ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) ২০২৬ সালের ১৮ জুলাই, শনিবার জানায়, রাজধানীর মতিঝিল এলাকা থেকে পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। পুলিশের অভিযোগ, তাঁরা মে মাসে দক্ষিণ কমলাপুরে কোরবানির পশুর হাটের এক ইজারাদারের অফিস লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছিলেন এবং বিদেশি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে একই ব্যবসায়ীর কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে প্রাণনাশের হুমকি দিয়েছিলেন। পুলিশ জানায়, গ্রেফতারের পর তিনটি বিদেশি আগ্নেয়াস্ত্র ও সাত রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়েছে। সেদিন দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানানো হয় বলে জাগো নিউজ ২৪ সেদিন প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
সংবাদ সম্মেলনে তথ্য তুলে ধরেন ডিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (এস্টেট, ডেভেলপমেন্ট ও আইসিটি) এবং অতিরিক্ত দায়িত্বপ্রাপ্ত (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) মোহাম্মদ ওসমান গণি। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার প্রধান অভিযুক্ত তানিম রেজা ওরফে বাপ্পি (৪৬), যাঁকে পুলিশ শ্যুটার হিসেবে বর্ণনা করেছে। গ্রেফতার অন্য চারজন হলেন মোহাম্মদ জুয়েল (৪৮), শাকিল (২৭), মো. মানিক কাজী (৫০) ও রাকিবুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে রিজন (৩৫)। নিচে তাঁদের বিরুদ্ধে যা যা বলা হয়েছে, তার সবই পুলিশের বক্তব্য; জাগো নিউজের প্রতিবেদনে অভিযুক্ত বা তাঁদের আইনজীবীদের কোনো বক্তব্য ছিল না, আর কোনো অভিযোগই তখন পর্যন্ত আদালতে প্রমাণিত হয়নি।
হুমকি ও গুলির ঘটনা নিয়ে পুলিশ যা বলেছে
ওসমান গণির বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার শুরু ২০২৬ সালের ১৫ মে। সেদিন ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর হাটের ইজারা নেওয়া ওই ব্যবসায়ীর কাছে একটি বিদেশি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়। পুলিশ জানায়, ওই বার্তার সঙ্গে তাঁকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়। এরপর ১৯ মে দক্ষিণ কমলাপুরে তাঁর অফিস লক্ষ্য করে সন্ত্রাসীরা গুলিবর্ষণ করে বলে জানান এই কর্মকর্তা।
এ ঘটনায় মতিঝিল থানায় মামলা দায়ের করা হয়। পুলিশ বলছে, পরের তদন্তে হুমকি ও গুলি দুই ঘটনাতেই তানিম রেজা বাপ্পি ও তাঁর সহযোগীদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যায়। দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকায় তাঁদের আগে গ্রেফতার করা সম্ভব হয়নি বলে জানান কর্মকর্তা। ১৯ মের গুলিতে কেউ আহত হয়েছিলেন কি না, এই প্রতিবেদনের জন্য পড়া কোনো প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি; তাই এখানে হতাহতের বিষয়ে কিছু লেখা হলো না।
কর্মকর্তা সাংবাদিকদের আরও বলেন, বাপ্পি একজন অবৈধ অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে, বিভিন্ন গুলিবর্ষণের ঘটনায় তাঁর সম্পৃক্ততার তথ্যও পুলিশের কাছে আছে এবং মতিঝিল এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজির অভিযোগও রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, বাপ্পির বিরুদ্ধে ডিএমপির বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজি, দস্যুতা, অপহরণ, হত্যাচেষ্টা, নারী ও শিশু নির্যাতন ও মাদকসহ বিভিন্ন অভিযোগে মোট সাতটি মামলা রয়েছে। এগুলো পুলিশের বর্ণনা করা মামলা ও অভিযোগ, কোনো আদালতের রায় নয়।
হোটেল পূর্বাণীর কাছে ও উত্তর কমলাপুরে গ্রেফতার
পুলিশ জানায়, ২০২৬ সালের ১৭ জুলাই, শুক্রবার সকালে মতিঝিলের হোটেল পূর্বাণী সংলগ্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডিএমপির মতিঝিল বিভাগ বাপ্পিকে গ্রেফতার করে। কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় তাঁর সঙ্গে থাকা তিন সহযোগী জুয়েল, শাকিল ও মানিক কাজীকেও একই স্থান থেকে গ্রেফতার করা হয়।
পঞ্চম ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা হয় পরে। ওসমান গণি জানান, জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারদের দেওয়া তথ্য এবং প্রযুক্তির সহায়তায় মতিঝিলের উত্তর কমলাপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে রাকিবুল ইসলাম ভূঁইয়া ওরফে রিজনকে গ্রেফতার করা হয়। প্রযুক্তিগত সহায়তার ধরন সম্পর্কে পুলিশ বিস্তারিত কিছু জানায়নি।
অস্ত্র উদ্ধার ও মামলা
পুলিশ জানায়, গ্রেফতারদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ১৭ জুলাই দিনগত রাতে দক্ষিণ কমলাপুরে বাপ্পির অফিসে অভিযান চালানো হয়। সেখান থেকে যা উদ্ধার হয়েছে বলে কর্মকর্তা জানান:
- একটি বিদেশি রিভলভার
- দুটি বিদেশি পিস্তল
- পাঁচ রাউন্ড রিভলভারের গুলি
- দুই রাউন্ড পিস্তলের গুলি
- দুটি ম্যাগাজিন
- একটি ইলেকট্রিক শক গান
- একটি বিদেশি চাইনিজ কুড়াল
উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের ঘটনায় মতিঝিল থানায় অস্ত্র আইনে পৃথক একটি মামলা হয়েছে বলেও জানান ডিএমপির এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, গ্রেফতার পাঁচজনের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে এবং তাঁদের অন্য সহযোগীদের গ্রেফতার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। যে ইজারাদারের অফিসে গুলি চালানো হয়েছিল, ১৮ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে তাঁর নাম বা তিনি কোন হাটের ইজারাদার, তা পুলিশ জানায়নি; এই প্রতিবেদনেও তা উল্লেখ করা হলো না।
ঈদুল আজহার কয়েক সপ্তাহ আগের হুমকি
তারিখগুলোর গুরুত্ব বোঝা যায় মৌসুমের দিকে তাকালে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায়, ঈদুল আজহা বাংলাদেশে কোরবানির ঈদ নামে বেশি পরিচিত; এটি জিলহজ মাসের দশম দিনে পালিত হয় এবং সামর্থ্যবান মুসলিমরা সেদিন ও পরের দিনগুলোতে পশু কোরবানি দেন। বাংলাদেশে সাধারণত গরু, ছাগল ও মহিষ কোরবানি দেওয়া হয়; একটি গরু বা মহিষ সাতজনের নামে কোরবানি দেওয়া যায়, আর একটি ছাগল বা ভেড়া একজনের নামে।
২০২৬ সালে জাতীয় চাঁদ দেখা কমিটি ১৮ মে সন্ধ্যায় জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সভাকক্ষে বৈঠকে বসে। বৈঠক শেষে জানানো হয়, দেশের আকাশে জিলহজ মাসের চাঁদ দেখা গেছে এবং ২৮ মে, বৃহস্পতিবার সারা দেশে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে; বাংলা ট্রিবিউন সেদিন সন্ধ্যায় এ খবর প্রকাশ করে। অর্থাৎ পুলিশের বর্ণনা করা চাঁদা দাবি ইজারাদারের কাছে পৌঁছায় মে মাসের মাঝামাঝি, যখন ঢাকার অস্থায়ী পশুর হাটগুলোর ইজারা ও প্রস্তুতি চলছিল। তাঁর অফিসে গুলি চালানো হয় ১৯ মে।
সে বছর বিদেশি নম্বর থেকে হোয়াটসঅ্যাপে হুমকির ঘটনা এই প্রথম খবরে আসেনি। ২০২৬ সালের ২৬ জানুয়ারি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম জানায়, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বলেছেন, তাঁদের দাপ্তরিক হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে একাধিক বিদেশি নম্বর থেকে ফোন করে গালাগাল ও হুমকি দেওয়া হয়েছে; পুলিশ সুপার জানান, কারা এসব করছে তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। সেই ঘটনার সঙ্গে কমলাপুরের ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই, ঢাকার পুলিশও দুটিকে যুক্ত করেনি।

ঢাকার কোরবানির পশুর হাট যেভাবে ইজারা দেওয়া হয়
পুলিশ যে ধরনের ইজারাদারের কথা বলেছে, তিনি নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য একটি হাট পরিচালনা এবং আইনে অনুমোদিত মাশুল আদায়ের অধিকার পান। ২০২৬ সালে এ বিষয়ে কার্যকর আইন ছিল হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন, ২০২৩ (২০২৩ সনের ১০ নং আইন, ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩), যা ১৯৫৯ সালের হাটস অ্যান্ড বাজারস (এস্টাবলিশমেন্ট অ্যান্ড অ্যাকুইজিশন) অর্ডিন্যান্স রহিত করে প্রণীত হয়। আইনের সংজ্ঞায় হাট ও বাজার বলতে এমন স্থানকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে দৈনিক বা সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে কৃষিপণ্য, ফলমূল, পশু, হাঁস-মুরগি, ডিম, মাছ-মাংস, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্যসহ নানা পণ্য কেনাবেচা হয়। অর্থাৎ পশুর হাট সরাসরি এই আইনের আওতায় পড়ে।
আইনের ৪ ধারায় ঠিক সেই ধরনের হাটের কথা বলা হয়েছে, যা ঈদের আগে বসে। এ ধারা অনুযায়ী, কোনো ধর্মীয় বা অন্য বিশেষ উৎসব উপলক্ষে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জেলা প্রশাসকের পূর্বানুমোদন নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হাট-বাজার ছাড়া অন্য কোনো স্থানে, স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি না করে, বছরের নির্দিষ্ট সময়ের জন্য অস্থায়ী হাট বসাতে পারে। ৬ ধারা অনুযায়ী, হাট ইজারার প্রক্রিয়া, ইজারা নিয়ে আপত্তি বা আপিল নিষ্পত্তি, ইজারাগ্রহীতার সঙ্গে চুক্তিপত্র এবং ইজারার অর্থ ব্যবস্থাপনা বিধি দ্বারা নির্ধারিত হবে। ৭ ধারায় বলা হয়েছে, সিটি কর্পোরেশনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ পণ্যের কেনাবেচার মূল্যমান যাচাই করে টোল, কর, রেইট বা ফি আদায়ের হার নির্ধারণ করবে, সরকারের অনুমোদন নিয়ে তা প্রচার করবে, এবং অনুমোদিত হার ইজারা বিজ্ঞপ্তি, দরপত্রের সিডিউল ও ইজারাগ্রহীতার চুক্তিপত্রে যুক্ত করতে হবে। ১২ ধারা অনুযায়ী, হাট-বাজারের সরকারি খাস জমি অবৈধভাবে দখলে রাখা বা তার ওপর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ বা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া অপরাধ; এর শাস্তি অনধিক এক বছর বিনাশ্রম কারাদণ্ড বা অনধিক পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড।
বাস্তবে ঢাকার দুই সিটি কর্পোরেশন প্রতিবছর বসন্তকালে হাটগুলোর দরপত্র আহ্বান করে। ২০২৬ সালের ১৯ এপ্রিল দৈনিক ইত্তেফাক জানায়, রাজধানীতে সে বছর মোট ২৬টি কোরবানির পশুর হাট বসানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে, এর মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি) এলাকায় ১৩টি এবং ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন (ডিএনসিসি) এলাকায় ১৩টি, এবং হাটগুলোর ইজারার বিজ্ঞপ্তি ইতিমধ্যে পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। ২১ মে ঢাকা টাইমস জানায়, শেষ পর্যন্ত দুই সিটিতে ২৭টি অস্থায়ী হাট বসছে: ডিএসসিসির আওতায় ১১টি এবং ডিএনসিসির আওতায় ১৬টি, যার মধ্যে গাবতলীর স্থায়ী হাটও রয়েছে। ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে জানান, ১১টি হাটের মধ্যে ৯টিতে সরকারি মূল্যের চেয়ে বেশি দর পাওয়া গেছে; বাকি দুটির দর সন্তোষজনক না হওয়ায় বিভাগীয় কমিশনারের সিদ্ধান্ত চাওয়া হয়েছে। সর্বোচ্চ দরদাতাদের ইতিমধ্যে হাটের জায়গা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
ইজারাদারদের কোন নিয়ম মানতে হয়, তা ২০২৬ সালের ২০ মে ডিএনসিসির নগরভবনে ইজারাদারদের সঙ্গে এক সভায় স্পষ্ট করা হয়। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিএনসিসির প্রশাসক বলেন, বৈধভাবে ইজারা দেওয়া বা নির্ধারিত হাট ছাড়া অন্য কোথাও পশুর হাট বসানোর সুযোগ নেই; নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী হাট বসবে পাঁচ দিনের জন্য, এর আগে কোনো বেচাকেনা হলে তা অবৈধ বলে গণ্য হবে। তিনি জানান, অনিয়মের বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার জন্য প্রায় ১০০ জন কর্মকর্তাকে ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। পশু বিক্রির অর্থ থেকে ইজারাদার ৫ শতাংশ হাসিল নিতে পারবেন, এর বাইরে বিক্রেতার কাছ থেকে আর কোনো টাকা নেওয়ার সুযোগ নেই। ইজারাদারদের প্রতিদিনের বর্জ্য সেদিনই নির্ধারিত স্থানে সরানো, নারীদের জন্য আলাদা টয়লেট বসানো এবং হাটে পানি জমতে না দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়।
ইজারা সবসময় নির্বিঘ্নে হয় না। ২০২৫ সালের ৩ জুন প্রথম আলো জানায়, সেদিন রাজধানীতে আনুষ্ঠানিকভাবে কোরবানির পশু বেচাকেনা শুরু হলেও দুই সিটির তিনটি হাটের ইজারা তখনো চূড়ান্ত হয়নি, কারণ সরকার নির্ধারিত দর পাওয়া যায়নি; এসব হাটের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চেয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগে চিঠি দিয়েছিল দুই সিটি কর্তৃপক্ষ। ডিএনসিসির সম্পত্তি বিভাগ জানিয়েছিল, এর একটি হাটের সরকার নির্ধারিত দর ছিল ৮০ লাখ টাকা, কিন্তু তিন দফা দরপত্র আহ্বান করেও কাঙ্ক্ষিত দর পাওয়া যায়নি।

হাটের পেছনের পশুর বাণিজ্য
এই হাটগুলোর মধ্য দিয়ে যে বিপুল অর্থ ও পশুর লেনদেন হয়, তা থেকেই বোঝা যায় একজন ইজারাদার কেন চাঁদাবাজদের লক্ষ্য হতে পারেন। ২০২৬ সালের ২২ মে বাংলা ট্রিবিউন প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য উদ্ধৃত করে জানায়, সে বছর সারা দেশে কোরবানির পশুর সম্ভাব্য চাহিদা ধরা হয়েছিল ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার ৩৩৪টি, আর প্রস্তুত ছিল ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৩ হাজার ৮৪০টি পশু। এর মধ্যে গরু-মহিষ ৫৬ লাখ ৯৫ হাজার ৮৭৮টি, ছাগল-ভেড়া ৬৬ লাখ ৩২ হাজার ৩০৭টি এবং অন্যান্য প্রজাতির পশু ৫ হাজার ৬৫৫টি। অধিদপ্তরের উপপরিচালক (খামার) পত্রিকাটিকে বলেন, পশুর কোনো সংকট নেই, সম্ভাব্য চাহিদার তুলনায় প্রায় ২২ লাখ পশু উদ্বৃত্ত থাকবে।
একই প্রতিবেদনে আগের কয়েক বছরের প্রবণতাও তুলে ধরা হয়: ২০২৩ সালে দেশে প্রায় ১ কোটি ২৫ লাখ পশু উৎপাদিত হলেও কোরবানি হয়েছিল প্রায় ১ কোটি; ২০২৪ সালে উৎপাদন ছিল ১ কোটি ২১ লাখ, কোরবানি প্রায় ৯৫ লাখ; আর ২০২৫ সালে ১ কোটি ২৪ লাখ পশুর বিপরীতে কোরবানি হয়েছিল প্রায় ৯০ লাখ। দেশজুড়ে সরবরাহও সমান ছিল না। ঢাকা বিভাগে সম্ভাব্য চাহিদা ২১ লাখ ৫৮ হাজার ৮৬৯টি হলেও প্রাপ্যতা ছিল ১৪ লাখ ৪৩ হাজার ৯৪২টি; চট্টগ্রামেও প্রায় ৫০ হাজার পশুর ঘাটতির তথ্য ছিল। অন্যদিকে রাজশাহী, রংপুর, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগে বড় উদ্বৃত্ত ছিল, শুধু রাজশাহী বিভাগেই চাহিদার চেয়ে প্রায় ১৯ লাখ বেশি পশু প্রস্তুত করা হয়। ফলে রাজধানীর হাটে বিক্রি হওয়া পশুর বড় অংশ আসে উত্তরাঞ্চল থেকে।
বাংলা ট্রিবিউনের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানিয়েছিল, সে বছর সারা দেশে ৩ হাজার ৬০০টির বেশি পশুর হাট বসবে এবং রাজধানীর ২৭টি হাটে ২০টি ভেটেরিনারি মেডিক্যাল টিম দায়িত্ব পালন করবে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, পশুবাহী ট্রাকে চাঁদাবাজি বন্ধে সরকার কঠোর অবস্থানে থাকবে এবং হাট ও সড়কে নিরাপত্তা নিশ্চিতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবে। ঢাকা টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, হাটে সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন থাকবে, মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী স্বাস্থ্য পরীক্ষার সনদ ছাড়া কোনো পশু হাটে তোলা যাবে না, আর অনলাইনে পশু কেনাবেচায় কোনো হাসিল দিতে হবে না।
চাঁদাবাজি ও অবৈধ অস্ত্র নিয়ে আইন কী বলে
পুলিশ যে অপরাধগুলোর কথা বলেছে, সেগুলো দুটি পুরোনো কিন্তু এখনো কার্যকর আইনের আওতায় পড়ে। দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ৩৮৩ ধারায় চাঁদাবাজি (এক্সটরশন) বলতে বোঝানো হয়েছে কোনো ব্যক্তিকে তাঁর নিজের বা অন্য কারও ক্ষতির ভয় দেখিয়ে অসৎভাবে তাঁকে কোনো সম্পত্তি, মূল্যবান জামানত বা যেকোনো ধরনের চাঁদা বা অনুদান দিতে প্ররোচিত করা। ৩৮৪ ধারা অনুযায়ী চাঁদাবাজির শাস্তি অনধিক তিন বছরের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড। মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের ভয় দেখিয়ে চাঁদা আদায় এবং চাঁদা আদায়ের উদ্দেশ্যে কাউকে এমন ভয় দেখানো বা দেখানোর চেষ্টাকে দণ্ডবিধির ৩৮৬ ও ৩৮৭ ধারায় আলাদাভাবে অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে, এবং সাধারণ চাঁদাবাজির তুলনায় এগুলোর শাস্তি অনেক কঠোর।
অস্ত্রের বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত হয় অস্ত্র আইন, ১৮৭৮ দিয়ে। এর ১৪ ধারা অনুযায়ী, লাইসেন্স ছাড়া এবং লাইসেন্সে অনুমোদিত সীমার বাইরে কেউ আগ্নেয়াস্ত্র বা গোলাবারুদ নিজের দখলে বা নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবেন না। ১৯(চ) ধারা অনুযায়ী ১৪ ধারা লঙ্ঘন করে অস্ত্র বা গোলাবারুদ রাখার শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা অন্যূন সাত বছরের সশ্রম কারাদণ্ড; ১৯৯১ সালের সংশোধনীতে এই শাস্তি নির্ধারিত হয়। ১৯ক ধারায় বলা হয়েছে, অপরাধটি পিস্তল, রিভলভার, রাইফেল, শটগান বা অন্য আগ্নেয়াস্ত্র সংক্রান্ত হলে শাস্তি যাবজ্জীবন কারাদণ্ড অথবা অন্যূন দশ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড। পুলিশ শুধু জানিয়েছে যে অস্ত্র আইনে মামলা হয়েছে; ১৮ জুলাইয়ের প্রতিবেদনে কোন ধারায় মামলা হয়েছে তা বলা হয়নি, আর গ্রেফতারদের কেউ কোনো অপরাধে দোষী কি না, তা নির্ধারণের এখতিয়ার আদালতের।
মতিঝিল, কমলাপুর ও ঢাকা মহানগর পুলিশ
যে মতিঝিল এলাকায় গ্রেফতার হয়েছে, সেটি ঢাকার বাণিজ্যিক কেন্দ্র। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, মতিঝিল থানার আয়তন ৩.৬৯ বর্গকিলোমিটার, থানাটি গঠিত হয় ১৯৭৬ সালে; এর উত্তরে রমনা, রামপুরা ও খিলগাঁও, দক্ষিণে সূত্রাপুর, পূর্বে খিলগাঁও ও সবুজবাগ এবং পশ্চিমে পল্টন ও রমনা থানা। বাংলাদেশ ব্যাংক এবং সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও পূবালীসহ বহু ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসসহ অনেক সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এই থানায় অবস্থিত। ২০০১ সালের আদমশুমারিতে থানার জনসংখ্যা ছিল ২ লাখ ২৫ হাজার ৯৯৯, আর আয়ের প্রধান উৎস ছিল চাকরি ও ব্যবসা।
যে কমলাপুরে ইজারাদারের অফিসে গুলি চালানো হয় এবং পরে পুলিশ বাপ্পির অফিসে অভিযান চালায়, সেটি একই থানার মধ্যে, রাজধানীর প্রধান রেল টার্মিনাল কমলাপুর রেলস্টেশনকে ঘিরে গড়ে ওঠা এলাকা; স্টেশনের বলাকা ভাস্কর্যকে বাংলাপিডিয়া এলাকার উল্লেখযোগ্য স্থাপনার মধ্যে রেখেছে। বাংলাপিডিয়ায় দক্ষিণ কমলাপুরে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের একটি গণকবরের কথাও উল্লেখ আছে। ঢাকা টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ডিএসসিসির একটি অস্থায়ী পশুর হাট বসেছিল উত্তর শাহজাহানপুরে রেলওয়ে কলোনি সংলগ্ন মৈত্রী সংঘের মাঠে, যা শহরের একই অংশে।
যে বাহিনী গ্রেফতার করেছে, সেই ঢাকা মহানগর পুলিশ গঠিত হয় ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স, ১৯৭৬ (১৯৭৬ সনের ৩ নং অধ্যাদেশ, ২০ জানুয়ারি ১৯৭৬) অনুযায়ী, যাতে ঢাকা মহানগর এলাকার জন্য একটি পৃথক পুলিশ বাহিনী গঠনের বিধান করা হয়। গ্রেফতারকারী মতিঝিল বিভাগ সেই এলাকা দেখে, যেখানে গুলি ও অভিযান দুই-ই ঘটেছে; হুমকি ও গুলির মামলা এবং নতুন অস্ত্র মামলা, দুটিই হয়েছে মতিঝিল থানায়।

ছবি: S.M.M. Musabbir Uddin / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (১৮ জুলাই ২০২৬), বাংলা ট্রিবিউন (১৮ মে ও ২২ মে ২০২৬), ঢাকা টাইমস (২১ মে ২০২৬), দৈনিক ইত্তেফাক (১৯ এপ্রিল ২০২৬), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (২৬ জানুয়ারি ও ২০ মে ২০২৬), প্রথম আলো (৩ জুন ২০২৫), হাট ও বাজার (স্থাপন ও ব্যবস্থাপনা) আইন ২০২৩, দণ্ডবিধি ১৮৬০, অস্ত্র আইন ১৮৭৮ ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ অর্ডিন্যান্স ১৯৭৬ (বাংলাদেশ আইন, লেজিসলেটিভ ও সংসদবিষয়ক বিভাগ), বাংলাপিডিয়া (মতিঝিল থানা, ঈদুল আজহা)





মন্তব্য
(০)