আশির দশকের কোনো এক শনিবারের সন্ধ্যা। গ্রামের হাটের চায়ের দোকানে একটিমাত্র সাদাকালো টেলিভিশন, তার সামনে গাদাগাদি করে বসে আছেন লুঙ্গি-গামছা পরা কৃষকেরা। কেউ বেঞ্চে, কেউ মাটিতে, কেউ দাঁড়িয়ে। পর্দায় চলছে 'মাটি ও মানুষ', আর উপস্থাপক একজন তরুণ, যিনি কথা বলছেন নতুন ধানের জাত, সার আর সেচ নিয়ে। সেই তরুণের নাম শাইখ সিরাজ। টেলিভিশন তারকা, কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব শাইখ সিরাজের জন্মদিন আজ।
তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫৪ সালের এই দিনে, ৭ সেপ্টেম্বর, চাঁদপুরে; তাঁর পৈতৃক নিবাস চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলায়। তবে সার্টিফিকেট অনুযায়ী তাঁর জন্মতারিখ ২৮ জুন ১৯৫৬। পড়াশোনা করেছেন ঢাকার খিলগাঁও সরকারি উচ্চবিদ্যালয় ও নটর ডেম কলেজে, এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। মাটি, নদী, জলবায়ু আর মানুষের বসতি নিয়ে যে বিষয়ের কারবার, সেই ভূগোলের ছাত্র পরে সারা জীবন কাজ করবেন মাটি আর মানুষ নিয়েই, এটা হয়তো নিছক কাকতালীয় নয়।
জন্মতারিখ নিয়ে এই দুই রকম হিসাব তাঁর প্রজন্মের অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায়। স্কুলে ভর্তি বা পরীক্ষার নিবন্ধনের সময় কাগজে যে তারিখ লেখা হয়েছিল, সেটিই পরে সনদে থেকে গেছে, যদিও পরিবার জন্মদিন পালন করে আসল দিনে। শাইখ সিরাজের ক্ষেত্রেও তাই; তাঁর জন্মদিন পালিত হয় ৭ সেপ্টেম্বরেই।
ছাত্রজীবনেই তিনি যুক্ত হন বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ বেতার ও সংবাদপত্রের সঙ্গে। ১৯৭৮ সাল থেকে সাংবাদিকতায় তাঁর পথচলা। আজ তিনি ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড, চ্যানেল আই-এর প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও বার্তা প্রধান। টানা সাড়ে চার দশক ধরে তিনি গণমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে দেশের কৃষি, কৃষক এবং উৎপাদন ও অর্থনৈতিক খাতে অপরিসীম ভূমিকা রেখে চলেছেন।
খাদ্যঘাটতির দেশে একজন তরুণ সাংবাদিক
শাইখ সিরাজ যখন সাংবাদিকতা শুরু করেন, তখন বাংলাদেশ সদ্য স্বাধীন একটি দেশ, যার বড় দুশ্চিন্তার নাম খাদ্য। স্বাধীনতার পর প্রথম বছরগুলোতে দেশে চাল উৎপাদন ছিল মোটামুটি এক কোটি টনের ঘরে, অথচ মুখের সংখ্যা বাড়ছিল দ্রুত। বেশির ভাগ জমিতে তখনো দেশি জাতের ধান, একই জমিতে বছরে একটি বা বড়জোর দুটি ফসল। শুকনো মৌসুমে অনেক মাঠ পড়ে থাকত খালি। বিদেশি খাদ্য সাহায্যের ওপর নির্ভরতা ছিল দেশের নিত্যসঙ্গী।
এই পটভূমিতেই দেশের কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ শুরু করে। ১৯৭০ সালে গাজীপুরে প্রতিষ্ঠিত ধান গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীনতার পর নাম পায় বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট; তারা একের পর এক উচ্চফলনশীল জাত উদ্ভাবন করতে থাকে। উচ্চফলনশীল জাত মানে এমন ধান, যা একই জমিতে দেশি জাতের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি ফলন দেয়, তবে তার জন্য লাগে সময়মতো সেচ, সুষম সার আর নতুন চাষপদ্ধতি। গবেষণাগারে জাত তৈরি হলেই কাজ শেষ হয় না; আসল পরীক্ষা হয় তখন, যখন কৃষক সেই বীজ নিজের জমিতে বোনেন। আর সেখানেই দরকার ছিল এমন কারও, যিনি গবেষকের ভাষাকে কৃষকের ভাষায় অনুবাদ করতে পারেন।
একটি অনুষ্ঠানের জন্ম: 'আমার দেশ' থেকে 'মাটি ও মানুষ'
বাংলাদেশ টেলিভিশনের 'মাটি ও মানুষ' অনুষ্ঠান উপস্থাপনার মধ্য দিয়েই সব শ্রেণিপেশার মানুষের কাছে বিপুল গ্রহণযোগ্যতা পান শাইখ সিরাজ। ১৯৮২ সাল থেকে তিনি এই অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু শুরুটা অন্য নামে, অন্য চেহারায়। সে কথা তিনি নিজেই বলেছেন এভাবে:
শুরুতে এই অনুষ্ঠানটা হতো আমার দেশ নামে। তখন এটি ৫০ মিনিটের পাক্ষিক অনুষ্ঠান। পরে এটিকেই ‘মাটি ও মানুষ’ নামে সাপ্তাহিক অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত করি। আমার মনে হয়েছিল বাংলাদেশের মানুষের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের চেয়ে বেশি দরকার শিক্ষামূলক মোটিভেশনাল অনুষ্ঠান। কৃষকদের যদি নতুন বীজ, নতুন প্রযুক্তি, নতুন কৌশল, এসব ঠিকমত বোঝানো যায়, তাহলে কৃষিতে বিরাট পরিবর্তন নিয়ে আসা সম্ভব।
ভাবনাটা তখনকার বাস্তবতায় বেশ সাহসী ছিল। টেলিভিশন মানেই তখন নাটক, গান আর খবর। দেশে টেলিভিশন চ্যানেল বলতে ছিল কেবল বাংলাদেশ টেলিভিশন; বেসরকারি চ্যানেলের যুগ আসতে তখনো দেড় দশক বাকি। সেই একমাত্র চ্যানেলে প্রতি সপ্তাহে কৃষকের ফসল, বীজ আর মাটি নিয়ে অনুষ্ঠান চালানো ছিল নতুন ধরনের পরীক্ষা। শাইখ সিরাজের বিশ্বাস ছিল, টেলিভিশন শুধু বিনোদনের বাক্স নয়; ঠিকভাবে ব্যবহার করলে এটি হতে পারে লাখো কৃষকের শ্রেণিকক্ষ।
বাংলাদেশের কৃষিতে গত কয়েক দশকে যে বিরাট পরিবর্তন ঘটেছে, শাইখ সিরাজকে বর্ণনা করা হয় সেই পরিবর্তনের পেছনের অন্যতম প্রধান চরিত্র হিসেবে। বিজ্ঞানীরা যখন একের পর এক উচ্চফলনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন করছিলেন, আর সরকারের নানা পর্যায় থেকে কৃষিতে নতুন ধ্যানধারণা ও কৌশল চালুর চেষ্টা চলছিল, তখন সেগুলো সারা দেশে ছড়িয়ে দিতে বড় ভূমিকা রাখে 'মাটি ও মানুষ'।
হাটের টেলিভিশনের সামনে শনিবারের ভিড়
গত চার দশকে শাইখ সিরাজ হয়ে উঠেছেন বাংলাদেশের কৃষকদের কাছে কৃষিবিষয়ক তথ্যের প্রধান উৎস। আশির দশকে, যখনো টেলিভিশন ঘরে ঘরে পৌঁছায়নি, তখনো গ্রামের হাটবাজারে, কমিউনিটি সেন্টারে প্রতি শনিবার সন্ধ্যায় 'মাটি ও মানুষ' দেখার জন্য ভিড় করত মানুষ। অনেক বাড়িতে তখন টেলিভিশন কেনার সামর্থ্য ছিল না, তাই একটি সেটের সামনে জড়ো হতেন পুরো গ্রামের মানুষ।
সেই দৃশ্যের তাৎপর্য বুঝতে হলে মনে রাখতে হবে, তখন কৃষকের কাছে নতুন তথ্য পৌঁছানোর পথ ছিল খুব সীমিত। ইউনিয়ন পর্যায়ে কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা ছিলেন, কিন্তু একজন কর্মকর্তার পক্ষে হাজারো কৃষকের কাছে নিয়মিত যাওয়া সম্ভব ছিল না। পত্রিকা পড়ার সুযোগ ও অভ্যাস গ্রামে কম ছিল। বেতার ছিল, কিন্তু চোখে দেখার শক্তি তার নেই। টেলিভিশনের পর্দায় যখন কৃষক দেখলেন অন্য জেলার কোনো কৃষক নতুন জাতের ধানে বাম্পার ফলন পেয়েছেন, তখন সেটা তাঁর কাছে যেকোনো পরামর্শের চেয়ে বেশি বিশ্বাসযোগ্য হয়ে উঠল।
এখানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভূমিকাও মনে রাখা দরকার। ইউনিয়ন পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা কৃষকের কাছে সরাসরি পরামর্শ পৌঁছে দেন: কোন জাত কোন মাটিতে ভালো, কখন চারা রোপণ করতে হবে, কোন রোগে কোন প্রতিকার। টেলিভিশন এই কাজের প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল না, ছিল পরিপূরক। পর্দায় একটি নতুন জাতের সাফল্য দেখে কৃষক আগ্রহী হতেন, আর সেই আগ্রহ নিয়ে যেতেন স্থানীয় কৃষি অফিসে বা মাঠকর্মীর কাছে। একদিকে উৎসাহ, অন্যদিকে হাতে-কলমে সহায়তা; দুটো মিলেই বদলেছে গ্রামের মাঠ।
'রাবার ভাত খাব না': কৃষকের মন জয়ের লড়াই
তবে কৃষকদের নতুন ধরনের কৃষিতে উৎসাহিত করার কাজটা মোটেই অল্প পরিশ্রমের ছিল না। শাইখ সিরাজ সেই সময়ের কথা স্মরণ করে বলেছেন:
আজকের কৃষক এবং তিরিশ বছর আগের কৃষকের মধ্যে তফাৎ আকাশ আর পাতাল। তখন কৃষকের কাছে একজন কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা যে কথা বলতেন, একজন টেলিভিশন উপস্থাপক হিসেবে আমি যেকথা বলতাম, সেটা তারা মানতে চাইতো না। তারা ভাবতো, আমরা যেধরণের কৃষির কথা বলছি, যদি সেটাতে ভালো ফসল না হয়?
এই দ্বিধার কারণে কৃষকেরা নতুন কিছুতে উদ্বুদ্ধ হতে চাইতেন না, নতুন প্রযুক্তি নিতেও তাঁদের আপত্তি ছিল। তাঁদের অবস্থান থেকে দেখলে এই সতর্কতা অযৌক্তিক ছিল না। একজন ছোট কৃষকের পুরো বছরের খোরাক নির্ভর করে একটি-দুটি ফসলের ওপর। অচেনা বীজে ফসল নষ্ট হলে সেই ক্ষতি পোষানোর উপায় তাঁর নেই। বাপ-দাদার আমলের দেশি জাত কম ফলন দিলেও অন্তত চেনা ছিল।
আপত্তির আরেকটা কারণ ছিল স্বাদ। শাইখ সিরাজের ভাষায়:
আমি যখন আশির দশকে উচ্চফলনশীল নতুন জাতের ধানের কথা বলছি, গমের কথা বলছি, তখন পরিস্কার তারা আমাকে বলতো এই রাবার ভাত খাবো না। তখন পর্যন্ত উদ্ভাবিত নতুন জাতের ধানের মান তেমন ভালো ছিল না। ভাতটা ছিল রাবারের মতো, ভাতের দানা উপর থেকে থালার উপর ফেললে সেটি রাবারের মতো ড্রপ করতো।
কিন্তু পরিস্থিতি বদলাতে থাকে দুই দিক থেকে। একদিকে বিজ্ঞানীরা গবেষণায় নতুন নতুন সাফল্য পাচ্ছিলেন; বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট একের পর এক এমন জাত আনছিল, যেগুলোর ফলন বেশি, আবার ভাতের মানও আগের চেয়ে ভালো। অন্যদিকে শাইখ সিরাজও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে কৃষকদের মন জয় করতে নতুন কৌশল নিচ্ছিলেন। স্টুডিওর বক্তৃতার বদলে ক্যামেরা চলে গেল মাঠে; পর্দায় কথা বলতে শুরু করলেন কৃষক নিজেই।
একজন কৃষক যখন আরেকজন কৃষককে নিজের খেত দেখিয়ে বলেন কত মণ ধান পেয়েছেন, সেই কথার ওজন আলাদা। এই পদ্ধতিতেই নতুন ধান, গম, সবজি, মাছ চাষ আর হাঁস-মুরগি পালনের খবর গ্রাম থেকে গ্রামে ছড়াতে থাকে। স্বাধীনতার সময় যে দেশে চালের উৎপাদন ছিল এক কোটি টনের ঘরে, সেই দেশে পরের দশকগুলোতে উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণের বেশি। এই অর্জনের পেছনে গবেষক, সম্প্রসারণকর্মী আর কৃষকের সঙ্গে গণমাধ্যমের ভূমিকাও স্বীকৃত।
চ্যানেল আই এবং 'হৃদয়ে মাটি ও মানুষ'
নব্বইয়ের দশকের শেষে দেশে বেসরকারি টেলিভিশনের যুগ শুরু হয়। ১৯৯৯ সালে যাত্রা শুরু করা চ্যানেল আইয়ের প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন শাইখ সিরাজ, হয়েছেন এর বার্তা প্রধান। নিজের পরিচালনাধীন এই টেলিভিশনে তিনি শুরু করেন কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান 'হৃদয়ে মাটি ও মানুষ'। অনুষ্ঠানটির প্রথম সম্প্রচার ২০০৪ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি; তখন থেকে এটি সাপ্তাহিক অনুষ্ঠান হিসেবে চলছে, দেশ ও দেশের বাইরের কৃষির খবর নিয়ে।
চ্যানেল আই দেশের প্রথম দিকের বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশনগুলোর একটি। তখন দর্শক সবে বাংলাদেশ টেলিভিশনের বাইরে অন্য চ্যানেল বেছে নেওয়ার সুযোগ পেতে শুরু করেছেন। নাটক, গান আর টক শোর প্রতিযোগিতার মধ্যে একটি নতুন চ্যানেলে নিয়মিত কৃষির জন্য সময় বরাদ্দ রাখা ছিল অগ্রাধিকারের স্পষ্ট ঘোষণা। 'হৃদয়ে মাটি ও মানুষ' প্রচারিত হয় শনিবার রাতে; বাংলাদেশ টেলিভিশনের 'মাটি ও মানুষ' গ্রামের দর্শকের মধ্যে শনিবারের যে অভ্যাস তৈরি করেছিল, সেই ধারাবাহিকতা যেন এভাবেই টিকে আছে। এক প্রজন্মের দর্শক যে অনুষ্ঠান দেখে বড় হয়েছেন, তাঁদের সন্তানেরাও একই উপস্থাপককে দেখছেন নতুন অনুষ্ঠানে, নতুন প্রযুক্তির খবর নিয়ে।
'হৃদয়ে মাটি ও মানুষ' শুধু একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানে সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর ব্যানারে আয়োজিত হয়েছে কৃষকের কথা শোনার নানা আয়োজন। বাজেটের আগে কৃষকের দাবি-দাওয়া নিয়ে 'কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট' শীর্ষক সংলাপ, যেখানে মন্ত্রী ও নীতিনির্ধারকদের সামনে কৃষক সরাসরি নিজের সমস্যার কথা বলেছেন। ২০১১ সালে আয়োজিত হয়েছিল 'কৃষকের বিশ্বকাপ ক্রিকেট', যেখানে মাঠের কৃষকেরাই হয়েছিলেন খেলোয়াড়; এই প্রতিবেদনের ছবিটিও সেই আয়োজনের আগের সংবাদ সম্মেলনের। বিশ্বের নানা দেশের খামার ঘুরে সেখানকার প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞতাও তিনি দেশের কৃষকের সামনে তুলে ধরেছেন।
কৃষি বাজেট সংলাপের ধারণাটি বোঝা দরকার। প্রতিবছর জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ হয়, আর সেখানে ঠিক হয় কৃষিতে ভর্তুকি, সার, বীজ, সেচ ও গবেষণায় কত টাকা বরাদ্দ হবে। অথচ যাঁদের জন্য এই বরাদ্দ, সেই কৃষকের কথা বাজেট তৈরির টেবিলে খুব কমই পৌঁছায়। এই সংলাপগুলোতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক ফসলের ন্যায্য দাম, সারের জোগান, সেচের খরচ, কৃষিঋণ আর বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের দাপটের মতো সমস্যার কথা সরাসরি তুলে ধরেছেন। টেলিভিশনের পর্দায় সেই কথোপকথন দেখেছেন সারা দেশের মানুষ। একই নামে তাঁর সম্পাদিত ও লেখা বইও প্রকাশিত হয়েছে।
উন্নয়ন সাংবাদিকতার এক অগ্রপথিক
টেলিভিশনসহ গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রায় চার দশকের একনিষ্ঠ পথচলার মধ্য দিয়ে শাইখ সিরাজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন উন্নয়ন সাংবাদিকতার এক অগ্রপথিক হিসেবে। উন্নয়ন সাংবাদিকতা মানে এমন সাংবাদিকতা, যা শুধু ঘটনার খবর দেয় না, মানুষের জীবনমান বদলানোর পথও দেখায়: কোন বীজে বেশি ফলন, কোন রোগে কী প্রতিকার, কোন বাজারে ন্যায্য দাম।
গণমাধ্যমে তাঁর উদ্বুদ্ধকরণ প্রচারণায় বাংলাদেশের কৃষিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে বলে মনে করা হয়। খাদ্য উৎপাদনে সূচিত হয়েছে বৈপ্লবিক সাফল্য। গ্রামীণ জীবনের নানা ক্ষেত্রে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। একই সঙ্গে তিনি শহর-নগরের মানুষকেও করেছেন কৃষিমুখী; ছাদবাগান থেকে শুরু করে শিক্ষিত তরুণদের কৃষি উদ্যোগ, সবকিছুতেই তাঁর অনুষ্ঠানের প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়। ফলে দেশের অর্থনীতিতে কৃষির বহুমুখী অবদান সামনে এসেছে।
চ্যানেল আই ও বাংলাদেশ টেলিভিশনে কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠানের পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। কৃষিপ্রধান এই দেশে একসময় যে কৃষিকে নীরস বিষয় হিসেবে উপেক্ষা করা হতো, তাকে তিনি জাতীয় সংবাদের প্রধান খবরের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করেছেন। আজ টেলিভিশনের খবরে বা পত্রিকার প্রথম পাতায় কৃষকের ধানের দাম, সারের সংকট কিংবা নতুন জাতের খবর যে জায়গা পায়, তার পেছনে তাঁর দীর্ঘ চেষ্টার ভূমিকা অনস্বীকার্য।
বদলে যাওয়া কৃষি, বদলে যাওয়া কৃষক
আশির দশকের সেই দিনগুলোর সঙ্গে আজকের তুলনা করলে পরিবর্তনের মাপটা বোঝা যায়। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছে ৪ কোটি ১০ লাখ টন, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো চার কোটি টন ছাড়িয়ে। ধানের পাশাপাশি সবজি, মাছ, ডিম ও দুধ উৎপাদনেও দেশ অনেক এগিয়েছে। যে কৃষক একসময় নতুন বীজ নিতে দ্বিধা করতেন, আজ তাঁরাই হাইব্রিড বীজ, পাওয়ার টিলার, ধান কাটার যন্ত্র আর মোবাইল ফোনের পরামর্শ সেবা ব্যবহার করছেন।
তবু কৃষি এখনো দেশের সবচেয়ে বড় কর্মসংস্থানের খাত। বিবিএসের শ্রমশক্তি জরিপ ২০২২ অনুযায়ী দেশের মোট কর্মজীবী মানুষের ৪৫ দশমিক ৩৩ শতাংশ কৃষিতে নিয়োজিত। অর্থাৎ প্রায় প্রতি দুজন কর্মজীবী মানুষের একজনের জীবিকা মাঠ, খামার, পুকুর বা গোয়ালঘরের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর সমস্যা, সম্ভাবনা আর দাবির কথা গণমাধ্যমে তুলে আনার কাজটাই শাইখ সিরাজ করে চলেছেন কয়েক দশক ধরে।
শহরেও কৃষির প্রতি আগ্রহ বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে ছাদে, বারান্দায় সবজি ও ফলের বাগান এখন পরিচিত দৃশ্য। এই আগ্রহ এতটাই ছড়িয়েছে যে ২০২৩ সালে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ঘোষণা দেন, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা এলাকায় ছাদবাগান করলে বাড়ির মালিকেরা হোল্ডিং করে ১০ শতাংশ ছাড় পাবেন। শিক্ষিত তরুণদের অনেকে চাকরির বদলে বেছে নিচ্ছেন মাছ, মুরগি, ফল বা সবজির খামার। কৃষি যে শুধু গ্রামের দরিদ্র মানুষের পেশা নয়, বরং সম্ভাবনাময় উদ্যোগও হতে পারে, এই ধারণা ছড়িয়ে দেওয়ায় টেলিভিশনের কৃষি অনুষ্ঠানগুলোর ভূমিকা নিয়ে প্রায়ই আলোচনা হয়।
দেশ-বিদেশের স্বীকৃতি
উন্নয়ন সাংবাদিকতার জন্য শাইখ সিরাজ বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দুটি রাষ্ট্রীয় সম্মান পেয়েছেন: ১৯৯৫ সালে একুশে পদক এবং ২০১৮ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার। তিনি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অশোকার ফেলো; ১৯৯২ সালে এই ফেলোশিপ পান। ১৯৮০ সালে বিল ড্রেটনের প্রতিষ্ঠিত অশোকা বিশ্বজুড়ে এমন সামাজিক উদ্যোক্তাদের খুঁজে বের করে, যাঁরা নতুন ধারণা দিয়ে সমাজে পরিবর্তন আনছেন। কৃষি সাংবাদিকতাকে সামাজিক পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের স্বীকৃতি হিসেবেই তিনি এই ফেলোশিপ পান, একুশে পদক পাওয়ারও তিন বছর আগে।
খাদ্য নিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচন বিষয়ে সাংবাদিকতায় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০০৯ সালে পান জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এ এইচ বুর্মা অ্যাওয়ার্ড। এফএওর সাবেক মহাপরিচালক আডেকে হেনড্রিক বুর্মার নামে দেওয়া এই পুরস্কার দেওয়া হয় সেই সাংবাদিকদের, যাঁরা খাদ্য ও কৃষির বিষয়গুলো বিশ্বের মানুষের সামনে তুলে ধরেন।
এ ছাড়া তিনি পেয়েছেন এশিয়ার মর্যাদাপূর্ণ গুসি পিস প্রাইজ এবং ব্রিটেনের বিসিএ গোল্ডেন জুবিলি অনার অ্যাওয়ার্ড। ব্রিটিশ হাউস অব কমন্স তাঁকে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে, ব্রিটিশ-বাংলাদেশ ব্যবসায়ী সংগঠন দিয়েছে গ্রিন অ্যাওয়ার্ড। দেশে পেয়েছেন বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির স্বর্ণপদক, ডা. ইব্রাহিম মেমোরিয়াল স্বর্ণপদক, রণদা প্রসাদ সাহা স্বর্ণপদকসহ অর্ধশত দেশি-বিদেশি পুরস্কার ও সম্মাননা।
কলমে কৃষি: তাঁর বইগুলো
টেলিভিশনের পর্দার বাইরে শাইখ সিরাজের আরেকটি পরিচয় লেখক হিসেবে। মাঠের অভিজ্ঞতা, কৃষকের সমস্যা আর কৃষিনীতি নিয়ে ভাবনাগুলো তিনি গ্রন্থবদ্ধ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে:
- মৎস্য ম্যানুয়েল
- মাটি ও মানুষের চাষবাস
- ফার্মার্স ফাইল
- মাটির কাছে মানুষের কাছে
- বাংলাদেশের কৃষি: প্রেক্ষাপট ২০০৮
- কৃষি ও গণমাধ্যম
- কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট (সম্পাদিত)
- আমার স্বপ্নের কৃষি
- কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট (২০১১)
- সমকালীন কৃষি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ (২০১১)
- কৃষি ও উন্নয়ন চিন্তা (২০১৩)
বইগুলোর নাম দেখলেই বোঝা যায় তাঁর আগ্রহের পরিধি: মাছ চাষের হাতে-কলমে নির্দেশিকা থেকে শুরু করে কৃষি বাজেট, গণমাধ্যমের ভূমিকা আর উন্নয়নভাবনা পর্যন্ত। মাঠের কৃষক থেকে নীতিনির্ধারক, সবার জন্যই কিছু না কিছু আছে এই লেখাগুলোতে।
মাটি আর মানুষের সঙ্গে চার দশক
শাইখ সিরাজের কাজের মূল সুরটা তাঁর অনুষ্ঠানের নামেই ধরা আছে: মাটি ও মানুষ। মাটি মানে ফসল, খাদ্য আর প্রকৃতি; মানুষ মানে সেই কৃষক, যিনি রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে দেশের খাবার জোগান। এই দুইয়ের মাঝখানে তিনি দাঁড় করিয়েছেন টেলিভিশনের ক্যামেরাকে, যাতে কৃষকের কথা শহরের মানুষ, গবেষক আর সরকার শুনতে পায়, আবার গবেষণাগারের নতুন জ্ঞান পৌঁছে যায় কৃষকের উঠানে।
তাঁর কাজের সবচেয়ে বড় শিক্ষা সম্ভবত এটাই যে কৃষকের আস্থা অর্জন করতে হয় ধৈর্য দিয়ে। নির্দেশ দিয়ে বা উপদেশ দিয়ে নয়, কৃষককে কথা বলার সুযোগ দিয়ে, তাঁর সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়ে এবং অন্য কৃষকের সাফল্য তাঁর সামনে তুলে ধরে। চার দশক পরেও তিনি মাঠে গিয়ে কৃষকের পাশে বসে কথা বলেন, খেতের আল ধরে হাঁটেন, ক্যামেরার সামনে কৃষকের হাতে মাইক্রোফোন তুলে দেন। এই ধারাবাহিকতাই তাঁকে কৃষকের কাছে আপনজন করে তুলেছে।
আশির দশকে যে কৃষক 'রাবার ভাত' খেতে রাজি ছিলেন না, তাঁর সন্তান আজ হয়তো মোবাইল ফোনে কৃষি পরামর্শ খোঁজেন, ড্রোন দিয়ে খেতে ওষুধ ছিটানোর খবর দেখেন। এই দীর্ঘ রূপান্তরের সাক্ষী ও অংশীদার শাইখ সিরাজ। জন্মদিনে দা এগ্রো নিউজের পক্ষ থেকে কৃষকের এই বন্ধুকে শুভেচ্ছা।
ছবি: কৃষকের বিশ্বকাপ ক্রিকেট ২০১১-এর আগে সংবাদ সম্মেলনে শাইখ সিরাজ, Hridoye Mati O Manush Channel i from Bangladesh, Bangladesh / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)





মন্তব্য
(০)