বাম্পার ফলনের পরও ধানের দাম না পেয়ে ২০১৯ সালের মে মাসে দেশের বিভিন্ন এলাকার কৃষকেরা হতাশায় পড়েছিলেন। বিবিসি বাংলা ২০১৯ সালের ১৪ মে জানায়, বোরো ধান তখন মণপ্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছিল। সরকার পরিস্থিতি সামলাতে চাল রপ্তানির কথা বিবেচনা করছিল, আর দীর্ঘমেয়াদে চাষে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কথা ভাবছিল। যে বছর ধানের ফলন ভালো হয়, সে বছরই দাম নিয়ে কৃষককে হতাশ হতে হয়; এই চক্র থেকে বেরোনোর উপায় আছে কি না, সেই প্রশ্ন তখন জোরালো হয়ে উঠেছিল।
খরচের চেয়ে দাম কম, মাঠে কৃষকের ক্ষোভ
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার বানকিনা গ্রামের কৃষক আবদুল সিকদার সে সময় নিজের জমির পাকা বোরো ধানে পেট্রল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। তাঁর পরিবারের একজন সদস্য বিবিসি বাংলাকে জানান, খরচের তুলনায় ধানের দাম কম হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা থেকে তিনি এমনটি করেছিলেন। প্রথম আলোর টাঙ্গাইল প্রতিনিধির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি জমির একাংশে আগুন দিয়েছিলেন এবং আশপাশের জমির লোকজন ছুটে এসে আগুন নিভিয়ে ফেলেন। ওই এলাকায় ধান কাটতে একজন শ্রমিককে তখন ৯০০ থেকে এক হাজার টাকা মজুরি দিতে হচ্ছিল, আর প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছিল ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়।
উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী এলাকার মোসাম্মৎ বানেশা বেগম অন্যের তিন বিঘা জমি বর্গা নিয়ে বোরো ধান চাষ করেছিলেন। শ্রম আর খরচের তুলনায় দাম কম হওয়ায় তিনি থমকে যান। বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, "ধানের দাম নাই। কিন্তু কৃষি খরচ বেশি। ১২০০ টাকা দিয়া এক বিঘা ধান কাটাতে কামলা নিতে হয়। পোষায় না।" কুড়িগ্রামের আরেক কৃষক আজিজার রহমান জানান, প্রতি বছরই দাম নিয়ে তাঁদের হতাশায় পড়তে হয়। তাঁর কথায়, "আমাদের জমিতে ধান ছাড়া অন্য ফসল করা যায় না। এটা ধানী জমি। সে কারণে বাধ্য হয়ে ধান করি।"

কৃষিমন্ত্রীর ব্যাখ্যা: উদ্বৃত্ত ফলন ও গুদামের সীমা
সরকারও পরিস্থিতি স্বীকার করেছিল। তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক বিবিসি বাংলাকে বলেন, সে বছর আমন ও আউশের উৎপাদন বেশি হয়েছে এবং বোরো ধানও এক কোটি ৯০ লাখ টনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে। তাঁর মতে, ফলন বেশি হওয়ায় ধানের দাম আগের তুলনায় অস্বাভাবিক কম ছিল। তিনি জানান, তাৎক্ষণিকভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার চাল রপ্তানির বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে।
মন্ত্রী বলেন, "আমরা বেশি কিনতে পারতাম। কিন্তু সরকারি গুদামের ধারণ ক্ষমতা অনেক কম। সেজন্য আমরা ১২ লাখ টন টার্গেট করেছি। তার চেয়ে বেশি কেনা সম্ভব হবে না।" তাঁর ভাষায়, সাড়ে তিন কোটি টন চালের বাজারে ১০ বা ১২ লাখ টন কিনলে দামে প্রভাব পড়ে না, আর এর সুবিধা কৃষক সরাসরি পান না।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) বাজার পর্যবেক্ষণ সেবা জিআইইডব্লিউএস ২০১৯ সালের ১ এপ্রিল জানায়, নভেম্বর থেকে মে মৌসুমের বোরো ফসল দেশের বার্ষিক ধান উৎপাদনের অর্ধেকের বেশি জোগায়। সেবারের বোরো সংগ্রহে প্রতি কেজি ধানের দাম ২৬ টাকা, সেদ্ধ চালের ৩৬ টাকা এবং আতপ চালের ৩৫ টাকা ঠিক করা হয়, আর সংগ্রহ চলার কথা ছিল ২৫ এপ্রিল থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। বিবিসি বাংলা জানায়, সরকারের এই দাম অনুযায়ী মণপ্রতি ধানের দাম এক হাজার টাকার বেশি হয়, কিন্তু মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে সরকারি কেনা সেভাবে শুরু হয়নি।

দীর্ঘমেয়াদি পথ: প্রযুক্তিতে উৎপাদন খরচ কমানো
কৃষি অর্থনীতিবিদেরা তখন বলেছিলেন, ফলন ভালো হলেই ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হন; এ অবস্থা থেকে বেরোতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক ড. নাজনীন আহমেদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, ধান-চাল কেনার প্রচলিত পদ্ধতিতে সরকারের নজরদারি বাড়ালে কিছুটা সুফল মিলবে। তাঁর মতে, চাতালের জায়গায় অটো রাইস মিলের উত্থান হয়েছে, আর কৃষকের নিজের ধান ধরে রাখার ব্যবস্থা নেই; তাই ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষককে ধান কেটেই কম দামে বিক্রি করতে হয়।
তিনি বলেন, সরকার চাল কেনার প্রক্রিয়া একটু আগে শুরু করলে ঘোষিত দাম ক্ষুদ্র কৃষকের জন্য দর-কষাকষির ভিত্তি হতে পারে। তবে তাঁর ভাষায়, "দীর্ঘ মেয়াদে উৎপাদন খরচ কমাতে কৃষককে প্রযুক্তির দিকে নেয়া ছাড়া বিকল্প নাই।"

কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকও জানান, স্থায়ী উপায় হিসেবে সরকার প্রযুক্তির ব্যবহারসহ বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে চায়। তিনি বলেন, "ধান লাগানো এবং ধান কাটার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি খরচ হয়। এই ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ব্যবহারের জন্য সরকার কৃষককে সহযোগিতা করছে। একটি যন্ত্র কিনতে কৃষক ৫০ টাকা দিলে সরকার বাকি ৫০ টাকা দিচ্ছে।" তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, এটি একদিনে সম্ভব নয়, অনেক সময় লাগবে। কৃষি অর্থনীতিবিদদের মত ছিল, সারা দেশের কৃষকের তালিকা ও তথ্য সরকারের কাছে আছে; কৃষকদের সঙ্গে নিয়ে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে গুরুত্ব দিলে অল্প সময়েই স্থায়ী সমাধান সম্ভব হতে পারে।
ছবি: Balaram Mahalder / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: বিবিসি বাংলা, প্রথম আলো, জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও জিআইইডব্লিউএস)





মন্তব্য
(০)