রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীতে ধরা পড়া ২ কেজি ওজনের একটি ইলিশ ২০২৬ সালের ৭ জুলাই মঙ্গলবার ৯ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে বলে সেদিন সকালে জাগো নিউজ জানায়। মাছটি কিনেছেন টাঙ্গাইলের এক ব্যক্তি, যিনি সৌদি আরবে থাকেন। দৌলতদিয়া ৫ নম্বর ঘাট এলাকার মাছ ব্যবসায়ী সম্রাট শাজাহান শেখ সকাল সাড়ে ৯টার দিকে এ তথ্য জানান।
বিক্রিটি একটি নদীঘাটে একটি মাছের, কিন্তু এর পেছনে আছে আরও বড় এক গল্প: ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ, ২০১৭ সালে দেশটি একে নিজস্ব ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধন করেছে, প্রজনন ও বেড়ে ওঠার সুযোগ দিতে সরকার প্রতিবছর কয়েক মাস এর আহরণ বন্ধ রাখে, আর এই প্রতিবেদনের আগের দুই বছরে দেশের নথিভুক্ত ইলিশ উৎপাদন কমেছিল।
মাছটি যেভাবে ধরা পড়ে ও নিলামে ওঠে
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার ভোররাতে পদ্মা নদীর দৌলতদিয়ার কুশাহাটা এলাকায় জাল ফেলেন জেলে সাগর হালদার ও তার সহযোগীরা। সকালে জাল তুলে তারা দেখেন, তাতে আটকা পড়েছে বড় আকৃতির একটি রুপালি ইলিশ।
মাছটি তারা দৌলতদিয়ায় দেলোয়ারের আড়তে নিয়ে আসেন। সেখানে ওজন করে দেখা যায়, মাছটির ওজন ২ কেজি। পরে আড়তে উন্মুক্ত নিলামে তোলা হয় মাছটি। দৌলতদিয়া ৫ নম্বর ফেরিঘাট এলাকার মাছ ব্যবসায়ী সম্রাট শাজাহান শেখ কেজিপ্রতি ৪ হাজার ৫০০ টাকা দরে মোট ৯ হাজার টাকায় মাছটি কিনে নেন।
একই ঘাটের আগের কয়েকটি প্রতিবেদনেও, যেগুলোর কথা নিচে আছে, একই ধাপ দেখা যায়: জেলেরা মাছ আড়তে আনেন, ক্রেতাদের সামনে ওজন করা হয়, উন্মুক্ত নিলামে সর্বোচ্চ দরদাতা মাছটি পান, তারপর সেই ব্যবসায়ী মাছটি আবার বিক্রি করেন, প্রায়ই ঢাকার কোনো ক্রেতার কাছে, আর এ ক্ষেত্রে অনলাইনে যোগাযোগ করে পাওয়া এক ক্রেতার কাছে।
অনলাইনে যোগাযোগ, ক্রেতা প্রবাসী
মাছ ব্যবসায়ী সম্রাট শাজাহান জানান, উন্মুক্ত নিলামে ইলিশটি কেনার পর তিনি অনলাইনে যোগাযোগ করে কেজিতে ১০০ টাকা লাভে, অর্থাৎ ৪ হাজার ৬০০ টাকা কেজি দরে, টাঙ্গাইলের ওই সৌদি আরব প্রবাসীর কাছে মাছটি বিক্রি করেন। প্রতিবেদনে মাছটির বিক্রয়মূল্য ৯ হাজার ২০০ টাকা বলা হয়েছে।
একই ক্রেতা ১ কেজি ৬০০ গ্রাম ওজনের আরেকটি ইলিশও নিয়েছেন। ব্যবসায়ী জানান, সেটি তিনি ৪ হাজার টাকা কেজি দরে কিনে ৪ হাজার ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করেছেন। মাছ দুটি কীভাবে পৌঁছানো হয়েছে বা ক্রেতার পক্ষে দেশে কে সেগুলো গ্রহণ করেছেন, প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি।
প্রতিবেদনে কেবল ব্যবসায়ীর বক্তব্য আছে। বিক্রির টাকায় জেলেদের ভাগ নিয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই, কোনো মৎস্য কর্মকর্তার নামও নেই।
দৌলতদিয়া ও গোয়ালন্দ: যেখানে পদ্মা বহন করে যমুনার প্রবাহ
এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, দৌলতদিয়া গোয়ালন্দ উপজেলার চারটি ইউনিয়নের একটি; বাকি তিনটি উজানচর, ছোট ভাকলা ও দেবগ্রাম। উপজেলাটির আয়তন ১২১.৮২ বর্গকিলোমিটার, প্রধান নদী পদ্মা ও পুরাতন কুমার। বাংলাপিডিয়া এর জনসংখ্যা দিয়েছে ১ লাখ ১২ হাজার ৭৩২। গোয়ালন্দ থানা গঠিত হয় ১৯২০ সালে, উপজেলা হয় ১৯৮৪ সালে। জ্ঞানকোষটি উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মধ্যে গোয়ালন্দ ফেরিঘাট ও গোয়ালন্দ লঞ্চঘাটের নাম দিয়েছে।
গোয়ালন্দ যে জেলার অংশ, সেই রাজবাড়ীর আয়তন ১ হাজার ৯২.২৮ বর্গকিলোমিটার। এর উত্তরে পাবনা, পূর্বে মানিকগঞ্জ, পশ্চিমে কুষ্টিয়া ও ঝিনাইদহ, দক্ষিণে ফরিদপুর ও মাগুরা। ২০১১ সালের আদমশুমারিতে জেলার জনসংখ্যা ছিল ১০ লাখ ৪৯ হাজার ৭৭৮। প্রধান নদী পদ্মা, গড়াই, চন্দনা ও চিত্রা। রাজবাড়ী জেলা হয় ১৯৮৪ সালে। বাংলাপিডিয়ার হিসাবে জেলার ৬০.৮৪ শতাংশ মানুষের আয়ের প্রধান উৎস কৃষি, ১৪.৩৬ শতাংশের বাণিজ্য; জেলার দর্শনীয় স্থানের মধ্যে গোয়ালন্দ ফেরিঘাটের নামও আছে।
বাংলাদেশে গঙ্গা দেশে প্রবেশের স্থান থেকেই পদ্মা নামে পরিচিত। বাংলাপিডিয়া গোয়ালন্দের ভাটির নদীকে বর্ণনা করেছে "গোয়ালন্দ ঘাটে মিলনের পর গঙ্গা ও যমুনার সম্মিলিত প্রবাহ" হিসেবে। মেঘনায় মেশার আগে নিম্ন পদ্মার এই অংশ প্রায় ১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ৪ থেকে ৮ কিলোমিটার চওড়া। রাজবাড়ীর তীরে দৌলতদিয়া তাই সেই অংশে, যেখানে দুই নদী সবে মিলেছে।
দৌলতদিয়া একটি ব্যস্ত নদী পারাপারেরও এক প্রান্ত। ওপারে মানিকগঞ্জের পাটুরিয়া; পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া ফেরিপথ চালায় বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশন (বিআইডব্লিউটিসি)। ২০২৬ সালের মার্চে করপোরেশনের এক উপমহাব্যবস্থাপক বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, এই পথে নিয়মিত ১২টি ফেরি চলে, ঈদের জন্য ১৭টি প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তিনি জানান, পদ্মা সেতু চালুর আগে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার যানবাহন ফেরিতে পার হতো, ঈদে তা বেড়ে হতো ৬ থেকে ৭ হাজার; এখন এই পথ ব্যবহার করে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ যানবাহন। পারাপারে চারটি ফেরিঘাট ও একটি লঞ্চঘাট ব্যবহৃত হয়; ১ নম্বর ঘাট দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ২ থেকে ৫ নম্বর ঘাট চালু ছিল। এই প্রতিবেদনের ব্যবসায়ী কাজ করেন ৫ নম্বর ঘাট এলাকায়।

দৌলতদিয়ায় পদ্মার বড় মাছ বিক্রির আগের খবর
দৌলতদিয়ায় একটি বড় মাছ চড়া দামে বিক্রির খবর আগেও এসেছে। ২০২৩ সালের ১৩ মে প্রথম আলো জানায়, গোয়ালন্দের উজানচর ইউনিয়নের দেবীপুর চরের কাছে পদ্মায় ধরা পড়া প্রায় আড়াই কেজি ওজনের একটি ইলিশ দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে আনা হলে এক মাছ ব্যবসায়ী সেটি ৯ হাজার ২০০ টাকায় কেনেন। পরে ঢাকার এক ব্যবসায়ী তার কাছ থেকে মাছটি কেনেন ৯ হাজার ৯০০ টাকায়, কেজিপ্রতি ৩ হাজার ৮৫০ টাকা দরে; পত্রিকাটির শিরোনামে বিক্রির অঙ্ক বলা হয় ১০ হাজার টাকা।
একই প্রতিবেদনে স্থানীয় জেলে ও ব্যবসায়ীরা প্রথম আলোকে বলেন, নদীতে বড় ইলিশ বিরল হয়ে উঠেছে। গোয়ালন্দ উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা এই সংকটের জন্য নদীর পানি কমে যাওয়া ও চ্যানেলে পলি জমাকে দায়ী করেন এবং বলেন, এত বড় মাছ ধরা পড়া সুখবর।
২০২৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম একই ঘাটে আরও বড় এক বিক্রির খবর দেয়: দৌলতদিয়ার চর কর্ণেশন এলাকার কাছে পদ্মায় ধরা পড়া ২২ কেজি ৬০০ গ্রাম ওজনের একটি ঢাই মাছ। দৌলতদিয়ার একটি আড়তে ওজনের পর মাছটি কেজিপ্রতি ৪ হাজার ৬০০ টাকা দরে মোট ১ লাখ ৩ হাজার ৯৬০ টাকায় নিলামে ওঠে। নিলামে জয়ী স্থানীয় এক মাছ ব্যবসায়ী পরে কেজিতে ২০০ টাকা লাভে ১ লাখ ৮ হাজার ৪৮০ টাকায় মাছটি ঢাকার এক ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করেন বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়।

ইলিশ: সাগরের মাছ, ডিম ছাড়তে আসে নদীতে
ইলিশের বৈজ্ঞানিক নাম Tenualosa ilisha; এটি হেরিং গোত্রের (ক্লুপেইডি) মাছ। বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর ও লোহিত সাগর থেকে দক্ষিণ চীন সাগর পর্যন্ত এর বিস্তার; ইরান, ইরাক, পাকিস্তান, ভারত ও মিয়ানমারের নদীতে এবং বাংলাদেশের নদীগুলোতে এর দেখা মেলে। সাগর, মোহনা ও নদী, তিন জায়গাতেই ইলিশ বাস করে।
ইলিশের দেহ বেশ চাপা, রুপালি, ধাতব আভাযুক্ত। পূর্ণবয়স্ক ইলিশ সাধারণত ৩৫ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার লম্বা হয়, সবচেয়ে বড়গুলো প্রায় ৬০ সেন্টিমিটার; বাংলাপিডিয়ার হিসাবে বড় একটি ইলিশের ওজন মোটামুটি আড়াই কেজি। স্ত্রী ইলিশ পুরুষের চেয়ে দ্রুত বাড়ে এবং সাধারণত বড় হয়। এক থেকে দুই বছরের মধ্যে ইলিশ প্রজননক্ষম হয়, মূলত প্লাংকটন খায়, আর একটি বড় স্ত্রী ইলিশ ২০ লাখ পর্যন্ত ডিম বহন করতে পারে।
ইলিশ অ্যানাড্রোমাস মাছ: প্রাপ্তবয়স্ক মাছ ডিম ছাড়তে সাগর থেকে উজানে মিঠাপানিতে আসে, আর এর ডিম স্রোতে ভেসে বেড়ায়। পোনা নদীর চ্যানেলে বড় হয়, তারপর খাবার খেতে ও পরিণত হতে সাগরে নেমে যায় এবং ডিম ছাড়তে আবার নদীতে ফেরে। ডিম ছাড়া সবচেয়ে বেশি হয় সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে, ফেব্রুয়ারি-মার্চে আরেকটি ছোট মৌসুম আছে। বাংলাপিডিয়া পদ্মা, যমুনা ও মেঘনাকে ইলিশের ডিম ছাড়ার নদী হিসেবে উল্লেখ করেছে। জ্ঞানকোষটি জানায়, নদীতে ইলিশ ধরা হয় মূলত ফাঁসজাল (গিলনেট) ও অন্যান্য সরঞ্জাম দিয়ে, আর সাগরে যন্ত্রচালিত নৌকায়। পূর্ণবয়স্ক ইলিশ প্রধানত ধরা হয় মে থেকে অক্টোবর পর্যন্ত; জুলাইয়ের দৌলতদিয়ার বিক্রিটি তাই আহরণের প্রধান মৌসুমের মধ্যেই।
জ্ঞানকোষটি ইলিশ ধরার জায়গা বদলের কথাও লিখেছে। ১৯৭২ সালের দিক পর্যন্ত উজানের ইলিশ আহরণের কেন্দ্র ছিল পদ্মা, মেঘনা, করতোয়া, রূপসা, শিবসা ও পায়রা; এখন বেশির ভাগ ইলিশ আসে ভাটির নদী, মোহনা, উপকূল ও সাগর থেকে। কুমার নদ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সাগর থেকে নবগঙ্গা হয়ে পদ্মায় আসার একটি পথ বন্ধ হয়ে গেছে বলেও বাংলাপিডিয়া উল্লেখ করেছে। ২০২৩ সালে যে জেলে ও ব্যবসায়ীরা প্রথম আলোকে গোয়ালন্দে বড় ইলিশ বিরল হয়ে ওঠার কথা বলেছিলেন, তারা নদীর এই উজানের অংশের কথাই বলছিলেন।
দেশে কত ইলিশ ধরা পড়ে
২০২৬ সালের ৭ এপ্রিল দ্য ডেইলি অবজারভারে প্রকাশিত মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে সাম্প্রতিক বছরগুলোর জাতীয় ইলিশ উৎপাদন:
- ২০১৬-১৭: ৪ লাখ ৯৬ হাজার টন
- ২০১৭-১৮: ৫ লাখ ১৭ হাজার টন
- ২০১৮-১৯: ৫ লাখ ৩২ হাজার টন
- ২০১৯-২০: ৫ লাখ ৫০ হাজার টন
- ২০২০-২১: ৫ লাখ ৬৫ হাজার টন
- ২০২১-২২: ৫ লাখ ৬৬ হাজার টন
- ২০২২-২৩: ৫ লাখ ৭১ হাজার টন
- ২০২৩-২৪: ৫ লাখ ২৯ হাজার টন
- ২০২৪-২৫: প্রায় ৫ লাখ টন
একই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) একটি পরিসংখ্যানভিত্তিক পূর্বাভাস মডেল ব্যবহার করে ২০২৪-২৫ সালের উৎপাদন ৫ লাখ ৩৮ হাজার থেকে ৫ লাখ ৪৫ হাজার টন হতে পারে বলে প্রাক্কলন করেছিল, যা ২৯ সেপ্টেম্বরের এক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপন করা হয়; প্রতিবেদনটি এ-ও বলে, প্রকৃত উৎপাদন এর চেয়ে কম হতে পারে। হিসাবটি প্রতিবছর বেড়ে ২০২২-২৩ সালে সর্বোচ্চে পৌঁছায়, এর পরের দুই বছরের প্রতিটিতে কমেছে।
সরকারি এই হিসাব নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, লক্ষ্মীপুরের অবতরণকেন্দ্রগুলোতে পত্রিকাটি যে ৫০ জনের বেশি জেলে, ব্যবসায়ী ও পাইকারের সঙ্গে কথা বলেছে, তারা বলেছেন পরিসংখ্যান অনুমাননির্ভর; সেখানে দৈনিক সরবরাহ নিয়ে ব্যবসায়ীদের হিসাব জেলার নথিভুক্ত উৎপাদনের সঙ্গে মেলে না। একই প্রতিবেদনে মৎস্য অধিদপ্তরের বরাতে বলা হয়, বিশ্বের মোট ইলিশ আহরণের ৭৫ শতাংশ বাংলাদেশের।
এই অংশ নিয়ে সূত্রভেদে হিসাব আলাদা। ২০১৭ সালের আগস্টে দ্য ডেইলি স্টার ওয়ার্ল্ডফিশের এক প্রতিবেদনের বরাতে জানায়, বিশ্বের মোট ইলিশের ৬০ শতাংশের বেশি একা বাংলাদেশ উৎপাদন করে। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ওয়ার্ল্ডফিশের তথ্যের বরাতে এই হার ৮৬ শতাংশ বলে উল্লেখ করে, ইলিশ উৎপাদনকারী ১১টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশকে প্রথম বলে, এবং জানায় প্রায় ২৫ লাখ মানুষ ইলিশ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

২০২৬ সালে বলবৎ নিষেধাজ্ঞা ও অভয়াশ্রম
বছরের নির্দিষ্ট কয়েকটি সময় আহরণ বন্ধ রেখে বাংলাদেশ ইলিশ রক্ষা করে। দ্য ডেইলি অবজারভার জানায়, ২০২৬ সালের ৬ এপ্রিল এক সংবাদ সম্মেলনে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী বলেন, প্রতিবছর ১ নভেম্বর থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত জাটকা, অর্থাৎ ছোট ইলিশ ধরা, পরিবহন ও বিক্রি পুরোপুরি নিষিদ্ধ, এবং ২০২৬ সালের ৭ থেকে ১৩ এপ্রিল জাটকা সংরক্ষণ সপ্তাহ ঘোষণা করেন। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ডের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, মৎস্য কর্মকর্তারা ১০ ইঞ্চির চেয়ে ছোট ইলিশকে জাটকা বলেন, যার বয়স মোটামুটি আট থেকে নয় মাস।
২০২৬ সালের এপ্রিলের ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, বঙ্গোপসাগরে ১৫ এপ্রিল থেকে ১১ জুন পর্যন্ত ৫৮ দিন সব ধরনের মাছ ধরা নিষিদ্ধ, এবং প্রজনন মৌসুমে ইলিশ রক্ষায় আলাদা ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা আছে।
২০২৫ সালে প্রজনন মৌসুমের এই নিষেধাজ্ঞা মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় ৪ থেকে ২৫ অক্টোবর নির্ধারণ করে বলে ২০২৫ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়। প্রজ্ঞাপন জারি করে বাংলা আশ্বিন মাসের পূর্ণিমা ও অমাবস্যার এই সময়ে নদী, উপকূল, মোহনা ও সাগরে সারা দেশে ইলিশ ধরা, পরিবহন, মজুত, বাজারজাত, কেনাবেচা ও বিনিময় নিষিদ্ধ করা হয়। মৎস্য অধিদপ্তর জানায়, বিএফআরআই, অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও জেলেদের সঙ্গে পরামর্শ করে সময়টি ঠিক করা হয়েছে; বিএফআরআইয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৪ সালের নিষেধাজ্ঞায় ৫২.৫ শতাংশ মা ইলিশ ডিম ছাড়তে পেরেছে। ২০২৫ সালের নিষেধাজ্ঞায় ৩৭ জেলার ১৬৫ উপজেলার ৬ লাখ ২০ হাজার ১৪০টি জেলে পরিবারের প্রতিটিকে ২৫ কেজি করে, মোট ১৫ হাজার ৫০৩.৫০ টন চাল দেওয়ার কথা ছিল। সাগরের জলসীমায় ট্রলার প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, ড্রেজিং বন্ধ রাখা এবং নৌ পুলিশ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনী ও বিমানবাহিনীর অভিযানে অংশ নেওয়ার কথাও জানানো হয়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালের অভিযানে ২ হাজার ১৬৯টি ভ্রাম্যমাণ আদালত ও ৯ হাজার ৮১৩টি অভিযানে ৫৪.৮৬ টন ইলিশ জব্দ, ৬১২.১১ লাখ মিটার জাল ধ্বংস এবং ৭৫.২৭ লাখ টাকা জরিমানা আদায় হয়েছিল।
তৃতীয় নিষেধাজ্ঞাটি ইলিশের অভয়াশ্রমে, নদীর যে অংশগুলোতে জাটকা জড়ো হয়ে বেড়ে ওঠে। ২০২০ সালে দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস ১ মার্চ থেকে দুই মাস ইলিশ ধরা, বিক্রি ও পরিবহনে নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ছয়টি অভয়াশ্রমের তালিকা দেয়:
- চাঁদপুরের ষাটনল থেকে লক্ষ্মীপুরের চর আলেকজান্ডার পর্যন্ত মেঘনার ১০০ কিলোমিটার
- ভোলার শাহবাজপুর চ্যানেলের ৯০ কিলোমিটার
- ভোলার তেঁতুলিয়া নদীর ১০০ কিলোমিটার
- পটুয়াখালীর আন্ধারমানিক নদীর ৪০ কিলোমিটার
- শরীয়তপুরে নিম্ন পদ্মার (পদ্মার মোহনা) ২০ কিলোমিটার
- বরিশালের হিজলা থেকে মেহেন্দিগঞ্জ পর্যন্ত মেঘনার ৮৩ কিলোমিটার
দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড জানায়, ২০২৫ সালে লক্ষ্মীপুরে মেঘনার অভয়াশ্রমে নিষেধাজ্ঞা চলে ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল, এ সময় ইলিশ বিক্রি, কেনা ও মজুতও নিষিদ্ধ ছিল। লক্ষ্মীপুর জেলা মৎস্য বিভাগ রামগতির আলেকজান্ডার থেকে চাঁদপুরের মতলব উপজেলার ষাটনল পর্যন্ত এই ১০০ কিলোমিটার অংশকে ইলিশের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে বর্ণনা করে; নিষেধাজ্ঞার সময় মাছ ধরা থেকে বিরত থাকা জেলেরা ভালনারেবল গ্রুপ ফিডিং (ভিজিএফ) কর্মসূচির আওতায় ৪০ কেজি খাদ্যসহায়তা পান। একই প্রতিবেদনে ইলিশ রক্ষার উদ্যোগের সূচনা হিসেবে ২০০২ সালে মা ও ছোট ইলিশ ধরায় নিষেধাজ্ঞা এবং ২০০৩-০৪ সাল থেকে ইলিশ সংরক্ষণ কর্মসূচির কথা বলা হয়।
২০২৬ সালের ৭ জুলাইয়ের দৌলতদিয়ার বিক্রিটি ঘটে ৩০ জুন শেষ হওয়া জাটকা নিষেধাজ্ঞা এবং ১১ জুন শেষ হওয়া সাগরের নিষেধাজ্ঞার পরে, অক্টোবরের প্রজনন মৌসুমের নিষেধাজ্ঞার আগে, অর্থাৎ যে মাসগুলোতে আহরণ খোলা থাকে।

বাংলাদেশের নিবন্ধিত পণ্য
ইলিশ বাংলাদেশের জাতীয় মাছ, বাংলাপিডিয়া জানায়। ২০১৭ সালে জামদানি শাড়ির পর এটি দেশের দ্বিতীয় নিবন্ধিত ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হয়। মৎস্য অধিদপ্তর পেটেন্ট, শিল্প-নকশা ও ট্রেডমার্কস অধিদপ্তরের (ডিপিডিটি) কাছে আবেদন করেছিল; ডিপিডিটি ২০১৭ সালের ১ জুন তাদের জার্নালে আবেদনটি প্রকাশ করে। বিধি অনুযায়ী, দুই মাসের মধ্যে কোনো আপত্তি না এলে পণ্যটি নিবন্ধিত হবে; আপত্তি জানানোর সময় শেষ হয় ২০১৭ সালের ৩১ জুলাই, ২০১৭ সালের ৭ আগস্ট দ্য ডেইলি স্টার জানায়।
প্রথম আলো জানায়, ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট বৃহস্পতিবার ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে এক অনুষ্ঠানে মৎস্য অধিদপ্তর ইলিশের জিআই সনদ গ্রহণ করে। নিবন্ধনের ঘোষণার সময় অধিদপ্তর জানিয়েছিল, ইলিশ আমদানিকারক দেশগুলোকে এটিকে বাংলাদেশের পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি দিতে অনুরোধ করার পরিকল্পনা আছে।
দ্য ডেইলি স্টার জানায়, সে সময় ডিপিডিটির হাতে আরও ২৪টি জিআই আবেদন ছিল, যার মধ্যে ফজলি আম, রাজশাহী সিল্ক শাড়ি ও হাঁড়িভাঙা আম, এবং ২০১৭ সালের শেষ নাগাদ বাংলাদেশের জিআই পণ্যের একটি তালিকা প্রকাশের পরিকল্পনা ছিল অধিদপ্তরের।
ছবি: Fahad Faisal / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
সূত্র: জাগো নিউজ (৭ জুলাই ২০২৬), প্রথম আলো (১৩ মে ২০২৩; ২৪ আগস্ট ২০১৭), বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম (১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫; ১২ মার্চ ২০২৬), দ্য ডেইলি অবজারভার (৭ এপ্রিল ২০২৬), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড (২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৫; ৫ জুলাই ২০২৫; ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৫), দ্য ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস (৩০ এপ্রিল ২০২০), দ্য ডেইলি স্টার (৭ আগস্ট ২০১৭), বাংলাপিডিয়া (এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ)





মন্তব্য
(০)