দুই মাস আগেও যে তিস্তার চরে পানি থই থই করছিল, গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সেই চর এখন গোচারণভূমি। হাজারো গরু-ছাগল নিয়ে চরবাসী সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত সেখানে থাকছেন। রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) গবেষকেরা বলছেন, এই চারণভূমি থেকে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে।
গবেষকদের ব্যাখ্যা, অ্যানথ্রাক্সে মারা যাওয়া পশু নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ায় তা চরে এসে ঠেকে, ফলে চরের ঘাসে জীবাণু থাকার আশঙ্কা বেশি। তিস্তা সুন্দরগঞ্জের তারাপুর, বেলকা, হরিপুর, চণ্ডীপুর, কঞ্চিবাড়ী, শান্তিরাম, শ্রীপুর ও কাপাসিয়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে, আর এসব চরেই গরু-ছাগল পালন বেশি। চরের পশু উপজেলার ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভার হাটে বিক্রি হয়।
উপজেলা প্রাণিসম্পদ ও স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্যে, গত বছরের অক্টোবরে বেলকা ইউনিয়নে প্রথম সংক্রমণ দেখা দেয়; তখন অন্তত ১০টি গরু-ছাগল মারা যায়, সরকারি হিসাবে ৩৫ জন আক্রান্ত হন এবং একজন নারী মারা যান। চলতি বছরের আগস্টে কঞ্চিবাড়ীতে আক্রান্ত একটি গরু জবাইয়ের পর ছয়জন আক্রান্ত হন; পরে সর্বানন্দ, তারাপুর ও বামনডাঙ্গায় আক্রান্ত গরু জবাই করে সরকারি হিসাবে ৪৯ জন আক্রান্ত হয়েছেন। ৯ সেপ্টেম্বর বাছহাটি গ্রামে একটি অসুস্থ গরু জবাই করে প্রায় ১০০ পরিবারে মাংস বিলানো হয়েছিল; পরীক্ষায় সেই মাংসে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু পাওয়া যায়।
আইইডিসিআরের মেডিকেল অ্যানথ্রোপলজিস্ট ড. দৌলত খান বলেন, অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু প্রায় ১০০ বছর মাটিতে বেঁচে থাকতে পারে। আক্রান্ত পশু মারা গেলে অন্তত ছয় ফুট মাটির নিচে পুঁততে হয়, কিন্তু অনেকে তা নদীতে ভাসিয়ে দেন; সেই জীবাণু চরের মাটিতে মিশে ঘাসের মাধ্যমে আবার পশুর শরীরে ঢোকে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের এপিডেমিওলজি সেলের ডেপুটি চিফ এপিডেমিওলজিস্ট ডা. মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রতিবছর পশুকে টিকা দিতে হবে, টিকাদান অব্যাহত রাখতে হবে এবং গরু-ছাগলকে চরের ঘাস খাওয়ানো থেকে বিরত রাখতে হবে।
হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মোজাহারুল ইসলাম জানান, তিস্তার চরের প্রায় প্রতিটি বাড়িতে ছোট গরুর খামার আছে এবং বছরের প্রায় ছয় মাস চরের ঘাসই পশুর প্রধান খাবার। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা কে এম ইফতেখারুল ইসলাম বলেন, এরই মধ্যে উপজেলায় ৪৫ হাজার গরুকে অ্যানথ্রাক্সের টিকা দেওয়া হয়েছে এবং টিকাদান চলছে; সংক্রমণস্থলের চারপাশের তিন কিলোমিটারে পশুকে টিকা দেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, আপাতত আক্রান্তের সংখ্যা নেই বললেই চলে।
সেপ্টেম্বরে গাইবান্ধা ছাড়াও রংপুর, দিনাজপুর, মেহেরপুর ও কুষ্টিয়ায় অ্যানথ্রাক্সের খবর মিলেছে। মেহেরপুরের গাংনীতে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪১২ জন আক্রান্তের তথ্য পাওয়া যায়, তাঁদের ২৬২ জন ছাগলের ও ১৩০ জন গরুর মাংসের সংস্পর্শে এসেছিলেন। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে আগস্ট থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৫৪ জন আক্রান্ত হন। রংপুরের পীরগাছার আদমপাড়ায় ১৩ জন শনাক্ত হন; যে গরুর মাংস থেকে সংক্রমণ, সেটি সুন্দরগঞ্জ থেকে কেনা হয়েছিল বলে জানা গেছে।
খামারি ও চরবাসীর জন্য করণীয়: অসুস্থ বা হঠাৎ মারা যাওয়া পশু জবাই না করা, মৃত পশু নদীতে না ফেলে নিরাপদে মাটিচাপা দেওয়া, প্রতিবছর টিকা দেওয়া এবং পশুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা নিশ্চিত না করে মাংস কেনা ও খাওয়া থেকে বিরত থাকা। ত্বকে চুলকানি, ফোসকা ও ঘা এ রোগের পরিচিত লক্ষণ।
প্রতিবেদনটি সমকালের সুন্দরগঞ্জ (গাইবান্ধা) প্রতিনিধি এ মান্নান আকন্দের।
ছবি: Moheen Reeyad / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0); চট্টগ্রামের আনন্দবাজারে মাঠে চরছে গরু।
সূত্র: সমকাল





মন্তব্য
(০)