রাজশাহীতে পদ্মা নদীর চরে পরিযায়ী পাখি শিকারের দায়ে এক ব্যক্তিকে তিন দিনের কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। ২০২৫ সালের ২৮ জানুয়ারি, মঙ্গলবার সকালে রাজশাহী বন বিভাগের বন্যপ্রাণী পরিদর্শক ও নৌপুলিশের যৌথ অভিযানে চারটি মৃত পাখিসহ তাঁকে আটক করা হয় বলে জাগো নিউজ ২৪ জানায়। জেলা প্রশাসনের একজন সহকারী কমিশনার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে আদালত পরিচালনা করেন। প্রতিবেদনে দণ্ডিত ব্যক্তির নাম লিটন হোসেন বলা হয়েছে; তিনি রাজশাহীর শ্রীরামপুর এলাকার বাসিন্দা।
উদ্ধার হওয়া পাখিগুলো ছিল পাতি তিলিহাঁস, ছোট আকারের এক পরিযায়ী হাঁস, যা বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ অনুযায়ী বাংলাদেশে রক্ষিত বন্যপ্রাণীর তালিকাভুক্ত। পাখির সঙ্গে প্রায় ৩০০ মিটার কারেন্ট জালও জব্দ করা হয়, যা দেশে নিষিদ্ধ; পরে জালটি পুড়িয়ে ফেলা হয়।
গোপন তথ্য, ভোরের অভিযান ও ঘটনাস্থলেই আদালত
বন বিভাগের বন্যপ্রাণী পরিদর্শকের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানে আটক ব্যক্তির কাছে চারটি মৃত পাতি তিলিহাঁস ও প্রায় ৩০০ মিটার কারেন্ট জাল পাওয়া যায়। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, তাঁরা রাজশাহীর পদ্মার চরে প্রায়ই অভিযান চালান এবং সেখানে প্রতিনিয়ত পরিযায়ী পাখির মরদেহ পান।
পরিদর্শক জানান, আটকের সূত্র ছিল একটি গোপন তথ্য। সরকার তথ্যদাতাদের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করায় একজন তাঁদের জানান, সোমবার, ২৭ জানুয়ারি সন্ধ্যায় বিষ টোপ দেওয়া হয়েছে। সেই তথ্যের ভিত্তিতে মঙ্গলবার সকালে অভিযান চালিয়ে পাখিসহ ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়। এরপর বন বিভাগ জেলা প্রশাসনকে জানালে প্রশাসন একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পাঠায় এবং তিনি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন।
আদালত পরিচালনাকারী সহকারী কমিশনার পত্রিকাটিকে নিশ্চিত করেন, ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ওই ব্যক্তিকে তিন দিনের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে এবং জব্দ করা অবৈধ জাল পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে। জরিমানা করা হয়েছিল কি না, প্রতিবেদনে তা বলা হয়নি; দণ্ডিত ব্যক্তির কোনো বক্তব্যও তাতে ছিল না।
ঘটনাটি আকারে ছোট, চারটি পাখি ও একজন মানুষ। তবে পরিদর্শকের বর্ণনায় একসঙ্গে কয়েকটি বিষয় উঠে আসে: প্রতি শীতে পদ্মায় পরিযায়ী জলচর পাখির আগমন, তাদের মারতে বিষের ব্যবহার, এসব পাখির আইনি সুরক্ষা, আর সেই সুরক্ষা কার্যকর করতে বন্যপ্রাণী কর্মী, নৌপুলিশ ও জেলা প্রশাসনের যৌথ কাজ।

পাখি নিয়ে বন্যপ্রাণী আইন, ২০১২ কী বলে
এই ঘটনার দিন বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী বিষয়ে কার্যকর আইন ছিল বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২, যা ২০১২ সনের ৩০ নং আইন, তারিখ ১০ জুলাই ২০১২। আইনের প্রস্তাবনায় সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৮ক-এর কথা বলা হয়েছে, যেখানে জীববৈচিত্র্য, বন ও বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা বিধান রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে অন্তর্ভুক্ত।
আইনে শিকারের সংজ্ঞা বিস্তৃত। ধারা ২(৩৭) অনুযায়ী শিকার অর্থ কোনো বন্যপ্রাণীকে হত্যা করা, ধরা, বিষ প্রয়োগ করা বা অনুরূপ কোনো উদ্যোগ; এসব উদ্দেশ্যে বন্যপ্রাণীকে তাড়িয়ে নেওয়া; অথবা কোনো বন্যপ্রাণীকে আহত বা ক্ষতি করা, তার কোনো অংশ নেওয়া বা বন্য পাখি বা সরীসৃপের বাসা বা ডিম সংগ্রহ বা ধ্বংস করা। অর্থাৎ বিষ প্রয়োগের কথা সংজ্ঞাতেই আছে। ধারা ২(২২) অনুযায়ী পরিযায়ী প্রজাতি হলো সেই সব বন্যপ্রাণী, যারা এক বা একাধিক দেশের ভৌগোলিক সীমানা পেরিয়ে বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে আসা-যাওয়া করে।
ধারা ৬(১) বলে, এই আইনের অধীন লাইসেন্স বা ক্ষেত্রমতো পারমিট ছাড়া কেউ কোনো বন্যপ্রাণী শিকার করতে পারবেন না। ধারা ৬(২) সরকারকে সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপন দিয়ে নির্দিষ্ট বা সব বন্যপ্রাণী কোনো নির্দিষ্ট বন বা এলাকায় অথবা সারা দেশে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শিকার নিষিদ্ধ করার ক্ষমতা দিয়েছে।
পাখির জন্য নির্দিষ্ট দণ্ডের বিধান ধারা ৩৮-এ। ধারা ৩৮(১) অনুযায়ী তফসিল ১ ও ২-এ উল্লিখিত কোনো পাখি বা পরিযায়ী পাখি হত্যা করলে তা অপরাধ, এবং এর জন্য সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি ঘটালে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ ২ লাখ টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড।
ধারা ৩৮(২) হত্যার পরের ধাপগুলো নিয়ে। তফসিল ১ ও ২-এ উল্লিখিত কোনো পাখি বা পরিযায়ী পাখির ট্রফি বা অসম্পূর্ণ ট্রফি, মাংস বা দেহের অংশ সংগ্রহ, দখলে রাখা, কেনা, বেচা বা পরিবহন করলে সর্বোচ্চ ৬ মাস কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ ৩০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে; পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড, অথবা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অথবা উভয়। আলাদা একটি বিধান, ধারা ৩৯, ধারা ৬ বা ধারা ১০ থেকে ১২ লঙ্ঘনের দণ্ড ঠিক করেছে: সর্বোচ্চ ১ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়, আর পুনরাবৃত্তিতে সর্বোচ্চ ২ বছর কারাদণ্ড বা সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়।
২০১২ সালের ১০ জুলাই বাংলাদেশ গেজেটে প্রকাশিত আইনের তফসিল ১, অর্থাৎ রক্ষিত বন্যপ্রাণীর তালিকায়, অ্যানাটিডি গোত্রের হাঁস ও রাজহাঁসের মধ্যে পাতি তিলিহাঁস (ইউরেশীয় টিল, Anas crecca) রয়েছে। ধারা ২(৪৪) অনুযায়ী তফসিল ১ ও ২-এ উল্লিখিত বন্যপ্রাণীই আইনের ভাষায় রক্ষিত বন্যপ্রাণী।
মামলা কীভাবে এগোয়, তা অন্য কয়েকটি ধারায় আছে। ধারা ৩২ অনুযায়ী লাইসেন্স ছাড়া শিকার করা বা দখলে রাখা বন্যপ্রাণী, তার মাংস ও দেহের অংশ এবং অপরাধে ব্যবহৃত অস্ত্র, বস্তু ও যন্ত্রপাতি কর্মকর্তা জব্দ করতে পারেন, এবং জব্দ করা সবকিছু সরকারের অনুকূলে বাজেয়াপ্তযোগ্য। ধারা ৪৩ অনুযায়ী বাঘ ও হাতি সংক্রান্ত ধারা ৩৬-এর অপরাধ ছাড়া এই আইনের অন্য সব অপরাধ আমল-অযোগ্য, জামিনযোগ্য এবং ক্ষতিপূরণ সাপেক্ষে আপসযোগ্য। ধারা ৪৪ বলে, ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তির লিখিত অভিযোগ ছাড়া আদালত এই আইনের অপরাধ বিচারার্থ গ্রহণ করবে না, এবং বিচার করবেন প্রথম শ্রেণির জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট বা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট, অথবা ফৌজদারি কার্যবিধির অধীন ক্ষমতাপ্রাপ্ত স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেট।
ভ্রাম্যমাণ আদালত যেভাবে কাজ করে
রাজশাহীর দণ্ডটি দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত, যা মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ (২০০৯ সনের ৫৯ নং আইন) অনুযায়ী পরিচালিত হয়। ওই আইনের ধারা ৪-এ বলা হয়েছে, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও অপরাধ প্রতিরোধের স্বার্থে কিছু অপরাধ তাৎক্ষণিকভাবে ঘটনাস্থলে আমলে নিয়ে সীমিত দণ্ড আরোপের জন্য সারা দেশে বা যেকোনো জেলা বা মেট্রোপলিটন এলাকায় ভ্রাম্যমাণ কার্যক্রম চলবে, যার নাম মোবাইল কোর্ট।
ধারা ৬(১) অনুযায়ী এই আইনে ক্ষমতাপ্রাপ্ত এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট বা ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে আইনের তফসিলে থাকা কোনো আইনের অপরাধ সংঘটিত বা উদ্ঘাটিত হলে তিনি তা ঘটনাস্থলেই আমলে নিয়ে, স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে নির্ধারিত দণ্ড দিতে পারেন। ধারা ৬(৪) বলে, ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অপরাধটি এত গুরুতর মনে হলে যে মোবাইল কোর্টের দণ্ড যথোপযুক্ত হবে না, তিনি দণ্ড না দিয়ে নিয়মিত মামলা দায়েরের ব্যবস্থা করবেন।
ধারা ৭-এ পরিচালনা পদ্ধতি এভাবে বলা আছে:
- ম্যাজিস্ট্রেট সংক্ষিপ্ত লিখিত অভিযোগ গঠন করে তা অভিযুক্তকে পড়ে ও ব্যাখ্যা করে শোনান এবং অভিযুক্ত তা স্বীকার করেন কি না জানতে চান;
- অভিযুক্ত স্বীকার করলে স্বীকারোক্তি লিপিবদ্ধ করে তাতে অভিযুক্ত ও উপস্থিত দুজন সাক্ষীর স্বাক্ষর বা টিপসই নেওয়া হয়, তারপর ম্যাজিস্ট্রেট উপযুক্ত দণ্ড দিয়ে স্বাক্ষরিত লিখিত আদেশ দেন;
- অভিযুক্ত অভিযোগ অস্বীকার করে সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিলে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়;
- ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হলে ম্যাজিস্ট্রেট অভিযোগটি বিচারের জন্য উপযুক্ত এখতিয়ারসম্পন্ন আদালতে পাঠান।
ধারা ৮ অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইনে যে দণ্ডই থাকুক, মোবাইল কোর্ট দুই বছরের বেশি কারাদণ্ড দিতে পারে না, তবে সংশ্লিষ্ট আইনে নির্ধারিত সীমার মধ্যে যেকোনো পরিমাণ অর্থদণ্ড দিতে পারে। ধারা ১৩ অনুযায়ী মোবাইল কোর্টের দণ্ডে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট এলাকার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আপিল করতে পারেন।
পাতি তিলিহাঁস: ঘটনার কেন্দ্রে থাকা পাখি
পাতি তিলিহাঁস বা ইউরেশীয় টিলের (Anas crecca) প্রথম বৈজ্ঞানিক নামকরণ করেন কার্ল লিনিয়াস, ১৭৫৮ সালে তাঁর সিস্টেমা নেচারি গ্রন্থে। এটি সবচেয়ে ছোট আকারের ডাবলিং বা ভাসমান-খাদক হাঁসগুলোর একটি: লম্বায় ৩৪ থেকে ৪৩ সেন্টিমিটার, ডানার বিস্তার ৫৩ থেকে ৫৯ সেন্টিমিটার; পুরুষ হাঁসের গড় ওজন প্রায় ৩৬০ গ্রাম, স্ত্রী হাঁসের প্রায় ৩৪০ গ্রাম। প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক সংস্থা আইইউসিএন বিশ্বব্যাপী একে ন্যূনতম উদ্বেগের (Least Concern) প্রজাতি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে, তবে বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী আইনের তফসিল ১ অনুযায়ী এটি রক্ষিত প্রাণী।
প্রজনন মৌসুমে পুরুষ হাঁসের মাথা ও গলার ওপরের অংশ খয়েরি, চোখের চারপাশে চওড়া ঝকমকে গাঢ় সবুজ ছোপ, পাশে আড়াআড়ি একটি সাদা দাগ, আর বুক হালকা পীতাভ, তাতে ছোট বাদামি ফোঁটা। স্ত্রী হাঁস হলদেটে বাদামি, পিঠ ও ডানা আরও গাঢ়, গায়ে ঘন রেখা। প্রজাতিটি লম্বা গাছপালাঘেরা আড়ালের মিঠাপানির জলাভূমিতে, যেমন উত্তরের বনাঞ্চলের জলা-ডোবা ও নলখাগড়াঘেরা পুকুরে প্রজনন করে, আর শীতে লোনা পানি, খাঁড়ি ও উপহ্রদেও থাকে। প্রজনন মৌসুমে এর প্রধান খাবার জলজ অমেরুদণ্ডী প্রাণী; শীতে খায় জলজ উদ্ভিদ ও ঘাসের বীজ, যার মধ্যে সেজ ও শস্যদানাও আছে।
বাংলাদেশের জাতীয় জ্ঞানকোষ বাংলাপিডিয়া জানায়, দেশে Anas গণের প্রায় এক ডজন হাঁসের প্রজাতি আছে এবং একটি ছাড়া সবগুলোই পরিযায়ী; ব্যতিক্রম আবাসিক প্রজাতিটি হলো পাতি হাঁস বা স্পটবিল ডাক। পাতি তিলিহাঁস শীতে আসা এসব অতিথিদের একটি।

রাজশাহীর এই ঘটনার আগেই এ অঞ্চলে স্যাটেলাইট ট্যাগ দিয়ে পাতি তিলিহাঁসের চলাচল নিয়ে গবেষণা হয়েছিল। দ্য ডেইলি স্টার ২০২০ সালের জানুয়ারিতে জানায়, ২০১৯ সালে চালু হওয়া ওয়াইল্ডবার্ড মনিটরিং প্রোগ্রাম বুনো হাঁসের গায়ে জিপিএসযুক্ত স্যাটেলাইট ট্যাগ লাগাচ্ছিল। ট্যাগ লাগানো একটি পাতি তিলিহাঁসের ওজন ছিল ৩১০ গ্রাম; প্রথম দিনে সেটি প্রায় ১০ কিলোমিটার এবং দ্বিতীয় দিনে সাড়ে ১৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়। পত্রিকাটির উদ্ধৃত এক গবেষক বলেন, তাঁরা দেখেছেন পাখিটি বিশেষ করে রাতে ধানখেতে যেত।
রাজশাহীর পদ্মার চর: জলচর পাখির শীতের আবাস
রাজশাহী জেলার আয়তন ২,৪২৫.৩৭ বর্গকিলোমিটার, অবস্থান দেশের উত্তর-পশ্চিমে। বাংলাপিডিয়ার বর্ণনায় জেলাটি বরেন্দ্র ভূমি, দিয়াড়া ও চরাঞ্চল নিয়ে গঠিত; প্রধান নদী পদ্মা, মহানন্দা ও শিব। চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায় বাংলাদেশে প্রবেশের স্থান থেকেই গঙ্গা সাধারণভাবে পদ্মা নামে পরিচিত, তাই রাজশাহী শহরের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া চওড়া নদীটিকে লোকে পদ্মা বলে। জেলাটি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৭৭২ সালে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের এ এম সালেহ রেজা ও সেলিনা পারভীন ২০১৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস (খণ্ড ৩, সংখ্যা ২)-এ প্রকাশিত এক সংক্ষিপ্ত গবেষণায় এই চরগুলোকে নদীর মৌসুমি প্রক্রিয়ার ফল হিসেবে বর্ণনা করেন: বালু, পলি ও ছোট নুড়িতে গড়া চর, যা নদীর মাঝে দ্বীপের মতো জাগে বা পাড়ের সঙ্গে জুড়ে যায়, আর তাতে থাকে ছোট-বড় জলাধার ও নালা, ঘাসবন, কৃষিজমি ও বনায়ন। লেখকেরা ২০০৮ সাল থেকে গোদাগাড়ী উপজেলার প্রেমতলী থেকে চারঘাট উপজেলার সারদা পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার এলাকায় পাখি পর্যবেক্ষণ করেন।
তাঁরা চরে ১৪১ প্রজাতির পাখি শনাক্ত করেন, যার ৫৮টি বাংলাদেশে পরিযায়ী, আর এই পরিযায়ীদের ৪৭টি জলচর পাখি। জলচরদের মধ্যে দুটি, টাফটেড পোচার্ড ও এশীয় ডাউইচার, প্রায়-সংকটাপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত ছিল। লেখকেরা লেখেন, শীতে অনেক পরিযায়ী পাখি পদ্মার চরে আসে এবং কিছু মানুষ টাকা আয়ের জন্য এদের শিকার করে। তাঁরা আরও উল্লেখ করেন, পরিযায়ী পাখি ফসলের মাঠে পোকামাকড় ও ইঁদুর দমনে ভূমিকা রাখে, বিষ্ঠার মাধ্যমে মাটিতে পুষ্টি যোগ করে এবং বীজ ছড়ায়। মূল নদীখাতে দেখা হাঁসের ঝাঁক দূরত্বের কারণে ছবি তোলা যায়নি, তবে একজন পাখি পর্যবেক্ষক পদ্মার চরে টিল, উইজন, গিরিয়া হাঁস, খুন্তে হাঁস, শাহ চখা ও নীলশির দেখার কথা জানান।
এই এলাকায় প্রথম সংগঠিত জলচর পাখি শুমারি হয় ২০২০ সালের ৫ জানুয়ারি। দ্য ডেইলি স্টার জানায়, সংরক্ষণকর্মী, পাখি পর্যবেক্ষক ও বনকর্মীরা রাজশাহী বিভাগে পদ্মার বালুচর ও অগভীর জলাশয়ে এক দিনে ৩৭ প্রজাতির ৪,০২৫টি জলচর পাখি গণনা করেন, যার ২৭টি প্রজাতি পরিযায়ী; আর এই বিভাগে এ ধরনের শুমারিতে বাংলাদেশ বন বিভাগ ও অন্যান্য সরকারি সংস্থা সেবারই প্রথম অংশ নেয়। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় পিয়ং হাঁস (গ্যাডওয়াল), ১,১০০টি; এরপর টেমিংকের চাহা, ৩৩০টি; আর দেখা মেলে বিরল বৈকাল তিলিহাঁসেরও। পত্রিকাটি জানায়, রাজশাহী বিভাগ সেন্ট্রাল এশিয়ান ফ্লাইওয়ে বা মধ্য এশীয় পরিযান পথে পড়ে, যেখানে পরিযায়ী পাখি বিশ্রাম নেয় ও খাবার খেয়ে শক্তি সঞ্চয় করে।
এক বছর পর, ২০২১ সালের ৫ জানুয়ারি প্রথম আলো জাতীয় সংবাদ সংস্থা বাসসের বরাতে জানায়, আইইউসিএনের বাংলাদেশ বুনো পাখি পর্যবেক্ষণ কর্মসূচির একটি দল বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব, রাজশাহী বার্ড ক্লাব ও বন বিভাগের সহযোগিতায় রাজশাহীতে পদ্মার ৩৯ কিলোমিটার এলাকায় ৪১ প্রজাতির ২,৭০৯টি পাখি গণনা করে, যার ২৮টি প্রজাতি পরিযায়ী। সবচেয়ে বেশি প্রজাতি দেখা যায় চর খানপুর, চর খিদিরপুর, চর নম্বর ১০, চারঘাটের একাংশ ও নদীর মাঝের একটি চরে। রাজশাহী বার্ড ক্লাবের এক সদস্য পদ্মার নদীখাতকে পাখির অভয়ারণ্য ঘোষণার দাবি জানান, আর প্রতিবেদনে আবারও বলা হয়, শীতে চরে আসা পরিযায়ী পাখি কিছু মানুষ শিকার করে।

একই চরে আগের ঘটনা
রাজশাহীর চরে শিকার করা পাখি বন্যপ্রাণী কর্মীদের হাতে আসার ঘটনা ২৮ জানুয়ারিই প্রথম নয়। দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ২০২০ সালের ২২ জানুয়ারি জানায়, বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের একটি দল, যার নেতৃত্বে ছিলেন একজন জুনিয়র ওয়াইল্ডলাইফ স্কাউট, পবা উপজেলার গহমাবোনা ও হরিপুর গ্রামের পাশের পদ্মার চরে অভিযান চালিয়ে ২৯টি আহত চখাচখি উদ্ধার করে। দলটি শিকারিদের ধরতে পারেনি: দুটি বস্তা নিয়ে যাওয়া এক ব্যক্তি বস্তা ফেলে পালিয়ে যান, আর সেই বস্তাতেই ছিল পাখিগুলো। হাঁসগুলোকে রাজশাহীর বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়, উড়তে পারলে সেগুলো ছেড়ে দেওয়ার কথা জানানো হয়।
বন্যপ্রাণী আইনের ধারা ৩০ সরকারকে আহত, জব্দ, বাজেয়াপ্ত, পরিত্যক্ত বা দান করা বন্যপ্রাণীর চিকিৎসা, খাদ্য, আশ্রয় ও নিরাপত্তার জন্য উদ্ধার কেন্দ্র স্থাপন এবং সেখান থেকে বন্যপ্রাণী প্রকৃতিতে অবমুক্ত করার নির্দেশিকা তৈরির ক্ষমতা দিয়েছে।
দেশের অন্য জায়গায় পাখি শিকারে বিষের ব্যবহারের খবর বহু আগেই এসেছিল। দ্য ডেইলি স্টার ২০১৩ সালের ১৮ মার্চ জানায়, পটুয়াখালী জেলার দূরবর্তী উপকূলীয় দ্বীপ ও সংরক্ষিত বনে কিছু শিকারি বিষের ফাঁদে আবাসিক ও পরিযায়ী পাখি ধরছে, এবং সে বছরের ২ জানুয়ারি গঙ্গামতি সংরক্ষিত বনে দুই শতাধিক পাখি হত্যায় জড়িত থাকার অভিযোগে স্থানীয় লোকজন এক ব্যক্তিকে ধরে। এক কৃষক পত্রিকাটিকে বলেন, বিষ খাওয়া পাখি কয়েক মিনিটের মধ্যে অসুস্থ হয়ে উড়ার ক্ষমতা হারায়, তারপর শিকারিরা সেগুলো কুড়িয়ে স্থানীয়ভাবে ও রেস্তোরাঁয় বিক্রি করে। রাঙ্গাবালীর একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, পাখি শিকার দণ্ডনীয় অপরাধ।
কারেন্ট জাল ও তা পুড়িয়ে ফেলার কারণ
রাজশাহীতে জব্দ হওয়া দ্বিতীয় জিনিসটি ছিল প্রায় ৩০০ মিটার কারেন্ট জাল। দ্য ডেইলি স্টারের আইন বিষয়ক পাতায় ২০১৮ সালের ২৯ জানুয়ারি প্রকাশিত এক লেখায় বলা হয়, কারেন্ট জাল হলো মনোফিলামেন্ট সিনথেটিক নাইলন সুতায় তৈরি মাছ ধরার জাল, এবং মৎস্য রক্ষা ও সংরক্ষণ আইন, ১৯৫০-এর ২০০২ সালের সংশোধনীতে এই জাল পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়। লেখাটিতে বলা হয়, আইনে কারেন্ট জাল বহন, পরিবহন, মালিকানা, দখলে রাখা ও ব্যবহার দণ্ডনীয়, এবং তৈরি, প্রস্তুত, আমদানি, বাজারজাত ও মজুত করাও এর আওতায়।
লেখাটিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশে সরকারি সংস্থাগুলো বছরের পর বছর কারেন্ট জাল জব্দ করে পুড়িয়ে ফেলছে, এবং লেখকের যুক্তি ছিল, ব্যবহার আর পোড়ানোর এই চক্রে গরিব জেলেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন অথচ জালের ব্যবহার থামছে না। পদ্মার চরে জব্দ হওয়া জাল পুড়িয়ে ফেলাও সেই চর্চারই অংশ। জালটি কী কাজে ব্যবহার হয়েছিল, বন পরিদর্শক তা বলেননি; জাগো নিউজের প্রতিবেদনে একে কেবল আটক ব্যক্তির কাছ থেকে জব্দ করা অবৈধ জাল বলা হয়েছে।

সংখ্যায় বাংলাদেশের পরিযায়ী পাখি
বাংলাপিডিয়ার হিসাবে বাংলাদেশে ১৬টি বর্গ ও ৬৭টি গোত্রের ৬২৮ প্রজাতির পাখি আছে। এর মধ্যে ৩৮৮টি আবাসিক এবং ২৪০টি পরিযায়ী, যারা ১০টি বর্গ ও ৩৩টি গোত্রভুক্ত। আবাসিক প্রজাতির ৪১টিকে বাংলাদেশে সংকটাপন্ন হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যার ১৯টি মহাবিপন্ন, ১৮টি বিপন্ন এবং ৪টি ঝুঁকিপূর্ণ।
উৎসভেদে সংখ্যা আলাদা। রেজা ও পারভীন সিদ্দিকী ও অন্যদের (২০০৮) উদ্ধৃত করে বাংলাদেশে পরিযায়ী প্রজাতির সংখ্যা বলেছেন ১৭১, যার ১৬০টি শীতের অতিথি, ৬টি গ্রীষ্মের অতিথি এবং ১০টি পান্থ-পরিযায়ী বা বসন্তের অতিথি। যে তালিকাই ধরা হোক, দেশের পরিযায়ী পাখির বড় অংশই শীতের অতিথি, আর পাতি তিলিহাঁস, পিয়ং হাঁস ও চখাচখি সেই দলেরই।
বাংলাপিডিয়া আরও জানায়, দেশের বেশির ভাগ পোচার্ড বা ভুতি হাঁস দক্ষিণের মোহনা ও উত্তর-পূর্বের বিলে ছড়িয়ে থাকে, আর তৎকালীন বরিশাল, নোয়াখালী ও চট্টগ্রাম জেলার চরাঞ্চলে চখাচখির বড় ঝাঁক দেখা যেত। রাজশাহীর ২০২০ ও ২০২১ সালের দুটি গণনাই হয়েছিল জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে, শীত মৌসুমের মাঝামাঝি; আর ২০১৪, ২০২০, ২০২১ ও ২০২৫ সালের জানুয়ারির প্রতিবেদনগুলো পদ্মায় একই চিত্র তুলে ধরে: প্রতি শীতে চরে বিপুল সংখ্যায় হাঁস ও সৈকতের পাখি, আর কিছু মানুষ যারা এদের শিকার করে।
ছবি: Koshy Koshy / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY 2.0)
সূত্র: জাগো নিউজ ২৪, বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০১২ ও এর তফসিল (বিডিলজ, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ), মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯ (বিডিলজ), বাংলাপিডিয়া, এ এম সালেহ রেজা ও সেলিনা পারভীন, জাহাঙ্গীরনগর ইউনিভার্সিটি জার্নাল অব বায়োলজিক্যাল সায়েন্সেস (২০১৪), দ্য ডেইলি স্টার, প্রথম আলো (বাসস), দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, উইকিপিডিয়া




মন্তব্য
(০)