২০২১ সালের নভেম্বরে রাজশাহী অঞ্চলের পুকুরগুলো থেকে রাজধানীতে যাচ্ছিল বরফ দেওয়া মাছের চেয়েও দামি এক পণ্য: জীবন্ত মাছ। জেলার পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা বড় আকারের রুই ও অন্যান্য রুইজাতীয় মাছ পানিভর্তি ট্রাকে তুলে জীবন্ত অবস্থায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছিল ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জায়গার মাছের আড়তে। ফরমালিন আর বাসি মাছ নিয়ে যাঁরা দুশ্চিন্তায় থাকেন, তাঁদের কাছে বাজারে পৌঁছেও নড়াচড়া করা একটি রুই মাছই টাটকা হওয়ার সবচেয়ে সহজ প্রমাণ।
দ্য এগ্রো নিউজের নিজস্ব প্রতিবেদক সে সময় জানিয়েছিলেন, নিরাপদ মাছ পাওয়ার বিষয়টি তখন বহুল আলোচিত, আর রাজশাহীর জীবন্ত রুইজাতীয় মাছ সাধারণ ক্রেতাদের ফরমালিনমুক্ত মাছ কেনার সুযোগ করে দিচ্ছিল। একই প্রতিবেদনে চাষিদের হিসাবও তুলে ধরা হয়েছিল: কেজিপ্রতি বাড়তি দাম একদিকে, অন্যদিকে ট্রাক ভাড়া আর পথে মাছ বাঁচিয়ে রাখার খরচ।
এই লেখায় জানা যাবে সেই প্রতিবেদনে কী উঠে এসেছিল, রাজশাহী থেকে জীবন্ত মাছ পাঠানো কীভাবে শুরু হয়েছিল, ২০২১ সাল পর্যন্ত মৎস্য অধিদপ্তর ও সংবাদপত্রগুলো জেলার পুকুর ও মাছ নিয়ে কী তথ্য দিয়েছিল, ২০২০ সালের লকডাউন ও সেপ্টেম্বরের অক্সিজেন সংকটে এই বাণিজ্যের কী হয়েছিল, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) পরিবহনের সময় মাছ বাঁচিয়ে রাখা নিয়ে কী বলে, জীবন্ত মাছ কেন বেশি দামে বিক্রি হয়, আর সে সময় দেশের মাছ সরবরাহে চাষের রুইজাতীয় মাছের অবস্থান কোথায় ছিল।
২০২১ সালের নভেম্বরের প্রতিবেদনে যা ছিল
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাজারে পাঠানো বরফ দেওয়া মাছের তুলনায় জীবন্ত মাছে চাষিরা কেজিপ্রতি প্রায় ১০০ টাকা বেশি দাম পাচ্ছিলেন। প্রতিটি ট্রাকে ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি জীবন্ত মাছ পরিবহন করা যেত। মাছকে জীবিত রাখতে এবং পানির গুণাগুণ ভালো রাখতে পথে ট্রাকের পানি একবার বা দুবার বদলাতে হতো।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, সে সময় রাজশাহী থেকে ঢাকায় এই জীবন্ত মাছ পরিবহনে ট্রাক ভাড়া লাগত ১৫ হাজার থেকে ১৬ হাজার টাকা। এরপর প্রতিবেদক নিজের একটি হিসাব দেন: জীবন্ত পরিবহনে কেজিপ্রতি ৬০ টাকা খরচ হলেও চাষি বরফ দেওয়া মাছের চেয়ে কেজিপ্রতি প্রায় ৪০ টাকা বেশি পান। ৬০ টাকার অঙ্কটি হিসাবের জন্য ধরে নেওয়া একটি খরচ হিসেবেই বলা হয়েছিল; ট্রাক ভাড়ার বাইরে এতে আর কী কী খরচ ধরা হয়েছে, প্রতিবেদনে তা ভেঙে বলা হয়নি।
প্রতিবেদনটি শেষ হয়েছিল একটি প্রস্তাব দিয়ে। জীবন্ত মাছ পরিবহনের জন্য বিশেষ সুবিধাসম্পন্ন মাছবাহী ট্রাক চালু বা উন্নয়ন করা গেলে চাষিরা আর্থিকভাবে আরও লাভবান হতে পারবেন বলে সেখানে বলা হয়। ২০২১ সালে এই বাণিজ্য চলছিল পানি রাখার ব্যবস্থা করা সাধারণ ট্রাকে, তাই পথে পানি বদলানোর বিষয়টি এত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
প্রতিবেদনের শিরোনামে যে রুই জাতীয় মাছের কথা বলা হয়েছে, তার মানে রুইজাতীয় বা রুই গোত্রের কার্প মাছ, যার মধ্যে আছে রুই, কাতলা ও মৃগেল। এটি বাংলাদেশের জাতীয় মাছ বোঝায় না; দেশের জাতীয় মাছ ইলিশ।

রাজশাহী থেকে জীবন্ত মাছ পাঠানো যেভাবে শুরু
জীবন্ত মাছ ঢাকায় পাঠানোর ধারণাটি ২০২১ সালে নতুন ছিল না। ইংরেজি দৈনিক দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০১৮ সালের ২৫ জুলাই জানায়, ২০০৯ সালে রাজশাহীর তানোর উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের মাছ ব্যবসায়ী জামাল উদ্দিন প্রথম এই ধারণা চালু করেন। তাঁর পাঠানো জীবন্ত মাছ ঢাকার কাঁচাবাজারে বেশি দামে বিক্রি হয়, এরপর অন্যরাও একই পথ ধরেন।
একই পত্রিকার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মধ্যে রাজশাহী অঞ্চল থেকে প্রতিদিন প্রায় ২৫০ ট্রাক জীবন্ত মাছ দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যাচ্ছিল, আর প্রতিটি ট্রাকে থাকত ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি জীবন্ত মাছ। ট্রাকপ্রতি এই পরিমাণ তিন বছর পর দ্য এগ্রো নিউজের দেওয়া হিসাবের সঙ্গে মিলে যায়।
দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস সেসব এলাকার নামও উল্লেখ করেছিল যেখানে মাছ চাষ ছড়িয়ে পড়েছিল: রাজশাহীর পবা, মোহনপুর, দুর্গাপুর ও তানোর; নওগাঁর মান্দা, বদলগাছী ও মহাদেবপুর; এবং নাটোরের বনপাড়া, লালপুর ও বড়াইগ্রাম। বাণিজ্যিক মাছ চাষের জন্য কয়েক শ বড় পুকুর খনন করা হয়েছিল, আর আগের এক দশকে তিন জেলায় কয়েক হাজার টন রুইজাতীয় ও অন্যান্য মাছ উৎপাদিত হয়েছিল।
রুইজাতীয় মাছের মধ্যে রুই, কাতলা, মৃগেল, সিলভার কার্প ও গ্রাস কার্প ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয়। ২০১৮ সালের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, আড়াই থেকে চার কেজি ওজনের একটি রুইজাতীয় মাছ সাধারণত কেজিপ্রতি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হতো। মৎস্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক রেজাউল ইসলাম পত্রিকাটিকে বলেন, মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে রাজশাহী ছিল পথিকৃৎ।
সংখ্যায় রাজশাহীর পুকুর ও মাছ
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের রাজশাহী জেলার আয়তন ২,৪২৫.৩৭ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে নওগাঁ, পূর্বে নাটোর, পশ্চিমে নবাবগঞ্জ, আর দক্ষিণে পদ্মা নদী ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গ। জেলার নয়টি উপজেলা হলো গোদাগাড়ী, চারঘাট, তানোর, দুর্গাপুর, পবা, পুঠিয়া, বাগমারা, বাঘা ও মোহনপুর। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২৫ লাখ ৯৫ হাজার ১৯৭, আর ৫৯.৩৫ শতাংশ খানার প্রধান পেশা ছিল কৃষি।
২০২০ সালের ১৬ এপ্রিল ইংরেজি দৈনিক দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (টিবিএস) মৎস্য অধিদপ্তরের বরাত দিয়ে জানায়, রাজশাহীতে প্রায় ১৯ হাজার চাষি ৫০ হাজার পুকুরে বছরে ৮৫ হাজার টন মাছ উৎপাদন করেন, যা জেলার নিজস্ব চাহিদার চেয়ে ৩২ হাজার টন বেশি। এই উদ্বৃত্ত মাছই যেত দেশের অন্য বাজারে। এলাকার মাছচাষিরা পত্রিকাটিকে বলেন, স্বাভাবিক সময়ে দেশের রুইজাতীয় মাছের চাহিদার ৮০ শতাংশ তাঁরাই মেটান; এটি চাষিদের দাবি, সরকারি হিসাব নয়।
পাঁচ মাস পর, ২০২০ সালের ২০ সেপ্টেম্বর টিবিএস রাজশাহীর মৎস্য অধিদপ্তরের আরেকটি হিসাব প্রকাশ করে। তাতে বলা হয়, জেলায় ১৩ হাজার হেক্টর জায়গাজুড়ে ৫০ হাজার পুকুর রয়েছে, যেখানে বছরে গড়ে ৮১ হাজার টন মাছ উৎপাদিত হয়, আর এর ৮৫ শতাংশই রুইজাতীয় মাছ। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর প্রতিদিন প্রায় ১৪০টি ট্রাক ৭০০ থেকে ৮০০ কেজি করে মাছ নিয়ে ঢাকার পথে রওনা হতো।
মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, একই প্রতিবেদনে জেলার বার্ষিক মাছ বাণিজ্যের পরিমাণ বলা হয় ১,৬২০ কোটি টাকা, আর এই খাতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন প্রায় ৯ লাখ মানুষ, যাঁদের মধ্যে খামারমালিক ১৭ হাজার। ২০২০ সালের প্রতিবেদনগুলোতে ট্রাকপ্রতি মাছের পরিমাণ দ্য এগ্রো নিউজের দেওয়া জীবন্ত মাছের হিসাব ৫০০ থেকে ৬০০ কেজির চেয়ে বেশি ছিল; সেগুলো জীবন্ত না বরফ দেওয়া মাছ, সূত্রে তা বলা হয়নি।
২০২০ সালের লকডাউন ও অক্সিজেন সংকট
প্রতিবেদনের আগের বছরেই বোঝা গিয়েছিল, এই বাণিজ্য কতটা ঝুঁকির মুখে থাকে। টিবিএস জানায়, ২০২০ সালের ২৬ মার্চ শুরু হয়ে ৩১ মে পর্যন্ত চলা লকডাউনে ঢাকায় মাছ পাঠানো প্রায় বন্ধ ছিল। এপ্রিলের প্রতিবেদনে পত্রিকাটি লেখে, প্রতিদিন ঢাকাগামী ট্রাকের সংখ্যা প্রায় ১৫০ থেকে নেমে প্রায় ২০-এ দাঁড়িয়েছিল, আর চাষিরা জানান, বিক্রির উপযোগী মাছভর্তি পুকুর থাকলেও তাঁরা ক্রেতা পাচ্ছিলেন না।
দামও কমে গিয়েছিল। ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে পবা উপজেলার এক মাছচাষি টিবিএসকে বলেন, ফেব্রুয়ারিতে তিনি রুই বিক্রি করেছিলেন কেজিপ্রতি ৩২০ টাকায়, কিন্তু তখন বিক্রি করতে হচ্ছিল ২৭০ টাকায়। চাষিদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিভিন্ন জাতের মাছের দাম কেজিতে ৪০ থেকে ৫০ টাকা কমে গিয়েছিল।
এরপর আসে আবহাওয়ার আঘাত। প্রথম আলো ২০২০ সালের ৩ সেপ্টেম্বর জেলা মৎস্য দপ্তরের বরাত দিয়ে জানায়, এক দিনে রাজশাহীর পুকুরগুলোতে ৬১৬ মেট্রিক টন মাছ মরে ভেসে উঠেছিল। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার হিসাবে শুধু পবা উপজেলাতেই ক্ষতি হয় ৩০৭ মেট্রিক টন। মেঘলা আবহাওয়ার পর বৃষ্টিতে পুকুরের পানিতে অক্সিজেন উৎপাদন কমে গিয়েছিল। জেলা মৎস্য কর্মকর্তা অলোক কুমার সাহা বলেন, যেসব পুকুরে কাতল ও সিলভার কার্প জাতীয় মাছ বেশি চাষ করা হয়েছে, সেই সব পুকুরের বেশি ক্ষতি হয়েছে। পত্রিকাটি জানায়, যেসব পুকুরে চাষিরা এয়ারেটর চালিয়েছেন বা নিয়মিত জাল টেনেছেন, সেখানে ক্ষতি কম হয়েছিল।
ঘটনাটি জীবন্ত মাছ পরিবহনের মূল নীতিটিই মনে করিয়ে দেয়: রুইজাতীয় মাছের দরকার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন, আর একই পানিতে মাছ যত বেশি, অক্সিজেন তত দ্রুত ফুরায়।

পথে মাছ বাঁচিয়ে রাখা: এফএওর নির্দেশনা যা বলে
দ্য এগ্রো নিউজের প্রতিবেদনে শুধু ব্যবহারিক রূপরেখাটুকু ছিল: ট্রাকপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ কেজি মাছ আর পথে একবার বা দুবার পানি বদল। কেন এসব ধাপ জরুরি, তা ব্যাখ্যা করে এফএওর স্বাদুপানির মাছ চাষ বিষয়ক প্রশিক্ষণ সহায়িকা, যা তাদের সিম্পল মেথডস ফর অ্যাকুয়াকালচার সিরিজের অংশ। সেখানে জীবন্ত মাছ পরিবহনকে মাছ চাষের নিয়মিত কাজ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, খামারের ভেতরে কয়েক মিনিটের স্থানান্তর থেকে শুরু করে এক-দুই দিনের যাত্রা পর্যন্ত।
জীবন্ত মাছ পরিবহন নিয়ে এফএওর সহায়িকার প্রধান কথাগুলো এমন:
- পরিবহনের আগে মাছকে খাবার দেওয়া বন্ধ রাখতে হয়, যাতে পেট খালি থাকে এবং পানি কম নোংরা হয়: উষ্ণ পানিতে ১২ থেকে ২৪ ঘণ্টা, ঠান্ডা পানিতে আরও বেশি, আর চায়নিজ কার্পের ক্ষেত্রে সম্ভব হলে অন্তত ৪৮ ঘণ্টা।
- পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন লিটারপ্রতি ৩ থেকে ৫ মিলিগ্রামের নিচে নামা, কিংবা মোট অ্যামোনিয়া লিটারপ্রতি ৫ মিলিগ্রামের বেশি হওয়া বিপদের লক্ষণ।
- উষ্ণ পানির মাছের জন্য পরিবহনের পানির তাপমাত্রা প্রায় ১৫ থেকে ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং পিএইচ প্রায় ৭ থেকে ৭.৫ রাখা ভালো; পানিতে পলি বা রাসায়নিক থাকা চলবে না।
- তাপমাত্রা বাড়লে অক্সিজেনের চাহিদা দ্রুত বাড়ে, আর চাপে থাকা মাছ বিশ্রামরত মাছের চেয়ে অনেক বেশি অক্সিজেন খরচ করে; তাই মাছকে শান্ত ও ছায়ায় রাখতে হয় এবং রাতে বা ভোরের ঠান্ডা সময়ে পরিবহন করা ভালো।
- পথে থামা হওয়া উচিত সংক্ষিপ্ত, বড়জোর প্রায় ১৫ মিনিট; দীর্ঘ বিরতিতে মাছ অস্থির হলে পানি বদলানো যায়।
- গন্তব্যে পৌঁছে মাছকে ধীরে ধীরে নতুন পানির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হয়; তাপমাত্রার প্রতি ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পার্থক্যের জন্য অন্তত ২০ মিনিট সময় দিতে হয়।
এফএওর পুরোনো একটি পর্যালোচনা, আর. বেরকার দ্য ট্রান্সপোর্ট অব লাইভ ফিশ (ইআইএফএসি টেকনিক্যাল পেপার ৪৮, ১৯৮৬), একই কথা আরও স্পষ্ট করে বলে: মাছ পরিবহনে একক সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পানিতে পর্যাপ্ত দ্রবীভূত অক্সিজেন। সেখানে বলা হয়েছে, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে অক্সিজেনের চাহিদা মোটামুটি দ্বিগুণ হয়, আর পরিবহনের আগে মাছকে না খাওয়ালে তার অক্সিজেনের চাহিদা ও পানিতে ছাড়া অ্যামোনিয়া দুটোই কমে।
এই নির্দেশনার আলোকে দেখলে রাজশাহীর ট্রাকে পথে পানি বদলানো আসলে অক্সিজেন কমে যাওয়া, অ্যামোনিয়া ও কার্বন ডাই-অক্সাইডে দূষিত পানি সরিয়ে নতুন পানি দেওয়ার উপায়। এফএওর সহায়িকা এটিও সতর্ক করে যে সন্দেহজনক অবস্থার বেশি মাছ নিয়ে মৃত্যুর বড় ঝুঁকি নেওয়ার চেয়ে অল্প সংখ্যক সুস্থ মাছ পরিবহন করা ভালো। এফএওর এসব অঙ্ক সাধারণ নির্দেশনা; জীবন্ত মাছ পাঠাতে চাইলে চাষিরা মৎস্য অধিদপ্তরের উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কাছ থেকে পরামর্শ নিতে পারেন।
জীবন্ত মাছের দাম বেশি কেন: টাটকা মাছ, ফরমালিন ও আইন
প্রতিবেদনে বলা বাড়তি দামের পেছনে আছে আস্থা। প্রতিবেদনের ভাষায়, জীবন্ত মাছ ক্রেতাদের ফরমালিনমুক্ত মাছ কেনার সুযোগ দিচ্ছিল। খাবার সংরক্ষণে ফরমালিনের অপব্যবহার ঠেকাতে বাংলাদেশ আইনও করেছিল। ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৫ (২০১৫ সালের ৫ নম্বর আইন) ফরমালিনের আমদানি, উৎপাদন, পরিবহন, মজুত, বিক্রি ও ব্যবহারকে লাইসেন্সের আওতায় আনে; ২০১৫ সালের এপ্রিলের একটি সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনে ৫ এপ্রিল ২০১৫ থেকে আইনটি কার্যকর হওয়ার তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
প্রতিবেদনের এক বছর আগে, ২০২০ সালের নভেম্বরে জাতীয় সংসদে মৎস্য ও মৎস্যপণ্য (পরিদর্শন ও মান নিয়ন্ত্রণ) বিল, ২০২০ পাস হয়, যা একই বিষয়ের ১৯৮৩ সালের আইনের জায়গা নেয়। দেশ রূপান্তর ২০২০ সালের ১৬ নভেম্বর জানায়, এতে মাছ ও মৎস্যপণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিকের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয় এবং নিরাপদ মাছ উৎপাদন নিশ্চিত করতে মাছচাষিদের নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা হয়।
টাটকা ও বরফ দেওয়া রুইজাতীয় মাছের দামের পার্থক্য শুধু বাংলাদেশের বিষয় নয়। রুই মাছ নিয়ে এফএওর ২০০৯ সালের তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, এই মাছ বেশির ভাগই স্থানীয় বাজারে টাটকা অবস্থায় বিক্রি হয়, আর স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত টাটকা মাছ বরফ দেওয়া মাছের চেয়ে প্রায় দেড় গুণ দাম পায়। রাজশাহীর ক্ষেত্রে ২০২১ সালে কেজিপ্রতি যে প্রায় ১০০ টাকা বাড়তি দামের কথা বলা হয়েছিল, সেটিই ট্রাক ভাড়া ও পথে পানি বদলের খরচকে সার্থক করে তুলছিল।
রুই ও অন্যান্য রুইজাতীয় মাছ
জে. কে. জেনার লেখা এফএওর তথ্যপত্র অনুযায়ী, রুই (Labeo rohita) কার্প পরিবারের একটি স্বাদুপানির মাছ, যার আদি বাস উত্তর ও মধ্য ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নদীগুলোতে। প্রাপ্তবয়স্ক রুই মূলত পানির মাঝের স্তরে খাবার খোঁজা উদ্ভিদভোজী মাছ, যা শেওলা ও নিমজ্জিত জলজ উদ্ভিদ পছন্দ করে। ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচের তাপমাত্রায় এই মাছ ভালো বাড়ে না।
এফএওর তথ্যপত্রে বলা হয়েছে, চাষের পুকুরে রুই এক বছরে প্রায় ৩৫ থেকে ৪৫ সেন্টিমিটার লম্বা ও ৭০০ থেকে ৮০০ গ্রাম ওজনের হয়, আর ১২ থেকে ১৮ মাসে বিক্রির উপযোগী ১ থেকে দেড় কেজি ওজনে পৌঁছায়। কাতলা ও মৃগেলের সঙ্গে তিন প্রজাতির ভারতীয় মেজর কার্পের মিশ্রচাষে রুই প্রধান মাছ, আর সাধারণত অন্য দুটির চেয়ে বেশি অনুপাতে ছাড়া হয়। পুকুর থেকে মাছ ধরতে সাধারণত টানা জাল ব্যবহার করা হয়।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, বাংলাদেশে ভারতীয় মেজর কার্পের মধ্যে রুই সবচেয়ে বড়, প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার পর্যন্ত হয়; কাতলা (৩৮ থেকে ৪৬ সেন্টিমিটার) ও মৃগেলও (৫০ থেকে ৮০ সেন্টিমিটার) দেশজুড়ে পাওয়া যায়। পরে বিদেশি কার্প যুক্ত হয়: আঁইশযুক্ত কমন কার্প ১৯৬০ সালে চীন থেকে, মিরর কার্প ১৯৭৯ সালে নেপাল থেকে এবং বিগহেড কার্প ১৯৮১ সালে নেপাল থেকে আনা হয়।

দেশের খাদ্য সরবরাহে চাষের মাছ
রাজশাহীর জীবন্ত মাছের ট্রাক ছিল চাষের মাছের দিকে দেশের বড় পরিবর্তনেরই অংশ। মৎস্য অধিদপ্তরের ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ ২০১৯-২০ অনুযায়ী, যা দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২১ সালের ৭ নভেম্বর প্রকাশ করে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে দেশে ৪৫ লাখ ৩ হাজার টন মাছ উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে চাষের মাছ ২৫ লাখ ৮৪ হাজার টন, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ের মাছ ১২ লাখ ৪৮ হাজার টন এবং সামুদ্রিক মাছ ৬ লাখ ৭১ হাজার টন; মোট উৎপাদনের ৫৭.৩৮ শতাংশই ছিল চাষের মাছ।
একই প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১০-১১ থেকে ২০১৯-২০ পর্যন্ত এক দশকে মুক্ত জলাশয় বা সামুদ্রিক মাছের চেয়ে চাষের মাছের উৎপাদন অনেক দ্রুত বেড়েছিল। মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণ দাঁড়িয়েছিল ৬২.৫৮ গ্রামে, যা লক্ষ্যমাত্রা ৬০ গ্রামের চেয়ে বেশি, আর দেশের মানুষের প্রাণিজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ আসছিল মাছ থেকে।
উদ্ধৃত হিসাব অনুযায়ী, মৎস্য খাত দেশের মোট দেশজ উৎপাদনে (জিডিপি) ৩.৫২ শতাংশ এবং কৃষি জিডিপিতে ২৬.৩৭ শতাংশ অবদান রাখছিল। এফএওর দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২০-এর বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ আহরণে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় এবং চাষের মাছ উৎপাদনে পঞ্চম।
এই জাতীয় চিত্রের পাশে রাজশাহীর বাণিজ্য দেখিয়েছিল, পুকুরে চাষ করা উদ্বৃত্ত রুইজাতীয় মাছ নিয়ে একটি জেলা কীভাবে দূরের শহরের ক্রেতার কাছে পৌঁছাতে পারে। ২০২১ সালের নভেম্বরের প্রতিবেদনের যুক্তি ছিল সরল: জীবন্ত মাছের বাড়তি দাম যতক্ষণ ট্রাক ও পানির খরচের চেয়ে বেশি থাকে, ততক্ষণ মাছ জীবন্ত পাঠানো চাষির জন্য লাভজনক, আর উন্নত সুবিধার ট্রাক সেই লাভ আরও বাড়াতে পারে।
ছবি: খালিদ মাহমুদ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ (নিজস্ব প্রতিবেদক), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, প্রথম আলো, দেশ রূপান্তর, মৎস্য অধিদপ্তর (ইয়ারবুক অব ফিশারিজ স্ট্যাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ ২০১৯-২০), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), বাংলাপিডিয়া, বাংলাদেশ সরকারি মুদ্রণালয়





মন্তব্য
(০)