চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষিরা ইন্দোনেশিয়ায় আম পাঠাতে চাইলে ঢাকায় দেশটির দূতাবাস সর্বাত্মক সহযোগিতা করবে, পাশাপাশি আমের প্রক্রিয়াজাতকরণেও সহায়তা দেবে বলে জানিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত আরিফ সোয়ুকু। ২০২৫ সালের ১ জুলাই, মঙ্গলবার দুপুরে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদরের মহারাজপুরে চাঁপাই এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজ পরিদর্শনে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।
রাষ্ট্রদূত বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের সুনাম রয়েছে সারাবিশ্বে; তাই এখানকার আম নিয়ে কাজ করতে চায় ইন্দোনেশিয়া। তবে বিষয়টি নির্ভর করছে ব্যবসায়ীদের ওপর। তারা ইন্দোনেশিয়ায় আম পাঠাতে চাইলে দূতাবাস সব ধরনের সহায়তা করবে বলে তিনি আশ্বাস দেন। এ সময় চাঁপাই এগ্রোর চলমান প্রকল্প ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা হয়। আমের বহুবিধ ব্যবহার এবং রপ্তানি খাতে আমের উজ্জ্বল সম্ভাবনা ঘিরে উভয় পক্ষই আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
পরিদর্শনের সময় রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে ছিলেন ঢাকাস্থ ইন্দোনেশিয়া দূতাবাসের থার্ড সেক্রেটারি রব্বি ফেরলি হারখা। চাঁপাই এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও নারী উদ্যোক্তা জেসমিন আকতার এবং ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও শিল্প উদ্যোক্তা মো. সফিকুল ইসলাম। পরে রাষ্ট্রদূত জেলার শিবগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন আমবাগান ঘুরে দেখেন; জেলার মধ্যে এই উপজেলাতেই সবচেয়ে বেশি আম উৎপাদন হয়।
একটি প্রক্রিয়াকরণ কারখানা এবং সেই কারখানায় কাঁচামাল জোগান দেওয়া বাগান, দুটোই রাষ্ট্রদূতের কর্মসূচিতে থাকায় তা আমের গোটা মূল্যশৃঙ্খলে আগ্রহের প্রতিফলন ঘটায়; গাছের আম থেকে শুরু করে তা দিয়ে তৈরি পণ্য পর্যন্ত। বিদেশি মিশনের এ ধরনের কৃষিশিল্প পরিদর্শন বাণিজ্যিক সম্পর্ক খতিয়ে দেখার একটি উপায়, যদিও প্রকৃত কোনো রপ্তানি চুক্তি নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও চাষিদের ওপরই।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ: বাংলাদেশের আমের রাজধানী
চাঁপাইনবাবগঞ্জ রাজশাহী বিভাগের একটি সীমান্তঘেঁষা জেলা এবং বাংলাদেশের সবচেয়ে পশ্চিমের জেলা। জেলার আয়তন প্রায় ১ হাজার ৭০২ বর্গকিলোমিটার, ২০২২ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জনসংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ ৩৫ হাজার। জেলার প্রধান দুই নদী পদ্মা ও মহানন্দা। উত্তর ও পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের মালদহ ও মুর্শিদাবাদ জেলা জেলাটিকে ঘিরে রেখেছে। প্রশাসনিকভাবে জেলায় রয়েছে পাঁচটি উপজেলা, শিবগঞ্জ, নাচোল, গোমস্তাপুর, ভোলাহাট ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর। বৃহত্তর রাজশাহী থেকে পৃথক করে ১৯৮৪ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জকে আলাদা জেলা করা হয়; এর অনেকটা জুড়ে আছে শুষ্ক, কিছুটা উঁচু বরেন্দ্র অঞ্চল।
আম চাষের কারণেই চাঁপাইনবাবগঞ্জের পরিচিতি দেশজুড়ে; জেলাটিকে বলা হয় বাংলাদেশের আমের রাজধানী। বিস্তীর্ণ জমি ঢেকে আছে আমবাগানে, আর জেলার মধ্যে শিবগঞ্জ, ভোলাহাট ও গোমস্তাপুর উপজেলাই আম উৎপাদনের প্রধান এলাকা। বরেন্দ্র অঞ্চলের উঁচু জমিতে ধান প্রধান ফসল হলেও পদ্মা অববাহিকার চরে ধান, গম ও তরমুজের পাশাপাশি আমই এ জেলার অর্থনীতির মেরুদণ্ড।
প্রতিবছর গ্রীষ্মে আমের মৌসুম ঘিরে জেলার লাখো মানুষের জীবিকা আবর্তিত হয়, চাষি থেকে শুরু করে ঝুড়ি তৈরির কারিগর, আড়তদার, শ্রমিক ও পরিবহন খাতের মানুষ পর্যন্ত। মৌসুমে বাগান থেকে আম পাড়া, বাছাই, প্যাকিং, পরিবহন, প্রতিটি ধাপেই কাজের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে আমের ফলন ভালো-মন্দের ওপর জেলার বড় একটি অংশের আয়-রোজগার নির্ভর করে।

বাংলাদেশে কত আম হয়
বাংলাদেশে আম কেবল একটি ফসল নয়। আম গাছ (বৈজ্ঞানিক নাম Mangifera indica) ২০১০ সালে বাংলাদেশের জাতীয় বৃক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি পায়, আর আম ভারত, পাকিস্তান ও ফিলিপাইনসহ কয়েকটি দেশের জাতীয় ফল। Mangifera indica অ্যানাকার্ডিয়াসি গোত্রের চিরসবুজ বৃক্ষ, যা প্রায় ৩০ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। পূর্ব ভারত, আসাম ও মিয়ানমারসহ এ অঞ্চলকে এর আদি নিবাস ধরা হয়। বাংলাদেশে সাধারণত জানুয়ারি থেকে মার্চে আমের মুকুল আসে; ওই সময়ে কুয়াশা, অসময়ের বৃষ্টি বা মেঘলা আবহাওয়া ফল ধারণে বড় ক্ষতি করতে পারে, ফলে মুকুলের সময় বৈরী আবহাওয়া হলে মৌসুমের ফলন কমে যায়।
বাংলা বিশ্বকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় একশ জাতের আম রয়েছে; এর মধ্যে ফজলি, ল্যাংড়া, গোপালভোগ, হিমসাগর, খিরসাপাত, আশ্বিনা, লক্ষ্মণভোগ ও মিসরিভোগের মতো উন্নত জাতের পাশাপাশি স্থানীয় বীজের গুটি আমও আছে। ঐতিহ্যগতভাবে বৃহত্তর রাজশাহী ও দিনাজপুর অঞ্চলই আম উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। উৎপাদন গত দুই দশকে অনেক বেড়েছে, বাংলাপিডিয়ার হিসাবে ২০০৫-০৬ মৌসুমে দেশে প্রায় ৬ লাখ ৪০ হাজার টন আম উৎপাদিত হয়েছিল, আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বার্ষিক উৎপাদন দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ লাখ টনে, যা বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষ আম উৎপাদনকারী দেশগুলোর কাতারে রেখেছে।
জাত উন্নয়নেও হয়েছে বড় অগ্রগতি। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি) এ পর্যন্ত এগারোটির মতো আমের জাত অবমুক্ত করেছে। এর মধ্যে ১৯৯৬ সালে অবমুক্ত আম্রপালি (বারি আম-৩) এখন সবচেয়ে জনপ্রিয়; গবেষকদের মতে দেশে উৎপাদিত প্রতি চারটি আমের একটি এখন আম্রপালি জাতের। বারি-৪ জাতটি তৈরি হয়েছে দেশি আশ্বিনা ও ফ্লোরিডার একটি হাইব্রিড জাতের সংকরায়ণে। নতুন জাত ও কলম-চারার মাধ্যমে বাগান সম্প্রসারণ আম উৎপাদন বাড়ানোর পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে।
বিশ্বজুড়ে ক্রান্তীয় ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলে আম জন্মায়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় আম উৎপাদনকারী দেশ ভারত, একাই বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ বা তার বেশি আম উৎপাদন করে; এরপরে বড় উৎপাদকদের মধ্যে আছে চীন ও থাইল্যান্ড। তবে সবচেয়ে বড় উৎপাদক হলেও রপ্তানিতে ভারত শীর্ষে নয়; তাজা আম রপ্তানিতে এগিয়ে মেক্সিকো। বিপুল ফলন সত্ত্বেও বাংলাদেশ উৎপাদিত আমের সামান্য অংশই বিদেশে পাঠায়, আর উৎপাদন ও রপ্তানির এই ব্যবধানের দিকেই ইঙ্গিত করেছিল রাষ্ট্রদূতের সফর।

খিরসাপাত ও জেলার নামী জাতগুলো
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সবচেয়ে নামী আম খিরসাপাত, যা হিমসাগর নামেও পরিচিত। জেলায় বাণিজ্যিকভাবে পাঁচটি উপজেলায় এটি চাষ হয়, তবে সবচেয়ে বেশি উৎপাদন শিবগঞ্জ উপজেলায়। চাঁপাইনবাবগঞ্জে প্রায় ৩ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে বছরে প্রায় ৩৫ হাজার টন খিরসাপাত উৎপাদিত হয় বলে জানা যায়। মাঝারি আকারের, গোলাকার এই আম আঁশহীন, রসালো, সুগন্ধি ও মিষ্টি; পাকলে ওপরের অংশ হলদে হয়ে ওঠে। খিরসাপাত গ্রীষ্মের শুরুতে পাকতে শুরু করে, সর্বোচ্চ ফলন আসে জুন মাসের ৭ থেকে ৩০ তারিখের মধ্যে; পাকা আম ঘরে ৬ থেকে ৮ দিন রাখা যায়।
খিরসাপাতের পরেই জেলার নামী জাত গোপালভোগ, ল্যাংড়া, হিমসাগর, ফজলি ও আশ্বিনা। জাতভেদে পাকার সময় আলাদা হওয়ায় জেলার আমের মৌসুম মে থেকে আগস্ট পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে, মৌসুমের শুরুতে গোপালভোগ ও খিরসাপাত, মাঝামাঝি ল্যাংড়া ও ফজলি, আর শেষ দিকে নামে দেরিতে পাকা আশ্বিনা। মৌসুমের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এই ধারাবাহিকতার কারণেই দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে তাজা আম পাওয়া যায়, যা প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
জেলার জাতগুলোর প্রতিটির আলাদা বৈশিষ্ট্য আছে। গোপালভোগ আগাম জাত, ছোট ও মিষ্টি; সীমান্তের ওপারের একই নামের একটি জায়গা থেকে নাম পাওয়া ল্যাংড়া সবুজাভ ও আঁশহীন; হিমসাগর ও খিরসাপাত আসলে মৌসুমের শুরুর সুগন্ধি জনপ্রিয় আমেরই কাছাকাছি দুই নাম; ফজলি খুব বড় আকারের দেরিতে পাকা আম; আর সবার শেষে পাকা আশ্বিনা তুলনামূলক টক, যা সরাসরি খাওয়ার চেয়ে জুস ও প্রক্রিয়াজাতকরণে বেশি ব্যবহৃত হয়। মিষ্টি টেবিল-ফল থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণের জাত পর্যন্ত এই বৈচিত্র্যের কারণে জেলার আম নানা ধরনের ক্রেতার কাছেই আকর্ষণীয়।

ভৌগোলিক নির্দেশক স্বীকৃতি ও এর গুরুত্ব
ভৌগোলিক নির্দেশক বা জিআই (Geographical Indication) হলো এমন একটি স্বীকৃতি, যা দিয়ে কোনো পণ্যকে তার নির্দিষ্ট ভৌগোলিক উৎস এবং সেই উৎসের সঙ্গে জড়িত বিশেষ গুণ বা সুনামের ভিত্তিতে চিহ্নিত করা হয়। বাংলাদেশে এই স্বীকৃতি দেয় পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর (ডিপিডিটি)। খিরসাপাত আম বাংলাদেশের তৃতীয় জিআই পণ্য। প্রথমটি ছিল জামদানি শাড়ি, যার সনদ দেওয়া হয় ২০১৬ সালে; দ্বিতীয়টি ইলিশ মাছ, স্বীকৃতি পায় ২০১৭ সালে। বারি ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে খিরসাপাতের জন্য ডিপিডিটিতে আবেদন করে এবং ২০১৯ সালের ২৭ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে সনদ হস্তান্তর করা হয়।
জিআই স্বীকৃতি একটি পণ্যের নামকে তার উৎপত্তিস্থলের সঙ্গে বেঁধে দেয় এবং দেশ ও রপ্তানি, দুই বাজারেই পণ্যটিকে সুরক্ষা ও পরিচিতি দিতে সহায়তা করে, ক্রেতাকে আসল পণ্যের নিশ্চয়তা দেয়। খিরসাপাতের উৎপত্তিস্থল চাঁপাইনবাবগঞ্জের জন্য এই স্বীকৃতি জেলাটির পরিচয়কেই আরও দৃঢ় করেছে, দেশের অন্যতম সেরা আমের উৎস হিসেবে। রাষ্ট্রদূত যে বিশ্বজোড়া সুনামের কথা বলেছিলেন, তার পেছনে এই পরিচয়ই কাজ করছে।
জামদানি শাড়ি ও ইলিশ মাছের পর খিরসাপাতই ছিল বাংলাদেশের প্রথম ফল, যা জিআই সনদ পায়। রপ্তানিমুখী একটি জেলার জন্য এমন স্বীকৃতি বিদেশের বাজারে ব্র্যান্ডিংয়ের কাজে লাগে, যেখানে নির্দিষ্ট উৎসের নাম একটি পণ্যকে আলাদা করে তোলে এবং সাধারণ আমকে বিখ্যাত নামে চালিয়ে দেওয়া ঠেকাতে সাহায্য করে।
কানসাট ও আমের বাণিজ্য
আমের মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জের বাণিজ্যের প্রাণকেন্দ্র শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট বাজার, যাকে অনেকেই দেশের সবচেয়ে বড় আমের বাজার বলে থাকেন। কানসাট ছাড়াও গোমস্তাপুরের রহনপুরসহ জেলার নানা বাজারে ভোর থেকে সাইকেল, ভ্যান ও ট্রাকে করে আম আসতে থাকে; আড়তে চলে কেনাবেচা, সেখান থেকে আম ছড়িয়ে পড়ে ঢাকাসহ সারা দেশে। মৌসুমজুড়ে এই বাজারগুলোকে ঘিরেই ব্যস্ত থাকে জেলার অর্থনীতি।
উত্তরাঞ্চল থেকে রাজধানীতে আম পরিবহন সহজ ও সাশ্রয়ী করতে বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০২০ সাল থেকে আমের মৌসুমে বিশেষ 'ম্যাঙ্গো স্পেশাল ট্রেন' চালু করে, যাতে কম খরচে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহী থেকে ঢাকায় আম পাঠানো যায়। দূরত্ব, দ্রুত পচনশীলতা ও পরিবহন খরচ আমের বাজারজাতকরণের বড় চ্যালেঞ্জ; তাজা আম ঘরে মাত্র কয়েক দিন ভালো থাকে বলে সংরক্ষণ, হিমাগার ও দ্রুত পরিবহনের সুবিধা এ খাতে বড় ভূমিকা রাখে।
অপরিপক্ব আম যাতে বাজারে না আসে এবং কৃত্রিম উপায়ে পাকানো ঠেকাতে প্রতি মৌসুমের আগে অঞ্চলটির প্রশাসন একটি আম নামানোর (হারভেস্টিং) ক্যালেন্ডার ঘোষণা করে, যেখানে আগাম গোপালভোগ থেকে দেরিতে পাকা আশ্বিনা পর্যন্ত কোন জাত কোন তারিখের আগে পাড়া যাবে না তা ঠিক করে দেওয়া হয়; কোনো এলাকায় আগে পাকলে চাষিরা স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়ে তা পাড়তে পারেন। এই ক্যালেন্ডারের উদ্দেশ্য অঞ্চলটির আমের সুনাম রক্ষা করা, যে সুনাম দেশ-বিদেশের ক্রেতাদের টানে।

বাংলাদেশের আম রপ্তানি
আম উৎপাদনে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকলেও রপ্তানিতে তা এখনো সামান্য। ২০২৪ সালের জুনে কৃষিমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ তখন ৩৮টি দেশে আম রপ্তানি করছে, তবে বছরে রপ্তানি হয় মাত্র প্রায় তিন হাজার টন। তাঁর দেওয়া তথ্যে ২০২১-২২ অর্থবছরে রপ্তানি হয় ১ হাজার ৭৫৭ টন, আর ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ১০০ টনে। বছরে প্রায় ২৫ লাখ টন উৎপাদনের বিপরীতে এই রপ্তানি নিতান্তই নগণ্য, শতকরা হিসাবে এক শতাংশেরও অনেক কম।
মন্ত্রীর ভাষ্যমতে, বাংলাদেশের প্রতিবছর কয়েক লাখ টন আম রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। প্রবাসী দক্ষিণ এশীয়দের বড় জনগোষ্ঠী আছে এমন বাজার এবং মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপেই বাংলাদেশের আম মূলত গেছে। তবে এই সম্ভাবনা কাজে লাগানোর পথে প্রধান বাধা উন্নত মানের আমের ধারাবাহিক জোগান, আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী প্যাকিং ও সার্টিফিকেশন, হিমাগার-নির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিমান পরিবহনের ওপর নির্ভরতা।
আমদানিকারক দেশগুলো সাধারণত ফলে ফলের মাছির উপদ্রব না থাকা এবং কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থাকার শর্ত দেয়। এ জন্য দূরের বাজারে আম পাঠাতে হলে হট ওয়াটার ট্রিটমেন্ট বা ভেপার হিট ট্রিটমেন্টের মতো আধুনিক প্রক্রিয়াকরণ, মানসম্মত বাগান ব্যবস্থাপনা এবং নির্ভরযোগ্য সনদায়ন প্রয়োজন হয়। উদ্বৃত্ত তাজা আম পাঠানোর বদলে এসব শর্ত মেনে একটি স্থিতিশীল সরবরাহ গড়ে তুলতে পারলেই দেশ কয়েক হাজার টন থেকে কর্মকর্তাদের বলা অনেক বড় অঙ্কের দিকে এগোতে পারবে। এ কারণেই রাষ্ট্রদূতের আম প্রক্রিয়াজাতকরণে সহায়তার প্রস্তাব চাষি ও উদ্যোক্তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
বছরের পর বছর বাংলাদেশের আম রপ্তানি কিছুটা বাড়লেও মোট ফলনের তুলনায় তা এখনো সামান্যই। সম্প্রসারণ কর্মকর্তারা চাষিদের বাগান ব্যবস্থাপনা ও রপ্তানির উপযোগী নিরাপদ হ্যান্ডলিংয়ে প্রশিক্ষণ দেন; তবুও কর্মকর্তা ও রপ্তানিকারকেরা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, রপ্তানি বাড়াতে হলে দেশে আলাদা রপ্তানিমুখী বাগান, উন্নত প্যাকিং হাউস ও ট্রিটমেন্ট সুবিধা দরকার।
বাজার হিসেবে ইন্দোনেশিয়া
ইন্দোনেশিয়া নিজেও বড় আম উৎপাদনকারী দেশ। ইন্দোনেশিয়ার আম খাত নিয়ে পরিচালিত গবেষণায় দেশটিকে বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম আম উৎপাদনকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়, বছরভেদে যা বৈশ্বিক উৎপাদনের ৩ থেকে ৫ শতাংশ। তবে দেশটি আম রপ্তানিতে পিছিয়ে, বছরে মাত্র প্রায় এক হাজার টন তাজা আম রপ্তানি হয়, যা তাদের মোট উৎপাদনের শূন্য দশমিক এক শতাংশের মতো। ইন্দোনেশিয়ার বেশির ভাগ আমই দেশের ভেতরে খাওয়া হয়।
বিশ্বের চতুর্থ জনবহুল দেশ ইন্দোনেশিয়ার জনসংখ্যা ২৭ কোটির বেশি, ফলে দেশটির অভ্যন্তরীণ বাজার বিশাল। ইন্দোনেশিয়া দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অন্যতম বড় অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক জোট আসিয়ানের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য। নিজেরা বিপুল আম উৎপাদন করলেও ক্রমবর্ধমান মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও তাজা ফল খাওয়ার সংস্কৃতির কারণে এটি একটি বড় ভোক্তাবাজার। ২০২২ সালে দেশটির তৎকালীন প্রেসিডেন্ট দেশে চাহিদা ও রপ্তানি, দুই লক্ষ্যেই আম উৎপাদন বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছিলেন, কারণ অভ্যন্তরীণ উৎপাদন রপ্তানির চাহিদা মেটাতে তখনো যথেষ্ট ছিল না।
এমন একটি দেশের দূতাবাসের আম আমদানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণে আগ্রহ চাঁপাইনবাবগঞ্জের চাষি ও উদ্যোক্তাদের জন্য একটি সম্ভাব্য নতুন বাজারের ইঙ্গিত দেয়। তবে বাংলাদেশের আম ইন্দোনেশিয়ার বাজারে ঢুকতে হলে দেশটির নিজস্ব আমদানি ও কোয়ারেন্টাইন বিধি মানতে হবে, এটিও একটি কারণ, যে জন্য রাষ্ট্রদূত রপ্তানির পাশাপাশি প্রক্রিয়াজাতকরণে সহায়তার কথাও বলেছিলেন। সফরকালে তিনি স্পষ্ট করেই বলেন, রপ্তানি হবে কি না তা নির্ভর করছে ব্যবসায়ীদের সিদ্ধান্তের ওপর।
প্রক্রিয়াজাতকরণ ও আমের বহুমুখী ব্যবহার
রাষ্ট্রদূতের প্রস্তাবের দ্বিতীয় অংশ ছিল আম প্রক্রিয়াজাতকরণে সহযোগিতা। বাংলাদেশে উৎপাদিত বিপুল আমের প্রায় পুরোটাই বিক্রি হয় তাজা অবস্থায়, অথচ আম দ্রুত পচনশীল এবং মৌসুম সীমিত। এ অবস্থায় প্রক্রিয়াজাতকরণ মৌসুমের বাইরেও আমের মূল্য ধরে রাখার একটি উপায়। আম থেকে তৈরি হয় পাল্প বা মণ্ড, জুস, স্কোয়াশ, জ্যাম, জেলি, আচার এবং শুকনো আম বা আমসত্ত্ব; কাঁচা আম শুকিয়ে গুঁড়া (আমচূর) করা হয়। এসব পণ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণযোগ্য এবং দূরের বাজারে পাঠানো তুলনামূলক সহজ।
তাজা আম ভিটামিন সি-তে সমৃদ্ধ এবং ভিটামিন এ-এর একটি উৎস; তবু এটি সবচেয়ে বেশি কদর পায় টেবিল ফল হিসেবে, যে কারণে প্রক্রিয়াজাত হয় সামান্যই। কিন্তু প্রক্রিয়াজাতকরণ এমন বাজার খুলে দেয় যেখানে তাজা ফল পৌঁছাতে পারে না, পাল্প ও জুস সারা বছর সংরক্ষণ ও সরবরাহ করা যায়, শুকনো আম ও আমচূর সহজে দূরে পাঠানো যায়, আর মৌসুমের ভরা সময়ে যে আম নষ্ট হয়ে যেত তা বিক্রয়যোগ্য পণ্যে রূপান্তর করা যায়।
প্রক্রিয়াজাত আমপণ্য এখনই তাজা ফলের চেয়ে দূরে পৌঁছায়, বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো দেশে ও বিদেশে আমের জুস ও পানীয় বিক্রি করে, আর পাল্প ও কনসেনট্রেটের চাহিদা চাষিদের তাজা ফলের স্বল্প মৌসুমের বাইরেও ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত রাখে। রাষ্ট্রদূতের প্রস্তাবিত ধরনের প্রক্রিয়াজাতকরণে সহযোগিতা চাঁপাইনবাবগঞ্জের আমের জন্য এই পথটিই আরও প্রশস্ত করতে পারে।
চাঁপাই এগ্রো ইন্ডাস্ট্রিজের মতো কৃষিভিত্তিক শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো এই মূল্য সংযোজনের কাজটিই করে, বাগানের কাঁচামালকে প্রক্রিয়াজাত পণ্যে রূপান্তর করে। রাষ্ট্রদূতের সফরে উভয় পক্ষ আমের বহুবিধ ব্যবহার নিয়ে আলোচনা করেন এবং প্রক্রিয়াজাত আমপণ্যের রপ্তানি সম্ভাবনা নিয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেন। যে দেশে বছরে লাখ লাখ টন আম হয় অথচ তার প্রায় পুরোটাই স্বল্প মৌসুমে তাজা বিক্রি হয়ে যায়, সেখানে প্রক্রিয়াজাতকরণের সক্ষমতা গড়ে তোলাকেই চাষিদের স্থিতিশীল আয়ের পথ হিসেবে দেখা হয়।
ছবি: Ferdous / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া, ঢাকা ট্রিবিউন, উইকিপিডিয়া, ইউএসডিএ, বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (বারি)-সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদন





মন্তব্য
(০)