সরাসরিবাজারদর
আটা (প্যাকেটজাত)৫৮—আদা - আমদানিকৃত১৬৭—আদা - দেশী১৫৪—আমন চাল - মাঝারি৫৬—আমন চাল - মোটা৪৮—আমন চাল - সরু৭২—আয়োডিনযুক্ত লবণ (প্যাকেটজাত)৩২—কাঁচা মরিচ২১৮—খামারের মুরগী১৬২—খাসী৯০০—চিনি (দেশী)১৩২—ছোলা - গোটা৮৫—ডিম ফার্ম - লাল৪৭—পেঁয়াজ - দেশী৬০—বোরো চাল - মাঝারি৫৫—বোরো চাল - মোটা৪৭—বোরো চাল - সরু৬৬—মাংসঃ– গরু৭২৯—মুগ ডাল১২২—রসুন - আমদানিকৃত১৯২—রসুন - দেশী১৭৩—সয়াবিন তেল১৬৩—
হালনাগাদ ২ নভেম্বর ২০২৬
ঢাকা২৮°আংশিক মেঘলাআর্দ্রতা ৭৮%বাতাস ৪ কিমি/ঘ

শিকারি থেকে বন্যপ্রাণীর রক্ষক: শ্রীমঙ্গলের পরিচিত সংরক্ষণকর্মীর জীবনাবসান

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের পরিচিত মুখ সীতেশ রঞ্জন দেব ২০২৬ সালের ১৪ জুলাই নিজ বাসভবনে মারা গেছেন। তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।

শিকারি থেকে বন্যপ্রাণীর রক্ষক: শ্রীমঙ্গলের পরিচিত সংরক্ষণকর্মীর জীবনাবসান
পরিবেশ

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এবং দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের অন্যতম পরিচিত মুখ সীতেশ রঞ্জন দেব মারা গেছেন। ২০২৬ সালের ১৪ জুলাই, মঙ্গলবার সকালে শ্রীমঙ্গলে নিজ বাসভবনে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।

সবার কাছে 'সীতেশ বাবু' নামে পরিচিত এই সংরক্ষণকর্মী ওই দিন সকাল ৯টার দিকে মারা যান। তাঁর নাতি রাজদ্বীপ দেব জানান, সকালে হঠাৎ করেই সীতেশ রঞ্জনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়; পরিবারের সদস্যরা তাঁকে হাসপাতালে নেওয়ার জন্য রওনা দিলেও পথেই তাঁর মৃত্যু হয়। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ডায়াবেটিসসহ বার্ধক্যজনিত নানা জটিলতায় ভুগছিলেন এবং বাড়িতেই চিকিৎসাধীন ছিলেন। দুপুর ২টার দিকে তাঁর নিজ গ্রাম নোয়াগাঁওয়ে শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হয়।

কয়েক দশক ধরে সীতেশ রঞ্জন দেব শ্রীমঙ্গলের বন, চা-বাগান ও গ্রামগঞ্জ থেকে আহত, অসুস্থ ও বিপন্ন বন্যপ্রাণী উদ্ধার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের কাজ করে এসেছেন। নিজের বাড়ির আঙিনাকেই তিনি রূপ দিয়েছিলেন বাংলাদেশের সবচেয়ে ব্যতিক্রমী বেসরকারি বন্যপ্রাণী উদ্ধারকেন্দ্রগুলোর একটিতে। তাঁর মৃত্যুতে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে তৃণমূল পর্যায়ের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণের একটি অধ্যায়ের ইতি ঘটল।

শিকারি পরিবারের সন্তান


সীতেশ রঞ্জন দেবের জন্ম ১৯৫০ বা ১৯৫১ সালে, শ্রীমঙ্গলেই। তিনি এসেছিলেন একটি শিকারি পরিবার থেকে। তাঁর বাবা ও দাদা শ্রীমঙ্গল অঞ্চলে পরিচিত ছিলেন চিতাবাঘ, বন্য শূকরসহ মানুষ ও ফসলের জন্য বিপজ্জনক নানা প্রাণী শিকারের জন্য। যে সময়ের কথা, তখন দেশে শিকার আইনত নিষিদ্ধ ছিল না; পেশাদার শিকারি ও বনপথের গাইড হিসেবেই এলাকায় এই পরিবারের পরিচিতি গড়ে উঠেছিল।

ছোটবেলা থেকেই সীতেশ রঞ্জন বাবার সঙ্গে বনে যেতেন। বাবার মৃত্যুর পরও তিনি শিকার চালিয়ে গেছেন; পাশাপাশি বন্দুক মেরামতের কারিগর ও বনভ্রমণের গাইড হিসেবেও কাজ করতেন। সিলেট বিভাগের এই অঞ্চলের ঘন আধা-চিরসবুজ বন, চা-বাগান আর টিলাভূমি ছিল তাঁর নিত্যদিনের চেনা জগৎ। বন্যপ্রাণীর আচরণ, তাদের গতিবিধি ও বাসস্থান সম্পর্কে যে গভীর জ্ঞান শিকারি জীবনে তিনি অর্জন করেছিলেন, পরবর্তী জীবনে সেই জ্ঞানই তিনি কাজে লাগিয়েছেন প্রাণী রক্ষায়।

একজন শিকারির চোখে বন্যপ্রাণীকে দেখা থেকে একজন রক্ষকের চোখে দেখার এই রূপান্তর সহজে ঘটেনি। সীতেশ রঞ্জনের জীবনের এই মোড় ঘোরানো ঘটনাটি ঘটেছিল একেবারে আকস্মিকভাবে, বনের ভেতরেই।

যে ভালুক বদলে দিয়েছিল তাঁর জীবন


১৯৯১ সালে বনের ভেতরে হঠাৎ এক ভালুকের মুখোমুখি হয়ে পড়েন সীতেশ রঞ্জন দেব। ভালুকের আক্রমণে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন; মুখের একাংশ ও ডান চোখ হারান। শেষ পর্যন্ত গুলি করে ভালুকটিকে থামাতে পারলেও নিজে গুরুতর জখম অবস্থায় টানা তিন মাস হাসপাতালে কাটাতে হয় তাঁকে।

এই ঘটনাই তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। সুস্থ হয়ে ফিরে এসে সীতেশ রঞ্জন শিকার ছেড়ে দেন এবং আহত ও বিপন্ন প্রাণী উদ্ধারের কাজে নিজেকে সঁপে দেন। যে হাতে এক সময় তিনি বন্দুক ধরতেন, সেই হাতেই শুরু হয় আহত পাখি, সাপ আর বন্যপ্রাণীর সেবা-শুশ্রূষা। লোকালয়ে ঢুকে পড়া সাপ সরিয়ে দেওয়া, চোরাকারবারিদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া প্রাণীর চিকিৎসা করা এবং সুস্থ হয়ে ওঠার পর তাদের আবার বনে ফিরিয়ে দেওয়া হয়ে ওঠে তাঁর দৈনন্দিন কাজ।

২০১০ সালে আল জাজিরার এক প্রতিবেদনে সীতেশ রঞ্জন দেবকে অভিহিত করা হয়েছিল বাংলাদেশের একজন অগ্রণী সংরক্ষণকর্মী হিসেবে, যাঁর শিরোনাম ছিল 'শিকারি থেকে বন্যপ্রাণীর রক্ষক'। এই রূপান্তরের গল্পই তাঁকে দেশ-বিদেশে পরিচিতি এনে দিয়েছিল।

মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের একটি চা-বাগান; এই অঞ্চলেই জন্ম ও কর্মজীবন কেটেছে সীতেশ রঞ্জন দেবের। ছবি: Bongo Vongo / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের একটি চা-বাগান; এই অঞ্চলেই জন্ম ও কর্মজীবন কেটেছে সীতেশ রঞ্জন দেবের। ছবি: Bongo Vongo / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 2.0)

শ্রীমঙ্গলে গড়ে ওঠা এক অভয়ারণ্য


নিজের বাড়ির আঙিনাকে সীতেশ রঞ্জন রূপান্তরিত করেন একটি বন্যপ্রাণী চিকিৎসাকেন্দ্রে, যা পরে পরিণত হয় বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে (স্থানীয়ভাবে বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন নামেও পরিচিত)। শ্রীমঙ্গল উপজেলার রূপসপুর এলাকায় গড়ে ওঠা এই কেন্দ্রটি দেশের সবচেয়ে পরিচিত বেসরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত বন্যপ্রাণী উদ্ধারকেন্দ্রগুলোর একটি। ২০১৩ সালের একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সেই সময়ের প্রায় ২২ বছর আগে, অর্থাৎ তাঁর শিকার ছেড়ে দেওয়ার সময়কালেই।

এই কেন্দ্র একই সঙ্গে ছিল একটি ছোট চিড়িয়াখানার মতো, যেখানে দর্শনার্থীরা আসতে পারতেন। ২০১৩ সালের ওই প্রতিবেদন অনুযায়ী, কেন্দ্রটি প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত জনসাধারণের জন্য খোলা থাকত। সেখানে দর্শনার্থীরা হাত বাড়িয়ে খাওয়াতে পারতেন মায়া হরিণকে; দেখা মিলত কথা বলতে পারা ময়না, ঘুঘু, বনমোরগ, ধনেশ, ডাহুক ও পায়রার মতো নানা পাখির। ছিল গাছে ওঠা ফলভোজী সোনালি কাছিম, শূন্যে ভেসে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ ফুট পর্যন্ত যেতে পারা উড়ন্ত কাঠবিড়ালি, একটি সাদা বাঘ, দুটি ভালুক, এক জোড়া অজগর, গন্ধগোকুল, হনুমান, সজারু ও গোখরা সাপ।

ওই প্রতিবেদনেই উল্লেখ করা হয়েছিল, কেন্দ্রের একটি স্ত্রী অজগর প্রতিবেদন প্রকাশের প্রায় ছয় বছর আগে ৩৮টি এবং তার আগের বছরের জুনে আরও ৪০টি ডিম দিয়েছিল; ডিম ফুটে বের হওয়া বাচ্চাগুলোকে অবমুক্ত করা হয় লাউয়াছড়ার বনে। কেন্দ্রের ব্যয় মেটাতে সীতেশ রঞ্জন মাছ চাষের ওপর অনেকটাই নির্ভর করতেন, কারণ কাজটি মূলত চলত তাঁর নিজের উদ্যোগ ও সামর্থ্যে। তিনি দুটি ভালুক পুষেছিলেন, যাদের নাম রেখেছিলেন রাম্বো ও জাম্বো; একবার বন্যার পানি থেকে উদ্ধার করা একটি চশমাপরা হনুমানের (ফেয়ার'স লিফ মাঙ্কি) বাচ্চাকেও তিনি সেবা দিয়ে বাঁচিয়ে তুলেছিলেন।

এলাকাবাসী, বিশেষ করে শিশুদের কাছে এই কেন্দ্র ছিল বিস্ময় ও শেখার এক জায়গাও। দর্শনার্থীরা দেখতে পেতেন বাংলা শব্দ নকল করা ময়না, গাছে ওঠা কাছিম আর এক ডাল থেকে আরেক ডালে ভেসে যাওয়া উড়ন্ত কাঠবিড়ালি; হাত বাড়িয়ে খাওয়াতে পারতেন মায়া হরিণকে। জীবন্ত বন্যপ্রাণীকে কাছ থেকে দেখিয়ে এই কেন্দ্র নীরবেই তাদের রক্ষার পক্ষে কথা বলত, আর ঠিক এই যুক্তিই সীতেশ রঞ্জন তুলে ধরতে চাইতেন তাঁর প্রকাশ্য অবমুক্তি অনুষ্ঠানে ডেকে আনা কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও গ্রামবাসীর কাছে।

বাংলাদেশের বনে একটি চশমাপরা হনুমান (ফেয়ার'স লিফ মাঙ্কি) খাবার খাচ্ছে; বন্যার পানি থেকে উদ্ধার করা এই প্রজাতির একটি বাচ্চাকে একবার সেবা দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন সীতেশ রঞ্জন দেব। ছবি: Md. Tareq Aziz Touhid / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
বাংলাদেশের বনে একটি চশমাপরা হনুমান (ফেয়ার'স লিফ মাঙ্কি) খাবার খাচ্ছে; বন্যার পানি থেকে উদ্ধার করা এই প্রজাতির একটি বাচ্চাকে একবার সেবা দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন সীতেশ রঞ্জন দেব। ছবি: Md. Tareq Aziz Touhid / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

তিন হাজারের বেশি প্রাণী উদ্ধার


আল জাজিরার ২০১০ সালের প্রতিবেদনে বলা হয়, সীতেশ রঞ্জন দেব সে পর্যন্ত চিতাবাঘ, অজগর ও বন্য শূকরসহ তিন হাজারের বেশি প্রাণী উদ্ধার করে আবার বনে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর গড়া কেন্দ্র থেকে উদ্ধার, সুস্থ করে তোলা ও অবমুক্ত করা প্রাণীর সংখ্যা তিন হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এই কেন্দ্রে বাংলাদেশে প্রথম নথিভুক্ত ব্রহ্মদেশীয় ফেরেট-ব্যাজারের মতো বিরল প্রাণীরও ঠাঁই হয়েছিল।

যে প্রাণীদের তিনি রক্ষা করতে এগিয়ে এসেছিলেন, তাদের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের মধ্যেই লুকিয়ে ছিল এক গভীর তাৎপর্য। তাঁর বাবা ও দাদা পরিচিত ছিলেন মানুষ ও ফসলের কাছে চলে আসা চিতাবাঘ ও বন্য শূকর শিকারের জন্য; আর আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, সীতেশ রঞ্জন নিজে যে হাজারো প্রাণী উদ্ধার করেছিলেন, তার মধ্যে ছিল চিতাবাঘ, অজগর ও বন্য শূকরও। এক শিকারির নাতি হয়ে তিনি নিজের জীবদ্দশাতেই এই প্রাণীদের সম্পর্কে পরিবারের গভীর জ্ঞানকে তাদের মারার হাতিয়ার থেকে বদলে দিয়েছিলেন তাদের বাঁচানোর উপায়ে।

বনকর্মী, পুলিশ, এলাকাবাসী ও বিভিন্ন বন্যপ্রাণী সংগঠন বিপদে পড়া প্রাণীর খবর পেলেই ডাক দিতেন সীতেশ রঞ্জনকে। তাঁর কেন্দ্রে চিকিৎসা পেয়েছে বনবিড়ালের ছানা, অজগর, লাজুক লরিস, নানা জাতের বানর, পাখি ও ভালুক। সুস্থ হয়ে ওঠা প্রাণীদের তিনি অনেক সময় প্রকাশ্যে অবমুক্ত করতেন; সেসব অনুষ্ঠানে ডেকে নিতেন কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, সাংবাদিক ও গ্রামবাসীকে, যাতে মানুষের মধ্যে বন্যপ্রাণী রক্ষার বার্তা ছড়িয়ে পড়ে।

প্রাণীর প্রতি তাঁর এই নিবেদন ছিল প্রায় একক লড়াইয়ের মতো। যথাযথ অর্থ বা সরকারি সহায়তার অভাবেও তিনি কীভাবে কাজ চালিয়ে গেছেন, এমন প্রশ্নের জবাবে তাঁর সহজ কথাটি ছিল, 'কাজটা করে ফেলতে হয়' (তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত মংগাবে'র প্রতিবেদনে উদ্ধৃত)। নিজের কেন্দ্রটির জন্য নিয়মিত আর্থিক ও সরকারি সহায়তার দাবিও তিনি বারবার জানিয়েছিলেন।

২০১০ সালে এক সাংবাদিক তাঁর কেন্দ্রে গিয়ে দেখেছিলেন, সীতেশ রঞ্জন দ্রুত হাতে এক প্রাণীর পর আরেক প্রাণীর সেবা করে যাচ্ছেন। তাঁর ওপর এলাকাবাসীর আস্থা এতটাই ছিল যে বিপদে পড়া কোনো প্রাণীর খোঁজ পেলে মানুষ প্রথমেই তাঁর বাড়ির কথা ভাবত। যেসব প্রাণীকে সুস্থ করা সম্ভব, তাদের তিনি চিকিৎসা দিতেন; যেগুলো বনে ফিরে টিকতে পারবে না সেগুলোকে কেন্দ্রেই রাখতেন; আর বাকিগুলোকে সবল হয়ে উঠলে ফিরিয়ে দিতেন বনে। প্রাণীর খাবার, ওষুধ ও খাঁচার খরচ জোগাতে নিজের জমিতে মাছ চাষই ছিল তাঁর প্রধান অবলম্বন।

ব্রহ্মদেশীয় অজগর, বাংলাদেশের স্থানীয় একটি প্রজাতি; শ্রীমঙ্গলের কেন্দ্রে উদ্ধার হওয়া প্রাণীদের মধ্যে অজগর ছিল নিয়মিত (ছবিটি বন্দি অবস্থায় তোলা)। ছবি: Mariluna / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)
ব্রহ্মদেশীয় অজগর, বাংলাদেশের স্থানীয় একটি প্রজাতি; শ্রীমঙ্গলের কেন্দ্রে উদ্ধার হওয়া প্রাণীদের মধ্যে অজগর ছিল নিয়মিত (ছবিটি বন্দি অবস্থায় তোলা)। ছবি: Mariluna / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)

শ্রীমঙ্গল ও লাউয়াছড়া: বন্যপ্রাণীর আবাস


সীতেশ রঞ্জনের কর্মভূমি শ্রীমঙ্গল সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জেলায় অবস্থিত, যা দেশের চা-শিল্পের প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এই অঞ্চলের ঘন বন, চা-বাগান আর টিলা বহু বিপন্ন প্রজাতির শেষ আশ্রয়গুলোর একটি। শ্রীমঙ্গল থেকে প্রায় ৮ কিলোমিটার দূরে এবং ঢাকা থেকে প্রায় ১৬০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এই অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্যপ্রাণী আবাস।

শ্রীমঙ্গলকে প্রায়ই বলা হয় 'বাংলাদেশের চায়ের রাজধানী'; এখানেই অবস্থিত বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট। উপজেলাটির আয়তন প্রায় ৪৫০.৭৩ বর্গকিলোমিটার এবং ২০২২ সালের আদমশুমারিতে জনসংখ্যা ছিল প্রায় ৩,৬১,৮০১ জন। চা-বাগানের বাইরেও এই অঞ্চল জলাভূমি ও বনে সমৃদ্ধ: জনপ্রিয় পর্যটনস্থল মাধবপুর লেককে বাংলাদেশে বড় সাদা-পেট মানিকজোড়ের (গ্রেট হোয়াইট-বেলিড হেরন) একমাত্র নিশ্চিত আবাসস্থল হিসেবে উল্লেখ করা হয়; কাছের বাইক্কা বিল ও বৃহত্তর হাইল হাওর জলাভূমিতে ভিড় করে বহু জলচর পাখি। শ্রীমঙ্গলের এই রূপসপুরেই সীতেশ রঞ্জন দেব গড়ে তুলেছিলেন তাঁর ছোট চিড়িয়াখানা ও উদ্ধারকেন্দ্র।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের আয়তন প্রায় ১,২৫০ হেক্টর (১২.৫ বর্গকিলোমিটার)। ১৯৭৪ সালের বন্যপ্রাণী আইনের আওতায় ১৯৯৬ সালের ৭ জুলাই এটিকে জাতীয় উদ্যান ঘোষণা করা হয়। এটি মূলত আধা-চিরসবুজ ও মিশ্র পর্ণমোচী বন, যার বেশির ভাগই গৌণ অরণ্য হলেও কিছু অংশে আদি বনের অবশিষ্টাংশ টিকে আছে। এখানে প্রায় ৪৬০ প্রজাতির জীব রয়েছে বলে নথিভুক্ত।

এই উদ্যানে ছয় প্রজাতির প্রাইমেট (নরবানর) পাওয়া যায়, যার মধ্যে রয়েছে উল্লুক বা হুলক গিবন, চশমাপরা হনুমান (ফেয়ার'স লিফ মাঙ্কি), মুখপোড়া হনুমান ও লাজুক লরিস। ২০০৭ সালের এক শুমারিতে লাউয়াছড়া ও সংলগ্ন পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনে ১৭টি দলে মোট ৬২টি উল্লুক গণনা করা হয়েছিল। এ ছাড়া এখানে ২৪৬ প্রজাতির পাখি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী এবং ব্রহ্মদেশীয় অজগরসহ ছয় প্রজাতির সরীসৃপ রয়েছে। সীতেশ রঞ্জন দেবের উদ্ধার করা বহু প্রাণীকে ঠিক এই বনেই অবমুক্ত করা হতো।

লাউয়াছড়া মূলত বৃহত্তর পশ্চিম ভানুগাছ সংরক্ষিত বনেরই অংশ, আর ২০০৭ সালের উল্লুক শুমারি এই দুই বন জুড়েই চালানো হয়েছিল। চা-বাগান আর গ্রামের একেবারে গা ঘেঁষে থাকা সংরক্ষিত ও রক্ষিত বনের এই বিস্তার, যেখানে বন্যপ্রাণীরা প্রায়ই বিপদে পড়ত, সেটিই ছিল সীতেশ রঞ্জনের সুস্থ করে তোলা প্রাণীদের ফিরিয়ে দেওয়ার সবচেয়ে কাছের নিরাপদ ঠিকানা। যেমন তাঁর কেন্দ্রের অজগরের ডিম থেকে ফোটা বাচ্চাগুলোকে বন্দি না রেখে অবমুক্ত করা হয়েছিল এই লাউয়াছড়াতেই।

শ্রীমঙ্গলের কাছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে একটি উল্লুক বা হুলক গিবন; এই উদ্যানে ছয় প্রজাতির নরবানর রয়েছে। ছবি: Fabian Lambeck / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)
শ্রীমঙ্গলের কাছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে একটি উল্লুক বা হুলক গিবন; এই উদ্যানে ছয় প্রজাতির নরবানর রয়েছে। ছবি: Fabian Lambeck / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 4.0)

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ ও আইন


সীতেশ রঞ্জন দেব প্রকাশ্যেই বন্যপ্রাণী পাচার, বন উজাড় এবং কেন বন্যপ্রাণী ক্রমশ লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, এসব নিয়ে কথা বলতেন। তিনি সতর্ক করতেন যে বন সংকুচিত হওয়ায় মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত বাড়ছে, আর তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে উভয়েই। তাঁর কাজের একটি বড় অংশই ছিল চোরাকারবারিদের হাত থেকে উদ্ধার হওয়া প্রাণীর চিকিৎসা ও পুনর্বাসন।

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণী রক্ষায় বর্তমানে কার্যকর আইনি কাঠামো হলো বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন, ২০২৬, যা আগের ২০১২ সালের আইনকে রহিত করে প্রতিস্থাপন করেছে। এই আইন সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী হত্যা, ধরা ও বেচাকেনা নিষিদ্ধ করে এবং প্রাণী ও তাদের আবাস রক্ষায় আইনি সুরক্ষা দেয়। সীতেশ রঞ্জনের মতো সংরক্ষণকর্মীদের মাঠপর্যায়ের কাজ এই আইনি কাঠামোর ব্যবহারিক প্রয়োগেরই একটি দিক।

তাঁর কেন্দ্রে বারবার ঠাঁই পাওয়া ব্রহ্মদেশীয় অজগর বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থানীয় প্রজাতি। বিশাল এই অজগর প্রকৃতিতে গড়ে প্রায় ৩.৭ মিটার এবং কখনো কখনো ৫ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। আইইউসিএনের লাল তালিকায় ২০১২ সালের মূল্যায়ন থেকে প্রজাতিটিকে 'বিপদাপন্ন' (ভালনারেবল) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; আবাস ধ্বংস ও চামড়ার জন্য অতিরিক্ত শিকারকেই এর প্রধান হুমকি হিসেবে ধরা হয়। প্রজাতিটি সিআইটিইএস-এর দ্বিতীয় তফসিলভুক্ত। সীতেশ রঞ্জনের উদ্ধার ও অবমুক্তির কাজ ঠিক এমন বিপন্ন প্রজাতিদের টিকিয়ে রাখার লড়াইয়েরই অংশ ছিল।

বাংলাদেশে বন্যপ্রাণীর বৈচিত্র্য যেমন সমৃদ্ধ, তেমনি তা ক্রমশ চাপের মুখে। দেশে প্রায় ১১৩ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ৬২৮ প্রজাতির পাখি (৩৮৮টি আবাসিক ও ২৪০টি পরিযায়ী) এবং ১২৬ প্রজাতির সরীসৃপ নথিভুক্ত হয়েছে। অথচ এর মধ্যে প্রায় ২০১ প্রজাতিকে বিপন্ন বিবেচনা করা হয়, আর বড় কয়েকটি প্রাণী দেশ থেকে একেবারেই হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশ থেকে হারিয়ে যাওয়া প্রাণীর মধ্যে আছে এক-শিংওয়ালা গন্ডার, দুই-শিংওয়ালা গন্ডার, বান্টেং, জলার হরিণ, ভারতীয় নেকড়ে, বন্য মহিষ ও ময়ূর। ২০০০ সাল নাগাদ হিসাব অনুযায়ী দেশের আদি বনভূমির মাত্র প্রায় ৯ শতাংশ টিকে ছিল, আর টিকে থাকা প্রাণীদের ওপর চাপের অনেকটাই এই বন ধ্বংসেরই ফল।

এই চাপ স্পষ্ট দেখা যায় ঠিক সেসব প্রজাতির মধ্যেই, যাদের আশ্রয় লাউয়াছড়ার বন আর সীতেশ রঞ্জনের কেন্দ্র। বাংলাদেশের একমাত্র কপি বা এপ উল্লুককে আইইউসিএনের লাল তালিকায় 'বিপন্ন' (এনডেঞ্জারড) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে; এর বিস্তৃতি অঞ্চলজুড়ে সংখ্যা এক লাখের বেশি থেকে কমে পাঁচ হাজারের নিচে নেমেছে বলে অনুমান করা হয়, অর্থাৎ ৯০ শতাংশের বেশি পতন। লাউয়াছড়ায় পাওয়া লাজুক লরিসকেও ২০২০ সালে 'বিপন্ন' হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়; অবৈধ পোষা প্রাণীর ও ঐতিহ্যবাহী ওষুধের বাজারে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হওয়া প্রাণীদের একটি এটি। চোরাকারবারিদের কাছ থেকে উদ্ধার হওয়া কিংবা বন কাটার ফলে আহত ও এতিম হয়ে পড়া এসব প্রাণীর জন্য রূপসপুরের কেন্দ্রটির মতো আশ্রয়ই অনেক সময় ছিল হাতের নাগালের একমাত্র ঠিকানা।

এই ক্ষয়ক্ষতির সঙ্গে নিজের চোখে দেখা বাস্তবতাকে বারবার মিলিয়ে দেখতেন সীতেশ রঞ্জন। তিনি বলতেন, বন কাটা পড়ায় প্রাণীরা আবাস হারিয়ে চা-বাগান আর গ্রামে ঢুকে পড়ছে, যেখানে ভয়ে তাদের মেরে ফেলা হচ্ছে কিংবা বিক্রির জন্য ধরা হচ্ছে। এসব প্রাণীর চিকিৎসা করে অবমুক্ত করা এবং প্রতিটি অবমুক্তির সময় কর্মকর্তা, সাংবাদিক ও গ্রামবাসীর সঙ্গে কথা বলা ছিল এই চক্র থামানোর তাঁর নিজস্ব পথ। তাঁর কেন্দ্রের ভূমিকা কেবল প্রাথমিক চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না; প্রাণী রেখে, বংশবৃদ্ধি ঘটিয়ে ও অবমুক্ত করে এটি হয়ে উঠেছিল এমন একটি জায়গা যেখানে বিরল প্রজাতির নথিভুক্তিও ঘটত, যার মধ্যে ছিল দেশে প্রথম নথিভুক্ত ব্রহ্মদেশীয় ফেরেট-ব্যাজারের ঘটনাও।

শেষ বিদায়


মৃত্যুর পর সীতেশ রঞ্জন দেবের মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে, যাতে মানুষ ও তাঁর হাতে বেঁচে ওঠা প্রাণীরা শেষবারের মতো তাঁকে বিদায় জানাতে পারে। এরপর দুপুরে তাঁর নিজ গ্রাম নোয়াগাঁওয়ে শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

বছরের পর বছর সীতেশ রঞ্জনের কাজ মৌলভীবাজারের গণ্ডি ছাড়িয়ে নজর কেড়েছিল অনেক দূর পর্যন্ত। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে উঠে এসেছিল তাঁর গল্প, আর শ্রীমঙ্গলের দর্শনীয় স্থানের তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছিল তাঁর কেন্দ্রটি। তবু তিনি বলতেন, এই কাজ কেবল একটি পরিবারের কাঁধে ছেড়ে রাখা যায় না; প্রতিষ্ঠাতার মৃত্যুর পরও যেন কাজটি টিকে থাকে, সে জন্য নিয়মিত অর্থ ও সরকারি সহায়তার দাবি জানিয়ে গেছেন বারবার। তাঁর মৃত্যুতে এই কাজ এখন কে এগিয়ে নেবে, সেই প্রশ্নটিই খোলা থেকে গেল।

শিকারি জীবন ছেড়ে কয়েক দশক ধরে আহত ও বিপন্ন প্রাণীর সেবা করে সীতেশ রঞ্জন দেব হয়ে উঠেছিলেন দেশের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আন্দোলনের এক পরিচিত মুখ। নিজের সীমিত সামর্থ্যে গড়ে তোলা শ্রীমঙ্গলের কেন্দ্রটি, আর তাঁর হাতে বনে ফিরে যাওয়া হাজারো প্রাণী, তাঁর কাজের নীরব সাক্ষী হয়ে রইল।

ছবি: Nasir Khan Saikat / উইকিমিডিয়া কমন্স (CC BY-SA 3.0)। প্রচ্ছদের ছবিতে শ্রীমঙ্গলের কাছে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান, যেখানে সীতেশ রঞ্জন দেব তাঁর উদ্ধার করা বহু প্রাণীকে অবমুক্ত করতেন।

সূত্র: জাগো নিউজ ২৪; আল জাজিরা (২০১০); দ্য ডেইলি স্টার (২০১৩); মংগাবে; উইকিপিডিয়া; আইইউসিএন লাল তালিকা।

অনলাইন ডেস্কদা এগ্রো নিউজ

পরিবেশ

সম্পর্কিত খবর

পরিবেশ

বরফের রাজ্য গরম হচ্ছে দ্রুত, হিমবাহ হ্রদের বন্যায় সবচেয়ে বেশি মৃত্যু ভারতে

কপ৩১-এর আগে প্রকাশিত দুটি প্রতিবেদন বলছে, ১.৫ ডিগ্রির সীমা সাময়িক পেরোলেও বরফের ক্ষতি স্থায়ী হবে; জাতিসংঘের নেতৃত্বে আরেক গবেষণা বলছে, ১৮৩৫ সাল থেকে হিমবাহ হ্রদের বন্যায় ভারতে মারা গেছেন ৬ হাজার ১১৯ জন।

ডাউন টু আর্থ২ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
পরিবেশ

কপ৩১-এ ঋণ নয়, অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন চাইবে বাংলাদেশ

তুরস্কের আনতালিয়ায় কপ৩১-এর ১১-১২ নভেম্বরের ওয়ার্ল্ড লিডার্স সামিটে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান; বাংলাদেশ সেখানে অনুদানভিত্তিক জলবায়ু অর্থায়ন ও বড় নির্গমনকারী দেশগুলোর জবাবদিহি দাবি করবে।

বাসস২ নভেম্বর ২০২৬২ মিনিটের পড়া
মৎস্য

সিংড়ার লাড়কিবাড়ী বিলে বিষ, সামাজিক মাছ চাষে চার লাখ টাকার ক্ষতি

নাটোরের সিংড়ায় চার দশক ধরে সামাজিকভাবে মাছ চাষ হওয়া লাড়কিবাড়ী বিলে রাতে কীটনাশক দেওয়ায় প্রায় চার লাখ টাকার মাছ মরেছে; বিলের দখল নিয়ে বিরোধকে দায়ী করছেন চাষিরা।

সমকাল২ নভেম্বর ২০২৬১ মিনিটের পড়া

মন্তব্য

(০)