সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ৯ অক্টোবর ২০২৬
ঢাকা২৭°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৭৫%বাতাস ৩ কিমি/ঘ

ফিলিপাইনের কালো আখ চাষে ঝুঁকছেন চুয়াডাঙ্গার দিননাথপুরের কৃষকেরা

২০২১ সালের অক্টোবরে চুয়াডাঙ্গার দিননাথপুরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছিল চিবিয়ে খাওয়ার ফিলিপাইনের কালো আখ; কৃষকেরা বলছিলেন, অন্য ফসলের চেয়ে এতে লাভ বেশি, চারারও চাহিদা আছে।

ফিলিপাইনের কালো আখ চাষে ঝুঁকছেন চুয়াডাঙ্গার দিননাথপুরের কৃষকেরা
ফসল

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার শঙ্করচন্দ্র ইউনিয়নের দিননাথপুর গ্রামের মাঠে ২০২১ সালের অক্টোবরে সারি সারি দাঁড়িয়ে ছিল গাঢ় রঙের লম্বা আখ। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের এই এলাকার কৃষকেরা বহু বছর ধরে চিনিকলের জন্য যে হালকা রঙের আখ চাষ করে আসছেন, এগুলো সেই আখ নয়। স্থানীয় চাষিরা একে বলেন ফিলিপাইনের কালো আখ, চিবিয়ে খাওয়ার এক জাতের আখ। সে সময় এলাকায় এটি বাণিজ্যিকভাবেই চাষ হচ্ছিল।

দ্য এগ্রো নিউজকে কৃষকেরা জানান, অন্যান্য ফসলের চেয়ে এই আখ চাষ লাভজনক, তাই দিন দিন এ অঞ্চলের কৃষকেরা আখ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন। তাঁদের হিসাবে এ জাতের আখ চাষে বিঘাপ্রতি খরচ প্রায় ১ লাখ টাকা, আর খরচ বাদ দিয়ে বিঘাপ্রতি লাভ প্রায় দেড় লাখ টাকা। কৃষকেরা লাভবান হতে থাকলে আগামীতে আরও বেশি জমিতে এই আখের চাষ হওয়ার সম্ভাবনা আছে বলে তাঁরা মনে করছিলেন।

এই প্রতিবেদনে জানা যাবে দিননাথপুরে কালো আখ কীভাবে এল, খরচ, দাম ও চারা নিয়ে চাষিরা কী বলেছেন, আর একই সময়ে অন্য জেলার প্রতিবেদনে কী উঠে এসেছিল। সেই সঙ্গে থাকছে চিবিয়ে খাওয়ার আখ আসলে কী, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএসআরআই) ও জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী আখ কীভাবে চাষ হয়, কোন কোন পোকা ও প্রাণী এই ফসলের ক্ষতি করে, এবং ২০২১ সালে চুয়াডাঙ্গা ও সারা দেশের আখ খাত কোন অবস্থায় ছিল।

দিননাথপুরে যেভাবে এল কালো আখ


দিননাথপুরের গল্পের শুরু একজন কৃষককে দিয়ে, তিনি হারিছ চৌধুরী। মূল প্রতিবেদন অনুযায়ী, এলাকায় তিনিই ২০১৮ সালে সর্বপ্রথম ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ চাষ করেন। এ জাতের আখের চারা তিনি পান চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে, অর্থাৎ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) স্থানীয় দপ্তর থেকে।

শুরুটা ছিল ছোট পরিসরে। প্রথম বছর তিনি মাত্র তিন কাঠা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে আখ লাগান। ফলন ভালো হয়, আখের মান ভালো হয়, বাজারে চাহিদাও ছিল এবং চাষে লাভ হয়। তাই পরের বছর তিনি সাড়ে চার বিঘা জমিতে এই আখের চাষ করেন।

হারিছ চৌধুরী প্রতিবেদককে বলেন, প্রথমে তিনি অল্প জমিতে এ জাতের আখ চাষ করেছিলেন, আর ফলন ভালো হওয়ায় চাষে তাঁর আগ্রহ বাড়ে। বড় পরিসরে চাষ করার জন্য তিনি নিজেই চারা তৈরি করেন এবং ২০২১ সালের মৌসুমে সাড়ে চার বিঘা জমিতে আখ লাগান। এ জমি থেকে ৬ লাখ টাকা লাভ হতে পারে বলে তিনি জানান। দেশে আখ চাষ ছড়িয়ে দিতেই তিনি চারা উৎপাদন করছেন বলেও জানান।

চারা উৎপাদন তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল দ্বিতীয় একটি ব্যবসা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি নিজের আখ থেকে চারা তৈরি করে জেলার অন্য কৃষকদের কাছে বিক্রি করতেন। নতুন জাতের আখ চাষ শুরু করতে চাইলে কৃষকের প্রথমেই দরকার রোপণের উপকরণ, আর ২০২১ সালে এই কালো আখের চারা বীজের দোকানে সহজে কেনার মতো কিছু ছিল না। তাই চাষির হাতে তৈরি চারাই ছিল নতুন চাষিদের প্রধান ভরসা।

পথ ধরলেন প্রতিবেশীরা, বিক্রি হলো চারা


গ্রামের আরও কয়েকজন কৃষক তাঁর পথ ধরেছিলেন। আখচাষি সোহান আলি জানান, তিনি দুই বিঘা জমিতে ফিলিপাইনের কালো জাতের আখ চাষ করছেন। তাঁর কথায়, অন্য কৃষকদের কাছে এই আখের চারার ব্যাপক চাহিদা আছে, আখ চাষ লাভজনক, আর নতুন উদ্যোক্তারা আখ চাষ করে স্বাবলম্বী হতে পারবেন।

একই গ্রামের কৃষক মফিজ জোয়ার্দ্দার তখন চাষ শুরু করতে যাচ্ছিলেন। তিনি জানান, সে বছর তিনি ১ বিঘা জমিতে আখ চাষ করবেন। চারা তৈরির জন্য তিনি দিননাথপুর গ্রাম থেকে ফিলিপাইনের কালো জাতের ১৩০টি আখ কিনে আনেন, প্রতিটির দাম পড়ে ৫০ টাকা। অন্য ফসল চাষ লাভজনক না হওয়ায় তিনি আখ চাষের দিকে ঝুঁকছেন বলে জানান।

এই প্রতিবেদনের সংখ্যাগুলো চাষিদের নিজেদের দেওয়া। বিঘাপ্রতি প্রায় ১ লাখ টাকা খরচ, বিঘাপ্রতি প্রায় দেড় লাখ টাকা লাভ, সাড়ে চার বিঘা থেকে সম্ভাব্য ৬ লাখ টাকা লাভ এবং প্রতিটি আখ ৫০ টাকা দামের কথা কৃষকেরা ২০২১ সালের অক্টোবরে বলেছিলেন। এগুলো কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর বা কোনো বাজার জরিপের হিসাব নয়। কৃষকের প্রকৃত লাভ নির্ভর করে মৌসুম, কাটার সময়ের দাম এবং শেষ পর্যন্ত কতগুলো আখ বিক্রির উপযোগী থাকে তার ওপর।

সূর্যাস্তের আলোয় বাংলাদেশের একটি আখখেত। ছবি: প্লেগ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূর্যাস্তের আলোয় বাংলাদেশের একটি আখখেত। ছবি: প্লেগ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

২০২১ সালে অন্য জেলার খবরে যা এসেছিল


সে বছর শুধু দিননাথপুরেই নয়, আরও কয়েকটি জেলায় কৃষকেরা এই কালো আখ চাষ করছিলেন। এই প্রতিবেদনের কয়েক সপ্তাহ আগে অন্য জেলা থেকে প্রকাশিত সংবাদেও প্রায় একই চিত্র উঠে আসে। সেসব প্রতিবেদন থেকে বোঝা যায় চারা কোথা থেকে আসছিল এবং দাম কোন দিকে যাচ্ছিল।

২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক ভোরের কাগজ চুয়াডাঙ্গার পাশের জেলা ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ থেকে জানায়, সেখানকার একটি ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ৬ বিঘা, অর্থাৎ প্রায় ২ একর জমিতে পত্রিকাটির ভাষায় ফিলিপাইন জাতের গ্যান্ডারি আখ চাষ করেছেন। তিনি পত্রিকাটিকে জানান, ২০১৯ সালে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার একটি গ্রামের এক কৃষকের খেত থেকে তিনি প্রতিটি ১০০ টাকা দরে মোট ২০ হাজার টাকায় ১০০টি চারা কিনে আনেন। ২০২০ সালে মাত্র ৩ শতকের বীজতলায় সেগুলো থেকে চারা বাড়ান, তখন একটি আখ থেকে ২০ থেকে ২৫টি চারা পান, আর ২০২১ সালের শুরুতে মাঠে বাণিজ্যিকভাবে আখ লাগান।

কালীগঞ্জের ওই চাষি নিজের হিসাবও দেন। তাঁর ভাষ্যে, ৩৩ শতকের এক বিঘা জমিতে প্রায় ২৫০০ থেকে ২৮০০ চারা লাগে। বেড়া, সার, সেচ ও জিআই তারসহ বিঘাপ্রতি খরচ ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা, আর প্রতি বিঘা থেকে প্রায় আড়াই থেকে ৩ লাখ টাকার আখ পাওয়া সম্ভব। তিনি প্রতিটি আখ ৭০ থেকে ৮০ টাকা দরে পাইকারি বিক্রির আশা করছিলেন এবং বাড়তি চারা প্রতিটি ৫০ টাকা দরে বিক্রি করেছেন বলে জানান। কালীগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পত্রিকাটিকে বলেন, আখ খুব লাভজনক ফসল, আর আখ চাষ সম্পর্কে চিনিকলের কৃষি বিভাগ ভালো বলতে পারবে।

২০২১ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক সময়ের আলো উত্তর-পশ্চিমের চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলা থেকে জানায়, সেখানে এক তরুণ খামারমালিক পত্রিকাটির ভাষায় লাল রঙের ফিলিপাইনের আখ বাণিজ্যিকভাবে চাষ করছেন এবং শত শত চারা তৈরি করে সারা দেশে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। তিনি জানান, আগের বছর একেকটি চারা ৫০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি করেছিলেন, কিন্তু ২০২১ সালে চাষ বেশি হওয়ায় বিক্রি করছেন ৩০ থেকে ৪০ টাকায়। জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, জেলার মাটিতে ফিলিপাইনের এ আখের ভালো ফলন পাওয়া যাচ্ছে।

এই প্রতিবেদনের আগে প্রকাশিত এ দুটি সংবাদ দিননাথপুরের কৃষকের জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে। প্রথমত, ২০১৯ সালেই চুয়াডাঙ্গা সদর পাশের জেলাগুলোর জন্য এই আখের চারার একটি উৎস ছিল। দ্বিতীয়ত, বেশি কৃষক চারা তৈরি শুরু করায় ২০২১ সালের মধ্যেই অন্তত একটি জেলায় চারার দাম কমতে শুরু করেছিল।

চিবিয়ে খাওয়ার আখ আসলে কী


আখ হলো স্যাকারাম গণের একটি লম্বা বহুবর্ষজীবী ঘাসজাতীয় উদ্ভিদ। বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, চাষ করা প্রজাতিগুলোর মধ্যে স্যাকারাম অফিসিনারাম সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় এবং সম্ভবত প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই এশিয়ায় এর চাষ হয়ে আসছে। আখের কাণ্ড গিঁটযুক্ত ও ভেতরে ভরাট, আর প্রতিটি গিঁট থেকে শিকড় বের হয়।

বাংলাদেশে বেশির ভাগ আখ চাষ হয় চিনি ও গুড় তৈরির জন্য। এর একটি ছোট অংশ চাষ হয় সরাসরি খাওয়ার জন্য। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দেশি জাতগুলোর মধ্যে মিশ্রিমালা ও গেন্ডারি মূলত চিবিয়ে খাওয়ার জন্য চাষ হয়। বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে চাষ হওয়া জাতগুলোর কাণ্ড সাধারণত ৫ সেন্টিমিটার পর্যন্ত মোটা এবং তুলনামূলক নরম হয়, অন্যদিকে উত্তরবঙ্গের বেশির ভাগ জাতের কাণ্ড সরু ও শক্ত, প্রায় ৩ সেন্টিমিটার ব্যাসের।

এই প্রতিবেদনের কালো আখটি চিবিয়ে খাওয়ার আখের দলে পড়ে। ২০২১ সালের প্রতিবেদনগুলোতে এর কাণ্ডের রং খয়েরি বা লালচে বলে বর্ণনা করা হয়েছে, আর কালীগঞ্জের চাষি ভোরের কাগজকে বলেছিলেন, এ জাতের আখ কড়া মিষ্টি এবং প্রতিটি আখ ১৮ থেকে ২০ ফুট লম্বা হয়। তবে কোনো প্রতিবেদনেই এই আখের নিবন্ধিত জাতের নাম পাওয়া যায়নি; ফিলিপাইনের কালো আখ নামটি চাষি ও ব্যবসায়ীদের দেওয়া।

বিএসআরআইয়েরও নিজস্ব চিবিয়ে খাওয়ার জাত আছে। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে টাঙ্গাইলে বিএসআরআই আয়োজিত এক প্রশিক্ষণ কোর্সের খবরে রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস জানায়, প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত আখের ৪৮টি জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে চিবিয়ে খাওয়া ও রস পানের উপযোগী ৩টি, বন্যাসহিষ্ণু ৯টি, জলাবদ্ধতাসহিষ্ণু ১০টি, খরাসহিষ্ণু ৭টি এবং লবণাক্ততাসহিষ্ণু ৬টি জাত উল্লেখযোগ্য। একই অনুষ্ঠানে বিএসআরআইয়ের মহাপরিচালক জানান, চিবিয়ে খাওয়া ও রস পানের উপযোগী জাতের আখ চাষ লাভজনক হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে আগ্রহ বাড়ছে।

ঢাকায় আখের রস বিক্রেতারা, যেখানে তাজা আখ মাড়াই করে রস তৈরি হয়। ছবি: স্টিভ ইভান্স / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
ঢাকায় আখের রস বিক্রেতারা, যেখানে তাজা আখ মাড়াই করে রস তৈরি হয়। ছবি: স্টিভ ইভান্স / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)

আখ যেভাবে চাষ হয়


আখ কেমন পরিবেশে ভালো জন্মায়, বাংলাপিডিয়ায় তার বর্ণনা আছে। উর্বর, আর্দ্র মাটি আর রোদেলা আকাশের নিচে আখ সবচেয়ে ভালো হয়। কিছুটা বালি, পলি ও জৈব পদার্থ মেশানো এঁটেল দোআঁশ মাটি আখ চাষের জন্য সেরা মাটিগুলোর একটি। মাটির অম্লমান বা পিএইচ ৬ থেকে ৭.৫ হলে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়। বছরে ১২৫০ থেকে ১৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টি হলে সেচের প্রয়োজন পড়ে না, আর বাড়ন্ত সময়ে বাতাসে বেশি আর্দ্রতা এবং পাকার সময় শুকনো আবহাওয়া থাকলে ফলন সন্তোষজনক হয়।

আখ বীজ থেকে নয়, কাণ্ডের টুকরা থেকে চাষ হয়। বাংলাপিডিয়া জানায়, কৃষকেরা আখের কাটা টুকরা বা সেট রোপণ করেন, আর কোনো কোনো এলাকায় আখ কাটার পর জমিতে থেকে যাওয়া গোড়া থেকে আবার আখ গজাতে দেওয়া হয়, যাকে মুড়ি আখ চাষ বলে। প্রতিটি টুকরায় অন্তত একটি চোখ বা কুঁড়ি থাকতে হয়, আর প্রতিবার কাটার পর গোড়া থেকে নতুন কাণ্ড বের হয়।

এ কারণেই কালো আখ ছড়িয়েছে চারার মাধ্যমে। একটি আখকে কয়েকটি কুঁড়িযুক্ত টুকরায় কাটা যায়, তাই একটি কাণ্ড থেকে অনেক চারা পাওয়া সম্ভব। কালীগঞ্জের চাষি ভোরের কাগজকে একটি আখ থেকে ২০ থেকে ২৫টি চারা পাওয়ার যে কথা বলেছিলেন, কিংবা মফিজ জোয়ার্দ্দার নিজে চারা তৈরির জন্য যে ১৩০টি আখ কিনেছিলেন, দুটিই এর উদাহরণ।

আখ দীর্ঘ সময় জমি দখল করে রাখে। বাংলাপিডিয়া বলছে, সারা বছর জমিতে থাকায় কিছু কৃষক আখের বদলে অন্য ফসল চাষে আগ্রহী হন, আর বাংলাদেশে আখ কাটার মৌসুম অক্টোবর থেকে মার্চ পর্যন্ত। আখের সারির মাঝের জমি কাজে লাগানোর উপায়ও বের করেছে বিএসআরআই। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরের ওই অনুষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, আখের সঙ্গে সাথী ফসল হিসেবে আলু, পেঁয়াজ, রসুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, ডাল, তেলবীজ ও মসলা চাষের প্রযুক্তি তারা উদ্ভাবন করেছে।

লম্বা চিবিয়ে খাওয়ার আখকে দাঁড়িয়ে রাখতে ঠেকনাও লাগে। ভোরের কাগজ কালীগঞ্জের খেতের বর্ণনায় জানায়, আখ যাতে নুয়ে না পড়ে সে জন্য প্রতিটি সারির মাঝে মাঝে শক্ত বাঁশের খুঁটিতে মোটা জিআই তার দিয়ে আখ বাঁধা ছিল, আর প্রতিটি সারির মাঝখান দিয়ে ভালোভাবে চলাফেরা করা যাচ্ছিল।

বেগুনি খোসার একটি আখের গিঁটে কুঁড়ি। এমন কুঁড়ি থেকেই নতুন চারা গজায়। ছবি: জেনিরগার্ডেন / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বেগুনি খোসার একটি আখের গিঁটে কুঁড়ি। এমন কুঁড়ি থেকেই নতুন চারা গজায়। ছবি: জেনিরগার্ডেন / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

পোকামাকড়, শিয়াল ও অন্যান্য শত্রু


আখের শত্রু অনেক। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রায় ১৫ প্রজাতির পোকাকে আখের প্রধান ক্ষতিকর পোকা ধরা হয়। এর বাইরে কৃমি বা নেমাটোড, মাকড়, ইঁদুর, শিয়াল ও কিছু পাখিও আখের ক্ষতি করে। প্রধান পোকাগুলোর মধ্যে আছে ডগার মাজরা পোকা, কাণ্ডের মাজরা পোকা, উইপোকা, পাতাফড়িং ও ছাতরা পোকা।

বাংলাপিডিয়া বলছে, ডগার মাজরা পোকা সবচেয়ে ব্যাপকভাবে দেখা যায় এবং দমন করাও সবচেয়ে কঠিন। এর কীড়া গাছের কচি ডগায় ঢুকে বাড়ন্ত অংশটি মেরে ফেলে, যাকে মরা ডগা বা ডেড হার্ট বলা হয়। আখ এক মিটারের চেয়ে খাটো থাকার সময় এই ক্ষতি বেশি হয়। কাণ্ডের মাজরা পোকা কাণ্ডের গায়ে ছোট গোল ছিদ্র করে ভেতরে ঢোকে এবং কখনো পুরো আখটিই ফুটো করে ফেলে।

চিবিয়ে খাওয়ার আখের ক্ষেত্রে পোকার মতোই বড় দুশ্চিন্তা প্রাণী। কালীগঞ্জের চাষি ভোরের কাগজকে বলেছিলেন, শিয়াল এই আখের প্রধান শত্রু, গবাদিপশুর উৎপাত তো আছেই। এগুলোর হাত থেকে রক্ষা করতে শুরুতেই খেতের চারপাশে মজবুত বেড়া দিতে হয়, আর সেটিই প্রথম দিকের বড় খরচ।

মাজরা পোকার আক্রমণ বা অন্য কোনো সমস্যা দেখা দিলে কৃষকের উচিত নমুনা নিয়ে উপজেলা কৃষি অফিসে যাওয়া অথবা আখের রোগবালাই ও পোকামাকড় নিয়ে কাজ করা বিএসআরআইয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা। মূল প্রতিবেদন বা ২০২১ সালের অন্য প্রতিবেদনগুলোতে কোনো কীটনাশক বা তার মাত্রার উল্লেখ নেই, তাই এখানেও তা দেওয়া হলো না।

২০২১ সালে চুয়াডাঙ্গা ও দেশের আখ খাত


চুয়াডাঙ্গা খুলনা বিভাগের একটি জেলা, আয়তন ১১৭৪.১০ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে কুষ্টিয়া ও মেহেরপুর, দক্ষিণ ও পূর্বে ঝিনাইদহ এবং পশ্চিমে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। বাংলাপিডিয়ায় দেওয়া ২০১১ সালের আদমশুমারির তথ্য অনুযায়ী, জেলায় উপজেলা ৪টি, জনসংখ্যা ১১ লাখ ২৯ হাজার ১৫ জন, আর ৬৫.১৪ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি।

চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার আয়তন ২৯৮.২৭ বর্গকিলোমিটার, ২০১১ সালে জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার ৯৩৫ জন। বাংলাপিডিয়া এ উপজেলার প্রধান ফসলের তালিকায় ধান, পাট, গম, পান, তুলা, ভুট্টা, তেলবীজ ও সবজির পাশাপাশি আখের নামও রেখেছে। দিননাথপুর গ্রামটি এই উপজেলার শঙ্করচন্দ্র ইউনিয়নে।

আখের সঙ্গে এ জেলার সম্পর্ক পুরোনো। রাষ্ট্রায়ত্ত কেরু অ্যান্ড কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেড জেলার দর্শনায় চিনিকল চত্বরের ভেতরে অবস্থিত। চিনির উপজাত চিটাগুড় বা মোলাসেস থেকে অ্যালকোহল তৈরির দেশের প্রথম লাইসেন্সপ্রাপ্ত ডিস্টিলারি এটি।

জাতীয় পর্যায়ে চিনিকলগুলো তখন চাপে ছিল। ২০২১ সালের ৪ জুলাই প্রথম আলো জানায়, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন রাষ্ট্রায়ত্ত ১৫টি চিনিকলের মধ্যে ৬টি বন্ধ ঘোষণা করেছে, আর চিনিকলের জন্য আখ চাষে কৃষকেরা আগ্রহ হারাচ্ছেন। একই প্রতিবেদনে বিএসআরআই জাতীয় বীজ বোর্ডের অনুমোদন পাওয়া নতুন উচ্চফলনশীল জাত বিএসআরআই আখ-৪৮ উদ্ভাবনের কথা জানায়।

২০২১ সালের অক্টোবরে বিএসআরআইয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, দেশে প্রায় ১.৮ লাখ হেক্টর জমিতে আখ চাষ হয়। এর মধ্যে চিনিকল এলাকায় প্রায় ১ লাখ হেক্টর এবং চিনিকলের বাইরের গুড় এলাকায় ০.৮ লাখ হেক্টর। মোট আখ উৎপাদন প্রায় ৭৩ লাখ টন, গড় ফলন হেক্টরে ৪০.৫২ টন। আর ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বাসসের খবরে বিএসআরআইয়ের দেওয়া হিসাবে, দেশে বছরে প্রায় ২০ লাখ টন চিনি ও গুড়ের প্রয়োজন, কিন্তু উৎপাদন হয় প্রায় ৬ লাখ টন, এর মধ্যে চিনি ০.৬৮ লাখ টন ও গুড় ৫.৩২ লাখ টন। বছরে ঘাটতি থাকে ১৪ লাখ টন।

এই প্রেক্ষাপটে স্থানীয় বাজারে গোটা গোটা আখ হিসেবে বিক্রি হওয়া চিবিয়ে খাওয়ার আখ কৃষকের সামনে চিনিকলে আখ বিক্রির বাইরে ভিন্ন একটি পথ খুলে দেয়। দিননাথপুরের চাষিরা বলেছিলেন, অন্য ফসলের চেয়ে বেশি লাভ হওয়ায় তাঁরা এই আখ বেছে নিচ্ছেন।

বিএসআরআই এবং সহায়তা যেখানে মিলবে


বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট আখ ও অন্যান্য মিষ্টি ফসল নিয়ে গবেষণার জাতীয় প্রতিষ্ঠান। এর অবস্থান পাবনার ঈশ্বরদীতে, ঢাকা থেকে প্রায় ১৯০ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, ১৯৩১ সালে ঢাকায় প্রতিষ্ঠিত আখ চারা পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে এর যাত্রা শুরু। পরে এটি গবেষণা কেন্দ্র ও ইনস্টিটিউটে রূপ নেয়, ১৯৮৯ সালে কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আসে এবং ১৯৯৬ সালে সংসদে পাস হওয়া আইনের মাধ্যমে স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান হয়।

২০২১ সালে নিজের ওয়েবসাইটে বিএসআরআই জানায়, প্রতিষ্ঠানটি ইক্ষু, তাল, খেজুর, গোলপাতা ও সুগারবিট নিয়ে এবং চিনি, গুড় ও চিবিয়ে খাওয়াসহ আখের বহুমুখী ব্যবহার নিয়ে গবেষণা করে। প্রতিষ্ঠানটির ভাষায়, দেশের উত্তর-পশ্চিম ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের স্বল্প বৃষ্টিপাত এলাকার একমাত্র নির্ভরযোগ্য অর্থকরী ফসল ইক্ষু। এর প্রযুক্তি হস্তান্তর উইং আখচাষি ও সম্প্রসারণকর্মীদের প্রশিক্ষণ দেয়, কৃষকের জমিতে নতুন প্রযুক্তির প্রদর্শনী স্থাপন করে এবং বিভিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে চাষাবাদের নতুন তথ্য ছড়িয়ে দেয়।

কালো আখ চাষের কথা ভাবছেন এমন কৃষকের জন্য দিননাথপুরের অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি কাজের কথা পাওয়া যায়:

  • হারিছ চৌধুরী শুরু করেছিলেন উপজেলা কৃষি অফিসের মাধ্যমে; চারা, মাটি ও পোকামাকড়ের সমস্যা নিয়ে প্রথমে সেখানেই খোঁজ নেওয়া যায়।
  • বিএসআরআই এবং এর আঞ্চলিক কেন্দ্র ও উপকেন্দ্রগুলো আখের জাত নিয়ে পরামর্শ দিতে পারে, যার মধ্যে ২০২১ সাল পর্যন্ত চিবিয়ে খাওয়া ও রস পানের জন্য অবমুক্ত ৩টি জাতও আছে।
  • চাষিরা পুরো বিঘায় যাওয়ার আগে ছোট জমিতে শুরু করেছিলেন; হারিছ চৌধুরীর ক্ষেত্রে সেটি ছিল তিন কাঠা।
  • বেশি কৃষক চারা তৈরি করায় ২০২১ সালেই অন্তত একটি জেলায় চারার দাম কমছিল, তাই চারার ব্যবসায় আগের দামের ওপর ভরসা করা যায় না।
পাবনার ঈশ্বরদীতে বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান ফটক। ছবি: এমসাইউম / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
পাবনার ঈশ্বরদীতে বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান ফটক। ছবি: এমসাইউম / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ছবি: প্লেগ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), ভোরের কাগজ, সময়ের আলো, বাসস, প্রথম আলো, বাংলাদেশ সুগারক্রপ গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

ফসল

সম্পর্কিত খবর

পরিবেশ

বিষখালীর ভাঙনে নদীতে ঝালকাঠির পৌনে তিন কোটি টাকার সাইক্লোন শেল্টার, ঝুঁকিতে ফসলি জমি

ঝালকাঠি সদরের পশ্চিম দেউরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টারের বড় অংশ বিষখালী নদীতে বিলীন হয়েছে; বাকিটুকুও ঝুঁকিতে। নদীতীরের বসতভিটা ও ফসলি জমি নিয়ে আতঙ্কে আছেন বাসিন্দারা।

বার্তা২৪১০ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
এগ্রোবিজ

জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় ঢাকায় সরু ও মাঝারি চাল কেজিতে ৩ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং মোকামে ধানের চড়া দামের কারণে রাজধানীর খুচরা বাজারে দেড় সপ্তাহে সরু ও মাঝারি চালের দাম কেজিতে সর্বোচ্চ ৩ টাকা বেড়েছে; মোটা চালের দাম কিছুটা স্থিতিশীল।

ডেইলি অবজারভার১০ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
ফসল

ভারতে আগাছায় ফসলের ক্ষতি এক দশকে ২৫% থেকে নেমে ১৩.৪৩%: আইসিএআরের গবেষণা

২০১৪-২০২৪ সালের ১,৬২২টি মাঠ পরীক্ষার ভিত্তিতে আইসিএআরের আগাছা গবেষণা অধিদপ্তর বলছে, আগাছায় গড় ফলন ক্ষতি এখন ১৩.৪৩ শতাংশ, যা ২০১৮ সালের হিসাবে ছিল প্রায় ২৫ শতাংশ। উন্নত আগাছা দমন পদ্ধতিই এর কারণ।

আইসিএআর১০ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)