সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা৩২°মূলত পরিষ্কারআর্দ্রতা ৫৬%বাতাস ৬ কিমি/ঘ

মাগুরায় বরই চাষে বাড়ছে উৎপাদন ও বাজার চাহিদা

২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষে মাগুরা সদর উপজেলায় বালসুন্দরী, আপেল ও কাশ্মিরি জাতের বরই চাষে আগ্রহ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন কৃষকরা। অনুকূল আবহাওয়া, উপযোগী মাটি এবং বাজারে ভালো চাহিদার কারণে এ মৌসুমে লাভের আশা করছেন তারা।

মাগুরায় বরই চাষে বাড়ছে উৎপাদন ও বাজার চাহিদা
পরিবেশ

২০২৬ সালের জানুয়ারির শেষ ভাগে মাগুরা জেলার সদর উপজেলায় বরই চাষ নতুন করে সম্ভাবনার কথা শোনাচ্ছিল। বিশেষ করে বালসুন্দরী, আপেল ও কাশ্মিরি জাতের বরই চাষে আগ্রহ বাড়ায় কৃষকদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছিল। স্থানীয় কৃষকরা জানান, অনুকূল আবহাওয়া ও উপযোগী মাটির কারণে এ এলাকায় বরই চাষ দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে; ভালো ফলন ও বাজারে চাহিদা থাকায় চলতি শীত মৌসুমে তারা লাভের প্রত্যাশা করছিলেন।

মাগুরার মাঠে বরইয়ের বাগান


সদর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, মিশ্র ফলের বাগানগুলোতে বরইয়ের পাশাপাশি আম, তরমুজ ও শীতকালীন সবজি বেগুন, ফুলকপি ও আলুর চাষ হচ্ছে। শীতের এই সময়ে বাগানজুড়ে ঝুলছিল পাকা বরই। কৃষকরা বলছিলেন, একই জমিতে একাধিক ফসল তোলার এই ধরন তাদের ঝুঁকি কমিয়ে আয়ের উৎস বাড়িয়ে দিয়েছে।

সদর উপজেলার মিঠাপুর গ্রামের কৃষক মো. পিকুল হোসেন জানান, এলাকার মাটি বরই চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘বালসুন্দরী ও আপেল বরইয়ের বাজার চাহিদা অনেক। খরচ বাদ দিয়েও এবার ভালো লাভ হবে বলে আশা করছি। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার পাইকাররা আগেই যোগাযোগ করছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘উন্নত জাতের আপেল বরই গাছ ছোট হলেও ফলন বেশি দেয়। আগে যারা বরই চাষে আগ্রহী ছিলেন না, তারাও এখন লাভ দেখে চাষে ঝুঁকছেন।’

রাউতাড়া গ্রামের কৃষক শওকত হোসেন বলেন, ‘বরই চাষে খরচ তুলনামূলক কম, অথচ লাভ ভালো।’ তিনি জানান, বরইয়ের পাশাপাশি ড্রাগন ফল, তরমুজ ও শীতকালীন সবজি চাষও তার পরিবারের আয়ের বড় উৎস হয়ে উঠেছে। খরচ, লাভ ও বাজার চাহিদা নিয়ে কৃষকদের এই বক্তব্য তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে বলা; এটি কোনো সরকারি হিসাব নয়।

বরই: পরিচিতি ও পুষ্টিগুণ


বরই বা কুল বাংলাদেশের একটি জনপ্রিয় ফল। উদ্ভিদবিজ্ঞানে এটি Ziziphus mauritiana নামে পরিচিত, যাকে ইংরেজিতে ইন্ডিয়ান জুজুব বা ‘বের’ বলা হয়। এটি Rhamnaceae বা বাকথর্ন পরিবারের একটি কাঁটাযুক্ত, চিরসবুজ ছোট গাছ বা গুল্ম। বাংলাপিডিয়া ও উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিবরণ অনুযায়ী, এই প্রজাতির আদি নিবাস দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ চীন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্য ও পশ্চিম আফ্রিকা। পরে তা আমেরিকার গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলসহ পৃথিবীর বহু অংশে ছড়িয়ে পড়েছে।

গাছটি দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং উপযুক্ত পরিবেশে ১০ থেকে ১২ মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে; কাণ্ডের ব্যাস হয় প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার। এর শাখা নিচের দিকে ঝুলে পড়ে এবং অনেক জাতে ধারালো কাঁটা থাকে, যদিও কিছু উন্নত জাত কাঁটাবিহীন। খরা সহ্য করার ক্ষমতা গাছটির বড় বৈশিষ্ট্য; গভীরে নামা শিকড় শুষ্ক পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে। পাতা পর্যায়ক্রমিক, ডিম্বাকার বা আয়তাকার, অগ্রভাগ গোলাকার এবং বৃন্ত থেকে বেরিয়ে আসা তিনটি প্রধান শিরা থাকে; পাতার উপরিভাগ গাঢ় সবুজ ও মসৃণ, নিচের দিক রোমশ।

ফল ডিম্বাকার বা গোলাকার, লম্বায় আড়াই থেকে ছয় সেন্টিমিটার পর্যন্ত হতে পারে; কাঁচা অবস্থায় হালকা সবুজ ও শাঁস সাদা-মচমচে, স্বাদ পানসে বা সামান্য টক-মিষ্টি। পাকলে ফল হলুদ থেকে লালচে বাদামি রং ধারণ করে, শাঁস নরম, রসালো ও কিছুটা ময়দাভাব হয় এবং খোসা কুঁচকে যায়; স্বাদ হয় টক-মিষ্টি। প্রতিটি ফলের ভেতরে একটি শক্ত আঁটি থাকে, যার মধ্যে এক বা দুটি লালচে-বাদামি বীজ থাকে।

পুষ্টিমানের দিক থেকে বরই সমৃদ্ধ। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বরইয়ে প্রায় ৮৫.৯ শতাংশ পানি, ০.৮ শতাংশ আমিষ, ১২.৮ শতাংশ শর্করা এবং সামান্য পরিমাণ ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ও লৌহ থাকে; প্রতি ১০০ গ্রাম খাদ্যোপযোগী অংশ থেকে মেলে প্রায় ৫৫ কিলোক্যালরি এবং ৫০ থেকে ১৫০ মিলিগ্রাম ভিটামিন সি। ভিটামিন সি-র পরিমাণে বরই পেয়ারার পরেই উল্লেখযোগ্য; লেবুজাতীয় ফল বা আপেলের চেয়ে এতে ভিটামিন সি বেশি থাকে। কাঁচা বা পাকা দুভাবেই বরই খাওয়া যায় এবং এ থেকে জ্যাম, জেলি, আচার ও চাটনি তৈরি হয়।

গাছে ধরে থাকা পাকা বরই (কুল)। ছবি: মৌচুমী / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
গাছে ধরে থাকা পাকা বরই (কুল)। ছবি: মৌচুমী / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

ফুল ও পরাগায়ন


বরই গাছের ফুল আকারে ছোট, হলুদ এবং পাঁচ পাপড়িবিশিষ্ট; পাতার কক্ষে এরা জন্মায়। জাতভেদে ফুল ভোরে বা দিনের শেষভাগে পুরোপুরি ফোটে। উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিবরণ অনুযায়ী, ফুলের গন্ধ ও মধুর টানে পোকামাকড় এসে পরাগায়ন ঘটায়; মৌমাছি, বোলতা ও মাছি এ কাজে ভূমিকা রাখে। বরইয়ের ফুল প্রোটোঅ্যান্ড্রাস ধরনের, অর্থাৎ পুরুষ ও স্ত্রী অংশ ভিন্ন সময়ে পরিণত হয়, তাই গাছ সহজে নিজের ফুলে নিজে পরাগায়িত হতে পারে না; এ কারণে ভালো ফল ধরার জন্য পরাগায়নকারী পোকার উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।

এই বৈশিষ্ট্যের কারণে বাগানের আশপাশে পরাগায়নকারী পোকার উপযোগী পরিবেশ রাখা ফল ধরার হারকে প্রভাবিত করে। একই কারণে একাধিক জাত পাশাপাশি থাকলে অনেক সময় পরস্পরের পরাগায়নে ফল ভালো ধরে বলে বিবরণে উল্লেখ আছে।

জাত ও বৈচিত্র্য


বরই Zizyphus গণের অন্তর্ভুক্ত, যেখানে প্রায় ৪০টি প্রজাতি রয়েছে। এর মধ্যে চাষযোগ্য দুটি প্রধান প্রজাতি হলো Z. mauritiana বা ইন্ডিয়ান জুজুব এবং Z. jujuba বা চাইনিজ জুজুব। বাংলাপিডিয়ার বিবরণ অনুযায়ী বাংলাদেশে জনপ্রিয় জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে বাউ কুল ১ ও ২, বারি কুল ১ ও ২, নারকেলি, সবজি ও আপেল কুল।

বাউ কুল ১ উদ্ভাবন করেছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্মপ্লাজম সেন্টার (জিপিসি)। বর্তমানে এটি দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় জাতগুলোর একটি এবং বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার লবণাক্ত এলাকা, সেন্ট মার্টিন, সোনাদিয়া ও কক্সবাজারের বালুময় এলাকা এবং খাগড়াছড়ি ও রাঙ্গামাটির পাহাড়ি এলাকায় পর্যন্ত চাষ হয়। এর ফলের ওজন ৯০ থেকে ২৫০ গ্রাম পর্যন্ত হয়, মিষ্টতা (টিএসএস) ১৮ থেকে ২১, বীজ খুব ছোট এবং গাছ কাঁটাবিহীন ও দ্রুতবর্ধনশীল, রোপণের ৪ থেকে ৫ মাসের মধ্যেই ফল দেয়।

বাউ কুল ২ বা শাহ কুলও জিপিসি-বাউয়ের উদ্ভাবন। এর ফলের ওজন ১০০ থেকে ২০০ গ্রাম, মিষ্টতা ১৯ থেকে ২৫ টিএসএস পর্যন্ত; গাছ খর্বাকৃতির এবং শাঁস মচমচে, রসালো ও সুমিষ্ট। আপেল কুল দেখতে আপেলের মতো আকর্ষণীয়, মচমচে ও মিষ্টি, দ্রুতবর্ধনশীল এবং এতে ফল ঝরে পড়ার হার কম। নারকেলি কুলের ফল টাকুর মতো লম্বাটে এবং সাতক্ষীরা, রাজশাহী ও আশপাশের এলাকা এর প্রধান উৎপাদন অঞ্চল; কুমিল্লার কাঁঠুয়া, বরুড়া ও চান্দিনায় যে জাত হয় তা স্থানীয়ভাবে ‘ডাব কুল’ নামে পরিচিত। মাগুরার কৃষকরা যে বালসুন্দরী, আপেল ও কাশ্মিরি জাতের কথা বলছিলেন, সেগুলো দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপকভাবে চাষ হওয়া বাণিজ্যিক জাত।

ভারতের থানেতে তোলা বরই (বের) ফলের ছবি। ছবি: Dinesh Valke / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
ভারতের থানেতে তোলা বরই (বের) ফলের ছবি। ছবি: Dinesh Valke / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)

চাষপদ্ধতি


বরই কঠিন পরিবেশেও টিকে থাকতে পারে এবং নানা ধরনের মাটিতেই জন্মায়, তবে পানি নিষ্কাশনের সুবিধাসম্পন্ন গভীর দোআঁশ বা উর্বর মাটি এর জন্য সবচেয়ে ভালো। সারা বছরই গাছ লাগানো গেলেও মার্চ থেকে মে মাস রোপণের উপযুক্ত সময়। সাধারণত নির্দিষ্ট দূরত্বে ৭৫ থেকে ১০০ সেন্টিমিটার ব্যাস ও গভীরতার গর্তে চারা রোপণ করা হয় এবং রোপণের আগে গর্তে পচা গোবরসহ জৈব সার ও প্রয়োজনীয় রাসায়নিক সার মিশিয়ে দেওয়া হয়। সারের সঠিক পরিমাণ ও সময়সূচির জন্য স্থানীয় উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া জরুরি, কারণ মাটির অবস্থা ও গাছের বয়স অনুযায়ী মাত্রা বদলায়।

বরইয়ের বংশবিস্তার বীজ ও অঙ্গজ, দুইভাবেই করা যায়। তবে উন্নত জাত টিকিয়ে রাখতে এখন কলম বা গ্রাফটিং পদ্ধতিই বেশি ব্যবহৃত হয়; বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী ক্লেফট গ্রাফটিং সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি, আর উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিবরণে রিং-বাডিং ও শিল্ড-বাডিংকে সফল উপায় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বীজের শক্ত খোসা থাকায় অঙ্কুরোদগমের আগে তা গরম বালিতে রেখে প্রক্রিয়াজাত করতে হয়।

বরইয়ের ফল সাধারণত নতুন গজানো ডালে ধরে, তাই নিয়মিত ছাঁটাই (প্রুনিং) খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণত মার্চের শেষে ফল সংগ্রহের পর তিন থেকে পাঁচ ফুট উচ্চতা রেখে ডালপালা ছেঁটে ফেলা হয় এবং কাটা অংশে আলকাতরা লাগিয়ে দেওয়া হয়, যাতে রোগ-সংক্রমণ কমে। পাউডারি মিলডিউ বা ফল পচা রোগ এড়াতে বাগানের কাছাকাছি বুনো বরই গাছ রাখতে নিষেধ করা হয়। সার দেওয়ার পর সেচ জরুরি; বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন ও খরায় হালকা সেচ দরকার হয়। গাছ রোপণের তিন বছরের মধ্যেই ফল দিতে শুরু করে।

পাতা ও ডালসহ বরই গাছ, ভারত। ছবি: Dinesh Valke / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
পাতা ও ডালসহ বরই গাছ, ভারত। ছবি: Dinesh Valke / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)

মাটি ও জলবায়ুর চাহিদা


বরই গাছ চরম তাপমাত্রা এবং শুষ্ক ও জলাবদ্ধ, উভয় পরিবেশই অনেকটা সহ্য করতে পারে। উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিবরণ অনুযায়ী, বছরে ১২৫ থেকে ২ হাজার ২২৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের বিস্তৃত পরিসরে গাছটি জন্মায়, তবে ৩০০ থেকে ৫০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাতের অপেক্ষাকৃত শুষ্ক এলাকায় এটি বেশি বিস্তৃত। গাছের টিকে থাকার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা প্রায় ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং সর্বোচ্চ প্রায় ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

বরই নানা ধরনের মাটিতেই টিকে থাকে, এমনকি ক্ষারীয় মাটিতেও (পিএইচ ৯.২ পর্যন্ত) জন্মাতে পারে বলে বিবরণে উল্লেখ আছে। তবে নিরপেক্ষ বা সামান্য ক্ষারীয় গভীর বেলে দোআঁশ থেকে দোআঁশ মাটি এর বৃদ্ধির জন্য সবচেয়ে উপযোগী। বাণিজ্যিক চাষ সাধারণত এক হাজার মিটার উচ্চতা পর্যন্ত লাভজনক হয়; এর বেশি উঁচুতে গাছ ভালো জন্মায় না। মাগুরার মতো নদীবিধৌত সমতল ও উর্বর অঞ্চলের মাটি এ কারণেই বরই চাষের অনুকূল।

সাথি ফসল ও মিশ্র বাগান


মাগুরার কৃষকরা যে একই জমিতে বরইয়ের সঙ্গে আম, তরমুজ, ড্রাগন ফল ও শীতকালীন সবজি তুলছিলেন, তা বরই চাষের একটি পরিচিত ও কার্যকর ধরন। বরই গাছের ফাঁকে সাথি ফসল হিসেবে আলু, মিষ্টি আলু, মরিচ, শাকসবজি, রসুন, আদা ও হলুদ চাষ করা যায়। গাছ ছোট থাকা অবস্থায় ফাঁকা জমি কাজে লাগিয়ে বাড়তি আয় করা সম্ভব হয়, আবার একাধিক ফসল থাকায় একটি ফসলে ক্ষতি হলেও সামগ্রিক ঝুঁকি কমে।

মিঠাপুর ও রাউতাড়ার কৃষকদের বক্তব্যেও এই চিত্র স্পষ্ট। তারা জানান, বরইয়ের পাশাপাশি তরমুজ ও শীতকালীন সবজি তাদের পরিবারের আয়ের বড় উৎস হয়ে উঠেছে; আপেল বরইয়ের মতো খর্বাকৃতির গাছ কম জায়গায় বেশি ফলন দেওয়ায় ছোট জমিতেও বাণিজ্যিক চাষ লাভজনক হচ্ছে বলে তারা মনে করছিলেন। মিশ্র বাগানের এই ধরন একদিকে জমির পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করে, অন্যদিকে বছরজুড়ে ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ফসল ওঠায় আয়ের ধারা অব্যাহত রাখে।

রোগবালাই ও ব্যবস্থাপনা


বরইয়ের সবচেয়ে বড় শত্রু ফল মাছি (ফ্রুট ফ্লাই); পরিণত পোকা পাকা ফলে আক্রমণ করে এবং লার্ভা ফলের ভেতর ঢুকে শাঁস নষ্ট করে। এছাড়া ফল ছিদ্রকারী পোকা, শ্যামলা পোকা (হোয়াইট ফ্লাই) ও লাক্ষা পোকার আক্রমণও হতে পারে। সম্প্রতি সুটি মোল্ড বা কালো ছত্রাক বরইয়ের একটি গুরুতর সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা পাতা কালো করে সালোকসংশ্লেষণে বাধা দেয়। পাউডারি মিলডিউ ও ফল পচা রোগও দেখা যায়।

পরিচ্ছন্ন বাগান, নিয়মিত ছাঁটাই, বর্ষার আগে-পরে সঠিক পরিচর্যা এবং আক্রান্ত ফল ও ডাল অপসারণ রোগবালাই নিয়ন্ত্রণের প্রাথমিক উপায়। বালাইনাশক কোন রোগে, কী মাত্রায় ও কখন ব্যবহার করতে হবে, তা মাটি, আবহাওয়া ও আক্রমণের ধরন অনুযায়ী বদলায়; তাই নির্দিষ্ট ওষুধ ও মাত্রার জন্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বা উদ্ভিদ সংরক্ষণ বিভাগের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ। অনুমোদিত মাত্রার বাইরে বালাইনাশক ব্যবহার ফল ও পরিবেশ দুইয়ের জন্যই ক্ষতিকর।

ফল ছাড়া বরই গাছের অন্যান্য ব্যবহার


বরই কেবল ফলের জন্যই উপযোগী নয়; গাছটির নানা অংশের বহুমুখী ব্যবহার আছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিবরণ অনুযায়ী, বরইয়ের পাতা উট, গরু ও ছাগলের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ফুল মৌমাছির মধু সংগ্রহের একটি উৎস; এ থেকে পাওয়া সোনালি-অ্যাম্বার রঙের মধুর স্বাদ কিছুটা মল্টের মতো। গাছের কাঠ শক্ত, মজবুত, মিহি দানাদার, টেকসই ও লালচে রঙের হওয়ায় নৌকার কাঠামো, কৃষি যন্ত্রপাতি ও জুতা তৈরিসহ নানা কাজে এবং জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বরই গাছে Tachardia lacca নামের পোকার সহায়তায় লাক্ষাও (লাক্ষারস) উৎপন্ন হয়। গ্রীষ্মমণ্ডলীয় আফ্রিকায় গাছের নমনীয় ডাল খড়ের ছাউনির চারপাশে বাঁধন হিসেবে এবং কাঁটাযুক্ত বেড়া তৈরিতে ব্যবহার করা হয় বলে উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিবরণে উল্লেখ আছে। অর্থাৎ ফল, জ্বালানি, পশুখাদ্য, মধু ও লাক্ষা, একাধিক দিক থেকেই গাছটি গ্রামীণ অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

মাগুরা জেলা: কৃষির ভূগোল


খুলনা বিভাগের মাগুরা জেলার আয়তন প্রায় ১ হাজার ৩৯ বর্গকিলোমিটার। উত্তরে রাজবাড়ী, দক্ষিণে যশোর ও নড়াইল, পূর্বে ফরিদপুর এবং পশ্চিমে ঝিনাইদহ জেলা দিয়ে এটি ঘেরা। জেলার প্রধান নদী গড়াই-মধুমতী, নবগঙ্গা ও কুমার। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী জেলার জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৯ লাখ ১৮ হাজার। মাগুরা মহকুমা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৪৫ সালে এবং ১৯৮৪ সালের ১ মার্চ এটি জেলায় উন্নীত হয়।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী মাগুরা জেলার আয়ের প্রায় ৬৬ শতাংশই আসে কৃষি থেকে; বাকি অংশ আসে বাণিজ্য (প্রায় ১২ শতাংশ), চাকরি, পরিবহন ও শিল্পসহ নানা খাত থেকে। এই চিত্রই বলে দেয়, এ অঞ্চলের অর্থনীতিতে কৃষিই মূল ভিত্তি। নদীবিধৌত এই অঞ্চলের উর্বর মাটি ও শীতের অনুকূল আবহাওয়া বরই, তরমুজ ও শীতকালীন সবজির মতো ফসলের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে, যা কৃষকদের মিশ্র ফলের বাগান গড়ে তুলতে উৎসাহিত করছে।

গড়াই নদী (কুষ্টিয়ার বড়বাজার ঘাটে তোলা); গড়াই-মধুমতী মাগুরা জেলার অন্যতম প্রধান নদী। ছবি: Anup Sadi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
গড়াই নদী (কুষ্টিয়ার বড়বাজার ঘাটে তোলা); গড়াই-মধুমতী মাগুরা জেলার অন্যতম প্রধান নদী। ছবি: Anup Sadi / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

ফলন, বাজার ও সম্ভাবনা


বরই মূলত শীতের ফল; পাকার সময় ফল হলুদ হয়ে আসে এবং ধাপে ধাপে সংগ্রহ করা হয়, যাতে পরিণত ফলই বাজারে যায়। সাধারণত হাত দিয়ে কয়েক দফায় ফল পাড়া হয় এবং সংগ্রহের পর তা যত্নে প্যাকেট করে দূরের বাজারে পাঠানো হয়। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে বরইয়ের হেক্টরপ্রতি ফলন সাধারণত ৮ থেকে ১২ টন। উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিবরণ অনুযায়ী উপযুক্ত বয়সে (১০ থেকে ২০ বছর) একটি গাছ বছরে ৮০ থেকে ২০০ কেজি পর্যন্ত ফল দিতে পারে, আর কলমের গাছে ফলের সংখ্যা আরও বেশি হয়।

বিশ্বজুড়ে বরইয়ের প্রধান উৎপাদন অঞ্চল ভারতের শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক এলাকা; এছাড়া পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামেও এটি চাষ হয়। উদ্ভিদবিজ্ঞানের বিবরণ অনুযায়ী উন্নত জাত ব্যবহারের ফলে ১৯৮৪ থেকে ১৯৯৫ সালের মধ্যে প্রায় ৮৮ হাজার হেক্টর জমিতে ৯ লাখ টন ফল উৎপন্ন হয়েছিল। ভারতে এই প্রজাতির ৯০টিরও বেশি জাত রয়েছে, যা বৃদ্ধির ধরন, পাতা, ফলের মৌসুম এবং ফলের আকার, রং ও স্বাদে একে অপরের থেকে আলাদা।

ভারতের বাগানগুলোতে সাধারণত মই বেয়ে হাতে দুই-তিন দফায় ফল পাড়া হয় এবং একজন শ্রমিক দিনে প্রায় ৫০ কেজি ফল সংগ্রহ করতে পারেন বলে বিবরণে উল্লেখ আছে। সংগ্রহের পর ফল কাপড়ে মুড়ে বস্তায় ভরে দূরের বাজারে পাঠানো হয়। নরম ও সহজে নষ্ট হওয়া ফল হওয়ায় বরই সংগ্রহ ও পরিবহনে যত্ন প্রয়োজন, যাতে বাজারে পৌঁছানোর আগে তা নষ্ট না হয়।

মাগুরার কৃষকদের বক্তব্যে বাজার চাহিদার ইতিবাচক চিত্রই ফুটে ওঠে। মিঠাপুরের পিকুল হোসেন জানান, বালসুন্দরী ও আপেল বরইয়ের চাহিদা বেশি এবং ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার পাইকাররা আগে থেকেই যোগাযোগ করছিলেন। তুলনামূলক কম খরচে ভালো লাভ পাওয়ার সম্ভাবনা এবং ছোট গাছে বেশি ফলনের সুযোগ আগ্রহী করে তুলছে নতুন চাষিদেরও। এই বক্তব্যগুলো কৃষকদের নিজস্ব প্রত্যাশা; প্রকৃত দাম ও লাভ মৌসুম ও বাজার পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে।

সব মিলিয়ে, নদীবিধৌত উর্বর মাটি, শীতের অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত ও খর্বাকৃতির জাত এবং মিশ্র ফলের বাগানের ধরন মাগুরায় বরই চাষকে একটি লাভজনক সম্ভাবনার জায়গায় নিয়ে যাচ্ছিল বলে কৃষকরা মনে করছিলেন।

ছবি: Ethel Aardvark / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাপিডিয়া (জুজুব ও মাগুরা জেলা), উইকিপিডিয়া (Ziziphus mauritiana)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

পরিবেশ

সম্পর্কিত খবর

বাংলাদেশ

AEZ-০৭: সক্রিয় ব্রহ্মপুত্র-যমুনা প্লাবনভূমি, যেখানে নদী জমি গড়ে আবার কেড়েও নেয়

নদীভাঙন, নতুন চর, বালু-পলির মাটি আর অনিশ্চিত বন্যার মৌসুম। কুড়িগ্রাম থেকে মানিকগঞ্জ পর্যন্ত প্রায় ৩ লাখ ১৯ হাজার হেক্টরের এই অঞ্চলে কৃষিকে টেকসই করতে দরকার জমিভিত্তিক তথ্য, উপগ্রহচিত্রের পর্যবেক্ষণ আর সময়মতো পরিকল্পনা।

তানিয়া চৌধুরী১ নভেম্বর ২০২৬১৩ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

বরেন্দ্রে বছরে ০.৬ মিটার পর্যন্ত নামছে পানির স্তর, সমন্বিত পানিনীতির দাবি

রাজশাহীতে নীতি সংলাপে বিশেষজ্ঞ ও জনপ্রতিনিধিরা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানি, খাল-বিল সংস্কার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও কম পানির ফসলের ওপর জোর দিয়েছেন।

বাসস১ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

দুই উৎসের বর্জ্য ঠেকালে হালদার ৮০ শতাংশ দূষণ কমতে পারে, বলছেন গবেষকেরা

অনন্যা আবাসিক এলাকা হয়ে আসা সিটি করপোরেশনের বর্জ্য আর বাহির সিগন্যাল শিল্প এলাকার বর্জ্য সামলাতে পারলে হালদার দূষণ অনেকটাই কমবে; এ বছর মা-মাছের ডিম মিলেছে প্রায় ৬ হাজার কেজি।

দৈনিক বাংলা১ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)