ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরপুর-দুর্গাপুর ইউনিয়নের কাদিরকোল গ্রামের কৃষক জয়নুদ্দিন খাঁ বাণিজ্যিকভাবে মসলা ফসল তেজপাতার চাষ করছেন। ২০২০ সালের মার্চে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৮ সালে এক বিঘা জমিতে ১০০টি চারা লাগিয়ে তিনি এই চাষ শুরু করেন; তখন তাঁর চার বিঘা জমিতে ৪০০টি তেজপাতা গাছ ছিল। জয়নুদ্দিন খাঁর ভাষ্য, বছরে প্রায় ৪০ হাজার টাকা খরচ করে তিনি প্রায় ৫ লাখ টাকার পাতা বিক্রি করেন, আর এই আয়ে তাঁর সংসারে সচ্ছলতা এসেছে।
ভারত সফর থেকে শুরু
জয়নুদ্দিন খাঁ জানান, ২০০৭ সালে প্রতিবেশী দেশ ভারতে বেড়াতে গিয়ে তিনি তেজপাতার চাষ দেখেন এবং নিজে চাষ করতে আগ্রহী হন। কিন্তু কোথাও চারা পাচ্ছিলেন না। পরে এক বন্ধুর কাছে খবর পান, খুলনার বেজেরডাঙ্গা এলাকায় চারা পাওয়া যায়। ২০০৮ সালে সেখান থেকে প্রতিটি ২০০ টাকা দরে ১০০টি চারা কিনে এনে বাড়ির পাশে অপেক্ষাকৃত জঙ্গলাকীর্ণ জমিতে লাগান।
চার বছর পর গাছের ডালপালা পাতায় ভরে গেলে তিনি পাতা ভাঙতে শুরু করেন। তিনি জানান, সেই থেকে প্রতিবছর দুবার গাছ থেকে পাতা ভেঙে বিক্রি করেন। লাভজনক হওয়ায় পরে আরও গাছ লাগিয়েছেন এবং চাষ ভালো আবাদি জমিতেও ছড়িয়েছেন। পেশায় কৃষক জয়নুদ্দিন খাঁর মোট ১৮ বিঘা আবাদি জমি আছে।

চাষের পদ্ধতি ও ফলনের হিসাব
জয়নুদ্দিন খাঁর অভিজ্ঞতায়, তেজপাতা চাষে প্রথমে জমি ভালোভাবে চাষ দিয়ে জৈব সার ছিটিয়ে দিতে হয়, তারপর সামান্য রাসায়নিক সার দিয়ে চারা লাগাতে হয়। তিনি জানান, এই গাছ ছাগল-গরু খায় না, আর পাতা ডালের উঁচুতে থাকায় চুরির ভয়ও কম। তাঁর হিসাবে চারা লাগানোর চার বছর পর থেকে পাতা পাওয়া যায় এবং ৫০ বছর পর্যন্ত পাতা মেলে।
তিনি জানান, তাঁর প্রতিটি গাছে বছরে প্রায় ২০ কেজি পাতা হয়, যা বাজারে কেজিপ্রতি ৬০ টাকা দরে বিক্রি হয়। পাতা পেতে তাঁর খরচ গাছপ্রতি ১০০ টাকার মতো। প্রথম বছর তিনি তিন মণ পাতা বিক্রি করেছিলেন, ২০২০ সালের মার্চে তা ১২ মণে দাঁড়ায়; পরের মৌসুমে ২০ মণ বিক্রির আশা করছিলেন তিনি। তাঁর মতে, এই চাষে পরিশ্রম কম, আর একবার লাগালে দীর্ঘদিন ফলন পাওয়া যায়। চাষের খুঁটিনাটি ও সার প্রয়োগের বিষয়ে আগ্রহী কৃষকদের উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নেওয়া ভালো।

তেজপাতা কী
তেজপাতা লরেসি গোত্রের চিরসবুজ গাছ Cinnamomum tamala-র পাতা। উদ্ভিদটির আদি নিবাস ভারতের উত্তরাঞ্চল (আসাম ও পশ্চিম হিমালয়), বাংলাদেশ, নেপাল, মিয়ানমারসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কয়েকটি দেশ। ইউরোপীয় বে লরেল পাতায় একটি প্রধান শিরা থাকে, কিন্তু তেজপাতায় লম্বালম্বি তিনটি শিরা থাকে এবং এর ঘ্রাণ দারুচিনির মতো। ভারতের স্পাইসেস বোর্ডের তথ্যে, এর পাতা মূলত রান্নায় স্বাদ ও ঘ্রাণের জন্য ব্যবহৃত হয়; সেখানে সাধারণত গাছের বয়স ১০ বছর হলে পাতা সংগ্রহ শুরু হয় এবং অক্টোবর থেকে মার্চের মধ্যে পরিণত পাতা তোলা হয়।

দেখাদেখি চাষে আরও কৃষক
জয়নুদ্দিন খাঁকে দেখে কাদিরকোল গ্রামের আরও দুই কৃষক তেজপাতা চাষ শুরু করেন। আবুল কালাম জানান, প্রথম বছর তিনি ৩৫ শতক জমিতে চাষ করে ভালো পাতা পাচ্ছেন এবং আরও বেশি জমিতে চাষের ইচ্ছা আছে। আরেক কৃষক মিজানুর রহমান বাড়ির আঙিনায় ১০ শতক জমিতে তেজপাতা লাগিয়েছেন।
ঝিনাইদহ কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের উপপরিচালক কৃপাংশু কুমার তখন বলেন, তেজপাতা খুবই লাভজনক ফসল। এ অঞ্চলের মানুষ সাধারণত বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ করেন না, তবে কাদিরকোলের জয়নুদ্দিন খাঁ করছেন এবং কৃষি বিভাগ তাঁকে নানাভাবে সহযোগিতা করে।
ছবি: কায়সার আহমাদ / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: দ্য এগ্রো নিউজ, প্রথম আলো (৮ মার্চ ২০২০), ভারতের স্পাইসেস বোর্ড, উইকিপিডিয়া





মন্তব্য
(০)