ঢাকার বেশ কয়েকটি জনবহুল এলাকায় কয়েক মাস ধরে বিষধর সাপ ধরা পড়ছিল। ২০২৫ সালের নভেম্বরের শুরুতে স্বেচ্ছাসেবী একটি সংগঠন জানায়, আগের চার মাসে তারা বাসাবাড়ি, গ্যারেজ ও বহুতল ভবন থেকে ৩৫১টি সাপ উদ্ধার করেছে, যার কয়েকটি মিলেছে নয়তলা পর্যন্ত উঁচুতে। এই হিসাব দিয়েছে বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনের আহ্বায়ক আদনান আজাদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ৩৫১টির মধ্যে মাত্র তিনটি নির্বিষ, বাকিগুলো বিষধর। ২০২৫ সালের ৪ নভেম্বর জাগো নিউজে প্রকাশিত এই প্রতিবেদন অনুযায়ী, উদ্ধার হওয়া সাপের মধ্যে ছিল উদ্ধারকারীদের ভাষায় পদ্মগোখরা, খৈয়া গোখরা ও রাজ কেউটে, অর্থাৎ স্থানীয় নামে পরিচিত কয়েক ধরনের গোখরা, সঙ্গে রাসেলস ভাইপার। অন্যদিকে বন বিভাগের ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিট জানায়, রাজধানীতে সাপের এমন উপদ্রবের কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই এবং সংগঠনটি উদ্ধার কাজের জন্য অনুমতি নেয়নি।
প্রতিবেদনে কথা বলা গবেষকেরা এই সংখ্যার অর্থ নিয়ে একমত হননি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রাণিবিজ্ঞানী পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক ও চিন্তার বিষয় বলেছেন। আর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভেনম রিসার্চ সেন্টারের একজন গবেষকের মতে, আবাসনের জন্য জলাভূমি ভরাট এবং আগের চেয়ে বেশি উদ্ধারকারী সংগঠন সাপের খবর জানানোয় বিষয়টি সামনে এসেছে। এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক থাকলেও সংশ্লিষ্ট এলাকাগুলোতে সাপের কামড়ের ঘটনা তেমন দেখা যায়নি বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
উদ্ধারকারী সংগঠনের হিসাব ও বন বিভাগের বক্তব্য
বাংলাদেশ অ্যানিমেল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের ভাষ্য অনুযায়ী, আগের চার মাস ধরে সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবীরা ঢাকার বিভিন্ন জায়গা থেকে সাপ উদ্ধার করছিলেন। আজাদ জানান, ওই সময়ে মোট ৩৫১টি সাপ উদ্ধার হয়েছে, যার তিনটি বাদে সবই বিষধর প্রজাতির। এই সংখ্যা সংগঠনটির নিজস্ব হিসাব; তুলনা করার মতো কোনো সরকারি হিসাব প্রতিবেদনে ছিল না।
বন বিভাগের ওয়াইল্ডলাইফ ক্রাইম কন্ট্রোল ইউনিটের ওয়াইল্ডলাইফ ইন্সপেক্টর আব্দুল্লাহ আস সাদিক ভিন্ন কথা বলেন। তিনি জানান, ঢাকায় সাপের এত উপদ্রবের কোনো তথ্য তাঁদের কাছে নেই। সংগঠনটি এই উদ্ধার কার্যক্রম চালাতে কোনো অনুমতি নেয়নি বলেও জানান তিনি।
আজাদের দাবি, তাঁরা উদ্ধার অভিযান এবং কতগুলো সাপ পাওয়া গেল সে বিষয়ে বন বিভাগকে জানান, যদিও প্রতিটি উদ্ধারের খবর সব সময় জানানো কষ্টকর হয়ে পড়ে। উদ্ধার করা সাপগুলো কোথায়, এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, এগুলো লোকালয় থেকে দূরে প্রাকৃতিক কোনো স্থানে অবমুক্ত করা হয়। সাধারণত এমন বনাঞ্চলে সাপগুলো ছেড়ে দেওয়া হয়, যেখানে সাপ নিজের পরিবেশ খুঁজে পায় এবং মানুষের সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা কম।
বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ বন বিভাগ। বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২-এর ৫(২) ধারা অনুযায়ী বন অধিদপ্তরের প্রধান বন সংরক্ষক পদাধিকারবলে প্রধান ওয়ার্ডেন, আর বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত বন সংরক্ষক ও বিভাগীয় বন কর্মকর্তারা যথাক্রমে অতিরিক্ত প্রধান ওয়ার্ডেন ও ওয়ার্ডেন। দেশের জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনার সার্বিক দায়িত্ব এই কর্মকর্তাদের ওপর ন্যস্ত।
কোথায় মিলেছে সাপ, নয়তলা পর্যন্ত
সংগঠনটি যেসব এলাকা থেকে বিষধর সাপ উদ্ধারের কথা জানিয়েছে সেগুলো হলো বনশ্রী, আফতাবনগর, মোহাম্মদপুর, বসিলা, উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টর, খিলগাঁও, কচুক্ষেত, মিরপুর-২, নিকেতন এবং উত্তরার উত্তরখান ও দক্ষিণখান। সবচেয়ে বেশি সাপ পাওয়া গেছে উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরের রাজউকের ফ্ল্যাট প্রকল্প এলাকায়, দ্বিতীয় অবস্থানে বনশ্রী। প্রতিবেদনের আগের এক সপ্তাহে খিলগাঁওয়ে নতুন করে বেশি সাপ দেখা যাচ্ছিল।
আজাদ বলেন, "উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউকের যে ফ্ল্যাট, ওখানে সবচেয়ে বেশি সাপ পেয়েছি। সাততলা, নয়তলা থেকে সাপ উদ্ধার করেছি। এখানকার ১১টা বিল্ডিং থেকে সাপ উদ্ধার করেছি।"
এত উঁচু ভবনে সাপ কীভাবে গেল, এমন প্রশ্নে আজাদের ধারণা, যেসব ভবনের ওপরের ফ্ল্যাটে সাপ পাওয়া গেছে, তার প্রতিটির গেটের সঙ্গে বাগানবিলাসের মতো লতানো গাছ রয়েছে এবং গাছগুলো বেয়ে ওপরে ওঠার ব্যবস্থা করা আছে। সেই গাছ বেয়েই হয়তো সাপ উঁচু ভবনে উঠেছে। এটি তাঁর ব্যাখ্যা; সাপ কীভাবে ওপরের তলায় পৌঁছেছে, সে বিষয়ে কোনো গবেষণার কথা প্রতিবেদনে ছিল না।
তিনি যে প্রকল্পের কথা বলেছেন, সেটি রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্প। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৭ সালের ফেব্রুয়ারিতে জানায়, নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষের আবাসন চাহিদা মেটাতে রাজউক ২০১২ সালে ১৮ নম্বর সেক্টরের প্রায় ২১৪ একর জমিতে প্রকল্পটি শুরু করে। তিনটি ব্লকে ১৪ তলার মোট ১৭৯টি ভবন, যার ৭৯টি ব্লক-এ, ৫২টি ব্লক-বি ও ৪৮টি ব্লক-সিতে, আর মোট ফ্ল্যাট ১৫ হাজার ৩৬টি। তখন প্রথম দফার ফ্ল্যাট ক্রেতাদের কাছে হস্তান্তরের প্রস্তুতি চলছিল।

খিলগাঁওয়ে মা সাপ, বাচ্চা ও ডিম
আজাদ জানান, বিষধর সাপগুলোর মধ্যে উদ্ধারকারীরা যাকে পদ্মগোখরা বলেন, সেটিই সবচেয়ে বেশি পাওয়া গেছে: ৩৫১টির মধ্যে প্রায় দুইশ। এর মধ্যে আটত্রিশটি পদ্মগোখরা উদ্ধার হয়েছে খিলগাঁওয়ের কয়েকটি বাসা থেকে, যার মধ্যে পুরুষ ও স্ত্রী (মা) সাপ যেমন ছিল, তেমনি ছিল বাচ্চাও।
আজাদ বলেন, "খিলগাঁওয়ের এক বাসায় তিনটা রুমের পুরো ফ্লোর ভেঙে মা সাপটা পেয়েছি। একই বাসা থেকে দুইটা বড় সাপ ও সাতটা বাচ্চা এবং আঠারটা পদ্মগোখরার ডিম উদ্ধার করেছি। এক বাসা থেকে ১৮টা পদ্মগোখরার বাচ্চা পেয়েছি।" যাঁদের বাসা থেকে সাপ উদ্ধার করা হয়েছে, তাঁরা পরে আবার বড় ও বাচ্চা সাপ দেখার কথা জানিয়েছেন বলেও জানান তিনি।
আজাদের ধারণা, নভেম্বর মাসজুড়ে আরও বেশি সাপ পাওয়া যেতে পারে, কারণ অক্টোবর ও নভেম্বর পদ্মগোখরার প্রজননকাল। আর অগাস্ট মাস খৈয়া গোখরার প্রজননকাল হওয়ায় সাপের সংখ্যা বেড়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর ভাষায়, "ওই মাসে এক বাসা থেকেই মা গোখরাসহ ২৭টা বাচ্চা, ২৮টা সাপ উদ্ধার করেছি।" ভেনম রিসার্চ সেন্টারের গবেষক মো. মিজানুর রহমানও একই কথা বলেন: যেসব মাসে এসব সাপের দেখা মিলছে, তখন তাদের প্রজননকাল, তাই যেখানেই সাপ উদ্ধার হচ্ছে সেখানে প্রচুর বাচ্চা ও ডিমও পাওয়া যাচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ফরিদ আহসান জানান, পদ্মগোখরা মূলত পানিপ্রেমী সাপ। নদী, জলাশয়, খাল-বিলে থাকতে পছন্দ করে, তবে পানির কাছের ঝোপঝাড় ও গর্তেও এর দেখা মেলে।
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ায় দেশের গোখরা সাপের প্রজনন সম্পর্কে বলা হয়েছে, স্ত্রী সাপ ১০ থেকে ২৫টি ডিম প্রায় দুই মাস পাহারা দেয়, তবে তা দেয় না, আর ডিম ফোটে ৬০ থেকে ৭০ দিনের মধ্যে। গোখরা নিশাচর, লম্বায় প্রায় দেড় মিটার, থাকে মানুষের বসতি, ফসলের মাঠ ও বনের কাছে, আর খায় মূলত ইঁদুর, ছোট পাখি ও উভচর প্রাণী। এর বিষ স্নায়ুবিধ্বংসী (নিউরোটক্সিক): স্নায়ুতে আঘাত করে শ্বাসপ্রশ্বাসের পেশি অবশ করে দিতে পারে এবং হৃদ্যন্ত্র বিকল করতে পারে।

স্থানীয় নামের আড়ালে কোন সাপ
বাংলাদেশে সাপের বৈচিত্র্য অনেক। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে দেশে প্রায় ৯০ প্রজাতির সাপ আছে, যার তিন-চতুর্থাংশের বেশি নির্বিষ; আর স্থলের সাপের মধ্যে তীব্র বিষধর প্রজাতি আধা ডজনেরও কম। পরিবেশবিষয়ক সংবাদমাধ্যম মোঙ্গাবে ২০২৩ সালের এপ্রিলে জানায়, দেশে প্রায় ১০০ প্রজাতির সাপ রয়েছে, যার ৩৭টি বিষধর: ১৬টি সামুদ্রিক সাপ, তিন ধরনের গোখরা, পাঁচ ধরনের কালাচ বা ক্রেইট, দুই ধরনের প্রবাল সাপ, ছয় ধরনের সবুজ বোড়া এবং একটি প্রকৃত ভাইপার, রাসেলস ভাইপার। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডও ২০২৩ সালের অগাস্টে একই হিসাব দেয়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী দেশে Naja গণের দুই প্রজাতির গোখরা পাওয়া যায়: স্পেকটাকলড বা দুই চশমাওয়ালা গোখরা (Naja naja), যার ফণায় কালো ইউ আকৃতির দাগ থাকে, এবং মনোক্লড বা এক চশমাওয়ালা গোখরা (Naja kaouthia), যার ফণায় একটি গোল কালো দাগ থাকে। এলাকাভেদে দুটির স্থানীয় নাম বদলে যায়, তাই এই প্রতিবেদনে উদ্ধারকারীদের ব্যবহৃত নামই রাখা হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া আঞ্চলিক কার্যালয়ের ২০১৬ সালের সর্পদংশন চিকিৎসা নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, স্পেকটাকলড কোবরা ঢাকার আশপাশে এবং রাজধানীর পশ্চিম ও উত্তরে পাওয়া যায়, আর মনোক্লড কোবরা সারা দেশেই আছে এবং গোখরার কামড়ের বেশির ভাগ ঘটনা এরই। বাংলাপিডিয়া গোখরাকে বাংলাদেশে বিপদাপন্ন প্রাণী হিসেবে উল্লেখ করেছে।
বাংলাপিডিয়ায় রাজগোখরা নামে পরিচিত কিং কোবরা (Ophiophagus hannah) আলাদা এবং অনেক বড় সাপ: পৃথিবীর দীর্ঘতম বিষধর সাপ, লম্বায় সাড়ে পাঁচ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। বাংলাপিডিয়া বলছে, সুন্দরবনে এটি সাধারণ, তবে সিলেট ও চট্টগ্রামের বনে বিরল। ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকা অনুযায়ী, যেখানে তুলনামূলক অক্ষত বাঁশঝাড় ও বন টিকে আছে, সেখানেই কিং কোবরা পাওয়া যায়।

রাসেলস ভাইপার বা চন্দ্রবোড়া (Daboia russelii) ভিন্ন গোত্রের সাপ, ভাইপার গোত্রের। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় এটি ভারী গড়নের, প্রায় দেড় মিটার লম্বা সাপ, গায়ে কালো ও সাদা বা হালকা হলুদ রেখায় ঘেরা ডিম্বাকার বাদামি ছোপ, এবং এর কামড় প্রাণঘাতী হতে পারে। এর বিষ মূলত রক্তবিধ্বংসী (হিমোটক্সিক): রক্তকণিকা ও রক্তনালির আবরণে আঘাত করে এবং রক্ত জমাট বাঁধা বন্ধ করে দেয়। ভাইপার ডিম না পেড়ে সরাসরি বাচ্চা দেয়। মোঙ্গাবে ২০২৩ সালের এপ্রিলে জানায়, এক শতাব্দীর বেশি সময় ধরে সাপটিকে বাংলাদেশে অত্যন্ত বিরল মনে করা হতো, কিন্তু ২০১৩ সাল থেকে এর কামড়ের একের পর এক ঘটনা আসতে থাকে। অধ্যাপক ফরিদ আহসানের সহ-লেখক হিসেবে করা ২০১৮ সালের এক গবেষণায় ২০১৩ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে এর কামড়ে ২০ জনের মৃত্যু নথিভুক্ত হয়, আর দেশের ৬৪ জেলার ১৭টিতে কামড়ের খবর পাওয়া যায়। গবেষণাটি সাপটির বিস্তারের সঙ্গে সেচের মাধ্যমে সারা বছর চাষাবাদকে যুক্ত করে, যার ফলে এর প্রধান খাবার ইঁদুর সারা বছর মাঠে থাকে। ২০২৪ সালের জুনে রাসেলস ভাইপার নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা তৈরি হয়; আরব নিউজ জানায়, তখন সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো বিভ্রান্তিকর তথ্য মোকাবিলায় কর্তৃপক্ষ সচেতনতা কার্যক্রম চালায়।

কারণ নিয়ে গবেষকদের ভিন্নমত
বাংলাদেশে সাধারণত বর্ষাকালে সাপের উপদ্রব বাড়ে। সাপ আবাসস্থল হিসেবে যেসব গর্ত ব্যবহার করে তাতে বৃষ্টির পানি ঢুকে পড়লে আশ্রয়ের জন্য শুকনো জায়গার খোঁজে সাপ উঁচু স্থানে, মানুষের বসতিতে বা ঘরে ঢুকে পড়ে। কিন্তু ঢাকার মতো জনবহুল শহরে এত বিষধর সাপ পাওয়ায় কোনো কোনো গবেষক বিস্ময় প্রকাশ করেছেন, আবার কেউ কেউ বিষয়টিকে স্বাভাবিক বলেই মনে করছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ফরিদ আহসান বিষয়টিকে "আনইউজুয়াল এবং চিন্তার" বলে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, "এটা আনইউজুয়াল তো বটেই। সাপ থাকতে পারে ঢাকা শহরে যদি ঝোপঝাড় থাকে। কিন্তু এত সাপ কী করে হলো, এটা তো চিন্তার বিষয়।" এর আগেও ঢাকায় কিছু বিষধর সাপ পাওয়া গেলেও এবারই প্রথম এত বেশি সাপের খবর পাওয়া যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ভেনম রিসার্চ সেন্টারের রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট মো. মিজানুর রহমান বিষয়টি অন্যভাবে দেখেন। তাঁর মতে, জলাশয় ও খাল-বিল ভরাট করে মানুষ বাসস্থান তৈরি করায় সাপের বাসস্থানের সংকট তৈরি হয়েছে, তাই সাপ মানুষের বাসায় ঢুকে পড়ছে। তিনি বলেন, "কোন কোন এলাকায় সাপগুলো পাওয়া যাচ্ছে, সেটা দেখার বিষয়। যেসব এলাকায় পাওয়া গেছে, তার প্রতিটি জায়গায় জলাশয়, খাল-বিল ভরাট করে মানুষ বাসস্থান গড়ে তুলেছে। সাপ তার নিজের জায়গায়ই আছে, কিন্তু আমরা তার জায়গায় চলে গেছি।"
রহমানের মতে, এত সাপের দেখা মেলা আসলে স্বাভাবিক। আগে বাংলাদেশে এ রকম সাপ উদ্ধারকারী সংগঠন কম ছিল, মানুষ সাপ দেখলেই মেরে ফেলত। এখন সাপ উদ্ধারের অনেক সংগঠন গড়ে উঠেছে, আর সাপের ঘটনা আলোচনায় আসার এটাই বড় কারণ বলে মনে করেন তিনি।
রহমান যেখানে কাজ করেন, সেই ভেনম রিসার্চ সেন্টার সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত একটি উদ্যোগ। মোঙ্গাবে ২০২৩ সালে জানায়, দেশি ও বিদেশি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় সরকার ২০১৮ সালে এটি চালু করে। এর মূল লক্ষ্য বিভিন্ন বিষধর সাপের কামড়ের চিকিৎসায় অ্যান্টিভেনম তৈরি করা, কারণ দেশে নিজস্ব অ্যান্টিভেনম নেই এবং আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। কেন্দ্রের প্রধান গবেষক অনিরুদ্ধ ঘোষ চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিশেষজ্ঞ।
ঢাকায় কমছে জলাভূমি
আজাদও জলাশয়, খাল-বিল ও গর্ত ভরাটকে দায়ী করেন। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, পাঁচ-ছয় বা সাত বছর আগেও উত্তরার দিয়াবাড়িতে কোনো আবাসিক ভবন ছিল না, ছিল জলাশয়; আফতাবনগরেরও একই অবস্থা ছিল। তাঁর ভাষায়, "এই জলাশয়েই সাপের বাসস্থান ছিল। মানুষ নিজের আবাসনের জন্য এখানে বাসস্থান করেছে। ফলে সাপগুলো কোথায় গেছে? সাপের থাকার জায়গা আস্তে আস্তে ছোট হয়ে গেছে। ফলে সে পেছনের যেসব প্লটে ভবন তৈরি হয়নি, সেখানে চলে গেছে। ওই এলাকার গর্তে সে আবাস গড়েছে।" টানা তিন-চার দিন প্রবল বৃষ্টিতে গর্তগুলো পানিতে ভরে গেলে সাপ বের হয়ে শুকনো জায়গার খোঁজে মানুষের বাসাবাড়িতে চলে আসে, আর এ কারণেই ওই সময় সাপ বেশি দেখা যাচ্ছিল বলে জানান তিনি।
প্রতিবেদনের আগে প্রকাশিত গবেষণাও রাজধানী ও এর আশপাশে দ্রুত জলাভূমি হারানোর সাধারণ চিত্র তুলে ধরে। ২০১৯ সালের মে মাসে দ্য ডেইলি স্টার বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা), বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) ও ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশসহ কয়েকটি সংগঠনের একটি গবেষণার কথা জানায়। তাতে দেখা যায়, ২০১০ সাল থেকে ঢাকা এলাকা তার ১ লাখ ৮৭ হাজার ৯৫৮ একর জলাভূমির মধ্যে ৪৩ হাজার ২০০ একর, অর্থাৎ ২২ শতাংশ হারিয়েছে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মধ্যে ছিল বসিলা ও উত্তর উত্তরা; দুটিই উদ্ধারকারী সংগঠনের তালিকায় আছে।
মোঙ্গাবে ২০২৩ সালের মে মাসে জানায়, বিআইপির ২০১৯ সালের এক গবেষণা অনুযায়ী ২০১০ সালে ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) প্রকাশের পর থেকে মাটি ভরাটের কারণে শহরটি তার ৩৬ শতাংশ জলাশয় হারিয়েছে। একই প্রতিবেদনে ল্যান্ডস্যাট উপগ্রহচিত্রভিত্তিক ২০১৮ সালের একটি গবেষণার কথাও বলা হয়, যাতে দেখা যায়, গবেষণা এলাকায় জলাভূমি ১৯৮৮ সালে ছিল ৪৩.০৮ শতাংশ, ২০০২ সালে ২৬.৯৭ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে ১২.১৩ শতাংশ। ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজউকের ড্যাপ ২০২২-এ সংস্থাটির ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় ৩ হাজার ৪৬৪টি পুকুর নথিভুক্ত হয়েছে।
বন্যপ্রাণী আইনে যা বলা আছে
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের ২০১২ সালের বন্যপ্রাণী আইন অনুযায়ী বন্যপ্রাণী ধরা ও মারা দণ্ডনীয় অপরাধ। প্রতিবেদনের সময় কার্যকর ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ (২০১২ সনের ৩০ নং আইন, ১০ জুলাই ২০১২)। এর ২(৩৭) ধারায় শিকারের সংজ্ঞায় রয়েছে কোনো বন্যপ্রাণীকে হত্যা করা, ধরা বা বিষ প্রয়োগ করা, এসব উদ্দেশ্যে তাড়িয়ে নেওয়া, আহত বা ক্ষতি করা এবং বন্য পাখি বা সরীসৃপের বাসা বা ডিম সংগ্রহ বা ধ্বংস করা। ৬(১) ধারা অনুযায়ী এই আইনের অধীন লাইসেন্স বা পারমিট ছাড়া কেউ কোনো বন্যপ্রাণী শিকার করতে পারবেন না।
ভেনম রিসার্চ সেন্টারের গবেষক রহমান জানান, আইন অনুযায়ী বন্যপ্রাণী বা সাপ উদ্ধারের পর সেগুলোকে প্রকৃতিতে অবমুক্ত করতে হবে, এবং উদ্ধার করা সাপ কোনো ব্যক্তির নিজের কাছে রাখার অনুমোদন নেই। আইনের ৯ ধারায় বলা আছে, ধৃত, উদ্ধারকৃত বা জব্দকৃত কোনো বন্যপ্রাণী খাঁচায় বা আবদ্ধ অবস্থায় রাখা তার জীবনের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হলে সেটিকে উপযুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। রহমানের ভাষ্যে, গবেষণার জন্য সাপ রাখার অনুমোদন কেবল ভেনম রিসার্চ সেন্টারের রয়েছে; আইনের ১০ ধারা প্রধান ওয়ার্ডেনকে শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং জীবন রক্ষাকারী ওষুধ তৈরির জন্য সাপের বিষ সংগ্রহ ও সংরক্ষণসহ কয়েকটি উদ্দেশ্যে পারমিট দেওয়ার ক্ষমতা দেয়।
৩৯ ধারায় ৬, ১০, ১১ বা ১২ ধারার বিধান লঙ্ঘনের দণ্ড নির্ধারিত: সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড, আর একই অপরাধের পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড।
দেশে সর্পদংশন এবং স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ
সাপ পাওয়া এলাকাগুলোতে কামড়ের ঘটনা তেমন না ঘটলেও সারা দেশে সর্পদংশন একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা। ডব্লিউএইচওর ২০১৬ সালের আঞ্চলিক নির্দেশিকায় উদ্ধৃত ২০০৯ সালের এক জাতীয় জরিপের হিসাবে গ্রামাঞ্চলে বছরে ৫ লাখ ৮৯ হাজার ৯১৯ জন সাপের কামড়ের শিকার হন এবং ৬ হাজার ৪১ জন মারা যান। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (ডিজিএইচএস) ও এর জাতীয় রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের ২০২৩ সালের ১৮ জুন প্রকাশিত, ২০২১-২২ সময়ের জাতীয় জরিপ অনুযায়ী দেশে বছরে প্রায় ৪ লাখ ৩ হাজার মানুষ সাপের কামড়ের শিকার হন এবং ৭ হাজার ৫১১ জন মারা যান। বিশ্বজুড়ে ডব্লিউএইচওর ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরের তথ্যপত্রের হিসাবে বছরে আনুমানিক ৫৪ লাখ মানুষকে সাপে কামড়ায়, ১৮ লাখ থেকে ২৭ লাখ জনের শরীরে বিষ ছড়ায় এবং ৮১ হাজার ৪১০ থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮৮০ জন মারা যান; সবচেয়ে বেশি ভোগেন কৃষিশ্রমিক ও শিশুরা।
সাপ দেখলে কী করতে হবে, সে বিষয়ে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের মূল বার্তা একটাই: সাপকে বিরক্ত না করা। ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, কখনো সাপ ধরা, ভয় দেখানো বা আঘাত করার চেষ্টা করা যাবে না; সাপকে কোণঠাসা না করে পালানোর সব সুযোগ দিতে হবে; আর মরা সাপ, এমনকি কাটা মাথা থেকেও বিষ ঢুকে যেতে পারে। বাসায় সাপ দেখা গেলে মানুষ ও পোষা প্রাণীকে দূরে রাখুন এবং নিজে ধরতে বা মারতে না গিয়ে বন বিভাগ বা প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারীকে খবর দিন।
একই নির্দেশিকায় বাড়িঘরকে সাপের কাছে কম আকর্ষণীয় করার কয়েকটি উপায় বলা হয়েছে:
- খাবার ইঁদুর ঢুকতে পারে না এমন পাত্রে রাখুন এবং ঘরের ভেতরে মুরগি বা অন্য গবাদিপ্রাণী রাখবেন না, কারণ এগুলো ইঁদুর ও বড় সাপকে আকর্ষণ করে।
- বাড়ির চারপাশ থেকে আবর্জনা, নির্মাণসামগ্রী ও ঝোপঝাড় সরিয়ে ফেলুন, ঘাস ছোট রাখুন এবং গাছের ডাল যেন ঘরের গায়ে না লাগে তা নিশ্চিত করুন।
- রাতে বাইরে হাঁটার সময় আলো ব্যবহার করুন এবং ভারী বৃষ্টি ও বন্যার পর বিশেষ সতর্ক থাকুন।
- যেখানে শোয়ার জায়গায় সাপ ঢোকার আশঙ্কা আছে, সেখানে উঁচু খাটে ভালোভাবে গুঁজে দেওয়া মশারির নিচে ঘুমান।
কাউকে সাপে কামড়ালে চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার পথে ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকা অনুযায়ী প্রাথমিক চিকিৎসা:
- আক্রান্ত ব্যক্তিকে আশ্বস্ত করুন, তিনি খুব ভীত থাকতে পারেন: বিষধর সাপের কামড়েও সব সময় বিষ ঢোকে না, গুরুতর বিষক্রিয়া সাধারণত ধীরে তৈরি হয় বলে চিকিৎসার সময় পাওয়া যায়, আর আধুনিক চিকিৎসা কার্যকর।
- তাঁকে আরামদায়ক ও নিরাপদ অবস্থায়, সম্ভব হলে বাঁ কাত করে রিকভারি পজিশনে শুইয়ে দিন এবং কামড়ানো হাত বা পা স্প্লিন্ট বা স্লিং দিয়ে স্থির রাখুন, কারণ নড়াচড়ায় বিষ ছড়ায়।
- ক্ষতস্থান কাটবেন না, ঘষবেন না, মালিশ করবেন না বা চুষবেন না; কোনো ভেষজ, রাসায়নিক বা বরফ লাগাবেন না।
- কখনো শক্ত করে বাঁধন বা টর্নিকেট দেবেন না; আগে থেকে বাঁধা থাকলে তা কেবল হাসপাতালে চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে খুলতে হবে।
- সাপ মারার চেষ্টা করবেন না, আর যত দ্রুত ও নিরাপদে সম্ভব আক্রান্ত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিন।
আরব নিউজের খবর অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন প্রোগ্রাম ম্যানেজার সাপে কামড়ানোর পর দেরি না করে স্থানীয় ওঝা বা হাতুড়ে চিকিৎসকের কাছে না গিয়ে সরাসরি হাসপাতালে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশের সরকারি হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যান্টিভেনম মজুত আছে এবং তা বিনা মূল্যে দেওয়া হয়।
ছবি: Md Shaifuzzaman Ayon / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (৪ নভেম্বর ২০২৫, বিবিসি বাংলার বরাতে), বাংলাপিডিয়া (গোখরা, সাপ, ভাইপার), বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ (বিডিলজ), ডব্লিউএইচও গাইডলাইনস ফর দ্য ম্যানেজমেন্ট অব স্নেকবাইটস, দ্বিতীয় সংস্করণ (২০১৬), ডব্লিউএইচও সর্পদংশন তথ্যপত্র (১২ সেপ্টেম্বর ২০২৩), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (১৬ অগাস্ট ২০২৩), মোঙ্গাবে (২৬ এপ্রিল ২০২৩ ও ১০ মে ২০২৩), দ্য ডেইলি স্টার (১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ ও ৬ মে ২০১৯), আরব নিউজ (২৩ জুন ২০২৪)





মন্তব্য
(০)