৪ জানায়। সদর উপজেলার গাবখান ধানসিঁড়ি ও পোনাবালিয়া ইউনিয়নের নদীতীরবর্তী এলাকায় তখন পরিযায়ী পাখিদের আনাগোনা বেড়েছিল। একদিকে পাখির কিচিরমিচির শব্দে পরিবেশ মুখর হয়ে উঠেছিল, অন্যদিকে তাদের ‘লাভ’ ও ‘রকেট’ আকৃতির দলবদ্ধ ওড়াউড়ি মুগ্ধ করছিল স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকদের।

সদর উপজেলার বুক চিরে বয়ে গেছে সুগন্ধা, বিষখালী, গাবখান, বাসন্ডা ও ধানসিঁড়ি নদী। এই নদীগুলোর মোহনার পশ্চিম দিকে গাবখান ধানসিঁড়ি ইউনিয়ন, দক্ষিণ-পূর্ব কোণে পোনাবালিয়া ইউনিয়ন এবং উত্তর-পূর্ব কোণে ঝালকাঠি পৌর এলাকা। প্রতি বছর শীতে দূরদূরান্ত থেকে পাখিরা আসে এসব নদীপাড়ে, আর ভ্রমণপিপাসু মানুষ পাখি দেখতে ভিড় করেন নদীতীরের বিভিন্ন স্থানে। প্রতিবেদন অনুযায়ী পাখিদের কলকাকলি প্রকৃতির শোভা বহুগুণে বাড়িয়ে দেয়। প্রতিবেদনে কোনো প্রজাতির নাম বা পাখির সংখ্যা দেওয়া হয়নি; ‘হাজারো’ শব্দটি ঝাঁকগুলো সম্পর্কে প্রতিবেদনেরই বর্ণনা।

বিষখালী নদী ও তার মোহনা


বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় বিষখালী কীর্তনখোলা ও নলছিটি নদীরই একটি বর্ধিত ধারা। আড়িয়াল খাঁ নদী বরিশাল সদর উপজেলার ভাসানী চরে এসে ভাসানীচর নাম নেয়। বরিশাল শহরের ৫ কিলোমিটার উত্তরে এর নাম হয় কীর্তনখোলা, ঝালকাঠি জেলার নলছিটি উপজেলায় নলছিটি, আর ঝালকাঠি সদর উপজেলায় ঢুকে সুগন্ধা। এই সুগন্ধাই ঝালকাঠি শহরে এসে বিষখালী নাম ধারণ করে। সেখানে নদীটি একটি বড় বাঁক তৈরি করে সোজা দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের দিকে বয়ে গেছে। এই বাঁকের কাছে কাউখালী ও গাবখান খালের মাধ্যমে বিষখালী মধুমতী ও কচা নদীর প্রবাহ পায়। বামনা উপজেলার ভাটিতে বাকদুঘ, আয়লা প্রভৃতি নদীর মাধ্যমে বুড়িশ্বর নদীপ্রণালীর সঙ্গে এর সংযোগ রয়েছে, এবং পাথরঘাটার ১৩ কিলোমিটার ভাটিতে বলেশ্বর-হরিণঘাটা মোহনা দিয়ে নদীটি বঙ্গোপসাগরে পড়েছে।

নদীটির মোট দৈর্ঘ্য ৯৬ কিলোমিটার। উৎপত্তিস্থল থেকে প্রথম ৩০ কিলোমিটারে এর গড় প্রস্থ প্রায় ১ কিলোমিটার, বাকি অংশে প্রায় ২ কিলোমিটার, আর গড় গভীরতা প্রায় ১৬ মিটার। বিষখালী সম্পূর্ণভাবে জোয়ার-ভাটায় প্রভাবিত; বেতনা, বামনা, বরগুনা ও পাথরঘাটায় পানি সংগ্রহ করে এর লবণাক্ততা পরীক্ষা করা হয়। নদীটি তীর ভাঙে, আর এই ভাঙনে বেতাগী, আনুয়া ও বামনার মতো শহর ও বন্দর হুমকির মুখে; বন্যা ও লবণাক্ততা ঠেকাতে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বেড়িবাঁধ নির্মাণ করেছে। একই সঙ্গে নদীর নানা অংশে পলি জমে চর গড়ে উঠছে, আর কিছু চরে বসতি ও চাষাবাদ হয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, বিষখালীর দুটি শাখা বদনখালীকোন ও খাকদোন পর্যাপ্ত প্রবাহের অভাবে মরে যাচ্ছে। ঝালকাঠি, বেতাগী, কাঁঠালিয়া, বামনা, বরগুনা, পাথরঘাটা ও ফুলঝুরি নদীটির উত্তর তীরের উল্লেখযোগ্য কয়েকটি স্থান।

এমন নদী পাখিদের কেমন আবাস দেয়, বাংলাপিডিয়ার জলাভূমি শ্রেণিবিভাগে তার ইঙ্গিত মেলে। লবণাক্ত জলাভূমির মধ্যে সেখানে রয়েছে মোহনা জলাভূমি: জোয়ার-ভাটার কাদা, বালু বা লবণাক্ত সমতল, যেখানে গাছপালা কম, যেমন নতুন জেগে ওঠা ভূমি, এবং জোয়ারপ্লাবিত জলা। মিঠাপানির জলাভূমির মধ্যে রয়েছে নদীজ জলাভূমি: স্থায়ী নদী ও স্রোতধারা, যার মধ্যে কিছু চরভূমিও পড়ে। বাংলাদেশে আসা পরিযায়ী সৈকতপাখিদের বিবরণে বাংলাপিডিয়া বলছে, এদের বেশির ভাগই উপকূলীয় এলাকা, মোহনা, চরভূমি, বিল, বাঁওড়, হাওর, পাহাড়ি ছড়া, পুকুর ও হ্রদে সীমাবদ্ধ থাকে।

ঝালকাঠিতে বিষখালী নদী, ২০১৬ সালের মার্চে তোলা। ছবি: Lonely Explorer / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
ঝালকাঠিতে বিষখালী নদী, ২০১৬ সালের মার্চে তোলা। ছবি: Lonely Explorer / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ঝালকাঠি সদর: নদীঘেরা এক উপজেলা


বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী বরিশাল বিভাগের ঝালকাঠি জেলার আয়তন ৭০৬ দশমিক ৭৬ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তর ও পূর্বে বরিশাল জেলা, পশ্চিমে পিরোজপুর জেলা এবং দক্ষিণে বরগুনা জেলা ও বিষখালী নদী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ৬ লাখ ৮২ হাজার ৬৬৯ জন, আর গড় সাক্ষরতার হার ৬৬ দশমিক ৭ শতাংশ। ঝালকাঠি মহকুমা গঠিত হয় ১৯৭২ সালে এবং ১৯৮৪ সালে এটি জেলায় উন্নীত হয়। জেলায় চারটি উপজেলা: কাঁঠালিয়া, ঝালকাঠি সদর, নলছিটি ও রাজাপুর। বাংলাপিডিয়া বিষখালী, গাজালিয়া, নলছিটি ও কালিজিরাকে জেলার প্রধান নদী হিসেবে উল্লেখ করেছে এবং আয়ের প্রধান উৎস হিসেবে কৃষির হার দেখিয়েছে ৪৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ, এরপর ব্যবসা ১৬ দশমিক ৪৫ শতাংশ ও চাকরি ১৪ দশমিক ৮৯ শতাংশ।

যে ঝালকাঠি সদর উপজেলায় পাখিরা জড়ো হয়, তার আয়তন ১৫৯ দশমিক ৪৫ বর্গকিলোমিটার এবং ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ১৬ হাজার ৩৪৮ জন। ঝালকাঠি থানা গঠিত হয় ১৯১৩ সালে এবং ১৯৮৪ সালে উপজেলায় রূপ নেয়; পৌরসভা গঠিত হয় ১৮৭৫ সালে। উপজেলায় ১০টি ইউনিয়ন, যার মধ্যে রয়েছে গাবখান ধানসিঁড়ি, পোনাবালিয়া ও বাসন্ডা। বাংলাপিডিয়ার তথ্যে এখানকার প্রধান ফসল ধান, ডাল ও শাকসবজি; প্রধান ফল আম, কলা, পেঁপে, সুপারি, জাম ও নারকেল; আর উল্লেখযোগ্য হাটের মধ্যে বাউকাঠি হাট, ঝালকাঠি হাট ও গাবখান হাট। আয়ের প্রধান উৎস কৃষি ৩৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ, ব্যবসা ১৮ দশমিক ৪০ শতাংশ ও চাকরি ১৬ দশমিক ৮৮ শতাংশ; প্রধান রপ্তানিপণ্য ধান ও লবণ।

এই নদীগুলোর তীরে জীবন বরাবরই ঝুঁকির। বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৭৮৬ ও ১৯৮৮ সালের বন্যা এবং ১৮২২, ১৯০৯, ১৯৬০ ও ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে উপজেলায় ব্যাপক প্রাণহানি ঘটে, সঙ্গে বসতবাড়ি, গবাদিপশু ও ফসলের বড় ক্ষতি হয়।

হোগল বন কেন পাখিদের আশ্রয়


সাচিলাপুর এলাকার লিটু গোমস্তা, রবিন ও আফছার জাগো নিউজকে জানান, প্রতি বছরই শীত মৌসুমে এখানে পরিযায়ী পাখির আগমন ঘটে। নদীর চরে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে হোগল বন রয়েছে, সেখানেই পাখিদের আশ্রয়স্থল। পাখিরা সাধারণত সকালে ও পড়ন্ত বিকেলে ঝাঁক বেঁধে উড়ে বেড়ায়; অন্য সময় খাবারের খোঁজে ও বিশ্রামে থাকে। নৌযানের শব্দ বা কেউ কোনোভাবে বিরক্ত করলে তারা আবার উড়তে শুরু করে। তাদের দল বেঁধে ওড়া একেক সময় একেক শৈল্পিক রূপ নেয়; কখনো ‘লাভ’, ‘লকেট’, ‘রকেট’ বা ‘বিমান’ আকৃতিতে ওড়ে বলে তারা জানান।

বাংলাপিডিয়া জানায়, হোগল বা হোগলা হলো টাইফেসি (Typhaceae) গোত্রের উদ্ভিদ Typha elephantiana-এর স্থানীয় নাম। সুন্দরবনের নদী-নালার কিনার বরাবর এটি প্রচুর জন্মে। দেখতে সাধারণ ঘাসের মতো এই উদ্ভিদ দুই থেকে পাঁচ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। এর পত্রফলক চ্যাপ্টা ও স্পঞ্জের মতো নরম কলায় গঠিত, মূলতন্ত্র আঁশের মতো, আর এটি প্রচুর পরাগরেণু তৈরি করে। সুন্দরবন ছাড়াও সিলেটের বিল, হাওর ও অন্যান্য নিচু এলাকায় প্রচুর হোগলা জন্মে। মাদুর তৈরিতে এর ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে; শুকনো হোগলা দিয়ে ঝুড়ি, দড়ি ও নানা হস্তশিল্পও তৈরি হয়।

এমন উদ্ভিদ কমে যাওয়া নিয়ে একই জ্ঞানকোষ সতর্ক করেছে। জলাভূমিবিষয়ক নিবন্ধে বাংলাপিডিয়া বলছে, হাওর এলাকায় মাখনা (Euryale ferox), সিংগাড়া (Trapa bispinosa), পদ্ম, শাপলা ও হোগলার মতো জলজ উদ্ভিদ ও ফলের ধারাবাহিক ও ব্যাপক আহরণে সেখানকার মাছ ও পরিযায়ী পাখির প্রয়োজনীয় আবাসের পরিমাণ ও মান মারাত্মকভাবে কমে গেছে। বাসিন্দারা বিষখালীর চরে যে হোগল বনের কথা বলেছেন, তা ঠিক এ ধরনেরই আবাস।

শীতে বাংলাদেশে যেসব পরিযায়ী পাখি আসে


বাংলাপিডিয়ার হিসাবে বাংলাদেশে ১৬টি বর্গ ও ৬৭টি গোত্রের ৬২৮ প্রজাতির পাখি নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৮৮টি আবাসিক এবং ২৪০টি পরিযায়ী। গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে পাখির প্রজাতি ১ হাজার ২০০-এর বেশি।

বাংলাপিডিয়া পরিযায়ী পাখি বলতে সেসব পাখিকে বোঝায়, যারা নির্দিষ্ট সময় পরপর, বিশেষ করে শীতে, বাংলাদেশে আসে। কোনো এলাকায় অবস্থান অনুযায়ী পাখিদের চারটি দলে ভাগ করা হয়: স্থায়ী আবাসিক, গ্রীষ্মকালীন আবাসিক বা অতিথি, শীতকালীন আবাসিক বা অতিথি, এবং পান্থ পরিযায়ী, যারা প্রজননস্থলে যাওয়া-আসার পথে বছরে দুবার একটি এলাকা পেরিয়ে যায়। কিছু প্রজাতি বাংলাদেশে নেমে মাত্র এক-দুই দিন থেকে আরও দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্বের গন্তব্যে চলে যায়; আবার কিছু প্রজাতি শরৎ বা বসন্তের যাত্রাপথে বেশি দিন বিরতি নেয়। পরিযানের সময়ও নির্দিষ্ট। গাছপালার আড়ালের ওপর নির্ভরশীল দুর্বল উড়িয়ে পাখি, যেমন কোকিল, থ্রাশ (দামা) ও রেন, রাতে পাড়ি দেয়; খোলা জায়গায় থাকা বা উড়ন্ত অবস্থায় খাবার ধরা দ্রুতগামী পাখি, যেমন বাজ, আবাবিল ও কসাই পাখি, দিনে পাড়ি দেয়; আর রাজহাঁসজাতীয় পাখি ও অনেক সৈকতপাখির মতো কিছু বড় পাখি দিনে-রাতে দুই সময়েই পাড়ি দেয়।

বাংলাপিডিয়া বলছে, বাংলাদেশে আসা পরিযায়ী পাখির বেশির ভাগই আসে উপমহাদেশের উত্তরের পার্বত্য অঞ্চল, অর্থাৎ হিমালয় ও তার ওপার থেকে। কিছু প্রজাতি আসে ইউরোপের নানা অঞ্চল থেকে, কিছু সুদূর সাইবেরিয়া থেকেও; সব মিলিয়ে এরা ইউরেশিয়া থেকে দক্ষিণ, দক্ষিণ-পূর্ব ও পূর্ব এশিয়ার দিকে পাখিদের বিশাল দক্ষিণমুখী পরিযানের অংশ। ইউরেশিয়ায় প্রজননকারী ৬০০-এর বেশি প্রজাতির পাখি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া কিংবা আফ্রিকায় পরিযান করে, আর বাংলাদেশে আসে তাদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি। সাইবেরিয়া থেকে আসে হাতে গোনা কয়েকটি প্রজাতি; বেশির ভাগ আসে হিমালয় ও উত্তর এশিয়া থেকে।

নদী ও চরে আসা শীতের অতিথিদের অনেকেই সৈকতপাখি। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী স্কোলোপাসিডি (Scolopacidae) গোত্রের সব সদস্যই পরিযায়ী। বাংলাদেশে এদের মধ্যে সচরাচর দেখা যায় দুই প্রজাতির গুলিন্দা (কার্লিউ), দুই প্রজাতির জৌরালি (গডউইট), ১৩ থেকে ১৪ প্রজাতির চাপাখি (স্যান্ডপাইপার), পাঁচ থেকে ছয় প্রজাতির কাদাখোঁচা (স্নাইপ), বনমোরগসদৃশ উডকক, তিন থেকে চার প্রজাতির বামন চাপাখি (স্টিন্ট ও ডানলিন) এবং রাফ। কাদাখোঁচা ও উডকক সাধারণত একা থাকে, কিন্তু অন্যরা সাধারণত কয়েকটি থেকে কয়েক হাজার সদস্যের ঝাঁকে থাকে, আর বড় ঝাঁকগুলো থাকে বড় জলাশয়ে। বাংলাপিডিয়া এটিও উল্লেখ করেছে যে গুলিন্দা, জৌরালি, কাদাখোঁচা ও উডকক পৃথিবীর নানা অঞ্চলে শিকারের পাখি বা ‘গেম বার্ড’ হিসেবে গণ্য, অর্থাৎ নিয়মিত বন্দুক দিয়ে শিকার করা হয়।

বাংলাদেশের একটি নদীতে পরিযায়ী পাখি, ২০১৪ সালের নভেম্বরে তোলা; প্রেক্ষাপট হিসেবে দেওয়া, বিষখালীর ছবি নয়। ছবি: Asifsaleheen / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশের একটি নদীতে পরিযায়ী পাখি, ২০১৪ সালের নভেম্বরে তোলা; প্রেক্ষাপট হিসেবে দেওয়া, বিষখালীর ছবি নয়। ছবি: Asifsaleheen / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

মধ্য এশীয় পরিযান পথের এক বিরতিস্থল


বিষখালীতে শীত কাটানো পাখিরা এক মহাদেশজোড়া যাত্রার অংশ। পরিযায়ী বন্যপ্রাণী সংরক্ষণবিষয়ক কনভেনশনের (সিএমএস) আওতায় মধ্য এশীয় পরিযান পথের (সেন্ট্রাল এশিয়ান ফ্লাইওয়ে) দেশগুলো ২০০৫ সালের ১০ থেকে ১২ জুন নয়াদিল্লির এক সভায় পরিযায়ী জলচর পাখি ও তাদের আবাস সংরক্ষণে একটি কর্মপরিকল্পনা চূড়ান্ত করে। পরিকল্পনাটিতে এই পরিযান পথকে উত্তর মহাসাগর ও ভারত মহাসাগরের মাঝের ইউরেশিয়ার বিশাল মহাদেশীয় এলাকা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এতে জলচর পাখির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিযান রুট রয়েছে, যার বেশির ভাগ রাশিয়ার (সাইবেরিয়া) সর্বউত্তরের প্রজননস্থল থেকে পশ্চিম ও দক্ষিণ এশিয়া, মালদ্বীপ ও ব্রিটিশ ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলের শীতকালীন আবাস পর্যন্ত বিস্তৃত। পথটি উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া এবং ট্রান্স-ককেশাসের ৩০টি দেশজুড়ে, আর পরিকল্পনায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশ হিসেবে ভুটান, ভারত, মালদ্বীপ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার সঙ্গে বাংলাদেশের নাম রয়েছে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী এই পরিযান পথে অন্তত ১৮২ প্রজাতির ২৭৯টি পরিযায়ী জলচর পাখির জনগোষ্ঠী রয়েছে, যার মধ্যে ২৯টি প্রজাতি বিশ্বব্যাপী বিপন্ন বা বিপন্নপ্রায়; এরা এই অঞ্চলেই প্রজনন, পরিযান ও শীতযাপন করে। ১৮২ প্রজাতির মধ্যে ১৭টি সিএমএসের পরিশিষ্ট ১-এ এবং ১০৩টি পরিশিষ্ট ২-এ তালিকাভুক্ত। পরিকল্পনায় ‘ফ্লাইওয়ে’ বা পরিযান পথ বলতে বোঝানো হয়েছে একদল পাখির জনগোষ্ঠী সারা বছরে যে মোট এলাকা ব্যবহার করে, প্রজননস্থল, যাত্রাবিরতির স্থান ও শীতকালীন আবাসসহ। এতে আরও বলা হয়েছে, অন্যান্য পরিযায়ী জলচর পাখি এই অঞ্চল পেরিয়ে যায় এমন পরিযান পথে, যা উত্তর মধ্য এশিয়াকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলেশিয়ার সঙ্গে (পূর্ব এশীয়-অস্ট্রেলেশীয় পরিযান পথ) এবং আফ্রিকা ও ইউরোপের সঙ্গে যুক্ত করে।

পাখিগুলো কী হুমকির মুখে, পরিকল্পনায় তা-ও বলা আছে। এতে বলা হয়েছে, গোটা অঞ্চলে দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও উন্নয়ন জোয়ারপ্লাবিত ও মিঠাপানির জলাভূমি, তৃণভূমি ও অন্যান্য আবাসের ওপর চাপ নাটকীয়ভাবে বাড়িয়েছে; এতে আবাসের অবক্ষয় ও বিলুপ্তি, দূষণ এবং জলচর পাখি আহরণ ঘটেছে, ফলে জলচর পাখির সংখ্যা কমেছে এবং স্থানীয়ভাবে বিলুপ্তিও ঘটেছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বড় উপকূলীয় জলাভূমি ও দ্বীপ অনেক প্রজাতির জন্য ভালো আবাস, কিন্তু অনেক জলাভূমি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায়, যেখানে এগুলো মানুষকে নানা পণ্য ও সেবা দেয়, অথচ অটেকসই ব্যবহারে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে ও নষ্ট হচ্ছে। পদক্ষেপ হিসেবে পরিকল্পনাটি দেশগুলোকে অবৈধভাবে পাখি ধরা, চোরাশিকার এবং বিষটোপ, মিস্ট নেট বা কুয়াশাজাল, ফাঁদ ও বিস্ফোরকের মতো অটেকসই শিকারপদ্ধতি নির্মূল বা যথাসম্ভব কমাতে, অবৈধ শিকার ঠেকাতে বন্দুকের মালিকানা নিয়ন্ত্রণ করতে, অবৈধ বাণিজ্য বন্ধ করতে এবং শিকারিদের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিতে বলেছে।

স্থানীয় মানুষ যেভাবে পাখি রক্ষা করছেন


লিটু গোমস্তা, রবিন ও আফছার জানান, আগে শিকারিরা বন্দুক নিয়ে পাখি শিকারে আসতো। তখন তাদের নিষেধ করলে অনেক সময় তর্ক-বিতর্কও হতো। তোপের মুখে শিকারিরা পাখি শিকার না করেই ফিরে যেতো। এভাবে কয়েক বছর পাখি রক্ষায় তৎপর থাকায় এখন আর কেউ এখানে পাখি শিকারে আসে না বলে তারা জানান।

পাখিপ্রেমী ও ব্যবসায়ী শামসুল হক মনু জানান, শীত এলেই জলাশয়, নদীতীরের নিরাপদ স্থানসহ বিভিন্ন হাওর, বিল ও পুকুরের পাড়ে চোখে পড়ে নানা রং-বেরঙের নাম জানা, অজানা পাখি। অথচ বেআইনিভাবে শিকার হচ্ছে এসব পাখি। তাঁর মতে, পরিযায়ী পাখি আমাদের বন্ধু, ঐতিহ্য, গর্ব ও প্রেরণা; অচেনা পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে এ পাখিদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করা দরকার, কারণ পাখি রক্ষা করা আমাদের দায়িত্ব।

মনু আরও জানান, পরিযায়ী পাখিদের বিচরণভূমি ক্রমশ সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। বন-জঙ্গল কেটে উজাড় করায় পাখিরা হারাচ্ছে তাদের নিরাপদ আশ্রয়। আবার ফসলি জমিতে কৃত্রিম সার ও মাত্রাতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে বিষে আক্রান্ত কীটপতঙ্গ খেয়ে মারা যাচ্ছে অতিথি পাখিরা।

পাখি কেন কম আসছে: বিশেষজ্ঞ ও গবেষণা


বরিশাল সরকারি সৈয়দ হাতেম আলী কলেজের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোসাম্মাৎ জেবুন্নেছা জাগো নিউজকে জানান, আশঙ্কাজনক হারে দেশে শীতে পাখি আসার সংখ্যা কমে যাচ্ছে। এর কারণ হিসেবে তিনি পাখিদের বাসস্থান সংকট, বিষটোপ ব্যবহারের কারণে খাদ্যসংকট, পাখির জীবন বিপন্ন করা, শিকার ও পাচারের কথা বলেন। তাঁর মতে, আইন প্রয়োগে কঠোর হতে হবে; তবে মানুষ সচেতন না হলে আইন প্রয়োগে খুব একটা সফলতা আসবে না, তাই প্রশাসনের সঙ্গে সবারই সহযোগিতা করতে হবে।

আবাসিক পাখির জাতীয় চিত্র দিয়েছে বাংলাপিডিয়া। দেশের ৩৮৮টি আবাসিক প্রজাতির মধ্যে ৪১টি বাংলাদেশে বিপন্ন: ১৯টি মহাবিপন্ন, ১৮টি বিপন্ন ও ৪টি সংকটাপন্ন; আর তথ্যের অভাবে ১৫৮টি প্রজাতির অবস্থা মূল্যায়ন করা যায়নি। বন বা জলাময় আবাসনির্ভর পাখিরা কমে গেছে, এবং ৭০ থেকে ৮০ বছর আগেও মোটামুটি বিস্তৃত গোলাপিশির হাঁস, নাকতা হাঁস, ময়ূর ও বর্মি ময়ূর দেশ থেকে কার্যত হারিয়ে গেছে। আইইউসিএন ২০০০ সালে বাংলাদেশের পাখিবিষয়ক লাল তালিকা বই (রেড বুক) প্রকাশ করে।

দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জলাভূমিতে জলচর পাখির প্রবণতা মেপেছে ২০২৩ সালে পিয়ার-রিভিউড সাময়িকী অ্যাভিয়ান কনজারভেশন অ্যান্ড ইকোলজিতে প্রকাশিত একটি দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা। আইইউসিএন বাংলাদেশ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গবেষকেরা ২০০৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত প্রতি শীতে উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের ৯ হাজার ৫০০ হেক্টরের রামসার এলাকা টাঙ্গুয়ার হাওরে জলচর পাখি গণনা করেন; এ কাজে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব ও বাংলাদেশ বন অধিদপ্তর সহযোগিতা করে। তাঁরা ৬৯ প্রজাতির জলচর পাখি নথিভুক্ত করেন, যার ৪১টি পরিযায়ী ও ২৮টি আবাসিক। সর্বোচ্চ ১ লাখ ৬৬ হাজার ৭৮৮টি পাখি গণনা হয় ২০১৩ সালে, আর সর্বনিম্ন ২৮ হাজার ৯২৫টি ২০১০ সালে। পরিযায়ী প্রজাতির মধ্যে ২৩টির (৫৯ শতাংশ) সংখ্যা কমার প্রবণতা দেখা যায়, যার মধ্যে রয়েছে মহাবিপন্ন বেয়ারের ভুতিহাঁস (বেয়ার্স পোচার্ড) ও সংকটাপন্ন পাতি ভুতিহাঁস (কমন পোচার্ড); আর ১৬টির (৪১ শতাংশ) সংখ্যা বাড়ার প্রবণতা দেখা যায়।

গবেষণাটি হাওরের ওপর চাপের কারণগুলোও তুলে ধরেছে। আগের গবেষণা উদ্ধৃত করে এতে বলা হয়েছে, মাত্র তিন দশকে মানুষের কর্মকাণ্ডে মূল হাওর অববাহিকার প্রায় ৪০ শতাংশ নিচু কৃষিজমি ও বসতিতে পরিণত হয়েছে, এবং ১৯৮০ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে গভীর জলের প্রায় ৭১ শতাংশ অগভীর জলে, পরে ধানখেতে রূপ নিয়েছে। গৃহপালিত হাঁস পালন বৃদ্ধি, গবাদিপশু চরানো, ইঞ্জিনচালিত ও বৈঠাচালিত নৌকা এবং জ্বালানি কাঠ সংগ্রহ পরিযায়ী জলচর পাখির জন্য বড় হুমকি; আর শীতে উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের জলাভূমিতে জাল ও বিষটোপ দিয়ে অবৈধ পাখি শিকার ক্রমবর্ধমান সমস্যা। গবেষকেরা হাওরের ভেতরে পাখির অভয়াশ্রম গড়ে সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করার সুপারিশ করেন।

বাংলাপিডিয়ার জলাভূমি নিবন্ধ এই ক্ষতিকে জাতীয় প্রেক্ষাপটে রেখেছে। এর হিসাবে দেশের জলাভূমির পরিমাণ ৭০ থেকে ৮০ লাখ হেক্টর, যা মোট ভূমির প্রায় অর্ধেক। দেশের প্রায় ১ হাজার ৫০০ প্রজাতির মেরুদণ্ডী প্রাণীর মধ্যে প্রায় ৭৫০টি পাখি, আর প্রায় ৪০০ প্রজাতির মেরুদণ্ডী প্রাণী ও প্রায় ৩০০ প্রজাতির উদ্ভিদ জীবনের পুরো বা আংশিক সময় জলাভূমির ওপর নির্ভরশীল। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র প্লাবনভূমিতে বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পে প্রায় ২১ লাখ হেক্টর জলাভূমি হারিয়ে গেছে, আর দক্ষিণ-পশ্চিমে চিংড়িচাষের বিস্তারে খালে দ্রুত পলি জমেছে এবং জমি লবণপানিতে স্থায়ীভাবে প্লাবিত থাকছে।

চখাচখি বা রাডি শেলডাক, শীতে বাংলাদেশে আসা হাঁসগুলোর একটি; ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে রাজশাহীতে তোলা, প্রেক্ষাপট হিসেবে দেওয়া। ছবি: Aneekchanda / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)
চখাচখি বা রাডি শেলডাক, শীতে বাংলাদেশে আসা হাঁসগুলোর একটি; ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে রাজশাহীতে তোলা, প্রেক্ষাপট হিসেবে দেওয়া। ছবি: Aneekchanda / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 4.0)

জলচর পাখি গণনা যেভাবে হয়


টাঙ্গুয়ার হাওরের মতো গণনা একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে হয়। ২০২৩ সালের গবেষণাটি জানায়, শুমারি হয়েছে প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে, যখন পাখিরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় কম সরে; সকাল ছয়টা থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত তিন থেকে পাঁচজনের দল গণনা করেছে, যাঁদের প্রত্যেকের অন্তত ১০ বছরের জলচর পাখি জরিপের অভিজ্ঞতা আছে। গণনার সংখ্যা, স্থানের নাম, তারিখ ও সময়, আবহাওয়া ও আবাসের তথ্য লেখা হয়েছে এশীয় জলচর পাখি শুমারির (এশিয়ান ওয়াটারবার্ড সেনসাস) জন্য তৈরি প্রমিত তথ্যপত্রে। ১ হাজারের বেশি পাখির বড় জমায়েত ‘ব্লক কাউন্ট’ পদ্ধতিতে অনুমান করা হয়েছে, নির্ভুলতা বাড়াতে এবং বিরল বা ছোট প্রজাতি খুঁজে পেতে প্রতিটি ঝাঁক কয়েকবার গোনা হয়েছে, আর পাখির ঝাঁক থেকে স্থল ৫০০ মিটারের বেশি দূরে থাকলে প্রায়ই কাঠের নৌকা থেকে গণনা হয়েছে। পাখিদের বিরক্ত না করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

গবেষণাটিতে জলচর পাখি হিসেবে ধরা হয়েছে রামসার কনভেনশন স্বীকৃত দলগুলোকে: ডুবুরি, পানকৌড়ি, গগনবেড়, বক ও বগলা, মানিকজোড়, কাস্তেচরা, চামচঠুঁটি, ফ্লেমিংগো, হাঁস, রাজহাঁস, সারস, জলমুরগি, জলপিপি, সৈকতপাখি, গাংচিল ও পানচিল। মধ্য এশীয় পরিযান পথের সিএমএস কর্মপরিকল্পনা বলছে, এ অঞ্চলে জলচর পাখির অবস্থা ও প্রবণতা নিয়ে তথ্য সীমিত ও পুরোনো, তাই পরিযান পথ ও দেশীয় পর্যায়ে আরও তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।

আইন ও প্রশাসনের ভূমিকা


২০২৫ সালের ডিসেম্বরে কার্যকর আইন ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ (২০১২ সনের ৩০ নং আইন, ১০ জুলাই ২০১২)। এর ৬ ধারায় বলা হয়েছে, এই আইনের অধীন লাইসেন্স বা ক্ষেত্রমতো পারমিট ছাড়া কেউ কোনো বন্যপ্রাণী শিকার করতে পারবেন না, এবং সরকার সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে কোনো নির্দিষ্ট বা সব বন্যপ্রাণীর শিকার কোনো নির্দিষ্ট বন বা এলাকায় বা সারা দেশে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নিষিদ্ধ করতে পারবে।

৩৮ ধারা পাখি নিয়ে। আইনের তফসিল ১ ও ২-এ উল্লিখিত কোনো পাখি বা পরিযায়ী পাখি হত্যা করলে সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড হবে; একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ ২ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। এমন পাখির ট্রফি বা অসম্পূর্ণ ট্রফি, মাংস বা দেহের অংশ সংগ্রহ, দখলে রাখা, কেনা-বেচা বা পরিবহন করলে সর্বোচ্চ ৬ মাসের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড, আর পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ ১ বছরের কারাদণ্ড, সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড। ৪৯ ধারা অনুযায়ী বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের স্বার্থে সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপন দিয়ে এয়ারগান আমদানি, বিক্রয়, ব্যবহার বা বহনে নিষেধাজ্ঞা দিতে পারে, তবে নিবন্ধিত শুটিং ক্লাব ও বনাঞ্চলসংলগ্ন এলাকার জনগোষ্ঠীকে এর বাইরে রাখতে হবে।

আইনে অভয়ারণ্য বলতে এমন এলাকাকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে বন্যপ্রাণী ধরা, মারা, গুলি ছোড়া বা ফাঁদ পাতা নিষিদ্ধ এবং মূলত বন্যপ্রাণীর নিরাপদ বংশবিস্তারের জন্য উদ্ভিদ, মাটি ও পানির মতো প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণের ব্যবস্থাপনা করা হয়। ১৩ ধারা অনুযায়ী সরকার গেজেট প্রজ্ঞাপন দিয়ে কোনো সরকারি বন, সরকারি ভূমি, জলাভূমি বা যেকোনো নির্দিষ্ট এলাকাকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করতে পারে, এবং তাকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, পাখি অভয়ারণ্য, হাতি অভয়ারণ্য, জলাভূমিনির্ভর প্রাণী অভয়ারণ্য বা মেরিন প্রটেক্টেড এরিয়া হিসেবে নির্ধারণ করতে পারে। কোনো জলাভূমিকে অভয়ারণ্য ঘোষণা করা হলে সেখানে বসবাসরত জেলে, নৌকাচালকসহ জনগোষ্ঠীর পেশাগত, প্রথাগত বা জীবিকার অধিকার সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখতে হবে। জাগো নিউজের প্রতিবেদনে বিষখালীর মোহনাকে এই আইনে অভয়ারণ্য ঘোষণার কোনো তথ্য ছিল না।

বাংলাদেশের চর কুকরি-মুকরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে খাবার খুঁজছে পাখিরা, ২০১৫ সালের এপ্রিলে তোলা; প্রেক্ষাপট হিসেবে দেওয়া। ছবি: Tawfiqur Rahman / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশের চর কুকরি-মুকরি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যে খাবার খুঁজছে পাখিরা, ২০১৫ সালের এপ্রিলে তোলা; প্রেক্ষাপট হিসেবে দেওয়া। ছবি: Tawfiqur Rahman / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ঝালকাঠি সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সেগুফতা মেহনাজ জাগো নিউজকে বলেন, অতিথি পাখি আমাদের সম্পদ, তাদের রক্ষা করা আমাদেরই দায়িত্ব, কারণ তারা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে। কেউ পাখিদের অভয়াশ্রমে বিরক্ত করলে বা কোনো শিকারি সেখানে গিয়ে পাখি শিকারের চেষ্টা করলে প্রশাসনকে জানালে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে তিনি জানান।

ছবি: Lonely Explorer / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১৪ ডিসেম্বর ২০২৫), বাংলাপিডিয়া (বিষখালী নদী, ঝালকাঠি জেলা, ঝালকাঠি সদর উপজেলা, পাখি, জলাভূমি, হোগলা), বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ (লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ, বাংলাদেশ কোড), সিএমএস মধ্য এশীয় পরিযান পথ কর্মপরিকল্পনা (২০০৫), অ্যাভিয়ান কনজারভেশন অ্যান্ড ইকোলজি (আলম ও সহকর্মী, ২০২৩)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

পরিবেশ

সম্পর্কিত খবর

পরিবেশ

মধ্যপ্রদেশের শালবনে আবার বোরার পোকা, কাটা হয়েছে ৪৫ হাজার গাছ

ভারতের মধ্যপ্রদেশের দিন্দোরিতে শালগাছের নিচে নতুন করাতগুঁড়া বলছে, শাল বোরার পোকার নতুন আক্রমণ শুরু হয়েছে; অথচ গত বছরের আক্রান্ত দেড় লাখ গাছ কাটার কাজ এখনো চলছে।

ডাউন টু আর্থ২ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় মুরাসু, অন্ধ্রে নারকেল-কলাচাষিদের ক্ষতি না কাটতেই নতুন শঙ্কা

ঘূর্ণিঝড় আর্নাবের এক সপ্তাহ না যেতেই ২-৩ নভেম্বর রাতে ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার পর্যন্ত দমকা হাওয়া নিয়ে অন্ধ্র প্রদেশের দক্ষিণ উপকূলে আঘাত হানার পূর্বাভাস ছিল ঘূর্ণিঝড় মুরাসুর।

ডাউন টু আর্থ২ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

কাশ্মীরে গবাদিপশু ও বন্যপ্রাণীর পথ মিলছে ৩৪ জায়গায়, খুরারোগের ঝুঁকি

জম্মু কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা মানচিত্র এঁকে দেখিয়েছেন, পশুপালকদের মৌসুমি পথ সংরক্ষিত এলাকার কাছ দিয়ে যাওয়ায় হাঙ্গুল, মারখোরের মতো বিরল বন্যপ্রাণীতে খুরারোগ ছড়ানোর ঝুঁকি আছে।

Mongabay India২ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)