২০২৬ সালের ২১ জুন, রোববার, বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সাপ্তাহিক ধারণাগত পূর্বাভাসে জানানো হয়, ২১ থেকে ৩০ জুন আগামী ১০ দিনে দেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে সামগ্রিকভাবে ভারী বৃষ্টিপাতসহ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হতে পারে। এর ফলে আগামী সাত দিনে উত্তরের রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রাম জেলায় তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল এবং উত্তর-পূর্বের সিলেট ও সুনামগঞ্জ জেলায় সুরমা-কুশিয়ারা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাসে আশঙ্কা জানানো হয়। পাশাপাশি নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলায় ভুগাই-কংস ও সোমেশ্বরী নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে বলেও পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়।
১০ দিনের পূর্বাভাসে যা বলা হলো
পূর্বাভাসে বলা হয়, বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর, ভারত আবহাওয়া অধিদপ্তর এবং বৈশ্বিক আবহাওয়া সংস্থাসমূহের তথ্যের ভিত্তিতে ২১ থেকে ২৮ জুন অথবা সন্নিহিত সময়ে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রংপুর, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগ এবং তৎসংলগ্ন উজানে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম, ত্রিপুরা ও মেঘালয় প্রদেশে সামগ্রিকভাবে ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এসব স্থানে বিগত সাত দিন স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়েছে বলেও কেন্দ্র জানায়।
আগামী ১০ দিনে, অর্থাৎ ২১ থেকে ৩০ জুনের মধ্যে, বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল, উত্তর-পূর্বাঞ্চল ও তৎসংলগ্ন উজানে সামগ্রিকভাবে ভারী বৃষ্টিপাতসহ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি বৃষ্টি হতে পারে বলে পূর্বাভাসে বলা হয়। এ সময়ে স্থানভেদে সর্বোচ্চ ৩৫০ থেকে ৪০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হতে পারে বলে আশঙ্কা জানানো হয়। এটি ছিল পানি সমতল সম্পর্কিত একটি ধারণাগত সাপ্তাহিক পূর্বাভাস, যেখানে আগামী কয়েক দিনে নদীগুলোর পানির উচ্চতা কেমন হতে পারে, তার একটি সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরা হয়।
নদী অববাহিকা ধরে পরিস্থিতি
উত্তরাঞ্চলের নদী অববাহিকা, অর্থাৎ রংপুর বিভাগের ক্ষেত্রে পূর্বাভাসে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে। এই নদীগুলোর পানি সমতল আগামী সাত দিন সময়বিশেষে দ্রুত বৃদ্ধিসহ সামগ্রিকভাবে বাড়তে পারে। এ সময়ে নদীগুলো নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও রংপুর জেলায় বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে কেন্দ্র আশঙ্কা প্রকাশ করে।
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী অববাহিকা, অর্থাৎ সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগের ক্ষেত্রে পূর্বাভাসে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় সোমেশ্বরী, জিঞ্জিরাম ও ভুগাই নদীর পানি সমতল হ্রাস পেয়েছে, অন্যদিকে সারিগোয়াইন, যাদুকাটা ও কংস নদীর পানি সমতল বৃদ্ধি পেয়েছে। এই নদীগুলোর পানি সমতল আগামী সাত দিন সময়বিশেষে দ্রুত বৃদ্ধিসহ সামগ্রিকভাবে বাড়তে পারে। এ সময়ে ভুগাই-কংস ও সোমেশ্বরী নদী নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও শেরপুর জেলায় সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে এবং নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল কোথাও কোথাও সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে বলে কেন্দ্র জানায়।
পূর্বাঞ্চলীয় ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় নদী অববাহিকা, অর্থাৎ চট্টগ্রাম বিভাগের ক্ষেত্রে বলা হয়, গত ২৪ ঘণ্টায় মুহুরী ও হালদা নদীর পানি সমতল হ্রাস পেয়েছে, আর ফেনী, হালদা, সাঙ্গু, মাতামুহুরী, সেলোনিয়া ও গোমতী নদীর পানি সমতল স্থিতিশীল ছিল। এই নদীগুলোর পানি সমতলও আগামী সাত দিন সময়বিশেষে দ্রুত বৃদ্ধিসহ সামগ্রিকভাবে বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়। অর্থাৎ পূর্বাভাসে একসঙ্গে উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বের তিনটি নদী অববাহিকার পানি বাড়ার প্রবণতার কথা বলা হয়।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের বক্তব্য
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার উদয় রায়হান জাগো নিউজকে বলেন, বাংলাদেশে গত দুদিন ময়মনসিংহ ও সিলেট বিভাগে বেশি বৃষ্টিপাত হচ্ছে। একই সময়ে দেশের তৎসংলগ্ন উজানে ও মেঘালয়েও ভারী বৃষ্টিপাত হয়েছে এবং কিছু জায়গায় ৫০০ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর ফলে আগামী ১০ দিনে তিন বিভাগে স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে তিনি জানান।
তিনি আরও বলেন, ফ্ল্যাশ ফ্লাড বা পাহাড়ি ঢলও হতে পারে, তবে সেটি নির্ভর করবে বৃষ্টি কী পরিমাণে হচ্ছে তার ওপর। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে বলে তিনি জানান। উল্লেখ্য, পাহাড়ি ঢল বা আকস্মিক বন্যা সাধারণত উজানের পাহাড়ি এলাকায় অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টির কারণে সৃষ্টি হয়, যা দ্রুত নেমে এসে ভাটির নিম্নাঞ্চল হঠাৎ প্লাবিত করে এবং আবার তুলনামূলক দ্রুতই নেমে যায়।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র কী, বিপৎসীমা মানে কী
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীন একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, যা পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অংশ। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, কেন্দ্রটি ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এর সদর দপ্তর ঢাকায়। দেশজুড়ে কেন্দ্রের ১০৯টি পানি সমতল পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র এবং ৬১টি পূর্বাভাস কেন্দ্র রয়েছে। এসব কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন নদীর পানির উচ্চতা সংগ্রহ করে কেন্দ্রটি বন্যার পূর্বাভাস ও সতর্কবার্তা দিয়ে থাকে, যা বন্যা মোকাবিলায় সরকারি ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পূর্বাভাসে ব্যবহৃত বিপৎসীমা ও সতর্কসীমা দুটি গুরুত্বপূর্ণ ধারণা। প্রতিটি নদীর নির্দিষ্ট পরিমাপক স্থানে একটি নির্ধারিত পানির উচ্চতাকে বিপৎসীমা ধরা হয়; নদীর পানি এই উচ্চতার ওপরে উঠলে সংলগ্ন নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। সতর্কসীমা সাধারণত বিপৎসীমার কিছুটা নিচে থাকে এবং পানি সেই উচ্চতার দিকে এগোলে তা বাড়তি সতর্কতার বার্তা দেয়। এ কারণেই উত্তরের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীকে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে এবং উত্তর-পূর্বের ভুগাই-কংস ও সোমেশ্বরী নদীকে সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে বলে আলাদা করে উল্লেখ করা হয়।
ধারণাগত বা সম্ভাব্যতাভিত্তিক পূর্বাভাস বলতে বোঝানো হয়, কোনো নিশ্চিত ঘোষণা নয়, বরং আবহাওয়া ও উজানের পানির চলমান তথ্যের ভিত্তিতে সামনের কয়েক দিনে পরিস্থিতি কোন দিকে যেতে পারে তার একটি সম্ভাব্য চিত্র। বৃষ্টির পরিমাণ পরিবর্তিত হলে এই চিত্রও বদলে যেতে পারে, যে কারণে কেন্দ্র পরিস্থিতি অব্যাহতভাবে পর্যবেক্ষণের কথা বলে।
তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার: উত্তরের নদী
পূর্বাভাসে নাম আসা তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার তিনটিই সীমান্ত পেরিয়ে আসা নদী এবং শেষ পর্যন্ত ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ব্যবস্থায় মেশে। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, তিস্তা পূর্ব হিমালয়ের একটি নদী; এর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ৪১৪ কিলোমিটার, যার ৩০৫ কিলোমিটার ভারতে এবং ১০৯ কিলোমিটার বাংলাদেশে। নদীটি প্রায় ১২ হাজার ৫৪০ বর্গকিলোমিটার এলাকার পানি নিষ্কাশন করে। সিকিম ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে নদীটি বাংলাদেশের রংপুর বিভাগে প্রবেশ করে এবং লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার ওপর দিয়ে বয়ে ফুলছড়ি উপজেলার কাছে যমুনায় মেশে।
লালমনিরহাট জেলায় তিস্তা নদীর ওপর নির্মিত তিস্তা ব্যারাজ দেশের অন্যতম বড় সেচ প্রকল্প; এর নির্মাণকাজ শুরু হয় ১৯৭৯ সালে এবং শেষ হয় ১৯৯৭-৯৮ সালে। বর্ষায় তিস্তা দ্রুত ফুলেফেঁপে ওঠে এবং অতীতে এই নদী বাংলাদেশে একাধিকবার তীব্র বন্যার কারণ হয়েছে। উজানের পরিস্থিতিও ভাটিতে প্রভাব ফেলে; উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিকিমে একটি হিমবাহি হ্রদ ফেটে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় তিস্তার উজানের একটি জলবিদ্যুৎ বাঁধ ধ্বংস হয়েছিল।
ধরলা নদীর উৎসও হিমালয়ে; এটি সিকিম, ভুটান ও পশ্চিমবঙ্গ হয়ে লালমনিরহাট দিয়ে বাংলাদেশে ঢোকে এবং কুড়িগ্রামের কাছে যমুনায় মেশে। ধরলাকে ব্রহ্মপুত্রের উপনদী হিসেবে ধরা হয় এবং তিস্তার সঙ্গে এটিও জুন থেকে সেপ্টেম্বরের মৌসুমি বর্ষায় উত্তরাঞ্চলে বড় বন্যার জন্ম দেয়। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭ সালে ধরলা ও যমুনার ভাঙনে লালমনিরহাটে একটি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের প্রায় ২ কিলোমিটার অংশ, কয়েকটি উপাসনালয়, একটি মাদ্রাসা ও একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়সহ ফসলি জমি নদীতে বিলীন হয় এবং প্রায় ৩ হাজার মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েন। শুকনো মৌসুমে এই নদীগুলো ক্ষীণ হয়ে চর জেগে উঠলেও বর্ষায় সেগুলোই দ্রুত পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে।
কুড়িগ্রাম দেশের অন্যতম নদীবহুল জেলা। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, জেলার আয়তন প্রায় ২ হাজার ২৪৫ বর্গকিলোমিটার এবং ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২০ লাখ ৭০ হাজার। ব্রহ্মপুত্র, যা বাংলাদেশের ভেতরে যমুনা নামে পরিচিত, তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার, এই নদীগুলো জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। জেলার মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, পরিবারভিত্তিক আয়ের উৎসের প্রায় ৭০ দশমিক ৪ শতাংশই আসে কৃষি থেকে। এতগুলো বড় নদী ও অসংখ্য চর থাকায় কুড়িগ্রামের নিম্নাঞ্চল বর্ষায় সবচেয়ে আগে প্লাবিত হয়, তাই উত্তরের নদীর পানি বাড়ার যেকোনো পূর্বাভাস এ জেলার কৃষক ও চরবাসীর কাছে সরাসরি গুরুত্ব বহন করে।

সুরমা-কুশিয়ারা ও হাওরের দেশ
উত্তর-পূর্বাঞ্চলে পূর্বাভাসে নাম আসা সুরমা ও কুশিয়ারা দুটিই মেঘনা নদী ব্যবস্থার অংশ। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতে এই নদী বরাক নামে পরিচিত; মণিপুরের পাহাড়ে উৎপন্ন হয়ে এটি বাংলাদেশ সীমান্তে এসে উত্তরের সুরমা ও দক্ষিণের কুশিয়ারা, এই দুই ধারায় ভাগ হয়ে সিলেট অববাহিকায় প্রবেশ করে। সুরমার দৈর্ঘ্য প্রায় ২৪৯ কিলোমিটার; এটি সিলেট, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। মেঘালয়ের পাহাড় থেকে নামা উপনদীগুলো একে পানি জোগায়, আর ভৈরববাজারের ওপরে কিশোরগঞ্জে সুরমা ও কুশিয়ারা আবার মিলে মেঘনা নদীর রূপ নেয়।
এই অঞ্চল মূলত হাওরের দেশ। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, হাওর হলো উত্তর-পূর্ব বাংলাদেশের বাটির মতো বিশাল নিচু ভূমি, যেখানে নদী ও খালের পানি এসে জমা হয়। বৃহত্তর সিলেট ও বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলজুড়ে এমন প্রায় ৪৭টি বড় হাওর এবং প্রায় ৬ হাজার ৩০০ বিল রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৩ হাজার ৫০০ স্থায়ী ও প্রায় ২ হাজার ৮০০ মৌসুমি। বর্ষায় ভারতের পাহাড় থেকে নেমে আসা নদীর পানিতে হাওর এলাকা প্রায় ৬ মিটার পর্যন্ত গভীর পানিতে ডুবে যায় এবং এলাকা বছরে সাত থেকে আট মাস পানির নিচে থাকে; তখন গ্রামগুলোকে পানির মধ্যে ছোট দ্বীপের মতো দেখায়।
হাওরের নিচু জমিতে মূলত এক ফসল, অর্থাৎ বোরো ধান হয়; বর্ষার পানি নেমে গেলে উন্মুক্ত পলিমাটিতে এই ধান আবাদ করা হয়। এ কারণে বর্ষার শুরুতে অসময়ের ঢল বা পানি দ্রুত বাড়া হাওরের কৃষকের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের প্রবল বাতাসে হাওরে বড় বড় ঢেউ উঠে তীরের বসতবাড়ির ক্ষতি করতে পারে; আবার পানি নামার পর প্রান্তিক জমিতে বোরো আবাদ বাড়ায় অনেক জলাভূমি শুকিয়ে যাওয়ার প্রবণতাও দেখা দিয়েছে।
সুনামগঞ্জ এই হাওর অঞ্চলের কেন্দ্রস্থল। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, জেলার আয়তন প্রায় ৩ হাজার ৫২৬ বর্গকিলোমিটার এবং ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ২৩ লাখ ৭৫ হাজার। জেলার উত্তর সীমানায় ভারতের মেঘালয় রাজ্য; প্রধান নদী সুরমা, কুশিয়ারা, ধামালিয়া ও যাদুকাটা, আর পরিবারভিত্তিক আয়ের উৎসের প্রায় ৬৬ দশমিক ৯৯ শতাংশই আসে কৃষি থেকে। এতটা কৃষিনির্ভর ও এতগুলো হাওরের জেলায় বর্ষার শুরুতে নদীর পানি বাড়ার যেকোনো আগাম বার্তা তাই বিপুলসংখ্যক কৃষকের কাছে সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ।

মেঘালয়ের বৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি বুঝতে হলে উজানের মেঘালয়ের বৃষ্টির কথা না বললে চলে না। সীমান্তের ওপারে মেঘালয়ের খাসি পাহাড়ের চেরাপুঞ্জি ও মৌসিনরাম পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি বৃষ্টিপাতপ্রবণ এলাকাগুলোর অন্যতম। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, চেরাপুঞ্জিতে বছরে গড়ে প্রায় ১১ হাজার ৭৭৭ মিলিমিটার এবং মৌসিনরামে প্রায় ১১ হাজার ৮৭৩ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়। ১৮৬০ সালের আগস্ট থেকে ১৮৬১ সালের জুলাইয়ের মধ্যে চেরাপুঞ্জিতে প্রায় ২৬ হাজার ৪৬১ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড হয়েছিল, আর ১৮৬১ সালের জুলাই মাসেই পড়েছিল প্রায় ৯ হাজার ৩০০ মিলিমিটার, যা আজও মাসিক বৃষ্টিপাতের বিশ্ব রেকর্ড।
এই বৃষ্টির কারণ ভূপ্রকৃতিগত। বঙ্গোপসাগর থেকে আসা মৌসুমি বায়ু জলীয় বাষ্প বয়ে বাংলাদেশের সমতল প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পেরিয়ে খাসি পাহাড়ে ধাক্কা খায়। খাসি পাহাড় মাত্র কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই প্রায় ১ হাজার ৩৭০ মিটার উঁচুতে উঠে যাওয়ায় জলীয় বাষ্পভরা মেঘ হঠাৎ ওপরে উঠে ঠান্ডা হয়ে প্রবল বৃষ্টি ঝরায়। এই পাহাড়ি বৃষ্টিই খাড়া ঢাল বেয়ে দ্রুত নেমে সোমেশ্বরী, যাদুকাটা, ভুগাই ও কংসের মতো নদী দিয়ে বাংলাদেশের সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ ও শেরপুরের নিম্নাঞ্চলে ঢল হয়ে নামে।
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেশের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বের পাহাড়ি অববাহিকায় এভাবেই অনিশ্চিত আকস্মিক বন্যা হয়, যা হঠাৎ বাড়ে ও হঠাৎ কমে। এ কারণেই ২১ জুনের পূর্বাভাসে মেঘালয়ে ভারী বৃষ্টির কথা এবং পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কার কথা আলাদা করে উল্লেখ করা হয়। সোমেশ্বরী নদীর উৎসও এই মেঘালয়েই; উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, মেঘালয়ের নকরেক পর্বতশ্রেণিতে উৎপন্ন হয়ে এটি সিমসাং নামে পরিচিত, পরে সুসং দুর্গাপুর হয়ে নেত্রকোনায় প্রবেশ করে কংস নদীতে মেশে এবং গারো পাহাড় অঞ্চলের দীর্ঘতম ও বৃহত্তম নদী।

বাংলাদেশে বন্যার ধরন ও কারণ
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে মূলত তিন ধরনের বন্যা দেখা যায়। মৌসুমি বন্যা ধীরে ধীরে বাড়ে ও কমে এবং বিস্তীর্ণ এলাকা ডুবিয়ে দেয়; আকস্মিক বন্যা বা পাহাড়ি ঢল হঠাৎ বাড়ে ও হঠাৎ কমে এবং মূলত পাহাড়ি উপত্যকায় হয়; আর জোয়ারজনিত বন্যা স্বল্পস্থায়ী, সাধারণত ৩ থেকে ৬ মিটার উঁচু হয় এবং অভ্যন্তরীণ পানি নিষ্কাশনে বাধা দেয়। ২১ জুনের পূর্বাভাসে উত্তরের অববাহিকায় মৌসুমি ধরনের স্বল্পমেয়াদি বন্যা এবং উত্তর-পূর্বের পাহাড়ি ঢলের আশঙ্কা, দুটোই একসঙ্গে উঠে আসে।
বন্যার পেছনে একাধিক কারণ কাজ করে। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, দেশের নিচু ভূপ্রকৃতি, ঘন নদীজাল, উজানে ও হিমালয়ে বৃষ্টি ও বরফগলা পানি, নদীতে পলি জমা, একাধিক নদীর একসঙ্গে পানি বাড়া, জোয়ার ও বাতাসের ব্যাকওয়াটার প্রভাব এবং বাঁধ ও বেড়িবাঁধে নদীপথ সরু হয়ে যাওয়া বন্যা পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। ভৌগোলিকভাবে দেশের ভেতরে বন্যার চরিত্রও আলাদা; বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, উত্তরাঞ্চলে অপেক্ষাকৃত অগভীর কিন্তু বিস্তৃত বন্যা হয়, আর মেঘনা অববাহিকার কেন্দ্রস্থল সিলেট অবনমন বর্ষার শুরুতেই আগে ভরে যায় ও ধীরে ধীরে পানি নামে।
বর্ষা ও বাংলাদেশের বন্যা
বাংলাদেশে বন্যা মূলত বর্ষাকালের ঘটনা। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র-যমুনা ও মেঘনা, এই তিন প্রধান নদী ব্যবস্থা মে থেকে অক্টোবরের মধ্যে দেশে আসা বার্ষিক পানিপ্রবাহের প্রায় ৯৫ শতাংশ বহন করে। একই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে বৃষ্টিপাত থেকেই তৈরি হয় প্রায় ১৮ হাজার ৭০০ কোটি ঘনমিটার পানি। প্রতিবছর গড়ে দেশের প্রায় ২৬ হাজার বর্গকিলোমিটার, অর্থাৎ আয়তনের প্রায় ১৮ শতাংশ এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়; তীব্র বন্যায় তা ৫৫ শতাংশের বেশি হতে পারে। হিসাব অনুযায়ী, দেশে তীব্র বন্যা হয় মোটামুটি প্রতি সাত বছরে একবার।
ইতিহাসে বড় বন্যার উদাহরণও কম নয়। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৬৬ সালের বন্যায় ঢাকা ও সিলেট মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং প্রায় ১২ লাখ মানুষ আক্রান্ত হয়; ১৯৭৪ সালে ময়মনসিংহের প্রায় ১০ হাজার ৩৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকা প্লাবিত হয়েছিল। এই দুটিই ছিল এবারের পূর্বাভাসে নাম আসা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ঘটনা।
দেশজুড়ে সবচেয়ে বড় বন্যাগুলোর মধ্যে বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ১৯৮৭ সালে দেশের প্রায় ৫৭ হাজার ৩০০ বর্গকিলোমিটার, অর্থাৎ প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছিল; ১৯৮৮ সালে প্রায় ৮২ হাজার বর্গকিলোমিটার, অর্থাৎ প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা ডুবে গিয়েছিল এবং রাজধানী ঢাকাও মারাত্মকভাবে আক্রান্ত হয়; আর ১৯৯৮ সালে দেশের দুই-তৃতীয়াংশের বেশি এলাকা দুই মাসের বেশি সময় পানির নিচে ছিল, যাকে রেকর্ডে থাকা সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যা বলা হয়। অন্যদিকে ১৯৫৪ সালে যমুনা ও গঙ্গার পানি অস্বাভাবিক উচ্চতায় উঠেছিল। অর্থাৎ এই অঞ্চলে বর্ষার পানি বাড়া নতুন কিছু নয়, বরং প্রতিবছরের নিয়মিত বাস্তবতা।
ঠিক এই কারণেই বর্ষার শুরুতে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সাপ্তাহিক পূর্বাভাসের গুরুত্ব অনেক। আগেভাগে কোন অঞ্চলে পানি বাড়তে পারে তা জানা থাকলে কৃষক মাঠের পাকা বা আধপাকা ফসল আগেভাগে তুলে নিতে পারেন, গবাদিপশু উঁচু জায়গায় সরানো যায়, আর স্থানীয় প্রশাসন আশ্রয়কেন্দ্র ও ত্রাণের প্রস্তুতি নিতে পারে। ২১ জুনের এই পূর্বাভাসও ছিল সেই আগাম সতর্কতার অংশ, যেখানে উত্তর ও উত্তর-পূর্বের নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের মানুষকে সামনের কয়েক দিনের সম্ভাব্য পানি বাড়ার বিষয়ে সজাগ থাকার বার্তা দেওয়া হয়।
ছবি: ইব্রাহিম হোসেন মেরাজ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪; বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র; বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড; বাংলাপিডিয়া; উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)