বাজারে চাল-ডালের দাম বাড়লেই অনেকে মুঘল আমলের সুবাদার শায়েস্তা খানের সময়ের কথা টানেন, যখন টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত বলে প্রচলিত। বিবিসি বাংলার এক বিশ্লেষণে ইতিহাসবিদ ও গবেষকদের বয়ানে প্রশ্নটি খতিয়ে দেখা হয়েছে: সত্যিই কি তখন চাল এত সস্তা ছিল, আর সস্তা চাল মানেই কি মানুষ সুখে ছিল?
ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আব্দুল করিম তাঁর ‘বাংলার ইতিহাস’ বইয়ে লিখেছেন, ঢাকা ছাড়ার সময় শায়েস্তা খান লালবাগ দুর্গের পশ্চিম ফটক বন্ধ করে শিলালিপিতে লিখে যান, চালের দাম তাঁর সময়ের মতো সস্তা না হলে এই ফটক খোলা যাবে না। ফটকটি অর্ধশতকের বেশি বন্ধ ছিল; ১৭৪০ সালে নবাব সরফরাজ খানের সময়ে চালের দাম আবার টাকায় আট মণে নামলে তা খোলা হয়। উনিশ শতকের শুরুতে ব্রাডলি বার্ট লিখেছিলেন, এক টাকায় ৭৪০ পাউন্ড বা আট মণ চাল পাওয়া যেত; কোনো কোনো ইতিহাসবিদের মতে কখনো নয় মণেরও বেশি।
ইতিহাসের শিক্ষক ও গবেষক ড. নাসিমা হামিদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, বিভিন্ন ঐতিহাসিক ও বিদেশি পর্যটকের বিবরণে সে সময় নিত্যপণ্যের দাম কম থাকার সত্যতা মেলে; তখন বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ায় প্রচুর খাদ্যশস্য উৎপাদন ও সরবরাহ ছিল। আওরঙ্গজেবের আমলে শায়েস্তা খান দুই দফায় প্রায় ২২ বছর বাংলা শাসন করেন; অধ্যাপক করিমের বইয়ে আছে, কৃষির উন্নতির জন্য তিনি কৃষকদের দ্বৈত কর থেকে রক্ষা করেন এবং কৃষিপণ্য বাজারজাতে ব্যবসায়ীদের উৎসাহ দেন। আগের সুবাদার মীর জুমলার শেষ দিকে ঢাকা ও আশপাশে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল বলেও বইয়ে উল্লেখ আছে।
তবে ভিন্নমত দিয়েছেন অধ্যাপক গোলাম রাব্বানী। তাঁর ভাষায়, তখন কৃষকের অবস্থা ছিল করুণ; রাসায়নিক সার বা সেচ ছাড়া, মৌসুমি বায়ু ও কায়িক শ্রমের ওপর নির্ভর করে এক টাকা আয়ের জন্য কৃষককে আট মণ চাল ফলাতে হতো, যা অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির মাপকাঠি নয়। তিনি জানান, বিদেশি বণিকেরা হালকা মসলিনের সঙ্গে জাহাজের ভারসাম্য রাখতে বাংলা থেকে চালও নিয়ে যেত; শায়েস্তা খান চাল রপ্তানি নিষিদ্ধ করলে কৃষকের ঘরে চাল পচতে শুরু করে, আর দাম আরও নেমে যায়।
ঐতিহাসিক যদুনাথ সরকারের মতে, ঢাকা ছিল বাংলার প্রধান ধান উৎপাদনকারী অঞ্চলের কেন্দ্রে, তাই মধ্য বাংলার তুলনায় এখানে চালের দাম স্বাভাবিকভাবেই কম ছিল; আবার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও ছিল খুব কম, ফলে পণ্য তাদের নাগালে সহজলভ্য ছিল না। গবেষকদের মতে, বাজার তদারকি ও কম ক্রয়ক্ষমতাসহ কয়েকটি কারণে তখন ভোগ্যপণ্যের দাম কম ছিল, কিন্তু সস্তা চাল মানেই সবার সচ্ছলতা নয়।
ছবি: Shmunmun / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)