সুন্দরবনের অসংখ্য গাছের মধ্যে কেওড়া অন্যতম পরিচিত একটি নাম, আর ২০২৬ সালের মে মাসের এক ফিচারে এটিকে বলা হয়েছিল আমলকীর মতোই প্রায় পুষ্টিসমৃদ্ধ এক বুনো ফল। কেওড়া একটি প্রকৃত ম্যানগ্রোভ, লবণাক্ত জোয়ার-ভাটার মাটির উদ্ভিদ, এবং বাংলাদেশ ও ভারতের ভাগাভাগি করা বিশাল ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের প্রধানতম গাছগুলোর একটি। এ গাছ সবচেয়ে বেশি জন্মায় বনের নদী-মোহনায়, অসংখ্য খালের কর্দমাক্ত কিনারায় এবং নতুন পলিতে গড়ে ওঠা চরাঞ্চলে। সুন্দরবনের বাইরে কেওড়া ছড়িয়ে পড়েছে দেশের উপকূলের লবণাক্ত বন-বাদাড়ে; কক্সবাজারের মহেশখালী ও চকরিয়ার বদরখালীসহ উপকূলীয় এলাকায় এর বাগান গড়ে উঠেছে। গোলাকার, টক স্বাদের সবুজ এই ফল উপকূলের মানুষ কাঁচা ও রান্না করে খায়, আর এর পলিফেনল ও খনিজ উপাদান গবেষকদেরও আগ্রহ টেনেছে। টক স্বাদের কারণে ফলটি হয়তো সবার পছন্দ নয়, তবু উপকূলের মানুষের কাছে এটি বহুদিনের চেনা এক মৌসুমি ফল। এই লেখায় কেওড়া গাছ, তার আবাস, ফুল ও ফল, পুষ্টি নিয়ে গবেষণা এবং উপকূলীয় বনায়নে এর ভূমিকার কথা একসঙ্গে দেখা হয়েছে।
কেওড়ার আবাস সুন্দরবন
কেওড়ার আদি ঠিকানা সুন্দরবন, যা পৃথিবীর বৃহত্তম একক জোয়ার-ভাটার লবণসহিষ্ণু ম্যানগ্রোভ বন। গঙ্গা-ব্রহ্মপুত্র বদ্বীপের যেখানে বাংলার নদীগুলো বঙ্গোপসাগরে মিশেছে, সেখানেই এর বিস্তার। এ বন এখন প্রায় ৬,০০০ বর্গকিলোমিটার, যার মধ্যে প্রায় ১,৭০০ বর্গকিলোমিটার জলভাগ, এবং এর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বাংলাদেশের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলায় পড়েছে। প্রায় ২০০ বছর আগে এ বন ছিল প্রায় ১৬,৭০০ বর্গকিলোমিটার, কালক্রমে তা অনেকটাই কমে এসেছে। 'সুন্দরবন' নামটি সম্ভবত এসেছে এর সবচেয়ে সাধারণ গাছ সুন্দরী থেকে, আর দীর্ঘদিন এ বন খুলনার নিউজপ্রিন্ট ও হার্ডবোর্ড কারখানার কাঁচামালেরও উৎস ছিল।
সুন্দরবন প্রায় ২০০টি দ্বীপের এক জটিল বিন্যাস, যেগুলোকে আলাদা করেছে প্রায় ৪০০টি পরস্পর-সংযুক্ত জোয়ার-নদী, খাঁড়ি ও খাল। ১৮৭৫ সালে একে সংরক্ষিত বন ঘোষণা করা হয়, বনটিকে ভাগ করা হয়েছে ৫৫টি কম্পার্টমেন্ট ও ৯টি ব্লকে, এর প্রায় ৩২,৪০০ হেক্টর তিনটি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, এবং ১৯৯৭ সালে এটি ইউনেসকোর বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা পায়। এর সবচেয়ে সাধারণ গাছ সুন্দরী (Heritiera fomes), গেওয়া (Excoecaria agallocha) ও কেওড়া (Sonneratia apetala); ১৯০৩ সালের এক জরিপেই বনটিতে ৩৩৪টি উদ্ভিদ প্রজাতি লিপিবদ্ধ হয়েছিল, যার মধ্যে এ অঞ্চলে পরিচিত ৫০টি প্রকৃত ম্যানগ্রোভের ৩৫টিই রয়েছে।
ম্যানগ্রোভ বলতে বোঝায় সেই লবণসহিষ্ণু গাছপালা, যারা জোয়ার-ভাটার নোনা কাদায় টিকে থাকার জন্য বিশেষভাবে অভিযোজিত; আর অগ্রপথিক (পাইওনিয়ার) প্রজাতি সেই গাছ, যা খালি বা নতুন জমিতে সবার আগে জন্মে পরবর্তী উদ্ভিদদের জন্য পথ তৈরি করে। এই বনে কেওড়া একটি অগ্রপথিক প্রজাতি: নতুন জমে ওঠা, মাঝারি থেকে প্রবলভাবে লবণাক্ত মাটিতে সবার আগে যে গাছগুলো জন্মে কেওড়া তাদের একটি। এটি দ্রুত বাড়ে, প্রবল আলো প্রয়োজন হয়, আর ঘন ঝাড়ে প্রতিবেশী যেকোনো গাছের চেয়ে উঁচু হয়ে ওঠে; এরপর বয়সের সঙ্গে ঝাড়টি দ্রুত ক্ষয়ে যায়। বঙ্গোপসাগরের বদলে যাওয়া চরে, যেখানে অবিরাম নতুন পলি জমে আবার ধুয়ে যায়, কেওড়াই প্রায়ই প্রথম শিকড় গাড়ে, আর নরম নতুন মাটিকে শিকড় দিয়ে বেঁধে রেখে সে জমিকে থিতু হতে ও অন্য গাছ জন্মাতে সাহায্য করে।
সুন্দরবনে প্রায় ৫০টি স্তন্যপায়ী প্রজাতি রয়েছে, আছে প্রায় ৩২০ প্রজাতির পাখি, প্রায় ৫০ প্রজাতির সরীসৃপ ও প্রায় ৪০০ প্রজাতির মাছ; নোনা জলের কুমিরের সংখ্যা আনুমানিক ২৫০, আর এ বন রয়েল বেঙ্গল টাইগারের শেষ শক্ত ঘাঁটি হিসেবেও পরিচিত। নোনা খালের এই জালই গাছপালার পাশাপাশি মাছ ধরা ও নানা জীবিকার ভিত্তি। এমন বৈচিত্র্যময় বাস্তুতন্ত্রেই কেওড়া বেড়ে ওঠে।
গাছ, শ্বাসমূল ও পাতা
কেওড়ার বৈজ্ঞানিক নাম Sonneratia apetala, গোত্র Lythraceae, যা অন্যান্য ম্যানগ্রোভ অ্যাপল গাছেরও গোত্র। এটি একটি উঁচু গাছে পরিণত হয়, উচ্চতায় প্রায় ২০ মিটার ও ঘেরে প্রায় ২.৫ মিটার, এবং ঘন ঝাড়ে এর থাকে একক সোজা কাণ্ড। পাতা সরল, বিপরীতমুখী ও চামড়ার মতো শক্ত, সরু ও লম্বাটে, অনেকটা তেজপাতার সদৃশ।
গাছের গোড়ার চারপাশে দেখা যায় অজস্র খাড়া শ্বাসমূল, যে পেনসিলের মতো মূলগুলো ম্যানগ্রোভ গাছ জলমগ্ন ও অক্সিজেন-দরিদ্র কাদার ভেতর থেকে বাতাস নিতে মাটির ওপর তুলে ধরে; কেওড়ার আত্মীয় Sonneratia প্রজাতিগুলোয় এই শঙ্কু-আকৃতির শ্বাসমূল দুই মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। কেওড়ার পাশেই সুন্দরবনে জন্মায় ম্যানগ্রোভ অ্যাপলের আরেক প্রজাতি ওড়া বা ছৈলা, আর দুটি গাছ প্রায়ই গলাগলি করে পাশাপাশি দাঁড়ায়। একই রকম অ্যাপল-আকৃতির ফলের জন্য Sonneratia গোত্রের বুনো প্রজাতিগুলোকে একত্রে ইংরেজিতে ম্যানগ্রোভ অ্যাপল বলা হয়। এই গোত্রের গাছে কাণ্ড প্রায় আধা মিটার পর্যন্ত চওড়া হতে পারে, আর কারও কারও ফল দেখতে পার্সিমন ফলের মতো। ম্যানগ্রোভ অ্যাপল গোত্রের গাছ পূর্ব আফ্রিকা থেকে গ্রীষ্মমণ্ডলীয় এশিয়া হয়ে উত্তর অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত বিস্তৃত।

ফুল, ফল ও সুন্দরবনের মধু
বসন্তে চিরসবুজ কেওড়া গাছে ছোট ছোট হালকা রঙের ফুল ফোটে; এসব ফুল উভয়লিঙ্গের এবং বাতাসে ভেসে আসা মৃদু সুবাস ছড়ায়। দেখতে ফুলগুলো অনেকটা নারীর ঝুমকো কানের দুলের মতো। ম্যানগ্রোভ অ্যাপল গোত্রের ফুল সাধারণত সন্ধ্যার দিকে ফোটে এবং রাতে পরাগায়ন হয়; এই গাছ মথসহ নানা পোকার খাদ্য-উৎস, আর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোথাও কোথাও Sonneratia গাছ জোনাকির ঝাঁক জড়ো হওয়ার জন্যও পরিচিত। ফুল ফোটার এই মৌসুম মৌমাছিদের জন্য উৎসব, আর বিশ্বখ্যাত সুন্দরবনের মধুর বড় অংশই আসে ম্যানগ্রোভ ফুলের মধু থেকে। বনের প্রধান মৌমাছি দানবাকৃতির Apis dorsata, আর মৌয়াল নামে পরিচিত পেশাদার মধু সংগ্রাহকেরা প্রতি মৌসুমে বন বিভাগের অনুমতি নিয়ে বাঘ ও কুমিরের ঝুঁকি মাথায় নিয়ে তিন থেকে চার মাস মধু সংগ্রহ করেন।
ফাল্গুনে ফুল ঝরে যাওয়ার পর চৈত্র-বৈশাখজুড়ে ধীরে ধীরে ফল গঠিত হয়, আর পাকা ফল আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টি পেরিয়ে আশ্বিন মাস পর্যন্ত পাওয়া ও খাওয়া যায়। ফল ছোট, গোলাকার ও ডুমুর-সদৃশ, সবুজাভ, এবং একটি ফলেই থাকে চমকপ্রদ সংখ্যক বীজ, প্রায় ২৫ থেকে ১২৫টি পর্যন্ত। ভেতরের শক্ত বীজ বাদে ওপরের সবুজ মাংসল অংশ টক স্বাদে ভরপুর। এই টক স্বাদই ফলটির পরিচয়, আর এ কারণেই এটি কাঁচা খাওয়ার পাশাপাশি টক রান্না, আচার ও চাটনিতে ব্যবহৃত হয়।
কারা খায় কেওড়া
কেওড়ার পাতা ও ফল সুন্দরবনের চিত্রা হরিণ ও রেসাস বানরের প্রিয় খাবার; এছাড়া কিছু পাখি ও মাছও ফল খায়। এই গাছ ঘিরে হরিণ ও বানরের মধ্যে একরকম নির্ভরতাও গড়ে ওঠে, কারণ উভয়ের কাছেই এর পাতা ও ফল লোভনীয়। এভাবে বনের খাদ্যজালে কেওড়া একটি গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দখল করে আছে। সুন্দরবন-লাগোয়া উপকূলীয় জনপদের মানুষ যুগ যুগ ধরে কেওড়া খেয়ে আসছে। তারা পাকা ফল কাঁচা খায়, আবার ডালের সঙ্গে ডিমওয়ালা চিংড়ি দিয়ে টক রান্না করে খায়; স্বল্প পরিসরে কেউ কেউ এ থেকে আচার ও চাটনিও বানায়।
অভ্যাসটি কেবল বাংলার নয়। Sonneratia গোত্রজুড়ে ম্যানগ্রোভ অ্যাপল বিভিন্ন দেশে খাওয়া হয়: মালদ্বীপে ফলটি কোরানো নারকেল ও চিনি দিয়ে খাওয়া হয়, আর শ্রীলঙ্কায় এর শাঁস নারকেলের দুধের সঙ্গে মিশিয়ে সতেজ পানীয় তৈরি হয়। এসব ব্যবহারই দেখায় কী করে অবহেলিত এক টক বুনো ফল দীর্ঘদিন ধরে উপকূলীয় খাদ্যের অংশ হয়ে আছে। রান্নাঘরের বাইরেও ম্যানগ্রোভ অ্যাপলের ব্যবহার আছে: দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোথাও কোথাও জেলেরা গাছটির নরম স্পঞ্জের মতো শ্বাসমূল কেটে জালের ভাসমান ফাতনা বানায়, যে কারণে এ গোত্রের গাছকে কখনও 'কর্ক ট্রি'ও বলা হয়।

পুষ্টিগুণ নিয়ে গবেষণা কী বলছে
২০২৬ সালের মে মাসের ওই ফিচারটি অবলম্বন করেছিল খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. শেখ জুলফিকার হোসেনের গবেষণার ওপর, যা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের রিসার্চ সেলের অনুদানে সুন্দরবনের বুনো ফুল-ফল নিয়ে পরিচালিত। সেই গবেষণা অনুসারে, চায়ের মতো কেওড়াতেও উপকারী ক্যাটেকিন ও নানা ধরনের পলিফেনল রয়েছে, আর দেশে পাওয়া ফলগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি পলিফেনল আমলকীতে, এরপরই কেওড়ার অবস্থান। আমলকী (Phyllanthus emblica) ভিটামিন সি ও পলিফেনলসমৃদ্ধ ফল হিসেবে সুপরিচিত, তাই পলিফেনলের বিচারে কেওড়াকে এর ঠিক পরেই রাখা একটি তাৎপর্যপূর্ণ তুলনা।
স্বতন্ত্র সমকক্ষ-পর্যালোচিত গবেষণাগুলোও একই দিকে ইঙ্গিত করে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) দেশের একটি রাষ্ট্রীয় বিজ্ঞান গবেষণা সংস্থা; তাদের ২০২৪ সালের একটি গবেষণা, যা PLoS One সাময়িকীতে প্রকাশিত, নোয়াখালীর হাতিয়ার কাছে মেঘনা মোহনার ম্যানগ্রোভ দ্বীপ নিঝুম দ্বীপ থেকে সংগৃহীত কেওড়া ফল এবং তা থেকে বানানো জ্যাম, জেলি ও আচার বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছে যে ফল ও এর পণ্যে রয়েছে প্রয়োজনীয় খনিজ সোডিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, ম্যাঙ্গানিজ, আয়রন, কপার ও জিংক, এবং প্রচলিত সাইট্রাস ফলের চেয়ে বেশি পরিমাণে ভিটামিন সি। ওই গবেষণায় ক্যাডমিয়াম, ক্রোমিয়াম, সিসা ও পারদের মতো ভারী ধাতু এবং ফ্লোরাইড, ক্লোরাইড, সালফেট ও ফসফেটের মাত্রাও নিরাপদ সীমার নিচে পাওয়া গেছে। ফলটির রাসায়নিক বিশ্লেষণে ক্যাটেকিন ও এপিক্যাটেকিনের মতো পলিফেনলের পাশাপাশি ফ্লাভোনয়েড ও ট্যানিনের উপস্থিতিও জানা গেছে।
পলিফেনল, ফ্লাভোনয়েড ও ক্যাটেকিন হলো উদ্ভিদে প্রাকৃতিকভাবে থাকা এক শ্রেণির যৌগ, যারা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে, অর্থাৎ কোষের ক্ষতিকর জারণ-প্রক্রিয়া ধীর করতে পারে; এ কারণেই পুষ্টিবিজ্ঞানে এসব যৌগ নিয়ে এত আগ্রহ। অন্যদিকে ভিটামিন সি দেহের টিস্যু গঠন ও মেরামত এবং স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধে প্রয়োজনীয় বলে স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, আর পটাশিয়াম, ক্যালসিয়াম, আয়রন, ম্যাগনেশিয়াম ও জিংক দেহের নানা স্বাভাবিক কাজের জন্য দরকারি খনিজ। এই খনিজ ও ভিটামিনগুলো সাধারণত শাকসবজি ও ফলমূল থেকে পাওয়া যায় এবং ভারসাম্যপূর্ণ খাদ্যের অংশ হিসেবেই দেহে কাজে লাগে।
ওই ২০২৪ সালের গবেষণাটি ব্যবহারিক দিকটিও দেখেছে। জ্যাম, জেলি ও আচারে প্রক্রিয়াজাত করা কেওড়া ফল গঠন ও স্বাদে ভালো নম্বর পেয়েছে, সংবেদন-মানদণ্ডে নয়ের মধ্যে প্রায় সাত থেকে আট, আর সংরক্ষণ-পরীক্ষায় পণ্যগুলো প্রায় এক বছর নিরাপদে টিকে থাকে। গবেষকদের হিসাব, গ্রামপর্যায়ে ছোট ছোট উদ্যোগে এমন পণ্য বানালে স্থানীয় অর্থনীতিতে বছরে প্রায় দশ হাজার মার্কিন ডলার যোগ হতে পারে। ২০২১ সালে ভারতের ওড়িশা উপকূলের অবহেলিত ম্যানগ্রোভ ফল নিয়ে Food Science and Biotechnology-তে প্রকাশিত একটি পর্যালোচনাতেও Sonneratia apetala-কে Aegiceras corniculatum ও Kandelia candel-এর পাশাপাশি পুষ্টিকর ম্যানগ্রোভ ফলগুলোর একটি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ম্যানগ্রোভ ফল উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ জৈব-সম্পদ, যা খাদ্যনিরাপত্তা ও জীবিকায় অবদান রাখে; অথচ কেওড়ার মতো অনেক পুষ্টিকর প্রজাতি এখনও অবহেলিত ও কম-গবেষিত থেকে গেছে, আর এগুলোর সংরক্ষণ ও বাণিজ্যিকীকরণ ভবিষ্যতে খাদ্য, ওষুধ ও পুষ্টির নিরাপত্তায় সহায়ক হতে পারে।
স্বাস্থ্য নিয়ে একটি সতর্কবার্তা
কেওড়ায় পাওয়া পলিফেনল ও ফ্লাভোনয়েড ধরনের উপাদান অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, এবং এ ধরনের উপাদান স্বাস্থ্যে সম্ভাব্য ভূমিকার জন্য ব্যাপকভাবে গবেষণার বিষয়; এ কারণেই গবেষকেরা ফলটিকে খাদ্য ও পুষ্টির দিক থেকে সম্ভাবনাময় বলছেন। তবে সম্ভাবনা আর প্রমাণিত ওষুধ এক নয়। কেওড়া একটি টক বুনো ফল, উপকূলীয় লোকজ ব্যবহারে এর দীর্ঘ ইতিহাস আছে, এবং কিছু গবেষণাগার-পরীক্ষায় ম্যানগ্রোভ ফলকে ডায়াবেটিস-প্রতিরোধীসহ নানা উপাদানের উৎস হিসেবে দেখা হয়েছে; কিন্তু এগুলো গবেষণার ফল, কোনো রোগের প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা নয়।
পাঠকের উচিত নয় কেওড়া কিংবা অন্য কোনো বুনো ফলকে রোগ নিরাময়ের উপায় ভাবা, আর ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতো কোনো সমস্যা থাকলে এর ওপর নির্ভর না করে যোগ্য চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা উচিত। যেকোনো অপরিচিত বুনো খাবারের মতোই গাছটি সঠিকভাবে চিনে নেওয়া এবং পরিমিত পরিমাণে খাওয়াই বিবেচনাপ্রসূত; কারণ ফলটি অম্ল ও টক স্বাদের। মনে রাখা ভালো, কোনো একক ফল নয়, বরং সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত পানি ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনই সুস্থ থাকার মূল ভিত্তি; কোনো উপসর্গ থাকলে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
উপকূলীয় বনায়নে কেওড়া
ফলের বাইরে কেওড়া আসলে বাংলাদেশের উপকূলীয় সবুজায়নের মেরুদণ্ড। দেশের ম্যানগ্রোভ বাগানে এটিই প্রধান রোপণ-প্রজাতি; নতুন জেগে ওঠা উপকূলীয় চরে রোপণ করা গাছের প্রায় ৯৫ শতাংশই কেওড়া, যা বর্ষায় প্রায় ১.৫ মিটার বাই ১.৫ মিটার দূরত্বে লাগানো হয়। বাংলাদেশে উপকূলীয় বনায়নের মূল লক্ষ্যই হলো নতুন জেগে ওঠা চর স্থিতিশীল করা, উপকূল ও সাগরের দ্বীপগুলোকে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করা এবং এসব এলাকায় নতুন বনভূমি গড়ে তোলা, আর এ কাজে কেওড়ার দ্রুত বৃদ্ধি ও লবণসহিষ্ণুতা একে বিশেষ উপযোগী করে তোলে। এসব বাগান উপকূল ও দ্বীপে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তোলে এবং নতুন জমিকে ধরে রাখে; সাগরের দ্বীপ ও নতুন জেগে ওঠা চরে এই সবুজ বেষ্টনী ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ধাক্কা অনেকটাই সামলে দেয়, আর তার আড়ালে ভেতরের জনপদ কিছুটা নিরাপদ থাকে।
কেওড়ার কাঠ প্যানেলিং, প্যাকিং বাক্স, আসবাব ও জ্বালানি কাঠে ব্যবহৃত হয়; অর্থাৎ ফল ও পরিবেশগত উপকারের পাশাপাশি গাছটির কাঠেরও অর্থনৈতিক মূল্য রয়েছে। ব্যবস্থাপনায় থাকা ঝাড়ে কাটার চক্র প্রায় ২০ বছর, বুক-সমান উচ্চতায় প্রায় ৩০ সেন্টিমিটার ন্যূনতম ব্যাস হলে তবেই গাছ কাটা হয়, আর ম্যানগ্রোভ বাগানের জন্য ১২ থেকে ১৫ বছরের আবর্তন উপযুক্ত ধরা হয়। গাছটির শত্রুও আছে: কেওড়া বিহোল বোরার নামের মথ Zeuzera conferta সুন্দরবনে এর সবচেয়ে গুরুতর পোকা, যা প্রথম ধরা পড়ে ১৯৮৩ সালে চর কাশেমে; এক জরিপে রোপিত ম্যানগ্রোভ এলাকায় প্রায় ৫২ শতাংশ গাছ আক্রান্ত পাওয়া যায়, প্রাকৃতিক সুন্দরবনে যা ছিল প্রায় ২২ শতাংশ।

বিস্তৃতি ও সুন্দরবনের বাইরে
কেওড়ার প্রাকৃতিক বিস্তৃতি ভারত, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারে। বাংলাদেশে এটি কেবল সুন্দরবনের গাছ নয়, উপকূলীয় বনায়নেরও প্রধান প্রজাতি; সম্প্রতি কক্সবাজারের মহেশখালী ও চকরিয়ার বদরখালীসহ লবণাক্ত উপকূলীয় এলাকায় এর বাগান গড়ে উঠেছে। নিজ প্রাকৃতিক এলাকার বাইরেও উপকূলীয় বনায়নের জন্য কেওড়া রোপণ করা হয়েছে, বিভিন্ন প্রতিবেদনে চীনেও এর উপস্থিতির কথা বলা হয়। লবণাক্ত কাদার পাশাপাশি মিষ্টি পানির পরিবেশেও কেওড়া বেঁচে থাকতে পারে, কেবল একটু বাড়তি পরিচর্যা দরকার হয়; ফলে শুধু সমুদ্র উপকূল নয়, কিছু অভ্যন্তরীণ স্যাঁতসেঁতে বা মৃদু লবণাক্ত জমিতেও গাছটি লাগানো সম্ভব বলে মনে করা হয়। এই সহিষ্ণুতা ও দ্রুত বৃদ্ধির কারণেই নতুন জেগে ওঠা জমি স্থিতিশীল করতে গাছটিকে বারবার বেছে নেওয়া হয়।
বেচাকেনায় নিষেধাজ্ঞা, তবু বাজারে বিক্রি
কেওড়া সুন্দরবনের গাছ হওয়ায় বনের কাঠের মতো এর ফলের বেচাকেনাও বাংলাদেশের বন আইনে সীমাবদ্ধ, ফলে ফলটি অবাধ পণ্য নয়। তবুও ফলের মৌসুমে উপকূলীয় হাট-বাজারে সাধারণত কেজিপ্রতি প্রায় ৩০ থেকে ৫০ টাকায় কিছু কেওড়া বিক্রি হতে দেখা যায়, আর এর বেশির ভাগই আসে সুন্দরবনের বদলে স্থানীয় বাগান থেকে। খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই গবেষক মনে করেন, উপকূলের অনাবাদি লবণাক্ত জমিতে কেওড়া ব্যাপকভাবে চাষ করা গেলে তা একদিকে আয়ের উৎস তৈরি করবে, পুষ্টির মাধ্যমে জনস্বাস্থ্যে সহায়ক হবে, অন্যদিকে ওইসব অঞ্চলের পরিবেশেরও উন্নতি ঘটাবে। তাঁর ও ফিচারটির মত, এর উপকার দেশজুড়ে ছড়িয়ে দিতে হলে জাতীয় পর্যায়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ দরকার, সঙ্গে প্রয়োজন গবেষণা ও জনসচেতনতা, যাতে এ প্রক্রিয়ায় সুন্দরবন নিজেই হরিলুট না হয়ে যায়।

ছবি: Amartyabag / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪; বাংলাপিডিয়া; বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর), PLoS One, ২০২৪; Food Science and Biotechnology, ২০২১





মন্তব্য
(০)