রাজধানী ঢাকায় ২০২৫ সালের ২৫ জুন বুধবার শুরু হয় জাতীয় বৃক্ষমেলা। জাগো নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবারের মেলায় এসেছে হাজার প্রজাতির বৈচিত্র্যময় গাছ। বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের উদ্যোগে মেলাটি বসে শেরেবাংলা নগরের সম্মেলন কেন্দ্র সংলগ্ন মাঠে। জাগো নিউজ কেন্দ্রটিকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র নামে উল্লেখ করেছে, আর পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে এর নাম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্র। মেলার স্লোগান ছিল "পরিকল্পিত বনায়ন করি, সবুজ বাংলাদেশ গড়ি"। একই দিনে পাশেই শুরু হয় তিন দিনের পরিবেশ মেলা।
বন অধিদপ্তরের যে রেঞ্জ কর্মকর্তা জাগো নিউজের সঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁর তথ্য অনুযায়ী মেলায় বৃক্ষের ১৩৫টি স্টল ও পরিবেশের ১৫টি স্টল ছিল। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা খোলা থাকার কথা। পরিবেশ মেলা চলার কথা ২৫ থেকে ২৭ জুন, আর বৃক্ষমেলা ২৫ জুন থেকে ২৪ জুলাই পর্যন্ত।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও বিশ্ব পরিবেশ দিবস
যেদিন মেলা শুরু হয়, সেদিনই বাংলাদেশ ২০২৫ সালের বিশ্ব পরিবেশ দিবস পালন করে। বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালিত হয় ৫ জুন। কিন্তু ২০২৫ সালে ৫ জুনের আগেই দেশে ঈদুল আজহার ছুটি শুরু হয়ে যাওয়ায় সরকার জাতীয়ভাবে দিবসটি পালনের তারিখ ২৫ জুনে সরিয়ে নেয়, ৫ জুন রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসসের বরাতে প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণ এ খবর দেয়। সেবারের প্রতিপাদ্য ঘোষণা করা হয় "প্লাস্টিক দূষণকে না বলুন, এখনই সময় পদক্ষেপ নেওয়ার"। প্রতিপাদ্য ও স্লোগান বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে স্ক্রল বার্তা হিসেবে প্রচারের কথাও জানানো হয়।
মেলা শুরুর দুই দিন আগে, ২৩ জুন সোমবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে আয়োজনের খবর জানায়। একই দিন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত উপদেষ্টা সচিবালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মেলার বিস্তারিত তুলে ধরেন, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়। তাঁর তথ্য অনুযায়ী, উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হওয়ার কথা বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের ভেতরে, প্রধান অতিথি প্রধান উপদেষ্টা। একই অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও বৃক্ষরোপণে অবদানের জন্য তিনটি জাতীয় স্বীকৃতি দেওয়ার কথা ছিল: ‘জাতীয় পরিবেশ পদক ২০২৪’, ‘বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ জাতীয় পুরস্কার ২০২৫’ ও ‘বৃক্ষরোপণে জাতীয় পুরস্কার ২০২৪’।
বণিক বার্তার ইংরেজি সংস্করণ ২৫ জুন দুপুর ১২টা ৪৯ মিনিটে জানায়, প্রধান উপদেষ্টা সেদিন সম্মেলন কেন্দ্রে পরিবেশ মেলা ২০২৫ এবং জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযান ও বৃক্ষমেলা ২০২৫ উদ্বোধন করেছেন। তিনি তিনটি জাতীয় পুরস্কার বিজয়ীদের হাতে তুলে দেন। বন অধিদপ্তরের সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির উপকারভোগীদের মধ্যে লভ্যাংশের চেকও বিতরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা এবং পরিবেশ সচিবও বক্তব্য দেন বলে পত্রিকাটি জানায়।
বৃক্ষরোপণ অভিযান শুধু রাজধানীতে সীমাবদ্ধ ছিল না। একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ঢাকার ১০০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এবং জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে চিত্রাঙ্কন, বিতর্ক ও স্লোগান প্রতিযোগিতা, সেমিনার এবং শিল্পসংশ্লিষ্ট সচেতনতামূলক কর্মসূচির পরিকল্পনা করা হয়। সারা দেশে বৃক্ষমেলা ও চারা বিতরণের কথা ছিল, আর এসএমএস বার্তা, ব্যানার ও অংশগ্রহণমূলক নানা আয়োজনের মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ফল, ফুল, ওষুধি ও বনজ গাছের চারা
মেলার স্টলগুলোতে নানা ফুল ও ফলের গাছের পাশাপাশি ছিল বিভিন্ন জাতের ওষুধি ও বনজ গাছ। বিক্রেতারা জাগো নিউজকে জানান, ফলের চারার মধ্যে রয়েছে আম, জাম, লিচু, কাঁঠাল, আনারস, জামরুল, আমলকী, পেয়ারা, আতা, শরিফা ইত্যাদি দেশি প্রজাতি, পাশাপাশি বিদেশি প্রজাতির আপেল, আঙুর, কমলা প্রভৃতি। ফুলের চারার মধ্যে রজনীগন্ধা থেকে শুরু করে দেশি ও বিদেশি গোলাপ, শিউলি, গাঁদা, জুঁই, হাসনাহেনা, ক্যাকটাস প্রভৃতি পাওয়া যাচ্ছিল। আর বনজ গাছের মধ্যে ছিল সেগুন, মেহগনি, শাল, কড়ই, শিমুল, গর্জন ইত্যাদি।
এসব গাছের অনেকগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ ইতিহাস জড়িয়ে আছে। জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে আম (Mangifera indica) ভারতীয় উপমহাদেশের পূর্বাঞ্চলের, অর্থাৎ বাংলাদেশ, আসাম ও মিয়ানমার অঞ্চলের নিজস্ব গাছ। দেশজুড়েই আমগাছ জন্মে, বেশির ভাগ বসতবাড়ির আশপাশে। কলমের মাধ্যমে বংশবিস্তার করা উন্নত জাতগুলো মূলত রাজশাহী, নবাবগঞ্জ ও দিনাজপুরে চাষ হয়; এর মধ্যে আছে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, ক্ষীরশাপাতসহ নানা জাত। দেশে প্রায় ১০০টি আমের জাত রয়েছে। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর তাদের বাগান, হর্টিকালচার সেন্টার ও নার্সারি থেকে উন্নত জাতের কলম উৎপাদন ও বিতরণ করে, আর বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের রাজশাহী, নবাবগঞ্জ ও জয়দেবপুরে গবেষণা কেন্দ্র রয়েছে। জ্ঞানকোষের হিসাবে ২০০৫-০৬ সালে প্রায় ৬ লাখ ৪১ হাজার ৫২৫ একর জমি থেকে দেশে প্রায় ৬ লাখ ৩৯ হাজার ৮২০ টন আম উৎপাদিত হয়।
বাংলাপিডিয়া কাঁঠালকে বাংলাদেশের জাতীয় ফল হিসেবে উল্লেখ করেছে। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের নিজস্ব গাছ, আর এর ফল পৃথিবীর বৃহত্তম ভোজ্য ফলগুলোর একটি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০০০-২০০৭ সালের তথ্য উদ্ধৃত করে জ্ঞানকোষটি জানায়, দেশে ২৫ হাজার ১১০ হেক্টর জমিতে কাঁঠাল চাষ হয়, বার্ষিক উৎপাদন ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৫০০ টন, যা দেশের মোট ফল উৎপাদনের প্রায় ২২ শতাংশ। পাকা কাঁঠালের কোষ টাটকা খাওয়া হয়, কখনো সিরায় সংরক্ষণ বা শুকিয়ে রাখা হয়; বড় বিচি সেদ্ধ বা ভেজে নানা রান্নায় ব্যবহৃত হয়, আর কাঁচা কাঁঠাল সবজি হিসেবে রান্না হয়। ফল ছাড়াও কাঁঠালগাছের হলুদ সারকাঠ মূল্যবান কাঠ হিসেবে ব্যবহৃত হয়, খোসা ও পাতা গবাদিপশুকে খাওয়ানো হয়, আর বসতবাড়ির সৌন্দর্য বাড়াতেও গাছটি লাগানো হয়।
মেলায় বনজ চারা হিসেবে বিক্রি হওয়া সেগুন এ দেশের নিজস্ব গাছ নয়। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় সেগুন (Tectona grandis) একটি বিদেশি পত্রঝরা বৃক্ষ, যা ১৮৭১ সালে মিয়ানমার থেকে এনে প্রথম দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কাপ্তাইয়ে লাগানো হয়। একে দেশের সবচেয়ে মূল্যবান কাঠের গাছ ধরা হয়। এর শক্ত, টেকসই, হলদে-বাদামি কাঠ জাহাজ নির্মাণ ও আসবাব তৈরিতে ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে শাল দেশি গাছ, যা পুরো একটি বনের ধরন গড়ে তোলে। বাংলাপিডিয়া শালবনকে ক্রান্তীয় আর্দ্র পত্রঝরা বন হিসেবে বর্ণনা করেছে, যেখানে প্রধান গাছ শাল (Shorea robusta)। বাংলাদেশে শালবনের আয়তন প্রায় ১ লাখ ২১ হাজার হেক্টর, যা দেশের মোট বনভূমির প্রায় ৩২ শতাংশ। শালবন মূলত গাজীপুর, টাঙ্গাইল, ময়মনসিংহ, জামালপুর, কুমিল্লা, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, রংপুর ও রাজশাহী জেলায়। সবচেয়ে বড় বলয়টি মধুপুর গড়, যা ব্রহ্মপুত্র ও যমুনার মাঝে উত্তর থেকে দক্ষিণে প্রায় ৯৬ কিলোমিটার বিস্তৃত। শাল কাঠ শক্ত ও টেকসই; ঘরবাড়ি নির্মাণ, খুঁটি, নৌকা ও আসবাবে এর ব্যবহার হয়। শালগাছের কাণ্ড থেকে ‘শাল ধুনা’ বা ‘রাল’ নামে সুগন্ধি রজন পাওয়া যায়, যা নৌকার ফাঁক বন্ধ করা, বার্নিশ ও রং তৈরিতে কাজে লাগে; আদিবাসী মানুষ এর পাতা দিয়ে পিঠা তৈরি করেন, আর পাতা দিয়ে ছোট ঝুড়ি ও শুকনো খাবার পরিবেশনের থালাও বানানো হয়। জ্ঞানকোষটি জানায়, শালগাছের সঙ্গে প্রায় পাঁচ শ প্রজাতির তলার উদ্ভিদ জন্মানোর তথ্য পাওয়া গেছে।

দাম ২০ টাকা থেকে ৭ লাখ টাকা
বিক্রেতারা জাগো নিউজকে জানান, মেলায় ২০ টাকা থেকে শুরু করে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত দামের গাছ ছিল। সবচেয়ে দামি ছিল বনসাই, যেগুলোর দাম ২ হাজার টাকা থেকে ৭ লাখ টাকা পর্যন্ত। বৃক্ষপ্রেমীরা স্টলে স্টলে ঘুরে খুঁজে খুঁজে পছন্দের গাছ কিনছিলেন।
খান নার্সারির বিক্রয়কর্মী আসাদুল জাগো নিউজকে বলেন, মেলা সেদিনই শুরু হওয়ায় তখনো ক্রেতার ভিড় বাড়েনি। তখন ইনডোর গাছের চাহিদা বেশি ছিল বলে তিনি জানান; তরুণ-তরুণীরা ঘর সাজানোর জন্য এসব গাছ কেনেন। তাঁর কথায়, অনেক পরিবেশবাদী সংগঠনও গাছ কেনে, আর ঢাকায় যাঁরা ছাদবাগান করেন তাঁদের কেউ কেউ ৫০ থেকে লাখ টাকার গাছ কেনেন।
মিরপুর থেকে আসা ছালেহা বেগম জাগো নিউজকে বলেন, "বারান্দায় লাগানোর জন্য গাছ কিনেছি পাঁচটি। কিছু ইনডোর প্ল্যান্টস নিয়েছি। মেলা মাত্র শুরু হয়েছে, আবার এসেও কেনাকাটা করবো।"
উপকর নার্সারির হামিদুল ইসলাম জানান, তাঁদের স্টলে সবজির চারা থেকে শুরু করে সব ধরনের ইনডোর গাছ রয়েছে। ইনডোর গাছের দাম ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত। অনেক নারী এসে শুধু সবজি আর ওষুধি গাছ কেনেন বলে তিনি জানান।
মেলার সবচেয়ে দামি গাছ বনসাই একটি পুরোনো শিল্প। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, পরিকল্পিত ছাঁটাই, তার দিয়ে ডাল বাঁকানো ও সার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে টবে বড় গাছকে ক্ষুদ্র বা বামন আকারে বড় করার শিল্প ও কৌশলই বনসাই। শব্দটি জাপানি: ‘বন’ অর্থ ট্রে, টব বা পাত্র, আর ‘সাই’ অর্থ গাছ বা রোপণ। শিল্পটির শুরু বহু শতাব্দী আগে চীনে; পরে জাপান তা গ্রহণ করে সারা বিশ্বে জনপ্রিয় করে তোলে। জ্ঞানকোষটি জানায়, বাংলাদেশে বনসাই ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে, এখানকার চাষিরা জাপানি ও চীনা দুই ধারাই অনুসরণ করেন, আর ছোট পাতার গাছ বনসাইয়ের জন্য বিশেষভাবে উপযোগী। দেশের নার্সারিগুলো সাধারণত বট, তেঁতুল, একাশিয়া, ক্যাসিয়া, কৃষ্ণচূড়া, আম, অশোক, ডালিম ও বাগানবিলাস দিয়ে বনসাই করে, আর ঢাকা ও চট্টগ্রামের বেশ কয়েকটি নার্সারি পাত্রে বনসাই উৎপাদন করে।

স্টল, সময়সূচি ও মেলার মেয়াদ
বন অধিদপ্তরের রেঞ্জ কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেন জাগো নিউজকে বলেন, এবারের মেলায় বৃক্ষের ১৩৫টি স্টল ও পরিবেশের ১৫টি স্টল রয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত মেলা চলবে। পরিবেশ মেলা শেষ হবে ২৭ জুন, আর বৃক্ষমেলা চলবে ২৪ জুলাই পর্যন্ত।
মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার সঙ্গেও এই তারিখ মেলে। ২৩ জুন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন উপদেষ্টা সাংবাদিকদের জানান, পরিবেশ মেলা চলবে শুক্রবার পর্যন্ত আর বৃক্ষমেলা ২৪ জুলাই পর্যন্ত; প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত ক্রেতা-দর্শনার্থীদের জন্য মেলা উন্মুক্ত থাকবে, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়।
এক বছর আগে জাতীয় কর্মসূচির সময়সূচি ছিল ভিন্ন। ২০২৪ সালে বিশ্ব পরিবেশ দিবস ৫ জুনেই একই সম্মেলন কেন্দ্রে, তখনকার নাম বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে, জাতীয় বৃক্ষরোপণ অভিযানের উদ্বোধন হয় এবং ৫ থেকে ১১ জুন পরিবেশ মেলা চলে, ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি) ২০২৪ সালের ৫ জুন জানায়। তৎকালীন পরিবেশ মন্ত্রণালয় ইউএনবিকে জানায়, ২০২৪ সালের বর্ষায় সারা দেশে ৮ কোটি ৩৩ লাখ ৩০ হাজার চারা রোপণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বৃক্ষরোপণ দিবস থেকে সামাজিক বনায়ন
বাংলাদেশে বৃক্ষমেলা ও বৃক্ষরোপণ অভিযানের শুরু বন অধিদপ্তরের সম্প্রসারণ কার্যক্রম থেকে। বাংলাপিডিয়া জানায়, ১৯৬২-৬৩ সালে রাজশাহী ও ঢাকায় দুটি বন সম্প্রসারণ বিভাগ গঠন করা হয় এবং ১ জুন বৃক্ষরোপণ দিবস চালু হয়। চারা উৎপাদন ও বিতরণ দিয়ে তাদের কাজ শুরু। প্রথম দিকে কার্যক্রম নার্সারি স্থাপন এবং জেলা সদর ও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে আনুষ্ঠানিক বৃক্ষরোপণে সীমাবদ্ধ ছিল। বৃক্ষরোপণ অভিযান প্রথমে এক দিনের ছিল, পরে তা এক সপ্তাহ, তারপর এক মাস এবং পরে তিন মাসে বাড়ানো হয়।
জ্ঞানকোষটি সামাজিক বনায়নকে এমন বনায়ন হিসেবে বর্ণনা করেছে, যার লক্ষ্য পরিকল্পনা থেকে আহরণ পর্যন্ত উপকারভোগীদের যুক্ত করে মানুষের, বিশেষ করে গ্রামের দরিদ্র মানুষের অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। এতে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) সংজ্ঞাও উদ্ধৃত হয়েছে: যেকোনো পরিস্থিতি, যেখানে স্থানীয় মানুষ ঘনিষ্ঠভাবে বনায়ন কার্যক্রমে যুক্ত থাকে। প্রথম দিকের একটি পরীক্ষামূলক উদ্যোগ নেওয়া হয় চট্টগ্রাম জেলার রাঙ্গুনিয়ার বেতাগী ও পোমরা নামের দুটি ন্যাড়া পাহাড়ে, যেখানে ১০১টি পরিবারকে জমি দেওয়া হয়; দ্বিতীয় ও তৃতীয় বছরের মূল্যায়নের সময় পরিবারের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৮৩টিতে।
বাংলাপিডিয়ার মতে, প্রকৃত অর্থে সামাজিক বনায়ন শুরু হয় এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে কমিউনিটি বনায়ন প্রকল্পের মধ্য দিয়ে। এডিবি ১ কোটি ১০ লাখ মার্কিন ডলার ঋণ দেয়, আর জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি এফএওর মাধ্যমে কারিগরি সহায়তা হিসেবে ২০ লাখ ডলার বরাদ্দ করে। প্রকল্পটি ১৯৮২ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত দিনাজপুর, রংপুর, পাবনা, রাজশাহী, বগুড়া, কুষ্টিয়া ও যশোর, এই সাত জেলায় চলে। এর আওতায় সড়ক, রেলপথ ও খালের বাঁধ বরাবর প্রায় ৪ হাজার ৮০০ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান, ৪ হাজার ৮০০ হেক্টরে জ্বালানি কাঠের বাগান, প্রদর্শনী কৃষিবন খামার এবং রাজশাহীতে একটি সামাজিক বনায়ন প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট গড়ার কাজ ছিল, আর প্রথমবারের মতো নারীরা কমিউনিটি বনায়নে অংশ নেন। এর ধারাবাহিকতায় ‘উপজেলা বনায়ন ও নার্সারি উন্নয়ন’ প্রকল্প সুন্দরবন ও পার্বত্য চট্টগ্রাম ছাড়া সারা দেশে বাস্তবায়িত হয়; এর লক্ষ্যের মধ্যে ছিল উপজেলা কমপ্লেক্সে ৩৪৫টি নার্সারি স্থাপন এবং ১০০টি বেসরকারি নার্সারি গড়তে সহায়তা। ১৯৯৪-৯৫ সালে উপকূলের ১০ জেলায় শুরু হওয়া উপকূলীয় সবুজ বেষ্টনী প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল গাছপালা বাড়িয়ে ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি কমানো।
২০২৫ সালের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যে লভ্যাংশের চেক বিতরণ করা হয়, তা এই সামাজিক বনায়ন কর্মসূচিরই অংশ। বন অধিদপ্তরের একজন সহকারী প্রধান বন সংরক্ষক ২০২০ সালের জুনে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডকে বলেন, সবুজ আচ্ছাদন বাড়ার পেছনে রয়েছে ১৯৭৪ সাল থেকে সরকারের ব্যাপক সামাজিক বনায়ন। ইউএনবির ২০২২ সালের ৪ এপ্রিলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নের জবাবে পরিবেশ মন্ত্রণালয় জানায়, ১৯৮০-৮১ থেকে ২০২০-২১ অর্থবছর পর্যন্ত সামাজিক বনায়নের আওতায় বন অধিদপ্তরের জমিতে ১ লাখ ২ হাজার ২২৯ হেক্টর উডলট ও ব্লক বাগান এবং সড়ক, রেলপথ, বাঁধসহ অন্যান্য জমিতে প্রায় ৭৬ হাজার ৭৫২ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান করা হয়েছে। ২০২৪ সালের জুনে মন্ত্রণালয় ইউএনবিকে জানায়, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত সামাজিক বনায়নের ১ লাখ ৬০ হাজার ৬৯৯ জন উপকারভোগী মোট ৩২.৬৯৫ বিলিয়ন টাকা লভ্যাংশ পেয়েছেন, আর ২০০৯-১০ থেকে ২০২২-২৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ২ লাখ ১৭ হাজার ৪০২ হেক্টর ব্লক বাগান ও ৩০ হাজার ২৫২ কিলোমিটার স্ট্রিপ বাগান করা এবং ১১ কোটি ২০ লাখের বেশি চারা বিতরণ ও রোপণ করা হয়েছে।
দেশের কতটা জমি গাছে ঢাকা
বন অধিদপ্তরের ‘বাংলাদেশের বন ও বৃক্ষসম্পদ প্রতিবেদন ২০১৯’ শীর্ষক সমীক্ষায় দেখা যায়, দেশের মোট আয়তনের ২২.৩৭ শতাংশ বৃক্ষাচ্ছাদিত, ২০২০ সালের জুনে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়। এফএওর আগের এক প্রতিবেদনে এই হার ছিল ১০.৯ শতাংশ। নতুন হিসাবে প্রাকৃতিক বনের বাইরের গাছ, সামাজিক বনায়নের মাধ্যমে তৈরি চাঁদোয়াসহ, গণনায় আনা হয়। পত্রিকাটির তথ্য অনুযায়ী, তখন বন অধিদপ্তরের হাতে প্রায় ১৬ লাখ ৪ হাজার হেক্টর প্রাকৃতিক বন এবং সামাজিক বনায়নের আওতায় ২ লাখ ৩৭ হাজার হেক্টর বাগান ছিল; আর অধিদপ্তরের ৬ লাখ ১৮ হাজার ২৫৩.৪৯ হেক্টর জমি (স্থল ও সামুদ্রিক) সংরক্ষিত বন হিসেবে শ্রেণিভুক্ত।
বনাচ্ছাদন ও বৃক্ষাচ্ছাদন আলাদা মাপকাঠি। ইউএনবির ২০২২ সালের এপ্রিলের প্রতিবেদনে সংসদে দেওয়া জবাবে পরিবেশ মন্ত্রণালয় বনাচ্ছাদন ১৪.১০ শতাংশ এবং বৃক্ষাচ্ছাদিত এলাকা ২২.৩৭ শতাংশ বলে জানায়; অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০২৫ সালের মধ্যে বৃক্ষাচ্ছাদন ২৪ শতাংশে নিতে কয়েকটি প্রকল্প চলছে বলেও জানানো হয়। এর আগে ২০২১ সালের মার্চে মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, ২০২৫ সালের মধ্যে বৃক্ষাচ্ছাদন ২৪ শতাংশের বেশি করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস জানায়। ২০২৪ সালের জুনে ইউএনবি জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে বৃক্ষাচ্ছাদন ২২.৩৭ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে এবং বনাচ্ছাদন ১৪.১ শতাংশ থেকে ১৬ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে; বৃক্ষাচ্ছাদন ও বনের কার্বনের পরিমাণ মাপতে তখন একটি জাতীয় বন জরিপ চলছিল। মন্ত্রণালয় আরও জানায়, ২৮টি সহ-ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে স্থানীয় মানুষকে নিয়ে ২২টি রক্ষিত বনাঞ্চল সংরক্ষণ করা হচ্ছে এবং বাংলাদেশের বিপন্ন উদ্ভিদ প্রজাতির লাল তালিকা হালনাগাদ করা হয়েছে।
ছবি: বিশ্বরূপ গাঙ্গুলী / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই ৩.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম, বণিক বার্তা, প্রথম আলো (বাসস), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশ (ইউএনবি), বাংলাপিডিয়া





মন্তব্য
(০)