সরকারি গুদামে খাদ্যশস্যের মজুত এখন প্রায় সক্ষমতার কাছাকাছি। এর মধ্যে ভিয়েতনাম থেকে আমদানি করা চালও দেশে আসতে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন আমন মৌসুমে সরকারের ধান-চাল সংগ্রহ কার্যক্রম কতটা হবে, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
একটি সূত্র বলছে, গুদামে জায়গার সংকট থাকায় এবার সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা কমানোর পাশাপাশি ধান-চালের সরকারি ক্রয়মূল্যও কমানোর পক্ষে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের একটি অংশ।
আবার খাদ্য মন্ত্রণালয়ের আরেকটি পক্ষ গত বছরের তুলনায় সামগ্রিক সংগ্রহ কমানোর পক্ষে নয়। তাদের মতে, প্রয়োজনে মিলমালিকদের কাছ থেকে সীমিত পরিমাণে চাল কেনা যেতে পারে। তবে কৃষকের স্বার্থ বিবেচনায় সরাসরি ধান সংগ্রহে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
এমন পরিস্থিতিতে আগামীকাল রোববার (৮ নভেম্বর) আমন মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ কমিটির (এফপিএমসি) সভা অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। খাদ্যমন্ত্রী আফরোজা খানমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় এ সভায় নয়জন মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রীর উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। সভায় আমন মৌসুমে ধান ও চালের সংগ্রহমূল্য এবং পরিমাণ চূড়ান্ত করা হবে।
গত বছর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আমন মৌসুমে মোট ৭ লাখ মেট্রিক টন ধান ও চাল সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে ১ লাখ টন ধান এবং ৬ লাখ টন চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। তবে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১ লাখ ৫৩ হাজার টন ধান কেনা হয়। অন্যদিকে ৬ লাখ টন চাল কেনার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে সংগ্রহ করা হয় ৯ লাখ টন।
চাল সংগ্রহে মিলমালিকদের বেশি আগ্রহের কারণ ছিল সরকার নির্ধারিত ক্রয়মূল্য। প্রতি কেজি সিদ্ধ চাল ৫০ টাকা এবং আতপ চাল ৪৯ টাকা দরে কেনা হয়েছিল। বিপরীতে প্রতি কেজি ধানের সংগ্রহমূল্য ছিল ৩৪ টাকা।
খাদ্য বিভাগের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, গত আমন ও বোরো মৌসুমে মিলমালিকরা সরকারের কাছে বিপুল পরিমাণ চাল বিক্রির সুযোগ পেয়েছিলেন। এতে তাদের অনেকেই ভালো মুনাফা করেছেন। ফলে সরকারি গুদামে এখন চালের মজুত অনেক বেশি।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, গতবার কৃষকরা ধানের ন্যায্যমূল্য থেকে অনেকটাই বঞ্চিত হয়েছেন। অন্যদিকে মিলমালিকরা তুলনামূলক বেশি লাভবান হয়েছেন। এবারও বেশি পরিমাণ চাল কেনার জন্য মিলমালিকরা খাদ্য বিভাগে চাপ তৈরি করছেন। তবে কর্মকর্তাদের একটি অংশ এবার চাল সংগ্রহের পরিমাণ কমানোর পক্ষে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) এক কর্মকর্তা বলেন, এবার চালের পরিবর্তে ধান সংগ্রহে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে। কারণ, সরকারি গুদামে চাল রাখার জায়গা সীমিত। এর মধ্যে বস্তার সংকটও রয়েছে। পাশাপাশি বিদেশ থেকে চাল আমদানি অব্যাহত আছে। তাই প্রয়োজনের অতিরিক্ত চাল সংগ্রহ না করাই ভালো হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি অংশ।
অন্যদিকে খাদ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক জামাল হোসেন বলেন, সামগ্রিক পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই আমন মৌসুমে ধান-চাল সংগ্রহের পরিমাণ নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে কৃষকরা যাতে বঞ্চিত না হন, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি গুদামে মোট ২১ লাখ ২২ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। অন্যদিকে সরকারি গুদামগুলোর কার্যকর ধারণক্ষমতা ২২ লাখ ৯৩ হাজার মেট্রিক টন। অর্থাৎ গুদামে এখন ধারণক্ষমতার প্রায় ৯৩ শতাংশ খাদ্যশস্য মজুত রয়েছে। ফলে নতুন করে বিপুল পরিমাণ চাল সংগ্রহ করা হলে সংরক্ষণ নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে সরকারি গুদামে জায়গা তৈরি করতে বিভিন্ন খাদ্য বিতরণ কর্মসূচির আওতা বাড়ানোর চিন্তা করছে খাদ্য বিভাগ।
জামাল হোসেন জানিয়েছেন, সরকারের চলমান কার্যক্রমগুলো শেষ হলে আগামী বছর ধারণক্ষমতা ২৬ লাখ টন হবে। আর এ সরকারের পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে ধারণক্ষমতা ৩০ লাখ টন করা হবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, গত বছর আমন মৌসুমে ১ কোটি ৭৩ লাখ ৫৯ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদিত হয়েছিল। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমেও ভালো ফলনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. জাহাঙ্গীর আলম খান বলেন, কৃষকরা যাতে ধানের ন্যায্যমূল্য পান, তা নিশ্চিত করা জরুরি। গুদামে জায়গার সংকট ও চালের বাড়তি মজুতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়েও সরকারকে এমন সংগ্রহনীতি নিতে হবে, যাতে কৃষকের স্বার্থ সুরক্ষিত থাকে।




মন্তব্য
(০)