প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের পোষ্য প্রাণী পালনে উৎসাহিত করতে এবং বাড়িতে হাঁস, মুরগিসহ অন্যান্য গৃহপালিত পশু-পাখি পালনে বাবা-মাকে সহযোগিতা করতে বলেছে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। ২০২৬ সালের ২৯ জুলাই, বুধবার অধিদপ্তরের এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। চিঠিটি প্রাথমিক শিক্ষার সব বিভাগীয় উপপরিচালক ও সংশ্লিষ্টদের কাছে পাঠানো হয় বলে সেদিন সন্ধ্যায় জাগো নিউজ ২৪ জানায়। হাঁস-মুরগি পালনে সহযোগিতার পাশাপাশি চিঠিতে শিক্ষার্থীদের সব প্রাণীর প্রতি সদয় আচরণ করতে, ছোট ছোট দল গঠন করে প্রতিবেশীদের পোষ্য প্রাণী পালনে উৎসাহিত করতে বলা হয়। একই সঙ্গে কাব স্কাউট ও হলদে পাখি সমাবেশে এবং নিয়মিতভাবে মা সমাবেশ ও উঠান বৈঠকে বিষয়টি আলোচনার নির্দেশনা দেওয়া হয়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, চিঠিতে বলা হয়, নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য নেওয়া ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় শিক্ষার্থীদের পোষ্য প্রাণী পালনে উৎসাহিতকরণের বিষয়টি নির্ধারিত আছে। কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে উল্লিখিত কার্যক্রম নেওয়ার জন্য চিঠিতে "নির্দেশক্রমে অনুরোধ" করা হয়। জাগো নিউজ ২৪ একে বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নেওয়া ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনা হিসেবে উল্লেখ করে। প্রতিবেদনে চিঠির স্মারক নম্বর, বাস্তবায়নের সময়সীমা বা প্রতিবেদন পাঠানোর কোনো ছক প্রকাশ করা হয়নি; শিক্ষক, অভিভাবক বা প্রাণিস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের কোনো প্রতিক্রিয়াও তাতে ছিল না।
চিঠিতে যে চারটি নির্দেশনা দেওয়া হয়
জাগো নিউজ ২৪-এর প্রতিবেদনে উদ্ধৃত চিঠি অনুযায়ী, বিদ্যালয় ও শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দেশনাগুলো হলো:
- শিক্ষার্থীরা যেন বাড়িতে হাঁস, মুরগিসহ অন্যান্য গৃহপালিত পশু-পাখি পালনে বাবা-মাকে সহযোগিতা করে।
- শিক্ষার্থীরা সব পোষ্য প্রাণীর প্রতি যেন সদয় আচরণ করে এবং অন্যদের সদয় আচরণ করতে উৎসাহিত করে।
- ছোট ছোট দল গঠন করে নিজ নিজ বাড়ির আশপাশের প্রতিবেশীদের পোষ্য প্রাণী পালনে উৎসাহিত করবে।
- কাব স্কাউট এবং হলদে পাখি সমাবেশে বিষয়টি আলোচনা করতে হবে এবং মা সমাবেশ, উঠান বৈঠকে নিয়মিত এ বিষয়ে আলোচনা করতে হবে।
প্রথম নির্দেশনাটি পরিবারকেন্দ্রিক: যে বাবা-মা আগে থেকেই হাঁস-মুরগি বা অন্য পশু-পাখি পালন করেন, শিক্ষার্থী তাঁদের সহযোগিতা করবে; একা খামার গড়ার কথা এতে বলা হয়নি। দ্বিতীয়টি আচরণ নিয়ে, অর্থাৎ সব প্রাণীর প্রতি সদয় থাকা এবং অন্যদেরও সদয় হতে উৎসাহ দেওয়া। তৃতীয় নির্দেশনায় শিক্ষার্থীদের ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আশপাশের বাড়িতে বার্তাটি পৌঁছে দিতে বলা হয়েছে। চতুর্থটিতে বলা হয়েছে, কোন কোন মাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হবে: প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চলা দুটি ইউনিফর্মধারী শিশু-কিশোর কার্যক্রম, আর মায়েদের নিয়ে বিদ্যালয়ের সমাবেশ ও পরিবারগুলোর উঠানে হওয়া বৈঠক।
জাগো নিউজ ২৪-এর ছাপা চিঠিতে প্রাণীগুলোকে বলা হয়েছে "পোষ্য প্রাণী", অর্থাৎ মানুষ যেসব প্রাণী লালন-পালন ও দেখাশোনা করে। উদাহরণ হিসেবে প্রথমে হাঁস ও মুরগির নাম এসেছে, তারপর "অন্যান্য গৃহপালিত পশু-পাখি"। গরু, ছাগল বা বিড়ালের মতো প্রাণীর নাম আলাদা করে উল্লেখ করা হয়নি, আর কোনো পরিবারের জন্য কতটি হাঁস-মুরগি বা পশু পালন করতে হবে, সে রকম কোনো সংখ্যাও চিঠিতে বেঁধে দেওয়া হয়নি।
চিঠি পাঠানো অধিদপ্তরটি
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো পরিচালনা করে। অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে এর অধীনস্থ দপ্তর হিসেবে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস, উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণের প্রতিষ্ঠান প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) নাম দেওয়া আছে। ফলে বিভাগীয় উপপরিচালকদের কাছে পাঠানো চিঠি তাঁদের মাধ্যমে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় বিদ্যালয় তদারককারী মাঠপর্যায়ের দপ্তরগুলোর কাছে পৌঁছায়।
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া বর্তমান কাঠামোর শুরু হিসেবে নব্বইয়ের দশকের কথা বলে। ১৯৯০ সালে জাতীয় সংসদে প্রাথমিক শিক্ষা (বাধ্যতামূলককরণ) আইন পাস হয়, ১৯৯২ সালের আগস্টে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ গঠিত হয়, আর ২০০৩ সালের জানুয়ারিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা ব্যুরো প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কাছে হস্তান্তর করা হয়। বাংলাপিডিয়ায় আরও বলা হয়েছে, ১৯৭২ সালের সংবিধানে শিক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয় এবং প্রাথমিক শিক্ষার মেয়াদ পাঁচ বছর রাখা হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অধীনে চার ধরনের প্রধান বিদ্যালয়ের কথা সেখানে আছে: সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, পিটিআই সংলগ্ন পরীক্ষণ বিদ্যালয়, নিবন্ধিত বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং কমিউনিটি বিদ্যালয়।
চিঠির বিষয়বস্তুর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের বয়সের সম্পর্ক আছে। বাংলাপিডিয়ার বাংলাদেশ স্কাউটস নিবন্ধে কাব শাখার বয়স ৬ থেকে ১০ বছরের বেশি বলা হয়েছে, অর্থাৎ যে শিশুরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষে পড়ে। চিঠিতে যে কাজগুলোর কথা বলা হয়েছে, যেমন বাবা-মাকে সহযোগিতা করা, প্রাণীর প্রতি সদয় হওয়া এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলা, সেগুলো এই বয়সী শিশুদের উপযোগী করেই বলা।

কাব স্কাউট ও হলদে পাখি: চিঠিতে নাম আসা দুই কার্যক্রম
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দেশের জাতীয় স্কাউট সংগঠন বাংলাদেশ স্কাউটসের যাত্রা শুরু ১৯৪৮ সালের ২২ মে ঢাকায়, ইস্ট বেঙ্গল স্কাউট অ্যাসোসিয়েশন নামে। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালের এপ্রিলে স্কাউট নেতারা বাংলাদেশ স্কাউট সমিতি গঠন করেন, যা ১৯৭২ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সরকারি স্বীকৃতি পায়। ১৯৭৪ সালের ১ জুন বিশ্ব স্কাউট সংস্থা একে ১০৫তম সদস্য হিসেবে স্বীকৃতি দেয়, আর ১৯৭৮ সালে এর নাম হয় বাংলাদেশ স্কাউটস। স্কাউট আন্দোলনের তিনটি শাখা: ৬ থেকে ১০ বছরের বেশি বয়সী শিশুদের কাব স্কাউট, ১১ থেকে ১৬ বছরের বেশি বয়সী স্কুল ও মাদরাসার শিক্ষার্থীদের স্কাউট, আর ১৭ থেকে ২৫ বছর বয়সী তরুণদের রোভার স্কাউট।
বাংলাপিডিয়া স্কাউটিংয়ের পদ্ধতি হিসেবে হাতে-কলমে শেখা, ছোট উপদলে কাজ করা, অর্জনের স্বীকৃতিতে ব্যাজ দেওয়া এবং খোলা জায়গায় কাজের কথা বলেছে। কাবদের মূলমন্ত্র সেখানে দেওয়া আছে "যথাসাধ্য চেষ্টা করা"। নিবন্ধে আরও বলা হয়েছে, স্কাউটরা বৃক্ষরোপণ, স্যানিটেশন, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং দুর্যোগের পর ত্রাণকাজের মতো সমাজসেবামূলক কাজে অংশ নেয়। বাড়ির পশু-পাখির যত্ন নিয়ে ছোট দলে আলোচনা উপদলে হাতে-কলমে শেখার এই ধারার সঙ্গেই মেলে।
হলদে পাখি হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মেয়ে শিশুদের জন্য বাংলাদেশ গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রম। সংগঠনটি গঠিত হয় বাংলাদেশ গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশন অ্যাক্ট, ১৯৭৩ (১৯৭৩ সনের ৩১ নং আইন) অনুযায়ী, যার তারিখ ১৯৭৩ সালের ৩ অক্টোবর। এই আইনে তৎকালীন পাকিস্তান গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশনের পূর্ব পাকিস্তান শাখাকে বাংলাদেশ গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। সরকারের লজ অব বাংলাদেশ ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আইনটিতে সংগঠনের পদবি, পোশাক ও ব্যাজ ব্যবহারের একচেটিয়া অধিকারের বিধানও আছে।
২০২৬ সালে এই কার্যক্রম সম্প্রসারণের কাজ চলছিল। জাতীয় বার্তা সংস্থা বাসস ২০২৬ সালের ১৮ মে জানায়, বাংলাদেশ গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রাম অঞ্চলের উদ্যোগে "হলদে পাখি কার্যক্রম সম্প্রসারণ কর্মসূচি-২০২৬" উপলক্ষে রাঙ্গামাটির কাপ্তাই উপজেলার ৫টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৯০ জন হলদে পাখির দীক্ষা গ্রহণ শেষে তাদের সনদপত্র ও পোশাক দেওয়া হয়। বাসসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সেই অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, গার্ল গাইডস কার্যক্রম শিশুদের নৈতিক শিক্ষা, শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ২৯ জুলাইয়ের চিঠিতে এসব দলের আলোচনার বিষয়ে প্রাণীর যত্ন যোগ করা হলো।
দেশের ঘরে ঘরে হাঁস-মুরগি: পরিসংখ্যান যা বলে
চিঠিতে হাঁস ও মুরগির নাম আগে আসার কারণ বোঝা যায় দেশে এই দুই পাখির সংখ্যা দেখলে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের (ডিএলএস) "লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স (২০২৪-২০২৫)" তথ্যপত্রে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যের ভিত্তিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মুরগির সংখ্যা ৩,৩৬০.৭০ লাখ এবং হাঁসের সংখ্যা ৭০৫.৮২ লাখ বলা হয়েছে; মোট পোলট্রি ৪,০৬৬.৫২ লাখ। তুলনার জন্য একই সারণিতে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে মুরগি ২,৬৮৩.৯৩ লাখ এবং হাঁস ৫২২.৪০ লাখ দেখানো হয়েছে।
ডিএলএসের একই সারণি অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডিম উৎপাদন হয় ২,৪৪০.৬৫ কোটি; জনপ্রতি বছরে ১০৪টি ডিম ধরে চাহিদা হিসাব করা হয় ১,৮৫০.১৬ কোটি। তথ্যপত্রে জনপ্রতি বছরে ডিমের প্রাপ্যতা ১৩৭.১৯টি বলা হয়েছে। মাংস উৎপাদন ছিল ৮৯.৫৪ লাখ মেট্রিক টন, আর চাহিদা ৭৭.৯২ লাখ মেট্রিক টন। এই হিসাবে বাণিজ্যিক খামারসহ সব গবাদিপশু ও পোলট্রি ধরা হয়েছে, শুধু বাড়ির হাঁস-মুরগি নয়।
একই তথ্যপত্রে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে (সাময়িক হিসাব) স্থির মূল্যে মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) প্রাণিসম্পদ খাতের অবদান ১.৮১ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে এর অংশ ১৬.৫৪ শতাংশ বলা হয়েছে। তথ্যপত্র অনুযায়ী, দেশের জনসংখ্যার ২০ শতাংশের প্রত্যক্ষ এবং ৫০ শতাংশের আংশিক কর্মসংস্থান প্রাণিসম্পদ খাতের ওপর নির্ভরশীল।

পারিবারিক পোলট্রি: হাঁস-মুরগির দেখাশোনা করেন কারা
গ্রামের বেশির ভাগ বাড়ির হাঁস-মুরগি জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ভাষায় "পারিবারিক পোলট্রি"। ২০১৪ সালে রোম থেকে আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল (ইফাদ) ও কিয়েমা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে প্রকাশিত এফএওর "ডিসিশন টুলস ফর ফ্যামিলি পোলট্রি ডেভেলপমেন্ট" নির্দেশিকায় পারিবারিক পোলট্রিকে খাদ্যনিরাপত্তা, আয় ও কর্মসংস্থানের জন্য পরিবারভিত্তিক ছোট পরিসরের উৎপাদন হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। নির্দেশিকা অনুযায়ী, নিম্ন আয়ের খাদ্য-ঘাটতির দেশগুলোতে পোলট্রির ৮০ শতাংশ পর্যন্ত পারিবারিক পোলট্রি, যেখানে মালিকেরা একটি থেকে শুরু করে কয়েক শ পাখি পালন করেন।
কাজটি কে করেন, সে বিষয়ে এফএওর নির্দেশিকা বলছে, পাখির দৈনন্দিন যত্ন ও ব্যবস্থাপনা সাধারণত নারীরাই করেন, প্রায়ই সন্তানদের সহযোগিতায়; পুরুষেরা সাধারণত রাতের আশ্রয়ঘর বানান, প্রয়োজনীয় উপকরণ কেনেন এবং মাঝেমধ্যে বিক্রিতে সাহায্য করেন। নারীদের এই মূল ভূমিকার কারণও নির্দেশিকায় বলা হয়েছে: পারিবারিক পোলট্রিতে শুরুতে বিনিয়োগ কম লাগে, আয় আসে দ্রুত ও ঘন ঘন, আর কাজটি বাড়ির আঙিনা না ছেড়েই করা যায়। এই প্রেক্ষাপটে শিশুদের বাবা-মাকে সহযোগিতা করার যে অনুরোধ চিঠিতে এসেছে, এফএওর বর্ণনা অনুযায়ী গ্রামের অনেক শিশু আগে থেকেই সেই ভূমিকা পালন করে।
পারিবারিক পোলট্রি থেকে একটি পরিবার কী পায়, তারও তালিকা দিয়েছে এফএও: উচ্চমানের পুষ্টিসমৃদ্ধ ডিম ও মাংস, অল্প আয় ও সঞ্চয়, যা নারীদের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ বলে সংস্থাটি উল্লেখ করেছে, এবং সবজিবাগান ও ফসলের জন্য সার। নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, এশিয়ায় পুকুরের ওপর হাঁস-মুরগি পালন করলে তাদের বিষ্ঠা মাছের খাদ্য হিসেবেও কাজে লাগে, যেমন মাছ ও হাঁসের সমন্বিত চাষে। নির্দেশিকা পারিবারিক পোলট্রিকে চার ভাগে ভাগ করেছে: যে ব্যবস্থায় পাখি প্রায় সব খাবার নিজে খুঁটে খায়, সেই ছোট পরিসরের মুক্তচর পদ্ধতি থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক খাদ্য ও এক দিনের বাচ্চা ব্যবহার করা ছোট পরিসরের নিবিড় খামার পর্যন্ত। খুঁটে খাওয়া পদ্ধতিতে সবচেয়ে প্রচলিত বাড়তি খাবার হলো অল্প শস্যদানা বা ঘরের উচ্ছিষ্ট।
বাংলাপিডিয়া জানায়, বাংলাদেশের গৃহপালিত হাঁস এসেছে বুনো নীলশির (ম্যালার্ড) হাঁস থেকে, আর দেশি মুরগি হোয়াইট লেগহর্নের মতো উন্নত জাতের তুলনায় কম মাংস ও কম ডিম দেয়; হোয়াইট লেগহর্ন মুরগি বছরে প্রায় ২৩০টি ডিম দিতে পারে। এফএওর নির্দেশিকায় বাংলাদেশের সোনালি মুরগিকে এমন একটি সংকর জাতের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, যা ছোট পরিসরের পোলট্রি উৎপাদনে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। নির্দেশিকায় বাংলাদেশে ইফাদের অভিজ্ঞতার কথাও আছে, যাতে দেখা গেছে দরিদ্র নারীরা সফলভাবে ছোট হ্যাচারি চালাতে পারেন।

বাড়ির হাঁস-মুরগির প্রধান রোগঝুঁকি
বাড়ির হাঁস-মুরগির সবচেয়ে বড় ঝুঁকি রোগ। এফএওর নির্দেশিকায় মুরগির বেশি মৃত্যুর কারণ হিসেবে অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রোগের মধ্যে সব অঞ্চলে রানীক্ষেত (নিউক্যাসল ডিজিজ) এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ফাউল কলেরার নাম এসেছে; হাঁসের প্রধান উদ্বেগ ডাক প্লেগ ও ডাক কলেরা। নির্দেশিকা অনুযায়ী, পারিবারিক পোলট্রিতে এসব রোগ নিয়ন্ত্রণে সবচেয়ে সফল কর্মসূচিগুলোতে কমিউনিটি টিকাদানকর্মী বা পোলট্রিকর্মীদের মাধ্যমে টিকা দেওয়া হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, প্রায়ই রানীক্ষেতের কারণে হওয়া উচ্চ মৃত্যুহার মালিকদের পাখির পেছনে বিনিয়োগে নিরুৎসাহিত করে।
বাংলাপিডিয়া রানীক্ষেতকে গ্রামীণ বাংলাদেশে বেশ প্রচলিত এবং মুরগি মৃত্যুর প্রধান কারণ বলে বর্ণনা করেছে; হাঁচি, কাশি, মাথা ও ঘাড় বেঁকে যাওয়া বা পক্ষাঘাত এর লক্ষণের মধ্যে পড়ে। সেখানে বলা হয়েছে, পরিচ্ছন্ন ব্যবস্থাপনা ও আক্রান্ত ঝাঁক আলাদা রেখে রোগটি নিয়ন্ত্রণ করা যায় এবং এর টিকা পাওয়া যায়। একই নিবন্ধে ফাউল কলেরা সম্পর্কে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে রোগটি প্রায়ই মহামারি আকারে দেখা দেয় এবং দূষিত মাটি, খাবার ও পানির মাধ্যমে ছড়ায়।
যে পরিবারে শিশুদের সহযোগিতা করতে বলা হয়েছে, সেখানে বাস্তব কথাটি হলো, টিকা ও চিকিৎসা প্রাণিস্বাস্থ্যকর্মীদের কাজ। অসুস্থ পাখির খবর দেওয়া এবং টিকার বিষয়ে জানার জায়গা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর; ওষুধ ও তার মাত্রা সেই দপ্তরের পরামর্শেই ঠিক করা উচিত, বাড়িতে আন্দাজে নয়।
প্রাণীর প্রতি সদয় আচরণ ও আইন
সব প্রাণীর প্রতি সদয় হওয়ার যে দ্বিতীয় নির্দেশনা চিঠিতে আছে, তার প্রতিধ্বনি দেশের প্রাণিকল্যাণ আইনেও পাওয়া যায়। প্রাণিকল্যাণ আইন, ২০১৯ (২০১৯ সনের ১২ নং আইন), যার তারিখ ২০১৯ সালের ১০ জুলাই, দ্য ক্রুয়েলটি টু অ্যানিমেলস অ্যাক্ট, ১৯২০ রহিত করে প্রণীত হয়। আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা প্রতিরোধ করা, সদয় আচরণ প্রদর্শন করা ও দায়িত্বশীল প্রতিপালনের মাধ্যমে প্রাণিকল্যাণ নিশ্চিত করা আবশ্যক, এবং সে জন্য সামাজিক সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন।
আইনের ৪ ধারায় প্রতিটি প্রাণীর মালিক বা তত্ত্বাবধানকারীর দায়িত্ব বলা হয়েছে: যৌক্তিক কারণ ছাড়া প্রাণীর প্রতি কল্যাণকর ও মানবিক আচরণ করা এবং নিজে নিষ্ঠুর আচরণ থেকে বিরত থাকা। আইনে প্রাণীর প্রতি অপ্রয়োজনীয় নিষ্ঠুর আচরণ, অঙ্গহানি, বিষ প্রয়োগ, পোষা প্রাণীর বাণিজ্যিক উৎপাদন ও ব্যবস্থাপনার নিবন্ধন এবং অপরাধ ও দণ্ড নিয়েও আলাদা ধারা আছে। চিঠিতে এই আইনের উল্লেখ ছিল না, তবে সব প্রাণীর প্রতি সদয় আচরণের আহ্বান একই কথাই প্রাথমিকের শিক্ষার্থীর বোঝার মতো ভাষায় বলে।
হাঁস-মুরগির কাছে শিশুদের সুরক্ষা
যাঁরা হাঁস-মুরগি নাড়াচাড়া করেন, বিশেষ করে শিশুদের জন্য, স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো কিছু সহজ সতর্কতার পরামর্শ দেয়। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) বাড়ির উঠানের পোলট্রি নিয়ে নির্দেশনায়, যা সর্বশেষ হালনাগাদ হয় ২০২৫ সালের ১৮ জুলাই, বলেছে মুরগি, হাঁস ও অন্যান্য পোলট্রি সালমোনেলার মতো জীবাণু বহন করতে পারে, যা মানুষকে অসুস্থ করে; ছোট শিশু, বয়স্ক মানুষ এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধক্ষমতার মানুষের অসুস্থ হওয়ার আশঙ্কা বেশি। সংস্থাটি পোলট্রি বা তাদের থাকার ও চলাফেরার জায়গার কোনো কিছু ছোঁয়ার পর সাবান ও প্রবহমান পানি দিয়ে হাত ধোয়ার পরামর্শ দিয়েছে এবং বলেছে, ছোট শিশুদের হাত ধোয়া বড়দের তদারকিতে হওয়া উচিত।
সিডিসি আরও বলেছে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের মুরগির ছানা, হাঁসের ছানা বা অন্য পোলট্রি ধরতে বা ছুঁতে দেওয়া উচিত নয়; পাখিকে চুমু খেয়ে বা জড়িয়ে ধরে তারপর মুখে বা নাকে হাত দেওয়া উচিত নয়; আর পোলট্রিকে ঘরের ভেতরে, বিশেষ করে যেখানে খাবার তৈরি বা রাখা হয়, সেখানে রাখা উচিত নয়। ঠোকর, কামড় বা আঁচড় লাগলে সঙ্গে সঙ্গে সাবান ও কুসুম গরম পানি দিয়ে ক্ষত ধুতে এবং পাখিটি অসুস্থ মনে হলে বা ক্ষত লাল, ব্যথাযুক্ত, গরম বা ফোলা হলে চিকিৎসকের কাছে যেতে বলেছে সংস্থাটি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বার্ড ফ্লুসহ প্রাণিবাহিত ইনফ্লুয়েঞ্জা বিষয়ক তথ্যপত্রে, যার তারিখ ২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি, বলা হয়েছে আক্রান্ত প্রাণীর সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সংস্পর্শই মানুষের সংক্রমণের প্রধান ঝুঁকি। সংস্থাটি সাধারণ মানুষকে অসুস্থ বা মৃত প্রাণীর সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে এবং প্রাণিস্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে জানাতে, প্রাণী ও তাদের পরিবেশের সংস্পর্শের আগে ও পরে ভালো করে হাত পরিষ্কার করতে এবং হঠাৎ মারা যাওয়া প্রাণী না খেতে পরামর্শ দিয়েছে। তথ্যপত্রে আরও বলা হয়েছে, ঠিকমতো প্রস্তুত ও রান্না করা পোলট্রি বা ডিমের মাধ্যমে এসব ভাইরাস মানুষের দেহে ছড়ানোর কোনো প্রমাণ নেই। শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে পরামর্শের জন্য অভিভাবকদের চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত।
ছবি: তাওসিফ সালাম / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্ল্যান্স ২০২৪-২০২৫), এফএও (ডিসিশন টুলস ফর ফ্যামিলি পোলট্রি ডেভেলপমেন্ট, ২০১৪), বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), লজ অব বাংলাদেশ (প্রাণিকল্যাণ আইন ২০১৯; বাংলাদেশ গার্ল গাইডস অ্যাসোসিয়েশন অ্যাক্ট ১৯৭৩), যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি), বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা





মন্তব্য
(০)