সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ১ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা৩০°পরিষ্কার আকাশআর্দ্রতা ৬৯%বাতাস ৫ কিমি/ঘ

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ৮০ পয়সার অ্যানথ্রাক্স টিকায় ২০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে গবাদিপশুর মালিকেরা ২০২৫ সালের অক্টোবরের শুরুতে অভিযোগ করেন, ভয় দেখিয়ে ৮০ পয়সার অ্যানথ্রাক্স টিকার জন্য ২০ টাকা বা তার বেশি নেওয়া হচ্ছে; উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, ১০ টাকা নির্ধারিত, বেশি নিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে ৮০ পয়সার অ্যানথ্রাক্স টিকায় ২০ টাকা নেওয়ার অভিযোগ
লাইভস্টক

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলায় ২০২৫ সালের অক্টোবরের শুরুতে গবাদিপশুর মালিকেরা অভিযোগ করেন, অ্যানথ্রাক্স বা তড়কা রোগের টিকাদান কর্মসূচিতে জড়িত লোকজন ভয় দেখিয়ে প্রতিটি টিকার জন্য ২০ টাকা, কোথাও কোথাও ৩০ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন। অথচ উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা নিজেই স্বীকার করেন, একটি টিকার দাম ৮০ পয়সা। পাশের রংপুর জেলার পীরগাছা থেকে রোগটি উপজেলায় ছড়িয়ে পড়ার সময় ২০২৫ সালের ৪ অক্টোবর জাগো নিউজ ২৪ এই অভিযোগের খবর প্রকাশ করে। প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বলেন, আনুষঙ্গিক খরচ মেটাতে পশুপ্রতি ১০ টাকা নিতে বলা হয়েছে, এর বেশি কেউ নিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

পশুর মালিকেরা পত্রিকাটিকে বলেন, এই দুঃসময়ে কর্মকর্তারা সেবা দিতে নয়, টাকা নিতে এসেছেন; তাঁদের দাবি, এভাবে চললে টিকাদানে জড়িতদের পকেটে অর্ধকোটি টাকার বেশি চলে যাবে। তাঁরা টিকাদানকর্মীদের মানবিক হওয়ার আহ্বান জানান। প্রাণিসম্পদ দপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়, কোনো মালিককে ভয় না দেখাতে এবং কেউ টাকা দিতে না পারলেও তাঁর পশুকে টিকা দিতে কর্মীদের নির্দেশ দেওয়া আছে।

পশুর মালিকদের অভিযোগ


প্রতিবেদনে বলা হয়, রোগ ছড়ানোর খবর প্রকাশের পর সুন্দরগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন জরুরি এক বৈঠকে গবাদিপশুকে টিকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, এবং তখন থেকে টিকাদান চলছিল। মালিকদের অভিযোগ, নানা কৌশল ও হয়রানির ভয় দেখিয়ে ৮০ পয়সার টিকার জন্য ২০ থেকে ৩০ টাকা নেওয়া হচ্ছিল। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, সচেতনতার কোনো প্রচারণা না থাকায় তখনও ৯০ শতাংশ গবাদিপশু টিকার বাইরে ছিল।

বামনডাঙ্গা ইউনিয়নের ফলগাছা গ্রামের দিনমজুর মো. সজিব মিয়ার চারটি গরু ও দুটি ছাগল আছে। তিনি জানান, দুজন লোক এসে তাঁকে পশুগুলোকে টিকা দেওয়াতে বলেন। দাম জানতে চাইলে তাঁরা বলেন ২০ টাকা। কম রাখতে বললে তাঁরা বলেন, প্রাণিসম্পদ অফিসে এই টিকার দাম আরও বেশি রাখবে, আর তখন তাঁদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। সজিব মিয়ার ভাষায়, "পরে ভয়ে আমি ২০ টাকা দিয়ে ভ্যাকসিন রাখি।" তিনি পত্রিকাটিকে জানান, দুটি ছাগলের জন্য ৫ টাকা করে মোট ১০ টাকা এবং চারটি গরুর জন্য ২০ টাকা করে মোট ৮০ টাকা নেওয়া হয়েছে।

টকই গ্রামের ভ্যানচালক মো. ফুল মিয়া (৫২) বলেন, কয়েকজন লোক মোটরসাইকেলে এসে তাঁকে টিকা দেওয়াতে বলেন। দাম জানতে চাইলে তাঁরা বলেন ২০ টাকা, আর এই দামেই সবাই টিকা নিচ্ছে। পরে তিনি ২০ টাকা দিয়ে একটি টিকা নেন।

মালিকেরা যে অঙ্কের কথা বলছিলেন, তার ভিত্তি ছিল কর্মসূচির আকার: উপজেলার প্রায় আড়াই লাখ গবাদিপশুর মধ্যে প্রায় ২ লাখকে টিকা দেওয়ার কথা। তাঁদের দাবি, এই হারে টাকা নেওয়া চলতে থাকলে টিকাদানে জড়িতরা তাঁদের কাছ থেকে অর্ধকোটির বেশি টাকা নিয়ে যাবেন।

টিকাদানকর্মী ও কর্মকর্তাদের বক্তব্য


পশুর মালিক সেজে জাগো নিউজের প্রতিবেদক টিকাদানকর্মী চন্দন কুমার রায়ের সঙ্গে কথা বলেন। তিনি বলেন, 'পশুপ্রতি ২০ টাকা করে ভ্যাকসিনে নিচ্ছি। এ টাকা আমাদের অফিসে জমা দিতে হয়।'

উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. বিপ্লব কুমার দে গরুপ্রতি টিকার দাম ৮০ পয়সা বলে স্বীকার করেন। তবে তিনি বলেন, আনুষঙ্গিক কিছু খরচ থাকায় ১০ টাকা করে নিতে বলা হয়েছে, এর বেশি নিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, কোনো মালিককে ভয় না দেখাতে এবং কেউ টাকা দিতে অক্ষম হলেও তাঁর পশুকে টিকা দিতে নির্দেশনা দেওয়া আছে।

তিনি পত্রিকাটিকে কর্মসূচির হিসাবও দেন। তখন পর্যন্ত ২৬ হাজার ৪০০ ডোজ টিকা এসেছিল, যার মধ্যে ২২ হাজার দেওয়া হয়েছিল; বাকিগুলো দিয়ে টিকাদান চলছিল। নতুন করে ৫০ হাজার ডোজ টিকা চেয়ে আবেদন পাঠানো হয়েছিল। উপজেলায় প্রায় আড়াই লাখ গবাদিপশু আছে, এর মধ্যে ২ লাখ টিকা পাবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাজ কুমার বিশ্বাস বলেন, টিকাপ্রতি কত টাকা নেওয়া যাবে, তা প্রাণিসম্পদ বিভাগ ভালো বলতে পারবে। তাঁর কথায়, "আমি যতটুকু জানি তাতে টিকাপ্রতি ১০ টাকা করে নিচ্ছেন তারা। তবে এটা তাদের সিদ্ধান্ত, এখানে আমাদের বলার কিছু নেই।" উল্লেখ্য, পয়সা টাকার শত ভাগের এক ভাগ; কর্মকর্তা টিকার দাম এই এককেই বলেছেন।

যেভাবে রোগটি সুন্দরগঞ্জে পৌঁছায়


সুন্দরগঞ্জ রংপুরের পীরগাছা উপজেলার লাগোয়া, যেখানে প্রথম এই প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। জাগো নিউজের ৪ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়, পীরগাছায় অ্যানথ্রাক্সে দুজন মারা গেছেন এবং সাতজন আক্রান্ত; রোগের জীবাণু মূলত গবাদিপশুর মাংস থেকে ছড়ায়; সুন্দরগঞ্জে তখন পর্যন্ত শতাধিক গরু মারা গেছে; আক্রান্ত গরু তখনও জবাই হচ্ছিল, আর সেসব গরুর মাংস কেটে প্রায় অর্ধশত মানুষ অসুস্থ হয়েছেন।

এর দুই দিন আগে, ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর, বার্তা সংস্থা ইউএনবি জানায়, রোগটি পীরগাছা থেকে মিঠাপুকুর ও কাউনিয়া উপজেলায় ছড়িয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ইউএনবিকে বলেন, পীরগাছায় ১৩ জনের অ্যানথ্রাক্স শনাক্ত হয়েছে, আর সেখানে জুলাই ও সেপ্টেম্বরে রোগের উপসর্গ নিয়ে দুজন মারা যান। সরকারের রোগ নজরদারি প্রতিষ্ঠান রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) একটি দল ১৩ ও ১৪ সেপ্টেম্বর পীরগাছা সদর ও পারুল ইউনিয়নের ১৮ জন সন্দেহভাজন রোগীর নমুনা নেয়, যার ১৩টিতে সংক্রমণ ধরা পড়ে। আইইডিসিআরের একটি সূত্র ইউএনবিকে জানায়, হিমায়িত গরুর মাংসের নমুনাতেও অ্যানথ্রাক্সের স্পোর পাওয়া গেছে, আর একজন রোগী সংক্রমিত ছাগলের মাংসের সংস্পর্শে এসে আক্রান্ত হন। দেউতি, পূর্ব পারুল ও আনন্দী ধনীরামের মতো গ্রামের বাসিন্দারা জানান, আগের দুই মাসে অ্যানথ্রাক্সে ১৫০টির বেশি গরু মারা গেছে।

একই সকালে ইউএনবির আরেকটি প্রতিবেদন, যা প্রথম আলোর ইংরেজি সংস্করণে প্রকাশিত হয়, জানায়, নতুন চারজন শনাক্ত হওয়ায় নিশ্চিত সংক্রমণ বেড়ে ১৭ জনে দাঁড়িয়েছে: কাউনিয়ায় দুজন, পীরগাছায় একজন ও মিঠাপুকুরে একজন। রংপুরের সিভিল সার্জন বলেন, ২৩ জন সন্দেহভাজন রোগীর মধ্যে ১৭ জনের পরীক্ষায় সংক্রমণ ধরা পড়েছে। রংপুরের জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ইউএনবিকে জানান, ২৬ আগস্ট থেকে পীরগাছা, কাউনিয়া, মিঠাপুকুর ও রংপুর সদরে ১ লাখ ৬৫ হাজারের বেশি গরু, ছাগল ও ভেড়াকে টিকা দেওয়া হয়েছে, এবং মসজিদ, মন্দির ও হাটবাজারে সচেতনতা কার্যক্রম চলছে। বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ পরিচালক বলেন, জনবলসংকট বড় চ্যালেঞ্জ, পরিদর্শনে সহায়তার জন্য স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত করা হচ্ছে।

সুন্দরগঞ্জের পরিস্থিতি নিয়ে জাগো নিউজ ৪ অক্টোবর ভোরে জানিয়েছিল, উপজেলার সাতজন অ্যানথ্রাক্সের উপসর্গ নিয়ে ৩ অক্টোবর সন্ধ্যায় গাইবান্ধা শহরের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চিকিৎসা নিতে আসেন, আর সেখানকার চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ তাঁদের গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। গাইবান্ধার সিভিল সার্জন পত্রিকাটিকে বলেন, কয়েক দিন আগে বেলকা ইউনিয়নের কিশামত গ্রামে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত একটি গরু জবাই করা হয়; সেই মাংস কাটাকাটি করে গ্রামের কয়েকজন আক্রান্ত হন এবং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন। তিনি জানান, সংক্রমণের লক্ষণ চর্মরোগ; কারও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হবে। গ্রামবাসীরা জানান, প্রায় ১১ জন চিকিৎসা নিয়েছেন, আর স্থানীয় এক ইউপি সদস্য বলেন, গরুটি জবাইয়ের চার দিন পর কয়েকজনের শরীরে উপসর্গ দেখা দেয়।

উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর পত্রিকাটিকে জানায়, বামনডাঙ্গা, সর্বানন্দ, তারাপুর ও বেলকা ইউনিয়ন এবং পৌরসভা এলাকায় রোগটি দেখা দিয়েছে, এবং সর্বানন্দ, বামনডাঙ্গা, তারাপুর ও পৌরসভায় এরই মধ্যে টিকা দেওয়া হয়েছে। উপজেলা ভেটেরিনারি সার্জন বলেন, পৌরসভায় দুটি গরু মারা গেছে, দপ্তরে ১৩ হাজার ডোজ টিকা আছে এবং আরও চাহিদা পাঠানো হয়েছে। দপ্তর সতর্ক করে, আক্রান্ত পশুর পরিচর্যা করলে বা জবাই করে মাংস কাটাকাটি করলে মানুষও আক্রান্ত হতে পারে, তাই অসুস্থ গরু-ছাগল কোনো অবস্থাতেই জবাই করা যাবে না।

গাইবান্ধা জেলায় তিস্তা নদীতে বাঁধা একটি নৌকা; তিস্তা সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোর একটি। ছবি: ইব্রাহিম হুসাইন মেরাজ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)
গাইবান্ধা জেলায় তিস্তা নদীতে বাঁধা একটি নৌকা; তিস্তা সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীগুলোর একটি। ছবি: ইব্রাহিম হুসাইন মেরাজ / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)

সুন্দরগঞ্জ ও এর কৃষিনির্ভর পরিবার


সুন্দরগঞ্জ রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা জেলার একটি উপজেলা। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ প্রকাশিত জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, এর আয়তন ৩৬৯.৮৫ বর্গকিলোমিটার; উত্তরে পীরগাছা, উলিপুর ও চিলমারী উপজেলা এবং পশ্চিমে পীরগাছা, মিঠাপুকুর ও সাদুল্লাপুর। প্রধান নদী তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র ও ঘাঘট। থানাটি গঠিত হয় ১৮৭৫ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৪ সালে। এখানে একটি পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়ন আছে, যার মধ্যে বামনডাঙ্গা, বেলকা, তারাপুর ও সর্বানন্দে রোগটি দেখা দেওয়ার খবর মেলে। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে উপজেলার জনসংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৬১ হাজার ৯২০।

এখানকার মানুষের প্রধান জীবিকা কৃষি। আদমশুমারির তথ্য উদ্ধৃত করে বাংলাপিডিয়া জানায়, ৭৫.২৩ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি; প্রধান ফসল ধান, পাট, গম, পেঁয়াজ, রসুন, তামাক, আখ, সরিষা ও ভুট্টা। উপজেলায় ৫৫টি হাটবাজার আছে, যার মধ্যে মীরগঞ্জ হাট, পাঁচপীর হাট, শোভাগঞ্জ হাট, বেলকা হাট ও বামনডাঙ্গা বাজার উল্লেখযোগ্য। আছে একটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, যেখানে বেলকার রোগীরা চিকিৎসা নেন।

যেখান থেকে প্রাদুর্ভাব শুরু, রংপুর জেলার সেই প্রতিবেশী উপজেলা পীরগাছার আয়তন ২৬৬.৮৪ বর্গকিলোমিটার, ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল ৩ লাখ ১৩ হাজার ৩১৯। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, সেখানকার ৭০.০৬ শতাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, আর দেওতি হাট ও পারুল হাট সেখানকার হাটগুলোর মধ্যে রয়েছে।

এমন পরিবারের কাছে গবাদিপশু বড় সম্পদ। সরকারের প্রাণিস্বাস্থ্য ও টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনাকারী প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর তাদের 'লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২০২৪' প্রকাশনায় হিসাব দিয়েছে, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে দেশে গরু ছিল ২৫০.১৩ লাখ, মহিষ ১৫.২৪ লাখ, ভেড়া ৩৯.০৩ লাখ ও ছাগল ২৭১.১৭ লাখ; সব মিলিয়ে রোমন্থক প্রাণী ৫৭৫.৫৭ লাখ। অধিদপ্তরের হিসাবে স্থিরমূল্যে জিডিপিতে প্রাণিসম্পদের অবদান ১.৮০ শতাংশ, কৃষি জিডিপিতে অংশ ১৬.৩৩ শতাংশ; এ খাতে প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থান ২০ শতাংশ এবং আংশিক কর্মসংস্থান ৫০ শতাংশ।

গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুরের একটি গ্রাম। ছবি: খায়রুজ্জামান / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার চণ্ডীপুরের একটি গ্রাম। ছবি: খায়রুজ্জামান / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৩.০)

অ্যানথ্রাক্স কী


বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউওএএইচ) জানায়, অ্যানথ্রাক্স হয় স্পোর তৈরিকারী ব্যাকটেরিয়া ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস থেকে, আর এর বিষাক্ত পদার্থই (টক্সিন) অসুস্থতার কারণ। রোগটির নাম এসেছে কয়লার গ্রিক প্রতিশব্দ থেকে, কারণ মানুষের ত্বকে এটি মাঝখানে কালো রঙের ঘা তৈরি করে। অক্সিজেনের সংস্পর্শে এলে ব্যাকটেরিয়া স্পোর তৈরি করে, আর সেই স্পোর অত্যন্ত টেকসই: মাটিতে কয়েক দশক টিকে থাকতে পারে, এবং ভেজা আবহাওয়া বা গভীর চাষে সুপ্ত স্পোর মাটির ওপরে উঠে আসতে পারে।

রোগটি মূলত গৃহপালিত ও বন্য তৃণভোজী প্রাণীর, তবে বেশির ভাগ স্তন্যপায়ী ও কয়েক প্রজাতির পাখিও আক্রান্ত হয়। ডব্লিউওএএইচ বলছে, অ্যানথ্রাক্স সাধারণত এক প্রাণী থেকে আরেক প্রাণীতে বা এক মানুষ থেকে আরেক মানুষে ছড়ায় না। প্রাণী সাধারণত মাটি বা খাবারের সঙ্গে স্পোর খেয়ে আক্রান্ত হয়; শ্বাসের সঙ্গে বা কাটা জায়গা দিয়েও স্পোর ঢুকতে পারে। মাংসাশী প্রাণী ও মানুষ আক্রান্ত প্রাণীর মাংস খেয়ে সংক্রমিত হতে পারে।

গরু, ছাগল ও ভেড়ার ক্ষেত্রে রোগটি প্রায়ই এত দ্রুত এগোয় যে পশুটিকে হঠাৎ মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ডব্লিউওএএইচের তালিকায় লুটিয়ে পড়ার আগের লক্ষণ হিসেবে আছে তীব্র জ্বর, মাংসপেশির কাঁপুনি ও শ্বাসকষ্ট; শরীরের বিভিন্ন ছিদ্র দিয়ে জমাট না বাঁধা রক্ত বেরোতে পারে, আর মৃত্যুর পর দেহ শক্ত না-ও হতে পারে। অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করে, তবে রোগের গতি প্রায়ই এত দ্রুত যে পশুর চিকিৎসার সুযোগই থাকে না।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ও ডব্লিউওএএইচ যৌথভাবে প্রকাশিত আন্তর্জাতিক নির্দেশিকা 'অ্যানথ্রাক্স ইন হিউম্যানস অ্যান্ড অ্যানিমেলস' (চতুর্থ সংস্করণ, ২০০৮) বলছে, অ্যানথ্রাক্স নিয়ন্ত্রণ শুরু হয় গবাদিপশুর মধ্যে রোগ নিয়ন্ত্রণ দিয়ে, আর দীর্ঘদিন ধরে গবাদিপশুর টিকাদানই নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির কেন্দ্রবিন্দু। নির্দেশিকায় আরও বলা হয়েছে, মানুষের মধ্যে রোগ নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করে প্রাণিস্বাস্থ্য ও জনস্বাস্থ্যের নজরদারি একসঙ্গে চালানোর ওপর, যেখানে দুই খাত নিয়মিত পরস্পরকে রোগের খবর জানাবে।

অণুবীক্ষণ যন্ত্রে গ্রাম স্টেইনিংয়ের পর দেখা অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস। ছবি: সিডিসি / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)
অণুবীক্ষণ যন্ত্রে গ্রাম স্টেইনিংয়ের পর দেখা অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু ব্যাসিলাস অ্যানথ্রাসিস। ছবি: সিডিসি / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

মানুষ যেভাবে আক্রান্ত হয়, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের পরামর্শ


মানুষের অ্যানথ্রাক্স প্রধানত তিন ধরনের: ত্বকের মাধ্যমে (কিউটেনিয়াস), খাবারের মাধ্যমে (গ্যাস্ট্রোইনটেস্টিনাল) এবং শ্বাসের সঙ্গে স্পোর ঢুকে (ইনহেলেশনাল)। ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকা অনুযায়ী, বিশ্বে মানুষের অ্যানথ্রাক্সের ৯৫ শতাংশের বেশি ত্বকের ধরন। এর ঘা, যাকে এসকার বলা হয়, সাধারণত শরীরের খোলা অংশে দেখা দেয় এবং চারপাশ বেশ ফুলে যায়; সংক্রমণ থেকে উপসর্গ দেখা দিতে কয়েক ঘণ্টা থেকে তিন সপ্তাহ লাগতে পারে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দুই থেকে ছয় দিন। আক্রান্ত মাংস খেলে মুখ-গলায় বা অন্ত্রে ঘা হতে পারে, সাধারণত তিন থেকে সাত দিনের মধ্যে।

ডব্লিউওএএইচ জানায়, মানুষের বেশির ভাগ সংক্রমণ হয় আক্রান্ত পশুর মৃতদেহ বা চামড়া, লোম, মাংস ও হাড়ের মতো পশুজাত পণ্য নাড়াচাড়া করে; ঝুঁকিতে থাকেন পশুচিকিৎসক, কৃষিশ্রমিক, খামারি ও কসাই। জীবাণুটির ত্বকে ঢুকতে সাধারণত কাটা বা আঁচড়ের দাগ লাগে। যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি) ত্বকের অ্যানথ্রাক্সকে বর্ণনা করেছে ব্যথাহীন একটি ঘা হিসেবে, যা সাধারণত মুখ, ঘাড়, বাহু বা হাতে হয় এবং যার মাঝখানটা কালো; সংস্থাটি বলছে, অ্যানথ্রাক্স এক মানুষ থেকে আরেক মানুষে ছড়ায় না।

ইউএনবির উদ্ধৃত স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরাও রংপুরের প্রাদুর্ভাব নিয়ে একই কথা বলেন: আক্রান্ত পশু বা এর মাংস, রক্ত, চামড়া ও হাড়ের সংস্পর্শে রোগটি মানুষের মধ্যে আসে, মানুষ থেকে মানুষে নয়, আর সাধারণত ত্বকে ঘা ও ক্ষত তৈরি করে। রংপুরের ডেপুটি সিভিল সার্জন বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবায়োটিক মজুত আছে এবং রোগী দ্রুত এলে চিকিৎসা কার্যকর হয়; তবে রোগটি যেহেতু গবাদিপশু থেকে আসে, প্রতিরোধ নির্ভর করে প্রাণিচিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর।

ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকা বলছে, যথাসময়ে রোগ নির্ণয় হলে অ্যানথ্রাক্সের যেকোনো ধরনই চিকিৎসাযোগ্য। প্রাকৃতিকভাবে সংস্পর্শে আসার আশঙ্কা থাকলে, যেমন অসুস্থ পশুর মাংস নাড়াচাড়া করলে, নির্দেশিকার পরামর্শ হলো চিকিৎসাকর্মীদের জানানো এবং শরীরে, বিশেষ করে খোলা ত্বকে, ফুসকুড়ি, ব্রণ বা ফোড়ার মতো ঘা দেখা দিলে কিংবা ফ্লুর মতো উপসর্গ হলে সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া। এমন অবস্থায় দেরি না করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

গবাদিপশুর টিকা এবং এর সঠিক ব্যবহার


ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকা অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ব্যবহৃত বেশির ভাগ পশু-অ্যানথ্রাক্স টিকা জীবন্ত স্পোরের টিকা, যার ভিত্তি ১৯৩০-এর দশকে ম্যাক্স স্টার্ন একটি গরু থেকে পাওয়া জীবাণু থেকে তৈরি করা ৩৪এফ২ স্ট্রেইন। এক ডোজের সুরক্ষা প্রায় এক বছর থাকে বলে ধরা হয়, তাই যেসব এলাকায় রোগটি বারবার ফেরে, সেখানে গবাদিপশুকে প্রতিবছর বুস্টার দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। টিকাটির রোগ সৃষ্টির ক্ষমতা কমানো, পুরোপুরি শূন্য নয়: মাত্রার বেশি দেওয়া বিপজ্জনক, আর ছাগল বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় বিশেষভাবে সংবেদনশীল বলে মনে হয়, তাই ছাগলের ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা দরকার। জীবন্ত জীবাণু হওয়ায় কোনো কোনো দেশে সরকারি প্রাণিচিকিৎসা দপ্তরের অনুমোদন ছাড়া এটি ব্যবহার করা যায় না।

নির্দেশিকা বলছে, প্রাদুর্ভাবের সময় সমান ঝুঁকিতে থাকা পশুদের টিকা দিতে হবে; আক্রান্ত দল থেকে তাদের আলাদা রাখা সম্ভব না হলে কিংবা একাধিক পশু আক্রান্ত হলে প্রতিবেশী পাল ও খামারের পশুকেও টিকা দিতে হবে, আর আক্রান্ত খামার থেকে এক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত বলয় আকারে টিকা দেওয়ার প্রয়োজন হতে পারে। টিকা দেওয়া পশু মাংসের জন্য জবাই করার আগে একটি নির্দিষ্ট অপেক্ষাকাল পার করতে হয়, যা টিকার লেবেলে লেখা থাকে এবং তিন থেকে ছয় সপ্তাহ পর্যন্ত হয়। তবে স্টার্ন ৩৪এফ২ টিকা দেওয়া গাভীর দুধের ক্ষেত্রে কোনো অপেক্ষাকাল নেই, আর নির্দেশিকায় বলা হয়েছে, এই টিকা দেওয়া পশুর পণ্য খেয়ে মানুষের অসুস্থ হওয়ার কোনো জানা খবর নেই।

বাংলাদেশ নিজেই এই টিকা তৈরি করে। ২০১৩ সালে প্রকাশিত এক গবেষণায় ঢাকার প্রাণিসম্পদ গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (লাইভস্টক রিসার্চ ইনস্টিটিউট) কর্মকর্তারা গবেষকদের জানান, সরকারের দুটি পরীক্ষাগারে অ্যানথ্রাক্সের টিকা তৈরি হয়; বছরে লক্ষ্য ৫১ লাখ ডোজ, কিন্তু ২০০৪ সালের জুলাই থেকে ২০১০ সালের জুন পর্যন্ত গড় উৎপাদন ছিল বছরে ৩৮ লাখ ডোজ, যেখানে দেশে তখন রোমন্থক প্রাণী ছিল প্রায় ৪ কোটি ৮৭ লাখ। টিকা বিতরণ ও প্রয়োগের এখতিয়ার ছিল কেবল সরকারি প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের।

ঈদুল আজহার আগে ঢাকায় ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল; অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয় এবং সুন্দরগঞ্জের টিকাদানের আওতায় ছিল যেসব পশু, ছাগল তাদের অন্যতম। ছবি: রাগিব হাসান / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)
ঈদুল আজহার আগে ঢাকায় ব্ল্যাক বেঙ্গল ছাগল; অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয় এবং সুন্দরগঞ্জের টিকাদানের আওতায় ছিল যেসব পশু, ছাগল তাদের অন্যতম। ছবি: রাগিব হাসান / উইকিমিডিয়া কমন্স (সিসি বাই-এসএ ৪.০)

টিকার টাকা ও প্রাদুর্ভাব নিয়ে আগের গবেষণা যা বলেছিল


সুন্দরগঞ্জের অভিযোগ নতুন নয়। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) ও আইইডিসিআরের গবেষকেরা ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে ২০১০ সালের অক্টোবর পর্যন্ত অ্যানথ্রাক্সের ১৪টি প্রাদুর্ভাব তদন্ত করেন, যাতে ১৪টি গ্রামে ১৪০টি পশু ও ২৭৩ জন মানুষ আক্রান্ত হয়। এসব প্রাদুর্ভাবের পেছনের পরিস্থিতি নিয়ে তাঁদের গবেষণা ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর 'ইনফেকশন ইকোলজি অ্যান্ড এপিডেমিওলজি' সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়।

গবেষণায় দেখা যায়, সরকার ১০০ ডোজের একটি শিশির জন্য প্রায় ৫০ টাকার কমানো দাম নির্ধারণ করে দিলেও গবেষণা এলাকার প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা বাড়তি খরচ মেটাতে কৃষকদের কাছ থেকে প্রতি ডোজে অনানুষ্ঠানিকভাবে ১০ টাকা বেশি নিতেন। কৃষকেরা প্রায়ই টাকা দিতে চাইতেন না, কারণ তাঁদের বিশ্বাস ছিল সরকারের দেওয়া টিকা বিনা মূল্যে পাওয়ার কথা; কেউ কেউ আবার ভয় পেতেন, দুধেল গাভীকে টিকা দিলে দুধ কমে যাবে। কর্মকর্তারা গবেষকদের জানান, তাঁদের দৈনিক সর্বোচ্চ প্রায় ৩০ টাকার যাতায়াত ভাতায় দূরের গ্রামে যাওয়ার খরচ ওঠে না।

টিকার সরবরাহ ও জনবল দুটিই ছিল কম। আক্রান্ত চারটি উপজেলায় প্রায় ৮ লাখ ৪৩ হাজার ২৯৭টি গরু ও ছাগল থাকলেও ২০০৯ সালের জুলাই থেকে ২০১০ সালের জুন পর্যন্ত সেখানে মাত্র ৪৬ হাজার ডোজ টিকা বিতরণ হয়, আর অ্যানথ্রাক্স, ক্ষুরারোগ, গলাফোলা ও বাদলা রোগের টিকা দেওয়ার দায়িত্ব ছিল মাত্র নয়জন প্রশিক্ষিত সরকারি টিকাদানকর্মীর। কর্মকর্তারা প্রাদুর্ভাবের পর সীমিত পরিসরে আক্রান্ত এলাকার চারপাশে বলয় আকারে টিকা দিতেন।

গবেষকেরা আরও দেখেন, আক্রান্ত গরু মরণাপন্ন হলে কৃষকেরা প্রায়ই মাংস খাওয়ার জন্য বাড়িতেই সেটি জবাই করতেন, নিজেরা খেতেন এবং প্রতিবেশীদের কাছে বিক্রি করতেন; চামড়া ব্যবসায়ীরা ফেলে দেওয়া মৃতদেহ থেকে চামড়া ছাড়িয়ে নিতেন; আর মৃতদেহ ও জবাইয়ের বর্জ্য ফেলা হতো খাদে, পানিতে বা খোলা মাঠে। গবেষকদের উপসংহার ছিল, এসব চর্চা আর সীমিত টিকাদান মিলে প্রাদুর্ভাব বারবার ফিরে আসার সুযোগ তৈরি করেছে। সম্প্রতি প্রাদুর্ভাব হয়েছে এমন এলাকায় বর্ষার ঠিক আগে পশুকে টিকা দেওয়ার পরামর্শ দেন তাঁরা।

জবাইয়ের আগে পরীক্ষা ও মৃত পশুর ব্যবস্থাপনা


ইউএনবির ২ অক্টোবরের প্রতিবেদনে রংপুর বিভাগজুড়ে দুর্বল তদারকির চিত্র উঠে আসে: অঞ্চলের ১ হাজার ৩০০ হাটবাজারে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৫০০ গরু-ছাগল জবাই হলেও প্রাণিচিকিৎসকের পরীক্ষা কদাচিৎ হয়, আর কোনো বাজারে আধুনিক কসাইখানা বা স্থায়ী প্রাণিচিকিৎসক নেই। আইনে জবাইয়ের আগে পশু পরীক্ষা এবং কসাইদের লাইসেন্স ও স্বাস্থ্য ছাড়পত্র নেওয়ার বিধান থাকলেও বেশির ভাগ ব্যবসায়ী অনুমতি ছাড়াই কাজ করেন। সুন্দরগঞ্জে ৩০টির বেশি জায়গায় প্রতিদিন ৬০ থেকে ৬৫টি গরু-ছাগল জবাই হয়; এক মাংস বিক্রেতা জানান, পরীক্ষা হয় কেবল পৌর বাজারে। ডা. বিপ্লব কুমার দে বলেন, প্রধান কসাইখানাগুলোতে পরিদর্শন নিশ্চিত করা হচ্ছে, তবে গ্রামীণ হাটে তা কার্যকর করা কঠিন বলে স্বীকার করেন। রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলায় ৬০ জনের বেশি ব্যবসায়ী লাইসেন্স ও স্বাস্থ্য পরীক্ষা ছাড়াই কাজ করছিলেন।

ডব্লিউওএএইচ বলছে, মৃত পশুর সঠিক নিষ্পত্তি অত্যন্ত জরুরি। অ্যানথ্রাক্সে মারা গেছে বলে সন্দেহ হলে পশুর মৃতদেহ কাটা বা খোলা যাবে না, কারণ অক্সিজেনের সংস্পর্শে জীবাণু স্পোর তৈরি করে। সব সংবেদনশীল পশুকে টিকা দেওয়া এবং সব মৃতদেহ নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত খামার বা বাড়িটি পৃথক (কোয়ারেন্টিন) রাখতে হবে; মৃতদেহ নিষ্পত্তির ভালো উপায় পুড়িয়ে ফেলা, নইলে গভীর গর্তে পুঁতে ফেলা, সঙ্গে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, জীবাণুমুক্তকরণ এবং পোকামাকড় ও ইঁদুর নিয়ন্ত্রণ। ডব্লিউএইচওর নির্দেশিকা পুড়িয়ে ফেলাকেই সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি বলেছে।

বাংলাদেশে কাজটি কেন কঠিন, ২০১৩ সালের গবেষণায় তা-ও বলা হয়েছে: দেশে মৃতদেহ পোড়ানোর ব্যবস্থা নেই, নিচু এলাকায় বর্ষার বন্যা পুঁতে ফেলার সুযোগ সীমিত করে, আর গরিব পরিবারের জন্য পোড়ানো ব্যয়বহুল। গবেষণায় আরও বলা হয়, জীবাণুটির বাতাস লাগে বলে না খোলা মৃতদেহে পচনের ফলে মৃত্যুর ৪৮ থেকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এর সক্রিয় কোষ মরে যায়; এ কারণেই ডব্লিউএইচও ও সিডিসি অ্যানথ্রাক্সে মৃত বলে সন্দেহ হওয়া পশুর মৃতদেহ না খোলার পরামর্শ দেয়।

ছবি: খালেক / উইকিমিডিয়া কমন্স (পাবলিক ডোমেইন)

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪ (৪ অক্টোবর ২০২৫ এবং একই দিনের আগের প্রতিবেদন), ইউএনবি (২ অক্টোবর ২০২৫), প্রথম আলো ইংরেজি (২ অক্টোবর ২০২৫), বিশ্ব প্রাণিস্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউওএএইচ), ডব্লিউএইচও, এফএও ও ডব্লিউওএএইচ: অ্যানথ্রাক্স ইন হিউম্যানস অ্যান্ড অ্যানিমেলস (২০০৮), যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধ কেন্দ্র (সিডিসি), ইসলাম ও সহকর্মী, ইনফেকশন ইকোলজি অ্যান্ড এপিডেমিওলজি (২০১৩), বাংলাপিডিয়া, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর (লাইভস্টক ইকোনমি অ্যাট আ গ্লান্স ২০২৩-২০২৪)

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

লাইভস্টক

সম্পর্কিত খবর

লাইভস্টক

ওজন কমানোর ওষুধে বদলাচ্ছে মার্কিন বাজার, চাহিদা বাড়ছে মুরগি আর অল্প পরিমাণ ভালো গরুর মাংসে

কোব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ব্রায়ান আর্নেস্ট বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চার পরিবারের একটিতে জিএলপি-১ ওষুধ সেবনকারী আছেন; তাঁরা আমিষবহুল মুরগি আর ছোট পরিমাণের ভালো মানের গরুর মাংস বেশি কিনছেন।

মিশিগান এজি টুডে৩১ অক্টোবর ২০২৬১ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

বন্যার আগেই সহায়তা: দক্ষিণ সুদানে এফএও ও ডব্লিউএফপিকে ২১ লাখ পাউন্ড দিল যুক্তরাজ্য

এল নিনোর সম্ভাব্য বন্যা ও খরার আগে জঙ্গলেই, ইউনিটি ও আপার নাইলে আগাম সতর্কতা, নগদ সহায়তা, জীবিকা সুরক্ষা ও ত্রাণসামগ্রী মজুতে এই অর্থ খরচ হবে ২০২৭ সালের মার্চ পর্যন্ত।

ডব্লিউএফপি৩১ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
লাইভস্টক

যুক্তরাষ্ট্রের ৫০০-র বেশি কাউন্টিতে বড় পশুর চিকিৎসকের সংকট

মন্টানায় এক তথ্যচিত্রের প্রদর্শনীতে পশুচিকিৎসকেরা বলেছেন, শিক্ষাঋণ, চেম্বার খোলার খরচ আর দিনরাত জরুরি ডাকের চাপে নতুন চিকিৎসকেরা গ্রামে যেতে চান না; একজন বাড়তি চিকিৎসকেই বদলেছে একটি ক্লিনিকের চিত্র।

নর্দার্ন এজি নেটওয়ার্ক৩১ অক্টোবর ২০২৬২ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)