অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্যের মাউন্টেন অ্যাশ (mountain ash) বনে আশির দশকের শেষে শুরু হয়ে পরে প্রায় ভুলে যাওয়া একটি বনায়ন-পরীক্ষা এমন ফল দিয়েছে, যা এর উদ্যোক্তারা খুঁজছিলেন না। যেসব অংশে বেশির ভাগ গাছ কেটে বন পাতলা করা হয়েছিল, সেখানে এখন গাছ বেশি বড়, আর কাঠে জমা কার্বন কখনো না-কাটা বনের সমান বা তার চেয়েও বেশি।
পরীক্ষাটির নাম সিলভিকালচারাল সিস্টেমস প্রজেক্ট (Silvicultural Systems Project)। একটি ব্লকের সব গাছ একসঙ্গে কেটে ফেলা, যাকে ক্লিয়ারফেল বলে, তা নিয়ে সংরক্ষণবাদী ও বনবিদদের দীর্ঘ বিতর্কের মীমাংসা করতে ভিক্টোরিয়া সরকার এটি শুরু করে। সংরক্ষণবাদীদের মত ছিল, এতে বিরল প্রাণীর আবাস নষ্ট হয়; বনবিদদের যুক্তি ছিল, মাউন্টেন অ্যাশ ভয়াবহ দাবানলে অভ্যস্ত, আর ক্লিয়ারফেল তারই বনায়ন-রূপ। আশির দশকের মাঝামাঝি রাজ্য সরকার কাঠশিল্প পুনর্গঠন করে এবং বিকল্প পদ্ধতি পরীক্ষায় আজকের হিসাবে প্রায় ২ কোটি ৬০ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলারের সমান অর্থ বিনিয়োগ করে।
১৯৮৭ থেকে ১৯৮৯ সালের মধ্যে দুটি জায়গায় পরীক্ষা বসানো হয়: সেন্ট্রাল হাইল্যান্ডসের টানজিল ব্রেন (Tanjil Bren) এবং ইস্ট গিপসল্যান্ডের ক্যাবেজ ট্রি ক্রিক (Cabbage Tree Creek)। তুলনা করা হয় ২৫০ থেকে ৩৫০ মিটার চওড়া প্রচলিত ক্লিয়ারফেল, ৫০ থেকে ১৪০ মিটারের ছোট ছোট খণ্ডে কাটা, আর ৫০ থেকে ৭০ শতাংশ গাছ কেটে বন পাতলা করার পদ্ধতি; পাশে না-কাটা বড় এলাকা রাখা হয় মানদণ্ড হিসেবে। ২০০০-এর দশকের শুরুতে ফল দাঁড়ায়, ক্লিয়ারফেল করা জমিতেই মাউন্টেন অ্যাশ সবচেয়ে ভালো জন্মায়। ফল প্রকাশের পর রাস্তা ঝোপে ঢেকে যায়, পরীক্ষাটিও সবাই ভুলে যায়।
২০১৪ সালে ইউনিভার্সিটি অব মেলবোর্নের প্রাকৃতিক বনে বনায়ন বিষয়ের ক্লাসের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গবেষকেরা টানজিল ব্রেনে ফিরে যান। ক্লিয়ারফেল অংশে তখনো ঘন, সতেজ মাউন্টেন অ্যাশ। কিন্তু চোখে পড়ে পাতলা করা অংশ: সেখানে রেখে দেওয়া গাছের বয়স মাত্র প্রায় ৮০ বছর, অথচ বুক-সমান উচ্চতায় গড় ব্যাস এক মিটারের অনেক বেশি, কোনোটি দেড় মিটারেরও বেশি। সবচেয়ে বড় গাছগুলো না-কাটা অংশের গাছের চেয়ে ব্যাসে ২০ শতাংশ বড়।
কার্বনের হিসাবও চমকপ্রদ। ৩০ বছরে পাতলা করা বন কাটার সময় সরানো সব কার্বন ফিরে পেয়েছে, তার ওপর না-কাটা বনের সমান বাড়তি কার্বনও জমিয়েছে। বড় গাছ আগুনে বেশি টেকে এবং তাতে কোটর তৈরির সম্ভাবনা বেশি, যা গ্রেটার গ্লাইডার ও লিডবিটারস পসামের (Leadbeater's possum) মতো বিরল প্রাণীর ক্রমে কমে আসা আবাস। ক্যামেরা-ফাঁদে দেখা গেছে, জরিপ করা প্রতিটি কাটা অংশেই লিডবিটারস পসাম আছে, অথচ না-কাটা কোনো অংশে নেই; কাটার পর গজানো অ্যাকেশিয়া গাছ এরা খাবার খোঁজা ও চলাচলে ব্যবহার করে।
গবেষক কেইটলিন হ্যামন্ড (Kaitlyn Hammond), ক্রেইগ নিটশকে (Craig Nitschke), প্যাট্রিক বেকার (Patrick Baker) ও রাফায়েল ত্রুভে (Raphael Trouve) তিনটি শিক্ষার কথা বলেছেন: দীর্ঘমেয়াদি বন-পরীক্ষা অপূরণীয়, আর অনেকগুলোই অবহেলায় হারিয়ে যাচ্ছে; বন পাতলা করা মানেই কাঠ, কার্বন আর বন্যপ্রাণীর মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়া নয়, উত্তর আমেরিকার সরলবর্গীয় বনের গবেষণাও তা-ই বলে; এবং বন ব্যবস্থাপনার কোনো একক সমাধান নেই। তবে তাঁরা সতর্ক করেছেন, সব জায়গায় বন পাতলা করা যায় না এবং করা উচিতও নয়; ক্লিয়ারফেল বা তীব্র দাবানলে ক্ষতিগ্রস্ত বনে গাছের বয়স ও আকারে বৈচিত্র্য আনতে এটি কাজে আসতে পারে।
গবেষকেরা লেখাটি দ্য কনভারসেশনের (The Conversation) জন্য লিখেছিলেন; সায়েন্সডেইলি তা প্রকাশ করেছে।
ছবি: CSIRO / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 3.0)
সূত্র: সায়েন্সডেইলি (দ্য কনভারসেশন)




মন্তব্য
(০)