২০১৯ সালের ৭ এপ্রিল, রোববার ভোরে কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারী উপজেলায় দুধকুমার নদে এক জেলের জালে ৪১ কেজি ৭০০ গ্রাম ওজনের একটি বাঘাইড় মাছ ধরা পড়ে। নদের সোনাহাট সেতুর কাছে রফিকুল ইসলাম নামের ওই জেলের জালে মাছটি আটকা পড়ে। পরে স্থানীয় লোকজনের কাছে মাছটি প্রতি কেজি ১ হাজার ১০০ টাকা দরে বিক্রি করা হয়। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ঘটনাটি নিশ্চিত করেন।
যেভাবে ধরা পড়ল মাছটি
ঢাকা ট্রিবিউন ও বাংলা ট্রিবিউনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মাছটি জালে আটকে যাওয়ার পর জেলেরা নিজেরা জাল টেনে তীরে তুলতে পারছিলেন না। পরে স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় মাছটি ডাঙায় তোলা হয়। বিডি২৪লাইভের প্রতিবেদনে মাছটির ওজন প্রায় ৪২ কেজি বলা হয়।
বড় মাছটি ধরতে পেরে জেলে রফিকুল ইসলাম খুশি বলে জানান। তিনি বলেন, মাছ ধরার জীবনে এই প্রথম এত বড় বাঘাইড় মাছ তাঁর জালে ধরা পড়েছে।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারাজুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, 'আমি জানার পরেও পরীক্ষায় দায়িত্ব পালনের কারণে মাছটি দেখতে পারিনি।'
মাছটি দেখতে ও কিনতে স্থানীয় লোকজন ভিড় করেন। এলাকাবাসী বলেন, শুকনো মৌসুমে দুধকুমার নদে এত বড় মাছ জেলেদের জালে ধরা পড়া আশ্চর্যের বিষয়।

দুধকুমার নদ
বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের রায়ডাক বা সংকোশ নদী পাটেশ্বরীর কাছে বাংলাদেশে ঢুকে দুধকুমার নাম নিয়েছে। পাটেশ্বরীতে গদাধর ও গঙ্গাধর নদী এর সঙ্গে মিলেছে। এরপর ৫২ কিলোমিটার দীর্ঘ আঁকাবাঁকা পথ পেরিয়ে নদটি কুড়িগ্রাম সদর উপজেলায় ব্রহ্মপুত্রে পড়েছে। দুধকুমারের মূল প্রবাহের বেশির ভাগ অংশই ভারতে। নদটিতে জোয়ার-ভাটার প্রভাব নেই, তবে প্রায়ই এর পানি পাড় উপচে পড়ে।
মহাবিপন্ন মাছ বাঘাইড়
বাঘাইড় বড় নদীর একটি শিকারি ক্যাটফিশ। আইইউসিএন বাংলাদেশের লাল তালিকায় এর বাংলা নাম বাঘাইড়, বাঘাড়ি ও বাঘ মাছ এবং ইংরেজি নাম গ্যাঞ্জেটিক গুঞ্চ ও ডেভিল ক্যাটফিশ লেখা হয়েছে। মাছটি স্রোতের পানি পছন্দ করে, বড় নদীর গভীর অংশে পাথর ও ডুবে থাকা গাছের গুঁড়ির নিচে থাকে। এটি ছোট মাছ, চিংড়ি ও ব্যাঙ খেয়ে বাঁচে।
আইইউসিএন বাংলাদেশের ২০১৫ সালের লাল তালিকার স্বাদু পানির মাছের খণ্ডে বাঘাইড়কে (Bagarius bagarius) 'মহাবিপন্ন' (ক্রিটিক্যালি এনডেঞ্জারড) প্রজাতি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০০০ সালের তালিকাতেও এটি মহাবিপন্ন ছিল। মূল্যায়নে বলা হয়, একসময় বড় ও মাঝারি নদীতে মাছটি মোটামুটি সহজে পাওয়া যেত, কিন্তু ব্যাপক পলি জমা ও অতিরিক্ত আহরণে ১৯৯০-এর দশকের মধ্যেই এর সংখ্যা মারাত্মকভাবে কমে যায়। গত ২৫ বছরে এর সংখ্যা মোট প্রায় ৮০ শতাংশ কমেছে বলে মূল্যায়নে ধারণা করা হয় এবং সাম্প্রতিক জরিপে বেশির ভাগ জায়গায় মাছটিকে দুর্লভ পাওয়া যায়। তখন প্রজাতিটি রক্ষায় নির্দিষ্ট কোনো সংরক্ষণ কার্যক্রম ছিল না বলেও তালিকায় উল্লেখ করা হয়।
লাল তালিকা অনুযায়ী পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, ব্রহ্মপুত্র, সুরমা, কুশিয়ারা ও কর্ণফুলীসহ দেশের বড় নদীগুলোতে মাছটির দেখা মিলেছে; চলনবিল ও কাপ্তাই হ্রদেও এটি পাওয়া গেছে।
তালিকায় আরও বলা হয়, বাঘাইড়ের দুটি প্রজাতি, Bagarius bagarius ও Bagarius yarrelli, শনাক্ত করা নিয়ে বিভ্রান্তি আছে। বাংলাদেশের বেশির ভাগ লেখক বড় নদীর বড় আকারের মাছটিকে Bagarius bagarius হিসেবে ধরেছেন, আর ২০০০ সালের তালিকায় বড়টিকে Bagarius yarrelli নামে মহাবিপন্ন ধরা হয়েছিল। ২০১৫ সালের তালিকায় Bagarius yarrelli-কে 'তথ্য অপ্রতুল' শ্রেণিতে রাখা হয়। দুধকুমারে ধরা পড়া মাছটি কোন প্রজাতির, তা প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়নি।

ছবি: মসনাত / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: ঢাকা ট্রিবিউন, বাংলা ট্রিবিউন, বিডি২৪লাইভ, আইইউসিএন বাংলাদেশ (রেড লিস্ট অব বাংলাদেশ, খণ্ড ৫: স্বাদু পানির মাছ, ২০১৫), বাংলাপিডিয়া





মন্তব্য
(০)