ফজরের নামাজ পড়েই ব্রহ্মপুত্রের দিকে তাকান অপিয়ল। পানি বাড়ছে না কমছে, বাতাস কোন দিক থেকে বইছে, তা দেখেই ঠিক করেন দিনের কাজ। ৭৩ বছরের এই কৃষকের জন্ম কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার চর বজরা দিয়ারখাতায়। প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে জীবনে ১২ বার বসতভিটা হারিয়েছেন তিনি; ২০২৫ সালেও ভেঙেছে ভিটার একাংশ আর ধানের জমির কিছুটা।
অপিয়লের বাবা ছনদ্দি মুন্সি পাকিস্তান আমলে ৬০ বিঘা জমির মালিক ছিলেন। স্বাধীনতার প্রায় ১০ বছর পর কয়েক বছরের ভাঙনে সেই জমির সবটাই নদীতে যায়, সচ্ছল পরিবারটি রাতারাতি নিঃস্ব হয়। দিনমজুরি আর মাটি কাটার আয়ে সংসার চলত। পরে একটি গাভি কেনেন; স্ত্রী বানেছা বেগম গাভির যত্ন নিতেন, দুধ বিক্রি আর মজুরির টাকা জমিয়ে ১৯৯৫ সালে দুই বিঘা জমি কেনেন তাঁরা।
বছর দশেক হলো বাবার জমির প্রায় ৪০ বিঘা আবার জেগে উঠেছে, কিন্তু তার একাংশ এখন প্রভাবশালীদের দখলে। অপিয়ল বলেন, ‘চোখের সামনত বাবার জমি, এল্যা সেই জমি অন্য মানুষ চাষ করে। আমার লাঠির জোর নাই, তাই জমিত যাবার পাই না।’
এখন নিজের কেনা আর বর্গা নেওয়া জমি মিলিয়ে কয়েক বিঘায় চাষ করেন তিনি: বজরা দিয়ারখাতায় দুই বিঘায় আমন, পাশের বান্ডালের চরে তিন বিঘায় ভুট্টা। চরের বালুমাটি পানি ধরে রাখতে পারে না বলে ধান ভালো হয় না, ভুট্টা হয়। অপিয়লের হিসাবে হাল, বীজ, সার আর সেচ মিলিয়ে বিঘাপ্রতি ভুট্টায় খরচ প্রায় ৩৫ হাজার টাকা; ফলন আর দাম ভালো হলে লাভ থাকে ২৫ থেকে ৩০ হাজার।
ফসল ওঠার আগে নগদ টাকা থাকে না, তাই সার আর তেল কিনতে হয় মহাজনের কাছ থেকে বাকিতে, বাড়তি দামে। ফসল বেচতে প্রথমে ঘোড়ার গাড়ি, তারপর নৌকায় যেতে হয় ১০ থেকে ১২ কিলোমিটার দূরের জোড়গাছ হাটে; ভাড়া, কুলির মজুরি আর হাটের টোলে লাভ আরও কমে, দাম পড়ে গেলে কিছুই থাকে না।
ছেলে মাসুদ রানা (৩৩) স্নাতকোত্তর পাস করে সরকারি চাকরির চেষ্টা করেছিলেন, পরে কয়েক বছর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাইক্রোক্রেডিট শাখায় কাজ করে পাঁচ বছর আগে গ্রামে ফিরেছেন। এখন বাবা-ছেলে একসঙ্গে খেতে কাজ করেন। দুই বছর আগে ভুট্টা আর গরু বিক্রির টাকায় প্রায় আট লাখ টাকা খরচ করে চিলমারী উপজেলা শহরে ছেলের জন্য বাড়ি করেছেন অপিয়ল, যাতে ভাঙনের বাইরে অন্তত একটা ঠিকানা থাকে।
তবু নিজে চর ছাড়তে চান না অপিয়ল। এই চরের মাটি, নদী, খেত আর গরুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁর জীবন। শেষ বয়সে তাঁর চাওয়া সামান্য: কৃষিকাজ করেই বাকি জীবন কাটানো, কারও কাছে যেন হাত পাততে না হয়, আর স্ত্রী যেন একটু ভালো থাকেন।
ছবি: Atiqur Rahman / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: প্রথম আলো





মন্তব্য
(০)