খরচের তুলনায় লাভ ভালো হওয়ায় ঝিনাইদহ জেলার মহেশপুর উপজেলায় পাবদা মাছের চাষ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে বলে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে জাগো নিউজ জানায়। উপজেলায় ২০১৬ সালে মাত্র দুজন চাষি পাবদা চাষ শুরু করেছিলেন; তখন পাবদাচাষির সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ৩০ জনে। আগের মৌসুমে উপজেলায় ১৫০ মেট্রিক টনের বেশি পাবদা উৎপাদিত হয়েছিল, আর পরের মৌসুমে উৎপাদন আরও বাড়বে বলে আশা করেছিল মৎস্য বিভাগ।
মহেশপুর বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমে খুলনা বিভাগের ঝিনাইদহ জেলার একটি সীমান্তবর্তী উপজেলা। এর আয়তন ৪১৭.৮৫ বর্গকিলোমিটার, উত্তরে ও পশ্চিমে ভারতের উত্তর ২৪ পরগনা ও নদিয়া জেলা। উপজেলার প্রধান নদী কপোতাক্ষ। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে এখানকার জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৩২ হাজার ৫১৪।

পোনা থেকে বাজারের মাছ: চাষের পদ্ধতি
চাষিরা ময়মনসিংহের বিভিন্ন বেসরকারি হ্যাচারি থেকে পাবদার পোনা সংগ্রহ করে আনেন। পুকুরে সেগুলোকে মিশ্র ও দানাদার খাবার খাইয়ে বড় করা হয়। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, সাধারণত মার্চের শুরুতে পুকুরে পোনা ছাড়া হয় এবং ছয় মাস পর থেকে মাছ ধরার উপযোগী হয়।
পানির পরিবেশ ঠিক রাখতে পাবদার সঙ্গে পুকুরে অন্য জাতের মাছও রাখা হয়, যাকে চাষিরা মিশ্র চাষ বলেন। খামারি আব্বাস জানান, মাছের গঠন ঠিক রাখতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দানাদার খাবার ব্যবহার করা হয়। আরেক খামারি জানান, মৎস্য বিভাগ তাঁদের নানাভাবে প্রশিক্ষণ দেয় এবং কোনো সমস্যা দেখা দিলে কর্মকর্তারা এসে পুকুরের পানি পরীক্ষাসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেন।

খরচ, লাভ ও পুকুরপাড়ে বিক্রি
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সাধারণত এক বিঘা আয়তনের একটি পুকুরে দেড় লাখ টাকা খরচ করে প্রায় ৩ লাখ টাকার মাছ বিক্রি করা যেত। পুকুরপাড় থেকেই পাবদা বিক্রি হচ্ছিল গড়ে কেজিপ্রতি ৩৩০ টাকায়।
চাষিদের কাছে বিক্রির সুবিধাই ছিল বড় আকর্ষণ। আব্বাস জানান, দেড় শ কিংবা দুই শ মণ, যে পরিমাণ মাছই ধরা হোক, ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে আসা বড় পাইকারেরা পুকুরপাড় থেকেই কিনে নিয়ে যান। লেখাপড়া শেষ করে বাবার সঙ্গে পাবদা চাষ করা রাজু জানান, সে বছর তিনি প্রায় আড়াই লাখ টাকার পাবদা বিক্রির আশা করছিলেন।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আলমগীর হোসেনের মতে, কৃষির অন্য যেকোনো খাতের তুলনায় পাবদা চাষ লাভজনক। তিনি জানান, মৎস্য বিভাগ খামারিদের নিয়মিত উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি বিক্রিতেও সহযোগিতা করছিল। মহেশপুরে উৎপাদিত পাবদা ঋণপত্রের (এলসি) মাধ্যমে ভারতে পাঠানো হতো, আর ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন বাজারেও এর চাহিদা ছিল বেশি।
পাবদা মাছ কেমন
পাবদা (বৈজ্ঞানিক নাম Ompok pabda) সিলুরিডি গোত্রের একটি দেশি ক্যাটফিশ। মৎস্যবিষয়ক তথ্যভান্ডার ফিশবেস জানায়, এটি সর্বোচ্চ ৩০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত লম্বা হয় এবং স্বচ্ছ ও ঘোলা দুই ধরনের পানির নদী, খাল, পুকুর ও হ্রদে বাস করে। বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান ও আফগানিস্তানে মাছটি পাওয়া যায়। এর শরীর লম্বাটে, মাথা বড়, মুখ চওড়া এবং মুখে একজোড়া শুঁড় থাকে।
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন ২০০৯ সালের মূল্যায়নে পাবদাকে ‘প্রায় সংকটাপন্ন’ শ্রেণিতে রাখে। বাংলাদেশের গবেষকেরা একে বিপন্ন দেশি মাছ হিসেবে উল্লেখ করেন। ২০১২ সালে নর্থ আমেরিকান জার্নাল অব অ্যাকোয়াকালচারে প্রকাশিত এক গবেষণায় পাবদার শুক্রাণু হিমায়িত করে সংরক্ষণের পদ্ধতি তৈরি করা হয় এবং প্রযুক্তিটি বাণিজ্যিক হ্যাচারিতে ছড়িয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। মহেশপুরের চাষিরাও হ্যাচারির পোনার ওপরই নির্ভর করেন।

ছবি: Biswarup Ganguly / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, ফিশবেস, আইইউসিএন লাল তালিকা (Ompok pabda, ২০০৯), নর্থ আমেরিকান জার্নাল অব অ্যাকোয়াকালচার (সরদার ও অন্যান্য, ২০১২), উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)