২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি বাংলা দৈনিক জাগো নিউজ ২৪-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে বলা হয়, বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তিনির্ভর বা স্মার্ট কৃষি এখন এক অপরিহার্য পথ হয়ে উঠেছে। নিবন্ধটির বক্তব্য ছিল, জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষিজমি সংকোচন, শ্রম সংকট ও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি একসঙ্গে কৃষির ওপর চাপ ফেলছে, আর এই বাস্তবতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ড্রোন, ইন্টারনেট অব থিংস (আইওটি), সেন্সর, মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল সাপ্লাই চেইনের সমন্বিত ব্যবহার আর কেবল একটি বিকল্প নয়, বরং একটি জরুরি দিকনির্দেশনা। নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, সরকার এরই মধ্যে কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তি আনতে নানা উদ্যোগ নিয়েছে, যা কৃষি ব্যবস্থাকে আরও দক্ষ, লাভজনক ও টেকসই করতে সহায়তা করবে। এই প্রতিবেদনে নিবন্ধটির মূল বক্তব্য তুলে ধরা হলো এবং তার পাশে রাখা হলো খাদ্য নিরাপত্তা বলতে আসলে কী বোঝায়, প্রিসিশন বা সুনির্দিষ্ট কৃষি কীভাবে কাজ করে এবং নিবন্ধটি লেখার সময় বাংলাদেশের কৃষি কোথায় দাঁড়িয়ে ছিল, সেই প্রেক্ষাপট।
খাদ্য নিরাপত্তা বলতে আসলে কী বোঝায়
নিবন্ধে ঠিকই উল্লেখ করা হয়, খাদ্য নিরাপত্তা শুধু খাদ্যের প্রাপ্যতা নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুষ্টি, নিরাপত্তা এবং মানুষ আদৌ প্রয়োজনীয় খাদ্য পাচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও। সবচেয়ে বহুল গৃহীত সংজ্ঞাটি এসেছে ১৯৯৬ সালের বিশ্ব খাদ্য সম্মেলন থেকে, যা জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) উদ্ধৃত করে: খাদ্য নিরাপত্তা তখনই বিদ্যমান থাকে, যখন সব মানুষ, সব সময়ে, সক্রিয় ও সুস্থ জীবনের জন্য তাদের খাদ্যচাহিদা ও খাদ্যপছন্দ পূরণ করে এমন পর্যাপ্ত, নিরাপদ ও পুষ্টিকর খাদ্যের শারীরিক ও অর্থনৈতিক নাগাল পায়। এফএও এই সংজ্ঞা থেকে চারটি মাত্রা আলাদা করে দেখায়, আর প্রতিটিই কৃষিতে প্রযুক্তি কেন গুরুত্বপূর্ণ, তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
- প্রাপ্যতা: অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বা আমদানির (খাদ্য সহায়তাসহ) মাধ্যমে পর্যাপ্ত পরিমাণে উপযুক্ত মানের খাদ্যের সরবরাহ।
- অভিগম্যতা: পুষ্টিকর খাদ্য পাওয়ার জন্য ব্যক্তি ও পরিবারের প্রয়োজনীয় সম্পদ ও অধিকার থাকা।
- ব্যবহার: পর্যাপ্ত খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যসেবার মধ্য দিয়ে খাদ্যকে এমনভাবে কাজে লাগানো, যাতে প্রকৃত পুষ্টিগত সুস্থতা আসে; এতে খাদ্যবহির্ভূত উপাদানের গুরুত্বও স্পষ্ট হয়।
- স্থিতিশীলতা: সব সময় পর্যাপ্ত খাদ্যের নাগাল থাকা, যাতে অর্থনৈতিক বা জলবায়ুজনিত আকস্মিক ধাক্কা কিংবা মৌসুমি সংকটের মতো চক্রাকার ঘটনার কারণে সেই নাগাল হারানোর ঝুঁকি না থাকে।
ধারণাটি সময়ের সঙ্গে বদলেছে। এফএওর নথি অনুসারে, শব্দটির উৎপত্তি সত্তরের দশকের মাঝামাঝি, যখন ১৯৭৪ সালের বিশ্ব খাদ্য সম্মেলন খাদ্য নিরাপত্তাকে সরবরাহের দৃষ্টিকোণ থেকে, অর্থাৎ মৌলিক খাদ্যপণ্যের প্রাপ্যতা ও দামের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার অর্থে দেখেছিল। ১৯৮৩ সালে এফএওর বিশ্লেষণ অভিগম্যতার দিকে মনোযোগ দেয়, চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্য বিবেচনায় আনে এবং জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি পরিবার ও ব্যক্তিকেও হিসাবে আনে। এরপর ১৯৯৬ সালের সম্মেলনের সংজ্ঞা এই ধারাগুলোকে একত্র করে আজও ব্যবহৃত বহুমাত্রিক ধারণায় রূপ দেয়। নৈতিক দিকটিও আগেই স্বীকৃত ছিল: খাদ্যের অধিকার ১৯৪৮ সালের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণায় স্থান পায়, আর পর্যাপ্ত খাদ্যের অধিকার আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয় ১৯৯৬ সালের সম্মেলনে।
প্রযুক্তি একসঙ্গে এই চারটি মাত্রার সঙ্গেই সম্পর্কিত। একই জমিতে ফলন বাড়ালে প্রাপ্যতা বাড়ে; খরচ ও অপচয় কমালে খাদ্য সাশ্রয়ী থাকে, যা অভিগম্যতার সঙ্গে জড়িত; ভালো মান ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনা ব্যবহারকে সহায়তা করে; আর বন্যা, খরা ও পোকার বিরুদ্ধে উৎপাদন স্থিতিশীল রাখলে স্থিতিশীলতা নিশ্চিত হয়। নিবন্ধটি প্রযুক্তিকে নিজে থেকে কোনো লক্ষ্য হিসেবে না দেখে এই কাঠামোর ভেতরেই স্মার্ট কৃষিকে স্থাপন করেছে।
বাংলাদেশে প্রশ্নটি কেন গুরুত্বপূর্ণ
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ বড় দেশ। ২০২২ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা গণনা করা হয় প্রায় ১৬ কোটি ৫১ লাখ ৫৮ হাজার, যা ২০১১ সালের গণনার চেয়ে ১৪ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি; আর এই সব মানুষকে খাওয়াতে হয় এমন একটি ভূখণ্ড থেকে, যা বাড়ছে না। সীমিত ও ক্রমসংকুচিত সম্পদের ওপর দাঁড়িয়ে এত মানুষের খাদ্য জোগান দেওয়ার এই চাপই নিবন্ধটি বর্ণনা করেছে।
উন্নয়নের সঙ্গে কৃষির অংশ কমলেও অর্থনীতিতে এর ভূমিকা এখনো কেন্দ্রীয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে খাতটি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২ শতাংশের বেশি জুগিয়েছে এবং ২০১৭ সালের এক হিসাব অনুযায়ী শ্রমশক্তির প্রায় ৪২ দশমিক ৭ শতাংশ এই খাতে নিয়োজিত, অর্থাৎ জনসংখ্যার বড় অংশ এখনো জীবিকার জন্য কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ধান প্রধান খাদ্য এবং একক হিসেবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফসল; ২০২৩ সালে জাতীয় উৎপাদন ছিল প্রায় ৩ কোটি ৯১ লাখ টন, আর ২০১৯ সাল থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদক দেশের স্থানে রয়েছে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, শুধু ধানই মোট আবাদি জমির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ দখল করে রাখে, আর উচ্চফলনশীল জাতের ধান মোট ধানি জমির প্রায় তিন-চতুর্থাংশ জুড়ে আবাদ হয়। ধানের পাশাপাশি গম, পাট, আলু, ডাল, তেলবীজ, আখ ও শাকসবজি দেশের প্রধান ফসলগুলোর মধ্যে পড়ে।
কৃষির কাঠামোই বুঝিয়ে দেয়, নিবন্ধে খরচ, শ্রম ও ন্যায্য মূল্যের প্রশ্ন কেন এত বড় হয়ে ওঠে। বাংলাদেশ ছোট ছোট খামারের দেশ: বাংলাপিডিয়ায় সংকলিত কৃষিশুমারির তথ্য অনুযায়ী প্রায় এক কোটি নব্বই লাখ কৃষি খানা আছে, যেগুলোর গড় আয়তন মাত্র আধা হেক্টরের মতো এবং যেগুলো এতটাই নিবিড়ভাবে চাষ করা হয় যে শস্য নিবিড়তা ১৭৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, অর্থাৎ বেশির ভাগ জমিতে বছরে একাধিক ফসল হয়। মোট প্রায় ১ কোটি ৪৩ লাখ হেক্টর ভূমির প্রায় ৬০ শতাংশ আবাদযোগ্য, আর শহর, সড়ক ও শিল্পের বিস্তারে বছরের পর বছর সেই আবাদি জমি ক্ষয়ে গেছে। এর ওপর জলবায়ু পরিবর্তন যোগ করে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও উপকূলের মাটিতে লবণাক্ততার ধীর অনুপ্রবেশ, যা খাদ্য নিরাপত্তার স্থিতিশীলতার মাত্রাকে হুমকিতে ফেলে। এসব অবস্থার কথা মাথায় রেখেই নিবন্ধটি যুক্তি দেয়, প্রযুক্তি এখানে কোনো বিলাসিতা নয়।

স্মার্ট বা প্রিসিশন কৃষি কী
নিবন্ধের ভাষায় স্মার্ট কৃষি হলো এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে তথ্যপ্রযুক্তি, এআই, আইওটি, সেন্সর, ড্রোন ও ডাটা বিশ্লেষণ ব্যবহার করে কৃষি পরিচালনা করা হয়। বিস্তৃত আলোচনায় একে সাধারণত প্রিসিশন বা সুনির্দিষ্ট কৃষি বলা হয়: এটি এমন এক খামার-ব্যবস্থাপনা কৌশল, যা খেত, উদ্ভিদ ও প্রাণীর তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করে, তা অন্যান্য তথ্যের সঙ্গে মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কাজে লাগায়; এর ঘোষিত লক্ষ্য সম্পদের দক্ষ ব্যবহার, উৎপাদনশীলতা, মান, লাভজনকতা ও টেকসইতা বাড়ানো। এটি ফসল ও প্রাণিসম্পদ, দুই ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, এমনকি সংযুক্ত সেন্সর দিয়ে গবাদিপশু বা মৌমাছির চাকের পর্যবেক্ষণও এর অন্তর্ভুক্ত।
এই ছাতার নিচে বেশ কয়েকটি উপকরণ আছে। স্যাটেলাইট অবস্থান নির্ণয় (জিপিএস বা জিএনএসএস) একজন কৃষককে খেতের নির্দিষ্ট স্থান চিহ্নিত করতে দেয়, ফলে ফলন, আর্দ্রতা, মাটির নাইট্রোজেন ও পিএইচ এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় কীভাবে বদলায়, তা মানচিত্রে আনা যায়। এরপর ভ্যারিয়েবল-রেট প্রযুক্তি বীজ বপন ও স্প্রে যন্ত্রকে প্রতিটি স্থানে কতটা বীজ, সার বা রাসায়নিক দেওয়া হবে তা মানচিত্র অনুযায়ী সমন্বয় করতে দেয়, পুরো খেতকে একরকম আচরণ না করে। সিদ্ধান্ত-সহায়ক মডেল ও বিগ-ডেটা বিশ্লেষণ পছন্দ ঠিক করতে সাহায্য করে, আর মেশিন লার্নিং ও এআইয়ের ব্যবহার বাড়ছে; তবে প্রিসিশন কৃষির আলোচনায় জোর দিয়ে বলা হয়, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কৃষকই নেন।
সাধারণ সুতোটি, যা নিবন্ধটি বারবার ফিরে এসে বলেছে, তা হলো কৃষক অনুমানের বদলে পরিমাপ করা তথ্যের ভিত্তিতে কাজ করেন। তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, আরও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থাপনা, বেশি উৎপাদন, কম খরচ ও বেশি পরিবেশবান্ধব কৃষি, এই বৈশিষ্ট্যগুলোই নিবন্ধ এই পদ্ধতির জন্য উল্লেখ করেছে, আর সেগুলো সাধারণভাবে প্রিসিশন কৃষির জন্য বর্ণিত সুবিধার সঙ্গে মিলে যায়।

খেতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা
নিবন্ধের ভাষ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৃষিতে পরিবর্তন আনছে, কারণ এটি কৃষককে পরিস্থিতির প্রতিক্রিয়া জানানোর বদলে আগেভাগে সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। এর প্রধান ব্যবহার তিনটি তুলে ধরা হয়। প্রথমত, রোগ ও পোকা শনাক্তকরণ: সাধারণ মোবাইল ফোনে তোলা ছবি পড়ে এআই ফসলের রোগ চিনতে পারে, ফলে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা যায় এবং ক্ষতি কম থাকে। দ্বিতীয়ত, ফলন পূর্বাভাস: তথ্য বিশ্লেষণ করে এআই একটি ফসলের সম্ভাব্য উৎপাদন অনুমান করতে পারে, যা বাজার পরিকল্পনা সহজ করে। তৃতীয়ত, আবহাওয়া বিশ্লেষণ: এআই-ভিত্তিক আবহাওয়ার তথ্য কৃষককে বপন, সার প্রয়োগ ও সেচের সঠিক সময় বেছে নিতে সাহায্য করে।
এই ব্যবহারগুলো প্রিসিশন কৃষির আলোচনার সঙ্গে মেলে, যেখানে মেশিন লার্নিং ক্রমেই সিদ্ধান্ত-সহায়ক ব্যবস্থাকে চালিত করছে, অথচ চূড়ান্ত বিচার কৃষকের হাতেই থাকছে। নিবন্ধে জানানো হয়, সরকারি গবেষণা সংস্থা, এর মধ্যে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল, যা দেশের কৃষি গবেষণা সমন্বয়কারী শীর্ষ সংস্থা, এবং বেসরকারি অ্যাগ্রি-টেক প্রতিষ্ঠানগুলো এরই মধ্যে কৃষিতে এআই ব্যবহার শুরু করেছে। নিবন্ধের দৃষ্টিতে এর প্রতিশ্রুতি হলো আগেভাগে ও তথ্যনির্ভর পদক্ষেপ, যা একদিকে ফলন এবং অন্যদিকে বাজারে পৌঁছানো পণ্যের মান দুটোই রক্ষা করে।
স্প্রে ড্রোন
নিবন্ধের যুক্তি অনুযায়ী ড্রোন কৃষির সাম্প্রতিক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবনগুলোর একটি। স্প্রের ক্ষেত্রে এর সুবিধা স্পষ্ট করে বলা হয়: দ্রুত কাজ হয়, অনেক কম শ্রম লাগে, কম সময়ে বেশি জমি কভার করা যায়, রাসায়নিক নাড়াচাড়ায় কৃষকের স্বাস্থ্যঝুঁকি কমে এবং সঠিক পরিমাণ কীটনাশক প্রয়োগ করা যায়। মৌসুমের ব্যস্ত সময়ে শ্রম সংকটে থাকা একটি দেশে নিবন্ধটি ড্রোন স্প্রেকে বিশেষভাবে কার্যকর বলে উল্লেখ করে এবং পূর্বাভাস দেয়, বড় খামারে ড্রোন অপরিহার্য হয়ে উঠবে।
স্প্রের বাইরেও প্রিসিশন কৃষিতে তুলনামূলক কম দামের ড্রোনে সাধারণ বা মাল্টিস্পেকট্রাল ক্যামেরা বসিয়ে অসংখ্য পরস্পর-ওভারল্যাপ করা ছবি তোলা হয়, যা জোড়া দিয়ে অর্থোফটো এবং এনডিভিআই (নরমালাইজড ডিফারেন্স ভেজিটেশন ইনডেক্স)-এর মতো উদ্ভিদ-মানচিত্র তৈরি করা হয়; একই উড্ডয়নের উচ্চতা-তথ্য থেকে ভূসংস্থানিক মানচিত্রও তৈরি হয়, যা ফসলের স্বাস্থ্যকে জমির ঢালের সঙ্গে মিলিয়ে দেখায়। পদ্ধতি যা-ই হোক, কীটনাশকের ধরন ও সঠিক মাত্রা যন্ত্র একা ঠিক না করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরামর্শ অনুযায়ী নির্ধারণ করা উচিত, যা কৃষক স্থানীয় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কাছ থেকে জেনে নিতে পারেন।
মাটির সেন্সর ও স্মার্ট সেচ
নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, মাটির স্বাস্থ্য কৃষির মূল ভিত্তি, আর সয়েল সেন্সর প্রযুক্তি কৃষককে মাটির আর্দ্রতা, পিএইচ ও পুষ্টি উপাদান মাপতে দেয়। এই পরিমাপ হাতে থাকলে সঠিক পরিমাণে সার দেওয়া যায়, পানির অপচয় হয় না, উৎপাদন বাড়ে ও খরচ কমে; নিবন্ধটি স্মার্ট সেচকে কৃষিকে আরও পরিবেশবান্ধব করে তোলার উপায় হিসেবে বর্ণনা করে।
প্রিসিশন কৃষির অভিজ্ঞতা এটি সমর্থন করে এবং আরও বিস্তারিত যোগ করে। সংযুক্ত সেন্সর ও খামার-সফটওয়্যার ধারাবাহিকভাবে তথ্য সংগ্রহ করে: মাটির আর্দ্রতা সেন্সর সেচের সময় এমনভাবে ঠিক করতে পারে যে মাটির প্রয়োজন হলেই পানি দেওয়া হয়, আর পুষ্টির বর্ণালিভিত্তিক পরিমাপ সারকে কেবল যেখানে দরকার সেখানেই দিতে দেয়, যা এক উদাহরণে সারের ব্যবহার ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়েছে। নতুন ধরনের মাটির ভেতরের সেন্সর কারও উপস্থিতি ছাড়াই তারহীনভাবে তথ্য পাঠাতে পারে। যে দেশে পানি ও সার দুটোরই বাস্তব খরচ ও পরিবেশগত প্রভাব আছে, সেখানে এই সাশ্রয় তুচ্ছ নয়।
মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল কৃষিসেবা
নিবন্ধটি লক্ষ করে, এখন বেশির ভাগ কৃষকের হাতেই স্মার্টফোন আছে, আর তাতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে কৃষিসেবা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হয়েছে। মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে একজন কৃষক পেতে পারেন আবহাওয়ার তথ্য, রোগ নির্ণয়ে সহায়তা, বাজারমূল্য, কৃষি পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ ভিডিও। নিবন্ধে বলা হয়, কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে কৃষকের কাছে পরামর্শ ও প্রযুক্তি পৌঁছে দেওয়ার প্রধান সরকারি সংস্থা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এরই মধ্যে নানা ডিজিটাল কৃষিসেবা চালু করেছে। এর বড় মূল্য পরিধিতে: যে তথ্য একসময় সম্প্রসারণ কর্মীর সরেজমিন সফরের ওপর নির্ভর করত, তা এখন একসঙ্গে লাখ লাখ কৃষকের সামনে তুলে ধরা যায়।
ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন ও ন্যায্য মূল্য
নিবন্ধের যুক্তি অনুযায়ী বাংলাদেশের কৃষির অন্যতম পুরোনো সমস্যা হলো, কৃষক যা উৎপাদন করেন তার ন্যায্য মূল্য পান না। উৎপাদন ও চাহিদার সমন্বয় দুর্বল, আর কৃষক ও ক্রেতার মাঝে মধ্যস্বত্বভোগীর একটি শৃঙ্খল দাঁড়িয়ে থাকে, ফলে উৎপাদক ক্ষতিগ্রস্ত হন। নিবন্ধে বলা হয়, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন এই সমস্যার সমাধান করতে পারে। এর সুবিধাগুলো হলো: কৃষক সরাসরি ক্রেতার সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন, মূল্যে স্বচ্ছতা বাড়ে, বাজার তদারকি সহজ হয় এবং কৃষকের লাভ বাড়ে। নিবন্ধ আরও যোগ করে, ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম কৃষিপণ্য বিপণনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। খাদ্য নিরাপত্তার মাত্রার হিসাবে এটি মূলত অভিগম্যতা ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত: আরও স্থিতিশীল ও ন্যায্য বাজার কৃষিকে টিকিয়ে রাখে এবং খাদ্যের প্রবাহ অব্যাহত রাখে।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও প্রতিবন্ধকতা
নিবন্ধ যে অর্থনৈতিক যুক্তি দিয়েছে তা ব্যাপক। প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎপাদন খরচ কমে, ফলন বাড়ে, কৃষকের আয় বাড়ে, কর্মসংস্থান তৈরি হয়, রপ্তানির সম্ভাবনা বাড়ে এবং সামগ্রিকভাবে গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হতে পারে। নিবন্ধ বিশেষভাবে কৃষিযন্ত্র পরিচালনা, ডেটা বিশ্লেষণ ও অ্যাগ্রি-সার্ভিস খাতে নতুন ধরনের কাজের কথা বলে এবং যুক্তি দেয়, ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমিয়ে কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে সহায়তা করে। যান্ত্রিকীকরণ এর কেন্দ্রে: পাওয়ার টিলার, চারা রোপণযন্ত্র ও হারভেস্টারের মতো যন্ত্র দিয়ে এরই মধ্যে বাংলাদেশের বড় অংশ জমি প্রস্তুত ও চাষ করা হয়, আর নিবন্ধে বর্ণিত শ্রম সংকটের প্রথম জবাবও এগুলোই।

প্রতিবন্ধকতা নিয়ে নিবন্ধটি স্পষ্ট ছিল। প্রযুক্তির উচ্চ প্রাথমিক খরচ, কৃষকের প্রযুক্তি সম্পর্কে সীমিত পরিচিতি, প্রশিক্ষণের অভাব, ইন্টারনেট সংযোগের সমস্যা, নীতির দুর্বল সমন্বয় এবং এসব ব্যবস্থা চালাতে প্রয়োজনীয় তথ্যের ঘাটতি, বিশেষ করে একটি উন্নয়নশীল দেশে, বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে বলে এতে বলা হয়। এসব সমস্যা সমাধানে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলে প্রযুক্তি আসলে কৃষকের কাছে পৌঁছাবে না বলে নিবন্ধ সতর্ক করে। বিপরীতে, সঠিক নীতি সহায়তা, প্রশিক্ষণ ও সহজ ঋণসুবিধা থাকলে কৃষিতে প্রযুক্তি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির একটি শক্তিশালী চালিকাশক্তি হতে পারে বলে এতে যুক্তি দেওয়া হয়।
নিবন্ধের সুপারিশ
নিবন্ধটি শেষ হয় একগুচ্ছ নীতিগত সুপারিশ দিয়ে। এতে বলা হয়, প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দিতে কৃষি প্রযুক্তিতে ভর্তুকি দিতে হবে; গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত কৃষক প্রশিক্ষণ পৌঁছাতে হবে; প্রযুক্তি দ্রুত ছড়াতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ গড়তে হবে; কৃষি গবেষণা ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে; এবং গ্রামে ইন্টারনেটসহ ডিজিটাল অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। এই সব ক্ষেত্রে কৃষি মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়।
ভবিষ্যতের কথা বলতে গিয়ে নিবন্ধটি এমন এক কৃষির চিত্র আঁকে, যা হবে তথ্যনির্ভর, পরিবেশবান্ধব, শ্রম-সাশ্রয়ী ও লাভজনক এবং যেখানে এআই, ড্রোন, সেন্সর ও রোবটিক্স সমন্বিত হয়ে কৃষি একটি আধুনিক শিল্পে রূপ নেবে। সীমিত জমিতে বদলে যাওয়া জলবায়ুর মধ্যে খাদ্য নিশ্চিত করা নির্ভর করছে সঠিক প্রযুক্তি নির্বাচন, সঠিক নীতি প্রণয়ন ও সঠিক বাস্তবায়নের ওপর বলে নিবন্ধ উপসংহার টানে; স্প্রে ড্রোন, মাটির সেন্সর, এআই রোগ শনাক্তকরণ, মোবাইল অ্যাপ ও ডিজিটাল সাপ্লাই চেইন সমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে তা-ই আগামী প্রজন্মের খাদ্য নিরাপত্তা রক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হবে বলে এতে যুক্তি দেওয়া হয়।
ছবি: Vis M / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪; জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও, ফুড সিকিউরিটি পলিসি ব্রিফ, জুন ২০০৬); উইকিপিডিয়া (প্রিসিশন অ্যাগ্রিকালচার; অ্যাগ্রিকালচার ইন বাংলাদেশ; ২০২২ সালের বাংলাদেশ আদমশুমারি); বাংলাপিডিয়া।





মন্তব্য
(০)