১৯৬০ সালের ৩ অক্টোবর যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো সফরে গিয়েছিলেন জাপানের তৎকালীন যুবরাজ আকিহিতো। মাছবিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত ২৬ বছর বয়সী যুবরাজকে শহরের শেড অ্যাকুয়ারিয়ামে ঘুরিয়ে দেখান মেয়র রিচার্ড জে. ডেলি, আর বন্ধুত্বের প্রতীক হিসেবে উপহার দেন ১৮টি ব্লুগিল মাছ, যা ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের প্রতীকী মাছ। ‘ফিশ ডিপ্লোমেসি’র সেই উপহারই পরে জাপানের জলজ পরিবেশের দীর্ঘস্থায়ী সংকট হয়ে ওঠে।
দেশে ফিরে আকিহিতো জাতীয় মৎস্য সংস্থাকে ১৫টি ব্লুগিলের বংশবিস্তারের দায়িত্ব দেন, উদ্দেশ্য ছিল প্রজনন করিয়ে প্রকৃতিতে ছাড়া। ‘প্রিন্স ফিশ’ নামে পরিচিতি পাওয়া মাছটির বংশধরদের ১৯৬৬ সালে শিজুওকা প্রিফেকচারের ইতো শহরের কাছে ইপ্পেকি-কো হ্রদে ছাড়া হয়, পরে আরও বিভিন্ন নদী ও হ্রদে। বন্দী অবস্থায় ধীরে বাড়ায় সরকার একসময় এর বাণিজ্যিক প্রজনন বন্ধ করে, কিন্তু প্রকৃতিতে মাছটি নীরবে বাড়তে থাকে।
শুরুতে পোকামাকড়, প্ল্যাঙ্কটন আর জলজ উদ্ভিদ খেলেও ব্লুগিল পরে চিংড়ি এবং স্থানীয় মাছের ডিম ও পোনা খেতে শুরু করে। ১৯৯৯ সালের মধ্যে মাছটি জাপানের প্রায় সব স্বাদুপানির জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়ে। দ্য জাপান টাইমসের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৯ সালের এক জরিপে টোকিওর রাজপ্রাসাদ-সংলগ্ন একটি পরিখায় ধরা মাছের প্রায় ৪৭ শতাংশই ছিল ব্লুগিল, আর আটটি পরিখায় মিলেছিল ৪ হাজার ১৮৬টি।
জাপানের সবচেয়ে বড় ও প্রাচীন স্বাদুপানির হ্রদ লেক বিয়ায় স্থানীয় ক্রুশিয়ান কার্পসহ বিভিন্ন মাছ খাদ্য আর আবাস নিয়ে প্রতিযোগিতায় হেরে যাচ্ছে, ডিমও খেয়ে ফেলছে ব্লুগিল। এতে স্থানীয় মাছের ওপর নির্ভরশীল মৎস্যজীবী, মাছ ধরার ঐতিহ্য আর খাদ্যসংস্কৃতিও ঝুঁকিতে পড়েছে। জাপানের মৎস্যসম্পদ ও শিক্ষাবিষয়ক গবেষণা সংস্থার গবেষক কেনজি সাইতোহের মতে, মাছটির বিস্তার স্থানীয় প্রজাতিগুলোর জন্য গুরুতর হুমকি।
মিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জীববিজ্ঞানী কোইচি কাওয়ামুরার নেতৃত্বে গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের ১৩টি ব্লুগিল জনগোষ্ঠীর মাইটোকন্ড্রিয়াল ডিএনএ জাপানের ৫৬টি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে মিলিয়ে দেখেন। জাপানের মাছের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় আইওয়ার গুটেনবার্গের কাছে মিসিসিপি নদীর একটি জলাশয়ের ব্লুগিলের, যা প্রমাণ করে, দেশজুড়ে ছড়ানো ব্লুগিলের শুরু সেই ১৫টি উপহারের মাছ থেকেই। কম জিনগত বৈচিত্র্যও তাদের বিস্তার ঠেকাতে পারেনি।
এখন জাপানের বিজ্ঞানীরা জিন সম্পাদনার প্রযুক্তি ক্রিসপার দিয়ে ব্লুগিলের প্রজননক্ষমতা বন্ধ করে সংখ্যা কমানোর সম্ভাবনা পরীক্ষা করছেন। তবে এর কার্যকারিতা, পরিবেশগত নিরাপত্তা আর স্থানীয় প্রজাতির ওপর প্রভাব নিয়ে সতর্ক মূল্যায়ন দরকার, আর জাপানের মানুষের মধ্যেও জিনগত পরিবর্তন দিয়ে প্রজাতি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বিধা আছে। নতুন পরিবেশে কোনো প্রজাতি ছাড়ার আগে তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব না জানলে কী হতে পারে, ব্লুগিল তার উদাহরণ।
জাগো নিউজের এ প্রতিবেদনের তথ্যসূত্র ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক ও দ্য গার্ডিয়ান।
ছবি: Ltshears / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪





মন্তব্য
(০)