২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে নামিবিয়ার মরুভূমিতে হুয়াব নদীর শুকনো খাত ধরে একদল হাতিকে অনুসরণ করছিলেন আলোকচিত্রী ফেদেরিকো ভেরোনেসি। সামনে পড়ল একটি মাদি হাতি, শুঁড়ে জড়ানো একটি মৃত শাবকের ছোট্ট দুটি পা, নিস্তেজ দেহটি ঝুলছে বাতাসে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সে বাচ্চাটিকে বয়ে বেড়াল, মাঝে মাঝে নামিয়ে যেন খাওয়ানোর বা পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করল, তারপর আবার তুলে নিল। সেই দৃশ্যের একটি ছবি লন্ডনের ন্যাচারাল হিস্ট্রি মিউজিয়ামের ২০২৬ সালের ‘ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার’ প্রতিযোগিতায় প্রধান পুরস্কার জিতেছে। বিবিসি বাংলায় প্রকাশিত ইসাবেল গেরেটসেনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে ছবির পেছনের গল্প।
প্রথম দেখায় দৃশ্যটি মায়ের শোক বলে মনে হয়েছিল। কিন্তু নামিবিয়ার মরু হাতি সুরক্ষায় কাজ করা অলাভজনক সংস্থা এলিফ্যান্ট হিউম্যান রিলেশনস এইডের (ইএইচআরএ) সংরক্ষণ কর্মসূচি পরিচালক ক্রিস্টিন উইন্টার জানান, শাবকবাহী হাতিটি মা নয়। ১৪ বছর বয়সী এই মাদি দুই বছর আগে নিজের শাবক হারায়; তারপর থেকে চারবার তাকে অন্য হাতির মৃত শাবক বইতে দেখা গেছে, যা এ অঞ্চলে প্রথম নথিভুক্ত আচরণ। উইন্টারের ধারণা, এটি হয়তো শোক সামলানোর এক রকম ‘আবেগীয় প্রক্রিয়া’, অথবা শিকারি প্রাণীর হাত থেকে ছোট দেহটি রক্ষার চেষ্টা।
নামিব মরুভূমির পাঁচটি নদীখাত ধরে প্রায় ১৫০টি মরু হাতি বাস করে, খাবার আর পানির খোঁজে পাড়ি দেয় দীর্ঘ পথ, খায় আনা গাছের (ফেইডারবিয়া আলবিডা) বীজকোষ বা প্লাবনভূমির ঘাস। এরা আলাদা প্রজাতি নয়, শেখা আচরণে শুষ্ক পরিবেশে টিকে থাকা একটি জনগোষ্ঠী। উইন্টার জানান, গত ২০ বছরে এদের সংখ্যা কমছে; কারণ আংশিক দীর্ঘ খরা, তবে প্রধানত মানুষের সঙ্গে সংঘাত, যার মূলে পানি: হাতিরা খামারে ঢুকে পানির ট্যাংক উল্টে দেয়, পাইপ ছেঁড়ে, পাম্প ভাঙে।
নবজাতকের মৃত্যুহার সবচেয়ে উদ্বেগের: ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে জন্মানো ১৬টি শাবকের মাত্র দুটি বেঁচেছে। সুস্থ নবজাতক হাতির ওজন যেখানে ১০০ থেকে ১২০ কেজি, মৃত শাবকগুলোর ওজন প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ কেজি। একটি তত্ত্ব, মায়েরা পূর্ণকাল গর্ভধারণে সক্ষম না থাকায় শাবক অপরিণত জন্মায়; আরেকটি, মানুষের সঙ্গে সংঘাতের দীর্ঘ মানসিক চাপ। ইন্ডিয়ানা ইউনিভার্সিটি ব্লুমিংটনের সহকারী অধ্যাপক ড্যানিয়েলা চুসিডের সঙ্গে ২০২৮ সাল পর্যন্ত চলা এক প্রকল্পে ইএইচআরএ হাতির মলে ভারী ধাতু ও পিএফএএসের মতো স্থায়ী রাসায়নিক আর থাইরয়েড ও কর্টিসল হরমোন পরীক্ষা করছে।
এলিফ্যান্ট ভয়েসেসের প্রতিষ্ঠাতা জয়েস পুল ছবিগুলোকে ‘সত্যিই মর্মান্তিক’ বলেছেন; কেনিয়ায় তিনি এক মা হাতিকে দুই দিন মৃত শাবকের পাশে দাঁড়িয়ে তোলার চেষ্টা করতে দেখেছেন। তাঁর মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি নামিবিয়া সরকারের দেওয়া শিকারের অনুমতিও মরু হাতিদের বিলুপ্তির দিকে ঠেলছে। ভেরোনেসির কাছে দৃশ্যটি ছিল ‘প্রায় মানবিক আচরণ’।
ছবি: Udo Schmidt / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0); নামিবিয়ার হাতির প্রতীকী ছবি, পুরস্কারজয়ী ছবিটি নয়
সূত্র: বিবিসি বাংলা





মন্তব্য
(০)