২০২৫ সালের নভেম্বরে উত্তরাঞ্চলের গাইবান্ধা জেলার সাত উপজেলার আমন ধানের মাঠজুড়ে একটি অজানা রোগ ছড়িয়ে পড়ে। জাগো নিউজ ২৪ ২০২৫ সালের ১৮ নভেম্বর জানায়, আক্রান্ত ধানগাছের পাতা দুই সপ্তাহের মধ্যে শুকিয়ে বাদামি হয়ে যাচ্ছিল এবং শীষ গঠনের আগেই গাছ নষ্ট হয়ে যাচ্ছিল। চাষিরা বলেন, বাজারে প্রচলিত কীটনাশক দিয়েও তাঁরা ফসল রক্ষা করতে পারছেন না; রোগ নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে এবং তাঁরা বড় লোকসানের মুখে পড়বেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) জেলা কার্যালয় জানায়, মাঠকর্মীরা নমুনা সংগ্রহ করেছেন এবং প্রাথমিক ধারণা অনুযায়ী এটি ব্যাকটেরিয়াল লিফ ব্লাইট; একই সঙ্গে কৃষি বিভাগ বৃষ্টির অভাব, পুষ্টির ঘাটতি ও জমির জলাবদ্ধতাকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করে।
চাষিরা যা জানিয়েছিলেন
চাষিরা পত্রিকাটিকে বলেন, বিঘাপ্রতি ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে, অথচ বিঘাপ্রতি এক মণ ধান পাওয়ারও সম্ভাবনা নেই। তাঁদের ভাষ্য, ধান রোপণের প্রায় দুই মাস পর রোগটি দেখা দেয়। তাঁদের অভিযোগ, কৃষি অফিস থেকে কেউ এসে পরামর্শ দেয়নি বা খোঁজ নেয়নি; তাই তাঁরা নিজেরাই দোকান থেকে কীটনাশক কিনে প্রয়োগ করেছেন, কিন্তু কাজ হয়নি। গাছে ধান নেই, কেন এমন হচ্ছে তা তাঁরা জানেন না। অনেকে ধারদেনা করে আমন রোপণ করেছিলেন; ধান বিক্রি করে ঋণ শোধের আশা ছিল তাঁদের।
গাইবান্ধা সদর উপজেলার রিফাইতপুরের কোমল বলেন, ‘ধারদেনা করে ধান লাগাইছি। ধানে কী এক অচেনা রোগ ধরলো, তাক কেউই ধরতে পারছে না। এবার ধানের আবাদে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়া লাগবে।’
পলাশবাড়ী উপজেলার পূর্বকুমারগাড়ীর ছামছুলজামান মার্জু বলেন, ‘এবার প্রায় ৫ বিঘা জমিতে আমনের আবাদ করেছি। প্রায় ৫০ হাজার টাকা খরচ করে এসব জমি রোপণ করেছি। সব জমির ধান নষ্ট হয়েছে। ৫ বিঘা জমি থেকে এক ছটাক ধানও পাওয়ার আশা নেই। অনেক কীটনাশক দিয়েছি। কাজ হয়নি। আক্রান্ত ধানের গাছগুলো গরুও খায় না। চোখের সামনে ধানের জমিগুলো মরে নষ্ট হচ্ছে।’
হালিমনগরের আব্দুল আজিজ বলেন, ‘আমার ৬৫ শতাংশ জমির ধানের পাতায় প্রথমে বাদামি দাগ হয়, পরে পুরো পাতা শুকিয়ে যায়। রোগটা কী, বুঝতে পারছি না। কৃষি অফিসে জানিয়েছি, তারা এসে দেখেছে কিন্তু এখনো কোনো কার্যকর ব্যবস্থা পাওয়া যায়নি। তুলামের বিলে প্রায় ৩ শতাধিক বিঘা জমি আছে। সব জমির ধানের একই অবস্থা। আমরা চাই, কৃষি অফিস থেকে লোকজন আসুক, কেন এমন হলো। আমরা সরকারের কাছে ক্ষতিপূরণ চাই।’
সাঘাটা উপজেলার ভরতখারী গ্রামের বর্গাচাষি খুশি মিয়া বলেন, ‘নিজের জমি নাই। প্রায় ১ বিঘা ১৭ শতাংশ জমি বর্গা নিয়ে ধান চাষ করেছি। প্রায় ২০ দিন আগে হঠাৎ জমিতে রোগ দেখা দেয়। পরে বালাইনাশক ব্যবহার করি। তবুও গাছ বাঁচাতে পারছি না।’ গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কোচাশহর গ্রামের কৃষক উজ্জল মিয়া বলেন, ‘আমরা সারাবছর কষ্ট করে চাষ করি কিন্তু এমন রোগে ধান নষ্ট হলে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে যাবে। সরকার যেন দ্রুত ব্যবস্থা নেয়।’
কৃষি বিভাগের বক্তব্য
কৃষি বিভাগ অবশ্য ভিন্ন ব্যাখ্যা দেয়। কর্মকর্তারা পত্রিকাটিকে বলেন, এটি কোনো বড় ধরনের রোগ নয়; প্রয়োজনীয় বৃষ্টি ও ধানগাছের পুষ্টির অভাবে পাতা লালচে হচ্ছে, আর কৃষকদের ভুল পরিচর্যার কারণে পাতা আবার সবুজ হতে একটু সময় লাগবে। প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞদের বরাতে আরও বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতা, অতিরিক্ত বৃষ্টি ও তাপমাত্রার ওঠানামা ধানের নতুন রোগ ছড়িয়ে পড়ার অন্যতম কারণ; দ্রুত রোগ নির্ণয় ও প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা না নিলে শুধু গাইবান্ধা নয়, আশপাশের জেলাগুলোর আমন উৎপাদনেও বড় প্রভাব পড়তে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের গাইবান্ধা কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. রোস্তম আলী বলেন, ‘মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তারা বিভিন্ন এলাকা থেকে আক্রান্ত ধানের নমুনা সংগ্রহ করেছেন। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ধানের গাছগুলো ব্যাকটেরিয়াল লিফ ব্লাইট রোগে আক্রান্ত।’ তিনি আরও বলেন, ‘জমিগুলো জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত, ধান চাষাবাদের অনুপযোগী। রোপা আমনের চারায় পুষ্টিকর উপাদান ব্যবহার না হওয়ায় বৃদ্ধিতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে শীষ বা পাতা রোগাক্রান্ত হচ্ছে। এ রোগ নিয়ে আমাদের মাঠকর্মীরা নিয়মিত কৃষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।’
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ওই মৌসুমে জেলার সাত উপজেলায় ১ লাখ ৩৩ হাজার ১২৫ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষ হয়েছিল এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৬ লাখ ৪২ হাজার ৯৯৪ মেট্রিক টন। কত জমি আক্রান্ত হয়েছে, প্রতিবেদনে তার কোনো হিসাব ছিল না, আর প্রতিবেদনের দিন পর্যন্ত নমুনা পরীক্ষার কোনো ফল প্রকাশিত হয়নি।
একই মৌসুমে রংপুর অঞ্চলের চিত্র
গাইবান্ধা ডিএইর রংপুর কৃষি অঞ্চলের পাঁচ জেলার একটি; বাকি চারটি রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও নীলফামারী। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা বাসস ২০২৫ সালের ৩১ অক্টোবর জানায়, এ অঞ্চলে লক্ষ্যমাত্রার ৬ লাখ ২০ হাজার ৪৩০ হেক্টরের বিপরীতে ৬ লাখ ২১ হাজার ৫০৫ হেক্টর জমিতে আমন চাষ হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার ১০০.১৭ শতাংশ, এবং ডিএই অঞ্চলটির জন্য ২০ লাখ ১০ হাজার ৫০৫ টন চালের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল। সংস্থাটির খবরে বলা হয়, চারা রোপণের প্রথম দিকে কৃষকদের খরার মতো পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে হয়েছিল; অঞ্চলটির ডিএইর অতিরিক্ত পরিচালক জানান, সাম্প্রতিক বৃষ্টি গাছের বাড়বাড়তিতে সহায়ক হয়েছে এবং স্বল্প জীবনকালের জাতে ভালো ফলন মিলছে।
গাইবান্ধার খবরের এক সপ্তাহ আগে, ২০২৫ সালের ১২ নভেম্বর, দ্য ডেইলি অবজারভার পাশের কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলা থেকে জানায়, সেখানে ব্যাকটেরিয়াল লিফ ব্লাইট এক জমি থেকে আরেক জমিতে ছড়িয়ে পড়ছে। উপজেলা কৃষি অফিস ২৪ হাজার ৩৬০ হেক্টরে রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছিল, চাষ হয়েছিল ২৪ হাজার ৩৬৫ হেক্টরে। পত্রিকাটি লেখে, পাতায় হলদে-সবুজ দাগ পড়ে পরে বাদামি হয়ে শুকিয়ে যায়, শিশির বা বৃষ্টিতে পাতা থেকে দুধের মতো তরল বের হয়, আর দূর থেকে জমি পাকা মনে হলেও কাছে গেলে দেখা যায় ধান শুকিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। উপজেলার জ্যেষ্ঠ কৃষি কর্মকর্তা জানান, সচেতনতামূলক প্রচারের অংশ হিসেবে লিফলেট বিতরণ চলছে।
আগের বছরের আমন মৌসুমও গাইবান্ধার কৃষকদের জন্য সহজ ছিল না। দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ২০২৪ সালের ৩০ অক্টোবর জানায়, ঘূর্ণিঝড় ‘দানা’র প্রভাবে দমকা হাওয়া ও গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে জেলার বহু জমির কাঁচা আমন ধানগাছ মাটিতে নুয়ে পড়ে; সেবার খরা ও বন্যা পেরিয়ে জেলায় প্রায় ১ লাখ ৩৩ হাজার হেক্টরে আমন চাষ হয়েছিল। জেলা ডিএইর একজন উপপরিচালক পত্রিকাটিকে বলেন, নুয়ে পড়া ধানগাছ বেঁধে দিতে এবং জমি থেকে পানি সরিয়ে দিতে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতাপোড়া: ব্রি ও ইরি যা বলে
ডিএই প্রাথমিক ধারণা হিসেবে যে রোগের নাম বলেছে, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) তালিকায় সেটি ধানের আটটি প্রধান রোগের একটি। ২০২৫ সালের জুনে প্রকাশিত কৃষকদের জন্য লেখা ব্রির বই ‘আধুনিক ধানের চাষ’-এর ২৫তম সংস্করণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে ধানের ৩২টি রোগ শনাক্ত হয়েছে, যার ৮টি প্রধান। বইটিতে রোগটির নাম ব্যাকটেরিয়াজনিত পোড়া বা পাতাপোড়া, এবং বলা হয়েছে, এটি গাছের সব অবস্থায় আক্রমণ করতে পারে। চারা রোপণের ১৫ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে আক্রান্ত চারার গোড়া পচে যায়, পাতা নেতিয়ে পড়ে হলুদাভ হয়ে মারা যায়; এ অবস্থাকে কৃসেক বলে। আক্রান্ত কাণ্ডের গোড়ায় চাপ দিলে আঠালো ও দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ বের হয়।
ব্রির বর্ণনায়, বয়স্ক গাছে সাধারণত সর্বোচ্চ কুশি পর্যায় থেকে পাতাপোড়ার লক্ষণ দেখা যায়। প্রথমে পাতার অগ্রভাগ থেকে কিনারা বরাবর আক্রান্ত হয়ে তা নিচের দিকে বাড়তে থাকে। ব্যাকটেরিয়া পাতার ক্ষতস্থান দিয়ে প্রবেশ করে; আক্রান্ত অংশ প্রথমে শুষ্ক জলছাপের মতো দেখায়, পরে হলুদাভ হয়ে খড়ের রং ধারণ করে, এবং ক্রমে পুরো পাতাটাই মরে শুকিয়ে যায়। অতিমাত্রায় ইউরিয়া সারের ব্যবহার, শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ো আবহাওয়া রোগটি ছড়াতে সাহায্য করে। রোগ শনাক্তকরণের সংক্ষিপ্ত নির্দেশিকায় ব্রি আরও জানায়, কখনো কখনো সকালে আক্রান্ত পাতার নিচের দিকে ব্যাকটেরিয়া মেশানো হলুদাভ ঘোলা পানির বিন্দু দেখা যায়।
জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, বাংলাদেশে রোগটি প্রথম নজরে আসে ১৯৬৬ সালে। রোপা ধানে সাধারণত রোপণের প্রায় ছয় সপ্তাহ পর এটি দেখা দেয়, লক্ষণ প্রায়ই ডিগপাতায় স্পষ্ট হয়, এবং পাতা শুকানো সাধারণত আগা থেকে শুরু হয়ে পাতার দুই পাশ দিয়ে নিচে নামে; জাতভেদে তা পাতার খোল পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) তাদের রাইস নলেজ ব্যাংকে রোগটির কারণ হিসেবে জ্যান্থোমোনাস ওরাইজি পিভি. ওরাইজি (Xanthomonas oryzae pv. oryzae) নামের ব্যাকটেরিয়ার কথা বলেছে। ইরির তথ্যমতে, ২৫ থেকে ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও ৭০ শতাংশের বেশি আপেক্ষিক আর্দ্রতা রোগটির অনুকূল; জোরালো বাতাস ও একটানা ভারী বৃষ্টিতে ক্ষতের তরল বিন্দুর মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া সহজে ছড়ায়, আর বেশি নাইট্রোজেন সার পেলে সংবেদনশীল জাতে রোগ মারাত্মক হতে পারে। ইরি একে ধানের সবচেয়ে গুরুতর রোগগুলোর একটি বলেছে: রোগ যত আগে আসে, ফলন তত বেশি কমে; অনুকূল পরিবেশে সংবেদনশীল জাতে ক্ষতি ৭০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। থোড় অবস্থায় আক্রান্ত হলে ফলন না কমলেও দানার মান খারাপ হয় এবং ভাঙা চালের পরিমাণ বাড়ে।
ইরি মাঠে করার মতো একটি সহজ পরীক্ষার কথাও লিখেছে। একটি কচি দাগ আড়াআড়ি কেটে স্বচ্ছ গ্লাসের পরিষ্কার পানিতে রেখে কয়েক মিনিট পর আলোর দিকে ধরলে, কারণ ব্যাকটেরিয়া হলে কাটা মুখ থেকে ঘন বা ঘোলা তরল বের হতে দেখা যায়। এসব লক্ষণ রোগটির দিকে ইঙ্গিত দিতে পারে, তবে নিশ্চিত হওয়া যায় কেবল নমুনার পরীক্ষাগার পরীক্ষায়, যেমনটি গাইবান্ধা কার্যালয় শুরু করেছে বলে জানিয়েছিল।

অন্য সম্ভাবনা: বাদামি দাগ, টুংরো ও পুষ্টির ঘাটতি
মাঠে ধানের কয়েকটি সমস্যা দেখতে প্রায় একই রকম লাগে, তাই ব্রির বইতে এগুলো আলাদা করে চেনার উপায় দেওয়া আছে। ব্রি জানায়, ছত্রাকজনিত বাদামি দাগ রোগে পাতায় প্রথমে ছোট ছোট বাদামি দাগ দেখা যায়, দাগের মাঝখানটা হালকা বাদামি হয় এবং অনেক সময় চারদিকে হলুদ আভা থাকে; ফসলের যেকোনো অবস্থায় রোগটি হতে পারে। ইরির তথ্যপত্রে এর কারণ বাইপোলারিস ওরাইজি (Bipolaris oryzae) ছত্রাক; পানি না থাকা ও পুষ্টিহীন মাটিতে, কিংবা যে মাটিতে বিষাক্ত পদার্থ জমে, সেখানে রোগটি বেশি হয়, বিশেষত ৮৬ থেকে ১০০ শতাংশ আপেক্ষিক আর্দ্রতা এবং ১৬ থেকে ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায়। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার নিচু জমির ধানে এতে গড়ে ৫ শতাংশ ফলন কমে, আর মারাত্মক আক্রান্ত জমিতে ক্ষতি ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। ইরি উল্লেখ করেছে, ১৯৪৩ সালের বাংলার মহাদুর্ভিক্ষের প্রধান কারণ হিসেবে এই রোগকে বিবেচনা করা হয়; বাংলাপিডিয়া বলছে, রোগটি সারা বাংলাদেশেই দেখা যায়।
বাংলাপিডিয়ার মতে বাংলাদেশে ধানের সবচেয়ে ক্ষতিকর ভাইরাসজনিত রোগ টুংরো, যা সবুজ পাতাফড়িংয়ের মাধ্যমে ছড়ায়। ব্রি জানায়, এ রোগে জমিতে বিক্ষিপ্তভাবে গাছের পাতা কমলা-হলুদ রং ধারণ করে এবং আক্রান্ত গাছ কুশি কম দিয়ে খাটো থেকে যায়। গাইবান্ধার বিতর্কের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক একটি তথ্যও বইটিতে আছে: সালফার বা নাইট্রোজেনের ঘাটতি কিংবা ঠান্ডার প্রকোপেও ধানগাছ হলুদাভ হতে পারে, তবে কমলা-হলুদ হয় না, আর সে ক্ষেত্রে বিক্ষিপ্তভাবে নয়, পুরো জমির ধান সমভাবে হলুদাভ হয়।
কৃষি বিভাগের আরেক ব্যাখ্যা, পুষ্টির ঘাটতিরও চেনার মতো লক্ষণ ব্রির নির্দেশিকায় আছে। ইউরিয়া সার দেওয়ার পরও ধানগাছ হলদে থাকলে এবং বাড়বাড়তি কম হলে সালফারের অভাব হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। ধানগাছ মাঝে মাঝে খাটো বা বসে গেলে, পুরোনো পাতায় মরচে পড়া বাদামি থেকে কমলা রং ধরলে এবং কুশি কম থাকলে দস্তার অভাব হয়েছে বলে ধরা যায়। দুই ক্ষেত্রেই ব্রির প্রথম পরামর্শ জমি থেকে পানি সরিয়ে দেওয়া, তারপর সুপারিশকৃত মাত্রায় ঘাটতি থাকা সার উপরিপ্রয়োগ।

ব্রি ও ইরির ব্যবস্থাপনা পরামর্শ
ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতাপোড়া মোকাবিলায় ব্রির বইতে নিচের পদক্ষেপগুলোর কথা বলা হয়েছে, যার কোনোটিই কীটনাশক বা ছত্রাকনাশক নয়:
- সুষম মাত্রায় সার ব্যবহার করা;
- রোগ দেখা দিলে বিঘাপ্রতি অতিরিক্ত ৫ কেজি পটাশ সার উপরিপ্রয়োগ করা;
- ঝড়বৃষ্টির পর এবং রোগ দেখা দেওয়ার পর ইউরিয়া সারের উপরিপ্রয়োগ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা;
- কৃসেক হলে আক্রান্ত জমির পানি শুকিয়ে ৭ থেকে ১০ দিন পর আবার সেচ দেওয়া;
- রোগাক্রান্ত জমির ফসল কাটার পর নাড়া পুড়িয়ে ফেলা।
ইরি বলছে, রোগ প্রতিরোধী জাত লাগানোই ব্যাকটেরিয়াজনিত পাতাপোড়া নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর, নির্ভরযোগ্য ও সস্তা উপায়। এর বাইরে ইরির পরামর্শ হলো সুষম পুষ্টি, বিশেষ করে নাইট্রোজেনের পরিমিত ব্যবহার; প্রচলিত পদ্ধতিতে পানি জমিয়ে রাখা জমি ও বীজতলায় ভালো নিষ্কাশন; আগাছা পোষক সরিয়ে এবং নাড়া, খড়, মুড়ি ধান ও আপনা থেকে গজানো চারা চাষ দিয়ে মাটিতে মিশিয়ে জমি পরিষ্কার রাখা; আর পতিত জমি শুকাতে দেওয়া, যাতে মাটি ও গাছের অবশিষ্টাংশে থাকা জীবাণু দমে যায়।
বাদামি দাগ রোগের জন্য ব্রির পরামর্শ জমিতে জৈব সার ও সুষম মাত্রায় সার প্রয়োগ করা, এবং আমন মৌসুমে অক্টোবরের বৃষ্টি বন্ধ হয়ে গেলে পরিপূরক সেচের ব্যবস্থা করা। ইরি মাটির উর্বরতা বাড়ানোকেই প্রথম পদক্ষেপ বলেছে। সেচ নিয়ে ব্রি সাধারণভাবে বলছে, ধানের জমিতে সব সময় দাঁড়ানো পানি রাখার প্রয়োজন নেই: রোপণের পর ১০ থেকে ১২ দিন ছিপছিপে পানি রাখলে নতুন শিকড় সহজে গজায়, এরপর কম পানি রাখলেও চলে, তবে গাছ যেন পানির স্বল্পতায় না পড়ে। বৃষ্টিনির্ভর রোপা আমন এলাকায় জমির আইল ১৫ সেন্টিমিটার উঁচু ও ফাটলহীন রাখলে বৃষ্টির পানি ধরে রাখা যায়; ব্রির গবেষণায় দেখা গেছে, খরায় সম্পূরক সেচ পাওয়া ধানের ফলন সেচ না পাওয়া ধানের চেয়ে হেক্টরে প্রায় এক টন বেশি হয়।
প্রতিবেদনের দিন পর্যন্ত গাইবান্ধার রোগের কারণ নিশ্চিত হয়নি। তাই একই রকম লক্ষণ দেখলে কৃষকের জন্য নিরাপদ পথ হলো উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বা উপজেলা কৃষি অফিসকে জমি দেখানো; তাঁরা নমুনা পরীক্ষায় পাঠাতে পারেন এবং সঠিক প্রতিকার ও প্রয়োজন হলে কোন রাসায়নিক কতটুকু লাগবে, সে পরামর্শ দিতে পারেন।
গাইবান্ধা ও এর কৃষিজমি
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা জেলার আয়তন ২,১১৪.৭৭ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে কুড়িগ্রাম ও রংপুর, দক্ষিণে বগুড়া, পূর্বে জামালপুর, কুড়িগ্রাম ও ব্রহ্মপুত্র নদ, পশ্চিমে জয়পুরহাট, দিনাজপুর ও রংপুর জেলা। প্রধান নদী ব্রহ্মপুত্র, যমুনা, তিস্তা, করতোয়া, বাঙালি ও ঘাঘট। জেলার সাতটি উপজেলা গাইবান্ধা সদর, গোবিন্দগঞ্জ, পলাশবাড়ী, ফুলছড়ি, সাঘাটা, সাদুল্লাপুর ও সুন্দরগঞ্জ; এর মধ্যে গোবিন্দগঞ্জ সবচেয়ে বড় এবং পলাশবাড়ী সবচেয়ে ছোট।
জেলার ইতিহাস নদীর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এ অঞ্চলের আগের কেন্দ্র ছিল ভবানীগঞ্জ, যা ১৮৫৮ সালের ২৭ আগস্ট মহকুমা হয়; ১৮৭৫ সালে নদীভাঙনে ভবানীগঞ্জ নদীগর্ভে বিলীন হলে সদর দপ্তর গাইবান্ধায় সরিয়ে নেওয়া হয়। গাইবান্ধা জেলা গঠিত হয় ১৯৮৪ সালে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ২৩ লাখ ৭৯ হাজার ২৫৫। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী জেলার আয়ের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে কৃষির ভাগ ৬৫.০৮ শতাংশ, এরপর ব্যবসা ১১.৮৫ শতাংশ; জেলার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে একটি কৃষি প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটও রয়েছে।

আমন ধান ও দেশের খাদ্য জোগান
বাংলাদেশে ধান চাষ হয় তিন মৌসুমে: আউশ, আমন ও বোরো। বাংলাপিডিয়া জানায়, এর মধ্যে রোপা আমন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ২০০৯-১০ সালে দেশের ধানি জমির প্রায় ৪৬ শতাংশে রোপা আমনের চাষ হয়েছিল; আবাদি জমিতে আমন এগিয়ে, উৎপাদনে বোরো। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, সরকারের খাদ্য অধিদপ্তর মাথাপিছু দিনে ৪১০ গ্রাম চালের সুপারিশ করে, আর ধানের ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক ও কৃমিজনিত রোগ বেশি দেখা যায় জুন থেকে ডিসেম্বরে, অর্থাৎ আমন মৌসুমেই।
ব্রির ২০২৫ সালের বই অনুযায়ী, ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ পৃথিবীতে তৃতীয়, আর এখানে হেক্টরপ্রতি গড় ফলন ৫.২ টন; চীন, জাপান ও কোরিয়ায় তা ৬.৫ থেকে ৭.০ টন। তবে ওই দেশগুলোতে বছরে একটি মাত্র ধান ফসল হয়, আর বাংলাদেশে একই জমিতে বছরে তিনবার ধান উৎপাদন হয়। ১৯৬৮ সালে ইরি থেকে আসা প্রথম উফশী জাত আইআর৮ বাংলাদেশে মাঠপর্যায়ে চাষ শুরু হয়। বইটির তথ্যমতে, বর্তমানে দেশের মোট ধানি জমির প্রায় ৮০ শতাংশে ব্রি উদ্ভাবিত জাতের চাষ হয় এবং তা থেকে আসে মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯০ শতাংশ।
রোপা আমনের জন্য ব্রি ২০ থেকে ৩০ দিন বয়সের চারা, প্রতি গুছিতে একটি সতেজ চারা, সারি থেকে সারির দূরত্ব ২০ থেকে ২৫ সেন্টিমিটার এবং গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার রাখার সুপারিশ করে। জলাবদ্ধতা বা অন্য কোনো কারণে রোপণ দেরি হলে বইটিতে দ্বিরোপণ পদ্ধতির কথা বলা হয়েছে, যা রংপুর অঞ্চলে ‘বোলান’ নামে পরিচিত। বইটি সতর্ক করেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ধান চাষে খরা, অতিবৃষ্টি, তাপপ্রবাহ, শৈত্যপ্রবাহ, লবণাক্ততা ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে; এ জন্য বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাসভিত্তিক একটি ধান উৎপাদন ব্যবস্থাপনা প্রযুক্তির কথা বলা হয়েছে, যা কৃষককে আগেভাগে ব্যবস্থা নিতে সাহায্য করে।
বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, ব্রি ১৯৭০ সালে গাজীপুরের জয়দেবপুরে একটি স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়; এর আঞ্চলিক কার্যালয়গুলোর একটি রংপুরে, আর গবেষণা বিভাগগুলোর মধ্যে রয়েছে উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব বিভাগ।
ছবি: Ibrahim Husain Meraj / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (আধুনিক ধানের চাষ, ২৫তম সংস্করণ, জুন ২০২৫), ইন্টারন্যাশনাল রাইস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রাইস নলেজ ব্যাংক, বাংলাপিডিয়া, দ্য ডেইলি অবজারভার, বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), দ্য ফাইন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস





মন্তব্য
(০)