দূর থেকে শুঁটকি তৈরির এই কর্মযজ্ঞকে নিছক মাছ শুকানোর কাজ মনে হতে পারে। কিন্তু প্রতিটি মাচার পেছনে রয়েছে একেকটি পরিবারের গল্প। কারও জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক দশকের অভিজ্ঞতা, কারও কাছে এটি বংশপরম্পরায় পাওয়া পেশা, আবার কারও কাছে বেঁচে থাকার শেষ অবলম্বন। উপকূলের হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা এভাবেই জড়িয়ে আছে শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে।
ছোটবেলা থেকেই শুঁটকি তৈরির কাজ শিখেছেন পটুয়াখালীর কলাপাড়ার বাসিন্দা মোতাহার হোসেন। বাবা-চাচাদের কাছেই তার এই পেশার হাতেখড়ি। দেখতে দেখতে বয়স পঞ্চাশ পেরিয়েছে। জীবনের দীর্ঘসময় কেটেছে মাছ বাছাই, পরিষ্কার, শুকানো, সংরক্ষণ ও বিক্রির নানা কাজে। তার কাছে শুঁটকি কেবল ব্যবসা নয়, শৈশব থেকে দেখে আসা জীবনেরই একটি অংশ। পরিবারের বড়দের কাজ করতে দেখেই এই পেশার সঙ্গে পরিচয়। পরে সেই পরিচয়ই হয়ে উঠেছে জীবিকার পথ।
দীর্ঘ এই কর্মজীবনে অনেক উত্থান-পতন দেখেছেন মোতাহার। কখনো ঘূর্ণিঝড়, কখনো বন্যা, কখনো বৈরী আবহাওয়া; আবার কখনো করোনা ভাইরাসের মহামারি কিংবা অর্থনৈতিক সংকট। দেশজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ও ব্যবসা ও কাজের ওপর প্রভাব পড়েছে। প্রতিটি সংকটই নতুন করে ভাবিয়েছে—কীভাবে কাজ চালিয়ে নেওয়া যায়, কীভাবে শ্রমিকদের ধরে রাখা যায়, কীভাবে সংসারের খরচ মেটানো যায়। তবু পেশাটি ছাড়েননি তিনি। কারণ এই কাজের সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, পরিচিত পরিবেশ এবং পরিবারের জীবনযাপনের হিসাব।
কুয়াকাটার হাবিবুর রহমানের জীবনেও শুঁটকি একইভাবে জড়িয়ে আছে। প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এই পেশার সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘসময়ের অভিজ্ঞতায় দেখেছেন, শুঁটকির ব্যবসা শুধু মাছ কেনাবেচার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জেলে, মাছ বাছাইকারী, পরিষ্কারকর্মী, শুকানোর কাজে নিয়োজিত শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, পাইকার ও খুচরা বিক্রেতাসহ বহু মানুষের জীবিকা। তার নিজের সংসারও এই ব্যবসার আয়ের ওপর নির্ভরশীল। খেয়ে-পরে বেঁচে থাকা, পরিবারের খরচ চালানো এবং জীবনের প্রয়োজন মেটাতে আজও শুঁটকিই তার ভরসা।
মোতাহার ও হাবিবুর উপকূলের অসংখ্য মানুষের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। তাদের কারও জীবনের শুরু হয়েছে মাছের আড়ত কিংবা শুকানোর মাঠে, কেউ কাজ শিখেছেন পরিবারের কাছ থেকে, আবার কেউ অভাবের তাড়নায় যুক্ত হয়েছেন এই পেশায়। জীবনের প্রয়োজনেই তাদের দিনের বড় অংশ কাটে মাছের সঙ্গে। মাছের মৌসুম, আবহাওয়া আর বাজারদরের ওঠানামার ওপর নির্ভর করে তাদের আয়-রোজগার।
মৌসুমের অপেক্ষায় উপকূল
বাংলাদেশে শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে সমুদ্র উপকূল, নদীর মোহনা, দ্বীপ ও চরাঞ্চলের মানুষের জীবন গভীরভাবে সম্পর্কিত। বিশেষ করে কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, নোয়াখালী, ভোলা, পটুয়াখালী, বরগুনা ও খুলনার উপকূলীয় অঞ্চলে বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ শুকিয়ে শুঁটকি তৈরি করা হয়। কক্সবাজারের নাজিরারটেক, মহেশখালীর সোনাদিয়া, পটুয়াখালীর রাঙ্গাবালী ও কুয়াকাটা, বরগুনার পাথরঘাটা এবং সুন্দরবনসংলগ্ন দুবলার চর শুঁটকি উৎপাদনের পরিচিত এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম।
তবে সব অঞ্চলে উৎপাদনের ধরন কিংবা মৌসুম এক নয়। মাছের প্রাপ্যতা, স্থানীয় আবহাওয়া, জেলেদের মাছ ধরার সময় এবং বাজারের চাহিদার ওপর উৎপাদন নির্ভর করে। সাধারণত শুষ্ক মৌসুমে, বিশেষ করে বর্ষা কমে আসার পর থেকে শীতকাল পর্যন্ত অনেক উপকূলীয় এলাকায় শুঁটকি তৈরির কর্মযজ্ঞ বাড়ে। শীতকালেই শুঁটকিপাড়ায় কাজের চাপ বেশি থাকে। এ সময় রোদ ও তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত মাছ শুকানোর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। তবে মাছের ধরন ও এলাকার ওপর ভিত্তি করে সারাবছরই কোথাও না কোথাও শুঁটকি উৎপাদন চলে।
বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তরের মৎস্য পরিসংখ্যান বর্ষপঞ্জি এবং মৎস্য গবেষণা-সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শুঁটকি উৎপাদিত হয়। ২০২৩ সালের পরিসংখ্যানের বরাত দিয়ে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশে শুঁটকি উৎপাদনের পরিমাণ প্রায় ৭ লাখ ১০ হাজার মেট্রিক টন উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের শুঁটকি শিল্পে ঠিক কত মানুষ জীবিকা নির্বাহ করেন, তার নির্ভরযোগ্য জাতীয় হিসাব পাওয়া কঠিন। তবে বিভিন্ন গবেষণা ও সংবাদ প্রতিবেদন থেকে এ পেশার ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির চিত্র পাওয়া যায়। ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র অনুযায়ী, কক্সবাজারের নাজিরারটেকে শুঁটকির ভরা মৌসুমে প্রায় ২০ হাজার শ্রমিক কাজ করেন, যাদের অধিকাংশ নারী। অন্যদিকে ২০২৩ সালের একটি সংবাদ প্রতিবেদন অনুসারে, কুয়াকাটায় মৌসুমি শুঁটকি উৎপাদনে প্রায় ৭ থেকে ৮ হাজার শ্রমিক যুক্ত হন। এসব তথ্য থেকে বোঝা যায়, শুঁটকি উৎপাদন উপকূলের বহু মানুষের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
মৌসুম শুরু হলে উপকূলের অনেক এলাকায় কর্মচাঞ্চল্য বেড়ে যায়। জেলেদের জালে ধরা পড়া মাছ আসে আড়ত ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রে। এরপর শুরু হয় বাছাই, আকার অনুযায়ী আলাদা করা, পরিষ্কার, ধোয়া, লবণ মেশানো এবং শুকানোর কাজ। মাছের ধরন অনুযায়ী প্রস্তুতপ্রণালিও ভিন্ন হয়। কোনো মাছ অক্ষত অবস্থায় শুকানো হয়, কোনো মাছের পেট পরিষ্কার করতে হয়, আবার কোনো মাছ কেটে বা ফালি করে মাচায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মাছ ভালোভাবে শুকিয়ে গেলে তা বাছাই, প্যাকেটজাত ও সংরক্ষণ করা হয়। পরে পাইকারি ব্যবসায়ীদের হাত ধরে পৌঁছে যায় দেশের বিভিন্ন বাজারে।এই পুরো প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন হয় মানুষের শ্রম। মাছ ধরা থেকে শুরু করে ভোক্তার হাতে পৌঁছানো পর্যন্ত তৈরি হয় কাজের একটি বিস্তৃত শৃঙ্খল। ফলে শুঁটকি শিল্পের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি পরোক্ষভাবেও উপকূলের বহু মানুষ এই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভরশীল।
মাছের সঙ্গে যাদের দিনরাত
রাঙ্গাবালীর জেলে সালাউদ্দিন মিয়া জানান, শুঁটকি তৈরির মাঠে কাজের ধরন সহজ নয়। ভোর থেকে শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। মাছ আসার সঙ্গে সঙ্গে তা বাছাই করে আলাদা করতে হয়। পচনশীল মাছ দীর্ঘসময় ফেলে রাখা যায় না। তাই দ্রুত পরিষ্কার করে শুকানোর উপযোগী করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে মাছের আঁশ ছাড়ানো, নাড়িভুঁড়ি বের করা, মাথা বা অপ্রয়োজনীয় অংশ কেটে ফেলা এবং পরিষ্কার পানিতে ধোয়ার কাজ করতে হয়। এরপর বাঁশের মাচা, জাল কিংবা নির্দিষ্ট শুকানোর জায়গায় মাছ ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
রোদ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজের চাপও বাড়ে। মাছ যাতে সবদিকে সমানভাবে শুকায়, সে জন্য নির্দিষ্ট সময় পরপর উল্টে দিতে হয়। পাখি, কুকুর, বিড়াল, পোকামাকড় কিংবা ধুলাবালু থেকে মাছ রক্ষা করাও শ্রমিকদের দায়িত্বের অংশ। আবার হঠাৎ বৃষ্টি বা আকাশ মেঘলা হয়ে গেলে দ্রুত মাছ সরিয়ে নিরাপদ জায়গায় নেওয়ার তাগিদ তৈরি হয়। একটু অসতর্কতায় পুরো দিনের পরিশ্রম নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
কাজের পরিবেশও সব সময় স্বস্তিদায়ক নয়। মাছের গন্ধ, রোদ, ধুলাবালু, লবণাক্ত পানি ও দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে কিংবা বসে কাজ করার ক্লান্তি সহ্য করতে হয়। অনেক শ্রমিককে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ের চেয়ে বেশি সময় কাজ করতে হয়। বিশেষ করে মাছের সরবরাহ বেড়ে গেলে কিংবা আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে দ্রুত কাজ শেষ করার চাপ থাকে। কারণ মাছ শুকানোর জন্য উপযুক্ত রোদ যতক্ষণ পাওয়া যায়; ততক্ষণই তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
নারীর হাতেও গড়ে ওঠে শুঁটকির অর্থনীতি
শুঁটকি উৎপাদনের মাঠে নারীদের শ্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাছ বাছাই, পরিষ্কার, কাটা, ধোয়া, মাচায় ছড়িয়ে দেওয়া, উল্টে দেওয়া, শুকনো মাছ আলাদা করা এবং প্যাকেটজাত করার মতো বিভিন্ন কাজে তাদের অংশগ্রহণ রয়েছে। অনেক এলাকায় পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও দলবদ্ধভাবে এসব কাজ করেন। তাদের শ্রম ছাড়া অনেক প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্রের কাজ স্বাভাবিকভাবে চালানো সম্ভব নয়।
সংসারের কাজের পাশাপাশি কেউ কেউ শুঁটকির মাঠে কাজ করেন। দিনের উপার্জন দিয়ে সন্তানের পড়াশোনা, খাবার, চিকিৎসা কিংবা পরিবারের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেন। অনেক নারীর কাছে এই কাজ নিজস্ব আয় করার সুযোগ তৈরি করেছে। আবার অনেকের কাছে এটি পরিবারের অভাব সামাল দেওয়ার একটি অপরিহার্য পথ।
পাথরঘাটার লালদীয়া এলাকার নারী শ্রমিক রাহেলা বেগম এমনই একজন পরিশ্রমী শুঁটকি শ্রমিক। তিনি জানান, মাছ পরিষ্কারের কাজে দীর্ঘসময় হাত ভেজা থাকে। লবণাক্ত পানি ও মাছের সংস্পর্শে থাকা এবং খোলা জায়গায় রোদে কাজ করার মতো পরিস্থিতি তাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। কাজের পরিবেশ স্বাস্থ্যসম্মত না হলে ত্বকের সমস্যা, হাত-পায়ের অস্বস্তি কিংবা অন্যান্য শারীরিক জটিলতার ঝুঁকিও তৈরি হয়। আর এতসব প্রতিবন্ধকতাকে সঙ্গী করেই চলে শুঁটকি তৈরির কাজ। নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্ন কর্মক্ষেত্র, হাতমোজা ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী তাদের কাজকে নিরাপদ করতে পারে। যদিও শেষমেশ এই প্রয়োজন যেন অপ্রয়োজনের তালিকায় আটকে রেখে চলে প্রতিদিনের ব্যস্ততা।
শৈশবের বদলে শ্রমের বাস্তবতা
উপকূলীয় বিভিন্ন শুঁটকি উৎপাদন এলাকায় মাছ বাছাই, ছোট মাছ আলাদা করা, মাছ পরিষ্কার, ধোয়া, শুকানোর মাচায় মাছ ছড়িয়ে দেওয়া এবং শুকনো মাছ গুছিয়ে রাখার মতো কাজে শিশুদের যুক্ত থাকতে দেখা যায়। বিশেষ করে দরিদ্র জেলে ও শ্রমজীবী পরিবারের শিশুরা পরিবারের সদস্যদের সহযোগিতা করতে গিয়ে এসব কাজে অংশ নেয়। দেখা যায়, ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সী কোনো শিশু বিদ্যালয়ের ছুটির দিনে কিংবা পড়াশোনার পাশাপাশি মাছ বাছাই ও শুকনো মাছ গুছিয়ে রাখার কাজ করে।
একাধিক শুঁটকিপল্লিতে সরেজমিনে দেখা যায়, শৈশবের যে সময়টুকু বই, খেলা ও স্বপ্নে কাটার কথা, সেই সময়টুকু মাছের গন্ধমাখা কর্মক্ষেত্রে কাটে শত শত শিশুর। এতে ওদের ভবিষ্যৎ জীবনের সম্ভাবনাও সংকুচিত হয়। তবুও শিশুরা কাজে জড়ায়। হাত বাড়ায় আয়ের পথে। অভাবী পরিবারের কাছে শিশুর এই অংশগ্রহণ কখনো পারিবারিক সহযোগিতা হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু এই সহযোগিতা একসময় নিয়মিত শ্রমে পরিণত হয়। শেষমেশ শিশুটির পড়ালেখা, বিশ্রাম ও স্বাভাবিক বেড়ে ওঠার পথে বাধা সৃষ্টি হয়; তখন তা উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
প্রকৃতির সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই
শুঁটকি উৎপাদনের সবচেয়ে বড় নির্ভরতার জায়গাগুলোর একটি হলো আবহাওয়া। মাছ শুকানোর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত রোদ, অনুকূল তাপমাত্রা এবং তুলনামূলক কম আর্দ্রতা। কিন্তু উপকূলের আবহাওয়া সব সময় পূর্বানুমান অনুযায়ী চলে না। হঠাৎ বৃষ্টি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস কিংবা দীর্ঘস্থায়ী মেঘলা আবহাওয়া উৎপাদন ব্যাহত করতে পারে। বিশেষ করে খোলা জায়গায় মাছ শুকানো হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকি আরও বেশি।
একটি দুর্যোগে শুধু ব্যবসায়ীর মাছ নষ্ট হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হন মাছ বাছাইকারী, পরিষ্কারকর্মী, শুকানোর কাজে নিয়োজিত শ্রমিক, পরিবহনকর্মীসহ পুরো উৎপাদনশৃঙ্খলের মানুষ। মাছ নষ্ট হলে নতুন করে কাজের সুযোগ কমে যায়। কখনো কয়েক দিনের কর্মহীনতা একটি পরিবারের পুরো মাসের হিসাব এলোমেলো করে দেয়।
করোনাকালেও এ পেশার মানুষকে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে। বাজার ও পরিবহনব্যবস্থার বিঘ্ন, ক্রেতার সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ব্যবসা ও শ্রমের ওপর প্রভাব ফেলেছে। আবার মাছের দাম বেড়ে যাওয়া, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি এবং বাজারে চাহিদার ওঠানামাও তাদের জীবিকাকে অনিশ্চিত করে তোলে। ফলে শুঁটকি উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত মানুষদের জীবন শুধু মাছের মৌসুমের ওপর নয়, দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপরও নির্ভরশীল।
শ্রম আছে, অনিশ্চয়তাও আছে
দুবলার চরের শুঁটকি ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন বলেন, 'শুঁটকি উৎপাদনে যুক্ত শ্রমিকদের বড় একটি অংশের জীবন নির্ভর করে দৈনিক বা মৌসুমি কাজের ওপর। কাজ থাকলে আয় হয়, কাজ কমে গেলে আয়ও কমে যায়। অনেক ক্ষেত্রে কাজের স্থায়িত্ব, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, ন্যায্য মজুরি, স্বাস্থ্যসুরক্ষা কিংবা সামাজিক নিরাপত্তার সুযোগ সীমিত থাকে। অসুস্থ হলে কিংবা দুর্যোগে কাজ বন্ধ হয়ে গেলে বন্ধ হয়ে যায় পরিবারের আয়। বিকল্প আয়ের পথও সবার জন্য সহজলভ্য নয়।'
জানা যায়, শুঁটকিপল্লি ও কাজের চাপ ভেদে শুঁটকি উৎপাদনে নিয়োজিত শ্রমিকদের দৈনিক কম-বেশি ১২ ঘণ্টা কাজ করতে হয়। একজন অভিজ্ঞ শ্রমিক দিনে ৫০০-৮০০ টাকা মজুরি পান। নারী ও পুরুষ শ্রমিকের মজুরিতে পার্থক্য আছে। নারীরা গড়ে ৩০০-৪০০ টাকা আয় করেন। আর মাত্র ২০০ টাকার বিনিময়ে কাজ করেন শুঁটকিপাড়ার শিশুরা। এরপর বৃষ্টিতে মাছ নষ্ট হলে শ্রমিকদের মজুরি পাওয়ার সম্ভাবনাও নড়বড়ে হয়ে যায়। অনিশ্চিত হয়ে যায় তাদের সঙ্গে মালিকপক্ষের ভবিষ্যৎ সম্পর্ক।
অন্যদিকে শুঁটকি ব্যবসায়ীদেরও রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। মাছ সংগ্রহের খরচ, শ্রমিকের মজুরি, পরিবহন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের ব্যয় সামলাতে হয়। মানসম্মত শুঁটকি উৎপাদনের জন্য পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রয়োজন। কিন্তু পর্যাপ্ত অবকাঠামো, নিরাপদ শুকানোর জায়গা, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা ও সহজ শর্তে ঋণ না থাকলে ছোট ব্যবসায়ীদের পক্ষে এসব ব্যবস্থা গড়ে তোলা কঠিন হয়ে পড়ে।
মাচার পাশে জমে থাকে জীবনের গল্প
শুঁটকি শুকানোর মাঠে ছড়িয়ে থাকা প্রতিটি মাছের পেছনে রয়েছে কারও না কারও শ্রম। একটি মাছ মাচায় ওঠার আগে কতগুলো হাতের স্পর্শ পায়, কত মানুষের সময় ও পরিশ্রম ব্যয় হয়—ভোক্তার কাছে পৌঁছানোর পর তার হিসাব আর দৃশ্যমান থাকে না। বাজারের দোকানে সাজানো শুঁটকি দেখে ক্রেতা হয়তো স্বাদ, দাম কিংবা মানের কথা ভাবেন; কিন্তু সেই শুঁটকির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের জীবনসংগ্রামের কথা খুব কমই ভাবেন।
মোতাহার হোসেনের জীবনের কয়েক দশক আর হাবিবুর রহমানের ৩০ বছরের কর্মযজ্ঞ সেই অদৃশ্য শ্রমেরই সাক্ষ্য বহন করে। তাদের মতো মানুষেরা প্রতিকূলতার মধ্যেও পেশাটি ধরে রেখেছেন। কেউ পূর্বপুরুষের কাছ থেকে পাওয়া কাজকে এগিয়ে নিচ্ছেন, কেউ সংসারের দায় মেটাতে প্রতিদিন মাছের মাঠে যাচ্ছেন। তাদের কাছে শুঁটকি উৎপাদন কোনো সাময়িক কাজ নয়; এটি জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এক বাস্তবতা।
উপকূলীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আলোকযাত্রার বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়ক মো. ইব্রাহীম ওয়াহীদ মনে করেন, 'শুঁটকি উৎপাদনকে আরও নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও লাভজনক করতে হলে শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ উন্নত করা জরুরি। পাশাপাশি নারী শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি, শিশুদের শ্রম থেকে সুরক্ষা, নিরাপদ পানির ব্যবস্থা, পরিচ্ছন্ন প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, দুর্যোগসহনশীল অবকাঠামো এবং শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে একদিকে যেমন মাছের অপচয় কমবে। অন্যদিকে শ্রমিক ও ব্যবসায়ীদের ক্ষতির ঝুঁকিও কমতে পারে।'
বাংলাদেশ সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ওয়ার্কার ফোরামের চেয়ারম্যান সুমন শিকদারের অভিমত, 'শুঁটকিপাড়ার শিশুদের শিক্ষা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করে পরিবারগুলোর বিকল্প আয় এবং প্রাপ্তবয়স্ক শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করা জরুরি। দারিদ্র্যের কারণে কোনো শিশুকে যেন জীবিকার প্রয়োজনে শৈশব বিসর্জন দিতে না হয়। সেই দায়িত্ব পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষেরও।'
উপকূলের বাতাসে মাছ শুকানোর গন্ধ যতদিন থাকবে; ততদিন এই মাচাগুলোতে মানুষের কর্মব্যস্ততাও দেখা যাবে। তবে শুধু উৎপাদন বাড়লেই এই শিল্পের সার্থকতা আসবে না। শুঁটকির সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর জীবনমান, শ্রমের মর্যাদা ও নিরাপত্তাও সমান গুরুত্ব পেতে হবে। কারণ শুঁটকির প্রতিটি স্তরে যেমন মাছের রূপ বদলায়; তেমনই প্রতিটি স্তরে জড়িয়ে থাকে মানুষের ঘাম, সময়, স্বপ্ন আর বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা।
শুঁটকি তাই কেবল রোদে শুকানো মাছ নয়; এটি উপকূলের মানুষের শ্রমে গড়ে ওঠা এক জীবন্ত অর্থনীতি। যার প্রতিটি মাচার নিচে লুকিয়ে আছে অসংখ্য জীবনের গল্প।



মন্তব্য
(০)