চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার হাইদগাঁও ইউনিয়নের পূর্ব হাইদগাঁও গ্রামের সোহাফ উদ্দিন (৩১) কেঁচো সার বা ভার্মিকম্পোস্ট তৈরি করে নিজের পায়ে দাঁড়িয়েছিলেন। ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি প্রথম আলোয় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, তখন তিনি মাসে তিন টন করে কেঁচো সার তৈরি করছিলেন এবং সার ও বীজ বিক্রির একটি প্রতিষ্ঠানও দিয়েছিলেন। কেঁচো সার তৈরি করে এলাকায় তিনি বেশ পরিচিতি পেয়েছিলেন।
অষ্টম শ্রেণি থেকে কৃষি প্রশিক্ষণে
সোহাফ উদ্দিনের লেখাপড়া অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। দারিদ্র্যের কারণে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকেই তাঁকে বাবার সঙ্গে খেতে কাজ করতে হয়েছে, অষ্টম শ্রেণির পর লেখাপড়া আর এগোয়নি। তবু কিছু একটা করে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর তাগিদ ছিল তাঁর। ২০১৫ সালে উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের একটি কৃষি প্রশিক্ষণে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান তিনি। সেখানে উন্নত চাষাবাদের পাশাপাশি কেঁচো সার তৈরির পদ্ধতি শেখেন, এরপর এই কাজেই পুরো মনোযোগ দেন।
সোহাফ প্রথম আলোকে জানান, ২০১৭ সালের অক্টোবরে বাড়ির পাশে এক শ টাকায় সামান্য জায়গা ভাড়া নেন তিনি। টিনের ছাউনি দেওয়া ছোট একটি ঘরে ছয়টি রিং বসান। প্রতিটি রিংয়ে ১০০ থেকে ১২০ কেজি পচা গোবর, তরিতরকারির ফেলে দেওয়া অংশ, পাকা কলার খোসা আর কৃষি বিভাগ থেকে বিনা মূল্যে পাওয়া পাঁচ শ গ্রাম কেঁচো দিয়ে সার তৈরি শুরু করেন। এতে খরচ পড়ে তিন শ টাকা। ৪০ দিন পর প্রতিটি রিংয়ে ৪৫ কেজি করে সার তৈরি হয়। প্রতি কেজি সার তখন ১৮ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হতো, আর ছয়টি রিংয়ের সার বিক্রি করে তিনি পেয়েছিলেন পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ হাজার টাকার মতো। প্রতি তিন মাস অন্তর কেঁচোর বংশ বাড়ে বলে নতুন করে কেঁচো কিনতে হয় না। সোহাফের ভাষ্য, সার তৈরিতে গরু-ছাগল অথবা হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ও নাড়িভুঁড়ি লাগে; এসব তিনি ও তাঁর স্ত্রী জোগাড় করেন।

ছয়টি হাউসে মাসে তিন টন
সোহাফ জানান, অল্প পুঁজিতে পরিশ্রম করে ভালো লাভ হওয়ায় ২০১৮ সালে প্রতিবেশী খামারি আবু নঈমও এই কাজে যুক্ত হন, তাঁর কাছ থেকে নিয়মিত গোবর পাওয়া যায়। প্রতিবেদক সরেজমিনে দেখেছিলেন, ৩০ ফুট দীর্ঘ ও ১২ ফুট প্রস্থের ছয়টি লম্বা হাউসে সার তৈরি হচ্ছে, আর খামারে কাজ করছেন সোহাফ উদ্দিন, তাঁর স্ত্রী রুমা আক্তার ও আবু নঈম। প্রতি মাসে তাঁরা তিন টন করে সার তৈরি করছিলেন এবং সার বিক্রি করে মাসে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা পাওয়া যাচ্ছিল বলে জানা যায়।
চট্টগ্রামের বিভিন্ন নার্সারি, বাগানি ও ছাদবাগানের উদ্যোক্তারা তাঁর কাছ থেকে পাইকারি ও খুচরা দামে সার নিতেন। সোহাফ জানান, কেঁচো সারের জন্য ২০১৮ ও ২০১৯ সালে কৃষি উন্নয়ন মেলায় তিনি পুরস্কার পান। তিনি মেসার্স সাতগাছিয়া বীজ ভান্ডার নামে একটি প্রতিষ্ঠান দেন, সেখান থেকে বীজের পাশাপাশি কেঁচো সারও বিক্রি করতেন।
হাইদগাঁওয়ের কৃষক মোহাম্মদ আবু ছায়েমের প্রায় তিন একর জায়গায় নানা ফলের ও সবজির বাগান আছে। তিনি জানান, আগে তিনি ব্যাপক হারে রাসায়নিক সার ব্যবহার করতেন; সোহাফ উদ্দিনের কাছ থেকে কেঁচো সার কেনার পর তাঁর খরচ কমেছে। তাঁর হিসাবে, আগে সারের পেছনে খরচ হতো ৪০০ টাকা, এখন পড়ে ১৬০ টাকা।

কেঁচো সার কী, কীভাবে তৈরি হয়
কেঁচো সার হলো কেঁচোর সাহায্যে গোবর, তরিতরকারির উচ্ছিষ্টের মতো জৈব আবর্জনা পচিয়ে তৈরি জৈব সার; এর বড় অংশ কেঁচোর মল বা কাস্ট। কৃষি তথ্য সার্ভিসের (এআইএস) কৃষিকথায় ২০১৭ সালে প্রকাশিত একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, গবেষণায় কেঁচো সারের জন্য দুটি প্রজাতি অগ্রাধিকার পেয়েছে: ইউড্রিলাস ইউজেনি ও আইসেনিয়া ফিটিডা। কাঁচামাল হিসেবে প্রাণীর মল, গোবর, হাঁস-মুরগির বিষ্ঠা ও ছাগল-ভেড়ার মল চলে, এর মধ্যে গোবরই উৎকৃষ্ট।
এআইএসের নিবন্ধ অনুযায়ী মূল ধাপগুলো এমন:
- ছায়াযুক্ত জায়গায় চৌবাচ্চা, রিং বা হাউস তৈরি করে ওপরে চালা দেওয়া।
- আংশিক পচা জৈব দ্রব্য বিছিয়ে তার ওপর কেঁচো ছেড়ে দেওয়া।
- খাবারে পানি কম থাকলে পানি ছিটিয়ে আর্দ্রতা ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ রাখা এবং ভেজা চটের বস্তা দিয়ে পুরোপুরি ঢেকে রাখা।
- সার তৈরি হলে চালুনি দিয়ে চেলে কেঁচো আলাদা করা, যাতে সেগুলো আবার ব্যবহার করা যায়।
একই নিবন্ধে বলা হয়েছে, প্রথম দিকে সার তৈরিতে ৬০ থেকে ৭০ দিন লাগে, পরে ৪০ দিনে সম্পন্ন হয়; ভালো মানের কেঁচো সারে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়ামসহ ফসলের প্রয়োজনীয় নানা উপাদান থাকে এবং এটি মাটির উর্বরতা বাড়ায়। নিজের এলাকায় সার তৈরির প্রশিক্ষণ ও পরামর্শের জন্য উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করা যায়।

মাটির স্বাস্থ্য নিয়ে কৃষি কর্মকর্তার মত
পটিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কল্পনা রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কৃষকেরা বিভিন্ন ফসলে রাসায়নিক সার ব্যবহারের দিকে ঝুঁকছেন। এতে জমির উর্বরতা ও জৈব উপাদান কমে যাচ্ছে, ফলে ফলনও কমছে। তাঁর মতে, কেঁচো সার ব্যবহারে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা হয়, উর্বরতা বাড়ে; এতে কৃষকেরা লাভবান হবেন এবং রাসায়নিকমুক্ত ফসল উৎপাদন সম্ভব হবে।
ছবি: মৌচুমী / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: প্রথম আলো, কৃষি তথ্য সার্ভিস (কৃষিকথা), উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)